গদাদিত্য ও গদাধর।
9826
প্রকাশক
শ্রীক্ষীরোদচন্দ্র মজুমদার :১৯১, ঝামাপকুর লেন, কলিকাতা।
১৯৪৫ ১৯২৯৮ দুর্গা-সংখ্যা/সেবা
প্রিন্টার—শ্রীআশুতোষ মজুমদার বি, পি, এম’স্ প্রেস ২২।৫বি, ঝামাণকর লেন, কলিকাতা।
ভগবৎকপায় দীর্ঘকাল পরে আজ শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ ভাষ্য ও অনুবাদের সহিত প্রকাশিত হইল। শ্বেতাশ্বতরোপসিংখানি প্রসিদ্ধ প্রামাণিক উপনিষৎ- সমূহের মধ্যে অন্যতম। পূজ্যপাদ শঙ্কর ও রামানুজ প্রভৃতি আচার্য্যগণ শ্বেতা- শ্বতবোপনিষদের বহু বাক্য উদ্ধৃত করিয়া নিজ নিজ পক্ষ সমর্থন করিয়াছেন। ব্রহ্মসূত্রেও বিচার্য্য বিষয়রূপে শ্বেতাশ্বতরশ্রুতি গ্রহণ করিয়াছেন। অপরাপর প্রসিদ্ধ উপনিষদ্ হইতে শ্বেতাশ্বতরের বিশেষত্ব এই যে, ইহাতে অদ্বৈতবাদের কথা যেমন আছে, দ্বৈতবাদের কথাও তেমনই আছে। কাজেই দ্বৈতবাদী, দ্বৈতাদ্বৈত- বাদী ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী আচার্য্যগণ ইহা দ্বারা স্বপক্ষ সমর্থনের বিশেষ সুযোগ পাইয়াছেন। বস্তুতঃ ইহার মধ্যে এরূপ অনেক শ্রুতি দেখিতে পাওয়া যায়, যে সকলের প্রকৃত তাৎপর্য্য নির্ণয় করা বড়ই কঠিন হইয়া পড়ে। উদাহরণরূপে দুই একটা বাক্য উদ্ধৃত করিতেছি—
“জ্ঞাজ্ঞৌ দাবজাবীশনীশো” “দ্বা সুপর্ণা সযজা সখায়া” “জুষ্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশম্” ইত্যাদি।
এই সকল পড়িলে হঠাৎ বুঝিতে পারা যায় না যে, শ্রুতি দ্বৈতবাদ সমর্থন করিতেছেন, অথবা অদ্বৈতবাদ নির্দেশ করিতেছেন। আচার্য্য রামানুজ এইজাতীয় শ্রুতির সাহায্যে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ পক্ষই শ্রুতির অভিমত বলিয়া বুঝাইতে প্রয়াস পাইয়াছেন, অন্যান্য দ্বৈতবাদীরাও এই সকল শ্রুতি দ্বৈতবাদের পক্ষে নিয়োজিত করিয়াছেন। অবশ্য, শুদ্ধাদ্বৈতবাদী আচার্য্য শম্ভব আবার এই সমস্ত শ্রুতিকেই এমন কৌশলপূর্ণ ব্যাখ্যা দ্বারা অদ্বৈতবাদের অনুকূলে আনিয়াছেন, তাহা দেখিলে সহজেই মনে হয় যে, ব্রহ্মাদ্বৈত প্রতিপাদন ভিন্ন অন্য কোন অর্থেই ঐ সকল শ্রুতির তাৎপর্য্য হইতে পারে না।
সা-গবাদীরা— “অজানেকা লোহিতশুক্লকৃষ্ণাং বংশীঃ প্রজাঃ স্বজনানাং সরূপাঃ।”
এইশ্রুতি অবয়বনে প্রকৃতিবাদ স্থাপন ও সমর্থন করিয়াছেন, এই ‘অজা’শ্রুতি এই শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেরই অন্তর্গত।
কিন্তু আচার্য্য শঙ্কর সে কথা স্বীকার করেন নাই। তিনি এই শ্রুতিকথিত “লোহিতশুক্লকৃষ্ণাং” কথায় সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ অর্থ গ্রহণ না করিয়া তেজ, জল ও পৃথিবী অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন, কেন না, তেজের বর্ণ লোহিত, জলের বর্ণ শুক ও পৃথিবীর বর্ণ কৃষ্ণ। এই কারণে তাহার মতে ঐ ভূতত্রয়কে লক্ষ্য করিয়া শ্রুতিতে “লোহিত শুল্কৃষ্ণাং” বলা হইয়াছে, কিন্তু সাংখ্যসম্মত প্রকৃতিকে লক্ষ্য করিয়া নহে। বলা আবশ্যক যে, ব্রহ্মসূত্র বেদান্তদর্শনের “রূপকোপকুপ্টিশ্চ” এই সূত্র হইতেই প্রধানতঃ ঐ প্রকার ব্যাখ্যার উপাদান সংগ্রহ করিয়াছেন।
তাহার পর সাংখ্যবাদীরা “ঋষিংপ্রসূতংকপিলং” ইত্যাদি যে শ্রুতিবচনের সাহায্যে সা‘খ্যপ্রণেতা কপিলের স্বতঃ সিদ্ধ জ্ঞানমহিমা কীর্ত্তন করেন, সেই শ্রুতিও এই শ্বেতাশ্বতরেবই বৃক্ষিগত। ভাষ্যকার এ শ্রুতিরও অন্যপ্রকার অর্থ করিয়া সাংখ্যবাদের দুর্ব্বলতা প্রমাণ করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন।
এই শ্বেতাশ্বতরোপনিষদের ভাষা অপেক্ষাকৃত সরল ও প্রসাদগম্ভীর এবং অনেকটা আধুনিক সঙ্ স্কভাষার অনুরূপ, তথাপি স্থানে স্থানে ভাষ্যের সাহায্য ব্যতীত অর্থ সঙ্গতি করা কঠিন বলিয়া মনে হয়। ব্যাখ্যাকর্ত্তারাও কোন কোন দুর্বোধ্য অংশ অতি অল্প কথায় এমন অস্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করিয়াছেন যে, তাহা দ্বারা শ্রুতির প্রকৃত তাৎপর্য্য নির্ণয় করা অসম্ভব হইয়া পড়ে।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের অনেকগুলি ব্যাখ্যাগ্রস্ত আছে। তন্মধ্যে আচার্য্য শঙ্কবকৃত ভাষ্য, শঙ্করানন্দকৃত দীপিকা, নারাযণকৃত দীপিকা, বিজ্ঞানকৃত বিবরণ, বিশেষ উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলি মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছে। আমরা এই সংস্করণে কেবল শান্ধরভাষ্যমাত্র সন্নিবেশিত করিয়া উহারই অনুবাদ দিয়াছি। আচার্য্য শঙ্কারের উপনিষদ্-ব্যাখ্যা সর্ব্বজনবিদিত ও সুধীসমাজে সমাদৃত। শঙ্করের ভাষা—ভাষা, ভাব, গাম্ভীর্য্য ও যুক্তিবাহুল্যগুণে অতুলনীয় ও সর্ব্বত্র প্রশংসিত, কিন্তু বড়ই বিস্ময়ের বিষয় এই যে, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ভাষা সেরূপ নহে। ইহাতে ভাষার প্রসন্নতা নাই, ভাবের গভীরতা নাই, এবং তর্কযুক্তিরও প্রাচুর্য্য বা দৃঢ়তা নাই। সাধারণ টীকা-ব্যাখ্যায় যাহা থাকে, তাহার অধিক ইহাতে কিছু পাওয়া যায় না, এবং ভাষ্যের নিয়ম পদ্ধতিও ইহাতে সম্পূর্ণ দৃষ্ট হয় না। বিশেষতঃ ভাষ্যের প্রারম্ভে যে একটা বিস্তৃত ভূমিকা লিখিত আছে, তাহাও আচার্য্য শঙ্করের লিখনভঙ্গীর অনুরূপ নহে। আচার্য্য শঙ্কর যেখানে যাহা স্থাপন বা খণ্ডন করিয়াছেন, সর্ব্বত্র শ্রুতিবাক্যকে প্রধান প্রমাণরূপে গ্রহণ করিয়াছেন, এবং সেই সকল শ্রুতিপ্রমাণের উপর নির্ভর করিয়াই নানাবিধ যুক্তি ও তর্কের সাহায্যে স্বমত সংস্থাপন করিয়াছেন এবং পরমত খণ্ডন করিয়াছেন। তিনি সে সকল স্থলে অতি অল্পপরিমাণেই পুরাণবচনের সাহায্য লইয়াছেন, কিন্তু শ্বেতাশ্বতরের ভূমিকায় পুরাণ বচনেরই সমধিক প্রাচুর্য্য দেখা যায়।
আরও এক কথা, আচার্য্য শঙ্করকৃত সমস্ত ভাষ্যের উপরই মহামতি আনন্দগিরির টীকা দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু শ্বেতাশ্বতর ভাষ্যের উপর আনন্দগিরিকৃত টীকা আছে বলিয়া এ পর্য্যন্ত জানা যায় নাই।
এই সকল কারণে অনেকে মনে করেন যে, শ্বেতাশ্বতর-উপনিষদের যে ব্যাখ্যা শাঙ্করভাষ্য নামে প্রচলিত আছে, তাহা বস্তুতঃ আচার্য্য শঙ্করের লেখনীপ্রসূত নহে। অপর কোনও পণ্ডিত আপনার ব্যাখ্যাটাকে সুধীসমাজে আদরণীয় করিবার অভিপ্রায়ে শঙ্করের নামাঙ্কিত করিয়া চালাইয়াছেন, প্রকৃতপক্ষে উহা শঙ্করকৃত নহে। এ বিষয়ে তত্ত্বনির্ধারণের ভার সহৃদয় পাঠকবর্গের উপরেই সমর্পণ করিয়া আমরা এখানেই বিশ্রাম গ্রহণ করিলাম। ইতি—
ভাগবত চতুষ্পাটী কলিকাতা
শ্রীদুর্গাচরণ শর্ম্মা
১লা শ্রাবণ ১৩৩৮ সাল
অধ্যায়। শ্রুতিব সংখ্যা।
১। ব্রহ্ম জগতের কিরূপ কারণ? এবং সৃষ্টি স্থিতি ও সংহারের কারণ কি? তদ্বিষয়ে ব্রহ্মবাদী ঋষিগণের অনুসন্ধান ১—১ ২। কাল ও স্বভাবাদির কারণতাবাদ খণ্ডন... ১।—১ ৩। ঋষিগণকর্তৃক ধ্যানযোগে জগৎকারণ ব্রহ্মদর্শন... ১।৩—৪ ৪। নদীরূপে সংসারের বর্ণনা... ১।—৫ ৫। জীবের সংসারচক্রে ভ্রমণ ও মুক্তিলাভ, উভয়ের কারণ নির্দেশ... ১।৬—৮ ৬। জীব ও ঈশ্বরের ভেদনির্দেশ, ক্ষরাক্ষর বিভাগ প্রদর্শন এবং অক্ষর জ্ঞানে মুক্তির উপদেশ... ১.৯—১২ ৭। অগ্নি ও তৈলাদির দৃষ্টান্ত দ্বারা ব্রহ্মের ব্যক্তাব্যক্তভাব সমর্থন... ১।১৩—১৬ ৮। ধ্যানযোগ ও প্রাণায়ামক্রম নির্দেশ.. ২।১—৯ ৯। যোগ সাধনার স্থান নির্দেশ... ২।—১০ ১০। যোগসিদ্ধির পূর্ব্ব চিহ্ন নিরূপণ... ২।—১১ ১১। জীব ও পরমাত্মার ঐক্যদশন ও বন্ধক্ষয় কথন... ২।১২—১৫ ১২। পরমাত্মার স্বরূপ ও ব্যাপকতা প্রদর্শন... ২।১৬—১৭ ১৩। একই পরমেশ্বরের ঈশিত্রীশিতব্যভাব সমর্থন... ৩।১—৩ ১৪। পরমেশ্বরের স্মৃতিপূর্ব্বক প্রার্থনা... ৩।৪—৭ ১৫। পরমেশ্বর সম্বন্ধে জ্ঞানিগণের অনুভূতি প্রদর্শন... ৩।৮—১২ ১৬। অন্তর্যামী ও অঙ্গুষ্ঠমাত্র পুরুষেরস্বরূপ কথন... ৩।—১৩ ১৭: পুরুষের সর্বাত্মভাব বা বিরাট রূপ কথন... ৩।১৪—১৬ ১৮। পুরুষের দেহাবস্থান ও ইন্দ্রিয়সম্বন্ধবাহিত্য নিরূপণ... ৩।১৭—১৮ ১৯। পুরুষের নিরতিশয় অণুত্ব ও মহত্ত্বনিদ্দেশ ও তদ্বিজ্ঞানে শোক-দুঃখনিবৃত্তি কথন... ৩.১৯—২০ ২০। উক্তরূপে বিদ্বদনুভব প্রদর্শন... ৩।—২১ ২১। পুনশ্চ পরমেশ্বরের নানাবিধ বর্ণ রচনায় স্বভাব ও স্বরূপ বর্ণনা এবং তাহার নিকট সদ্বুদ্ধি প্রার্থনা... ৪।—১ ২২। পরমেশ্বরের স্ত্রী-পুরুষাদিভাব ও সর্বাত্মভাব নিরূপণ... ৪।২—৪ ২৩। জগৎপ্রকৃতিবে।ধক অজাশ্রুতি... ৪।—৫ ২৪। জীব ও অন্তর্যামিপ্রকাশক ‘দ্বা সুপর্ণা’ শ্রুতি.. ৪.৬—৭ ২৫। ঋক্ প্রভৃতি বেদ ও যজ্ঞাদির অধিষ্ঠানত্ব প্রতিপাদন... ৪.৮—৯ ২৬। মায়া ও মায়ী পরমেশ্বরের স্বরূপ ও সর্ব্বকারণত্ব নির্দেশ ৪।১০—১৫ ২৭। পরমেশ্বরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব ও তদ্বিজ্ঞানে অমৃতত্বলাভ ৪।১৬—১৮ ২৮। কালত্রয়েই পরমেশ্বরের কূটস্থভাব, এবং তুলনারহিত হইলেও মনোগ্রাহ্যত্ব প্রতিপাদন... ৪।১৮—২১ ২৯। পরমেশ্বরের নিকট পুত্রাদির অহিংসা প্রার্থনা.. ৪।—২২
শাঙ্করভাষোপেতা।
প্রথমোহধ্যায়ঃ।
( ভাষ্যভূমিকা)
শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ ইদং বিবরণমল্পগ্রন্থং ব্রহ্মজিজ্ঞাসুনাং সুখাববোধায়া- রভ্যতে। চিৎসদানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মস্বরূপোহপ্যাত্মা স্বাশ্রয়য়া স্ববিষয়য়া অবিদ্যয়া স্বানুভবগম্যয়া সাভাসয়া প্রতিবন্ধ স্বাভাবিকশেষপুরুষার্থঃ প্রাপ্তাশেষা- নর্থোহবিদ্যাপরিকল্পিতৈরেব সাধনৈরিষ্টপ্রাপ্তিঞ্চাপুরুষার্থং পুরুষার্থং মন্যমানো
ব্রহ্মজিজ্ঞাসুগণ যাহাতে সহজে বুঝিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে শ্বেতাশ্বতরো- পনিষদের নাতি বৃহৎ এই বিবরণ বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে। আত্মা (জীব) স্বভাবতঃ এক অদ্বিতীয় সৎ চিৎ আনন্দাত্মক ব্রহ্মস্বরূপ হইয়াও স্বাশ্রিত অবিদ্যার বিষয়ীভূত(কবলিত) হয়।(১) অবিদ্যা পদার্থটা সকলেরই ‘অহমজ্ঞঃ’ ইত্যাকার অনুভবগম্য, এবং চিদাভাসের সহিত সংবদ্ধ; আত্মা সেই অবিদ্যার আবরণে পতিত হইয়া আপনার স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞানৈশ্বর্য্য প্রভৃতি সমস্ত পুরুষার্থে বঞ্চিত হয়, এবং সর্ব্ববিধ অনর্থ বা দুঃখরাশি প্রাপ্ত হয়। তখন যাহা প্রকৃত পুরুষার্থ নহে, তাহাকেই আপনার অভীষ্ট পুরুষার্থ
(১) অবিদ্যা অর্থ অজ্ঞান। অবিদ্যা ব্রহ্মের শক্তি। শক্তি চিরদিনই শক্তি- মানে অবস্থান করে; সুতরাং ব্রহ্মশক্তি অবিদ্যাও ব্রহ্মাশ্রিত। অবিদ্যা যেমন ব্রহ্মকে অবলম্বন করিয়া থাকে, তেমনই আবার ব্রহ্মকে নিজের বিষয়ীভূতও করে, ব্রহ্মকে সকলের নিকট প্রকাশ পাইতে দেয় না; তাহার ফলেই অজ্ঞ জনেরা “ব্রহ্ম নাস্তি, ন ভাতি”—ব্রহ্ম নাই, ব্রহ্ম প্রকাশ পাইতেছে না, বলিয়া ব্রহ্মের অপলাপ করিয়া থাকে। ঐরূপ অবিদ্যা দ্বারা আবৃত হইয়াই অখণ্ড অনন্ত ‘নিত্য চিৎস্বরূপ ব্রহ্ম জীবভাব প্রাপ্ত হয়, এবং অবশভাবে বিবিধ যোনিতে ভ্রমণ করিতে করিতে সুখ-দুঃখময় কর্মফল ভোগ করিয়া থাকে। জীব যে, অজ্ঞানে আবৃত, তদ্বিষয়ে “অহমজ্ঞঃ মামহং ন জানামি”—আমি অজ্ঞ—আমি আমাকে জানি না, ইত্যাদি অনুভবই প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
মোক্ষার্থমলভমানঃ মকরাদিভিরিব রাগাদিভিরিতস্ততঃ সমাকৃষ্যমাণঃ সুরনরতির্য্য- গাদিপ্রভেদ-ভেদিত-নানাযোনিষু সঞ্চরন্ কেনাপি সুকৃত-কৰ্ম্মণা ব্রাহ্মণাদ্য- ধিকারিশরীরং’ প্রাপ্ত ঈশ্বরার্থ-কর্মানুষ্ঠানেনাপগতরাগাদিমলোহনিত্যাদিদশনে- নোৎপন্নেহামুত্রার্থভোগবিরাগ উপেত্যাচার্য্যমাচার্য্যদ্বারেণ বেদান্তশ্রবণাদিনা ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ ইতি ব্রহ্মাত্মতত্ত্বমবগম্য নিবৃত্তাজ্ঞান-তৎকার্য্যো বীতশোকো ভবতি। অবিদ্যানিবৃত্তিলক্ষণস্য মোক্ষস্য বিদ্যাধীনত্বাৎ যজ্যতে চ তদর্থোপনিষদারম্ভঃ। ১
তথা, তদ্বিজ্ঞানাদমৃতত্বম্—“হমেবং বিদ্বানমৃতইত ভবতি, নানুঃ পন্তা অয়নায় বিদূতে”। “ন চেদিহাবেদীৎ মহতী বিনষ্টঃ”। “য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি”। “কিমিচ্ছন্ কস্য কামায় শরীরমনুসংজরেং”। “তং বিদিত্বা ন লিপ্যতে কৰ্ম্মণা পাপকেন,” “তরতি শোকমাত্মবিৎ”। “নিচায্য তৎ মৃত্যুমুখাৎ প্রমুচ্যতে”।
বলিয়া মনে করে, এবং পরম পুরুষার্থ মোক্ষলাভে অসমর্থ হইয়া-সংসার- সাগরে মকর-কুম্ভীরাদিসদৃশ রাগদ্বেষাদি দোষে ইতস্ততঃ আকৃষ্ট হইয়া সুর নর পশু পক্ষি প্রভৃতিভেদে ভিন্ন নানাবিধ যোনিতে পরিভ্রমণ(জন্মগ্রহণ) করিতে থাকে। এইরূপ পরিভ্রমণ করিতে করিতে কখনও বিশেষ পুণ্য কম্মের ফলে ব্রহ্ম-জ্ঞানলাভের উপযুক্ত অধিকারা ব্রাহ্মণাদি শরীর প্রাপ্ত হয়। প্রাপ্ত হইয়া ঈশ্বরার্পণবুদ্ধিতে(নিষ্কাম ভাবে) কৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা রাগদ্বেষাদি দোষরাশি দূরীকৃত করতঃ চিত্তের বিশুদ্ধি সম্পাদন করে, এবং ব্রহ্মের নিত্যতা ও ঐহিক বা পারলৌকিক বিষয়-ভোগের অনিত্যতা ও ক্ষয়াদি দোষ দর্শন করিতে করিতে তদ্বিষয়ে বৈরাগ্য লাভ করে। অনন্তর উপযুক্ত আচার্য্য-সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিকট বেদান্ত শ্রবণ, তৎপরে মনন ও নিদিধ্যাসন দ্বারা আত্মা ও ব্রহ্মের অভেদ বা একত্ব অবগত হন। সেই ব্রহ্মাত্মৈক্য জ্ঞানে অজ্ঞান ও অজ্ঞানফল(সুখদুঃখাদিভোগ) সমূলে বিলুপ্ত হইয়া যায়, তখন জীব বীতশোক(ত্রিবিধ দুঃখের কবল হইতে মুক্ত) হন। অবিদ্যা-নিবৃত্তিই মোক্ষের স্বরূপ অর্থাৎ অবিদ্যা-নিবৃত্তি আর মুক্তি ফলতঃ একই কথা। বিদ্যা (স্বরূপ জ্ঞান) ব্যতীত অবিদ্যার নিবৃত্তি হয় না; এই কারণে-বিদ্যা দ্বারা অবিদ্যা-নিরাসের জন্য উপনিষদের আরম্ভ করা সঙ্গতই হইতেছে। ১
বিশেষতঃ আত্মবিজ্ঞানেই যে, অমৃতত্বলাভ হয়, মোক্ষপ্রাপ্তি হয়, তাহা নিম্নো- দ্ধৃত শ্রুতি স্মৃতি পুরাণাদি প্রমাণ হইতেও অবধারিত হয়। যথা—(শ্রুতি প্রমাণ—) ‘তাহাকে(আত্মাকে) যথোক্ত প্রকারে অবগত হইলে জীব এই দেহেই অমৃতত্ব লাভ করে(মুক্ত হয়)।’ ‘মুক্তিলাভের আর দ্বিতীয় পথ নাই’, ‘এই দেহে য’দ আত্মাকে জানিতে না পারে, তাহা হইলে অত্যন্ত ক্ষতি(অধোগতি) হয়।’ ‘যাহারা ইহাকে(ব্রহ্মকে) জানে, তাহারা মরণভয় অতিক্রম করে’, ‘[ আত্মার স্বরূপাবগত জীব] কিসের ইচ্ছায় বা কিসের কামনায় শরীরানুগত হইয়া দুঃখানু- ভব করিবে’? ‘তাহাকে জানিলে পর আর পাপকর্ম্মে লিপ্ত হয় না, অর্থাৎ পুণ্য
“এতদ্যো বেদ নিহিতং গুহায়াম্, সোহবিদ্যাগ্রন্থিং বিকিরতীহ সোম্য।” “ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্চিদ্যন্তে সর্ব্বসংশয়াঃ। ক্ষীয়ন্তে চাস্য কম্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে ॥”
“যথা। নদ্যঃ শ্লথমানাঃ সমুদ্রে হন্তং গচ্ছন্তি নামরূপে বিহায়।
তথা বিদ্যাত্মকপাদিমুক্তঃ পরং পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্ ॥”
“স যো হ বৈ তৎ পরমং ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি।” “স যো হ বৈ তদচ্ছায়মশরীরমলোহিতং শুভ্রমক্ষরং বেদয়তে যস্তু সোম্য। স সব্বমবৈতি”, “তৎ বেদ্যং পুরুষং বেদ যথা মা বো মৃত্যুঃ পরিব্যথাঃ।” “তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ।” “বিদ্যয়ামৃতমশ্রুতে।” “সর্ব্বাণি রূপানি বিচিত্য ধীরাঃ প্রেত্যাত্মাল্লাকাদমৃতা ভবন্তি।” “অপহত্য পাপ্যানমনন্তে স্বর্গে লোকে স্মেরে প্রতিষ্ঠিততি।” “তন্ময়া অমৃতা বৈ বভুবুঃ” “তদাত্মতত্ত্বং প্রসমীক্ষ্য
বা পাপকৰ্ম্ম তাহাকে স্পর্শ করে না‘। ‘আত্মবিদ পুরুষ শোকাতীত হয়’, ‘সেই আত্মাকে জানিলে মৃত্যুর অধিকার হইতে মুক্ত হয়‘। ‘যে লোক গুহানিহিত এই আত্মাকে জানে, হে সোম্য, সে লোক অবিদ্যা-গ্রন্থি চিন্ন করে,’ ‘সেই পবাবর অর্থাৎ ব্রহ্মাদি অপেক্ষাও উত্তম পরমাত্মাকে অবগত হইলে, হৃদযের অবিদ্যা-গ্রন্থ ও সব্বপ্রকার সংশয় ছিন্ন হইয়া যায়, এবং তাহার পূর্ব্বসঞ্চিত কম্মরাশি ক্ষয় প্রাপ্ত হয়‘। ‘নদীসমূহ যেমন চলিতে চলিতে সমুদ্রে যাইয়া অন্তমিত হয়, সমুদ্রে মিলিয়া এক হইয়া যায়, এক হইবার পূর্ব্বেই তাহারা নিজ নিজ নাম-গঙ্গা যমুনা প্রভৃতি সংজ্ঞা ও রূপভেদ বিসজ্জন দেয়, ঠিক তেমনই আত্মজ্ঞ পুরুষ স্বীয় নামরূপাদি ভেদ পরিত্যাগ করিয়া সেই পরাংপর দিব্য পুরুষকে প্রাপ্ত হয়।’ ‘যে কোন লোক ব্রহ্মকে জানে, সেই লোকই ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হয়‘। ‘যে ব্যক্তি অরূপ(অচ্ছায়) অশরীর ও শোণিত- সম্পর্কশূন্য শুভ্র জ্যোতিৰ্ম্ময় অক্ষর ব্রহ্মকে জানে, হে সোম্য, তিনি সমস্ত জগৎই অবগত হন’, ‘সেই বেদ্য-অবশ্য জ্ঞাতব্য ব্রহ্মপুরুষকে অবগত হও, যাহার ফলে মৃত্যু তোমাদিগকে পীড়াদানে সমর্থ হইবে না’, ‘যিনি জীব-ব্রহ্মের একত্ব দর্শন করেন, তদবস্থায় তাঁহার শোকই বা কি, আর মোহই বা কি? সে সব তাহার চলিয়া যায়‘। ‘বিদ্যার(উপাসনার) দ্বারা অমৃত(মোক্ষ) প্রাপ্ত হয়’। ‘বুধগণ জাগতিক সমস্ত রূপ(বস্তু) অনুসন্ধান করিয়া অর্থাৎ নিত্যানিত্য ও সত্য মিথ্যার বিবেক করিয়া ইহলোক হইতে প্রস্থান করিবার পর অমৃত(মুক্ত) ‘হন’। ‘জ্ঞানী পুরুষ পাপপুণ্য প্রতিহত করিয়া সর্ব্বোত্তম অনন্ত স্বর্গ লোকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, অর্থাৎ ব্রহ্মে মিলিত হয়‘। ‘যাহারা তন্ময় হইয়াছেন, তাহারা অমৃত হইয়াছেন‘। ‘যে কোন দেহী সেই আত্মতত্ত্ব সাক্ষাৎকার করিয়া শোকাতীত কৃতার্থ হয়, সেখানেই তাহার সর্ব্ব প্রয়োজন পরিসমাপ্ত হয়, আর কিছু পাইবার
দেহী, একঃ কৃতার্থো ভবতে বাতশোকঃ।” “য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি।” ঈশং তৎ জ্ঞাত্বামৃতা ভবন্তি। তদেবোপয়ন্তি।”
“নিচায্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি।” “তমেবং জ্ঞাত্বা মৃত্যুপাশাংশ্চিনত্তি।” “যে পূর্ব্বং দেবা ঋষয়শ্চ তৎ বিদুস্তেষাৎ শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্।” “বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে।” “কৰ্ম্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্তা মনীষিণঃ। জন্মবন্ধবিনির্ম্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্।” “সর্ব্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বুজিনং সন্তরিষ্যসি ॥” “জ্ঞানাগ্নিঃ সর্ব্বকস্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা।” “এতদ্বুদ্ধা বুদ্ধমান্ স্যাৎ কৃতকর্ত্তাশ্চ ভারত ॥” “ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্।” “সব্বেষামপি চৈতেযামাত্মজ্ঞানং পরং স্মৃতম্ ॥” তদ্ধ্যাগ্রং সর্ব্ববিদ্যানাং প্রাপ্যতে হ্যমৃতং ততঃ। প্রাপ্যৈতৎ কৃতকৃত্যো হি দ্বিজো ভবতি নানুথা ॥
বা চাহিয়া থাকে না‘। ‘যাহারা ইহা জানে, তাহাবাই অমৃত(মুক্ত) হয়’। “সেই পরমেশ্বরকে জানিয়া অমৃত হয়, তাহারা তাহাকেই প্রাপ্ত হয়‘। ‘ইহাকে অবগত হইয়া আত্যন্তিক শান্তি প্রাপ্ত হয়‘। সেই আত্মাকে যথোক্তপ্রকার জানিয়া মৃত্যু-বন্ধন ছেদন করে, অর্থাৎ আর মৃত্যুর অধীন হয় না‘। ‘পূর্ব্বে যে সকল দেবতা ও ঋষি তাহাকে অবগত হইয়াছেন, তাহাদেরই শাশ্বত শান্তি, অপর সকলের নহে‘।
‘বুদ্ধিযুক্ত(জ্ঞানী) পুরুষ ইহলোকেই পুণ্য পাপ উভয়ই ত্যাগ করেন’। বুদ্ধিযুক্ত মনীষিগণ কৰ্ম্মলভ্য শুভাশুভ ফল পরিত্যাগ করিয়া জন্মরূপ বন্ধন হইতে নির্ম্মুক্ত হইয়া অনাময়(নিত্য) পদ প্রাপ্ত হন‘।[হে অর্জুন, তুমি] একমাত্র জ্ঞানরূপ ভেলার সাহায্যে সমস্ত পাপসাগর সমুত্তীর্ণ হইবে‘। হে অর্জুন,[অগ্নি যেরূপ কাষ্ঠরাশিকে ভস্ম করে], সেইরূপ জ্ঞানাগ্নিও সমস্ত কর্ম্মকে ভস্মীভূত করে‘। ‘হে ভরতবংশসম্ভূত, মানুষ এই তত্ত্ব অবগত হইয়া প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে এবং কৃতকৃত্যতা প্রাপ্ত হয়‘। ‘তাহার পর যথাযথরূপে মদীয় তত্ত্ব জানিয়া অনন্তর আমাতে প্রবেশ করে অর্থাৎ মুক্তি- লাভ করে‘। ‘সমস্ত জ্ঞানের মধ্যে আত্মজ্ঞান পরম শ্রেষ্ঠ, এবং সর্ব্ববিদ্যার মধ্যে উহাই শ্রেষ্ঠ বিদ্যা; যেহেতু উহা হইতেই অমৃত বা মুক্তিফল লব্ধ হয়‘।
৫
এবং যঃ সর্ব্বভূতেষ্ পশ্যত্যাত্মানমাত্মনা। স সব্বসমতামেত্য ব্রহ্মাভ্যেতি সনাতনম্ ॥ সম্যগদর্শনসম্পন্নঃ কস্মভিন’ স বধ্যতে। দর্শনেন বিহীনস্ত সংসারং প্রতিপদ্যতে ॥ কৰ্ম্মণা বধ্যতে জন্তুর্বিদ্যয়া চ বিমুচ্যতে। তস্মাৎ কৰ্ম্ম ন কুব্বন্তি যতয়ঃ পারদর্শিনঃ। জ্ঞানং নিঃশ্রেয়সং প্রাহ্বৃদ্ধা নিশ্চয়দর্শিনঃ ॥ তস্মাজ্ঞানেন শুদ্ধেন মুচ্যতে সব্বপাতকৈঃ ॥” “এবং মৃত্যুঞ্জায়মানং বিদিত্বা জ্ঞানেন বিদ্বাংস্তেজঅভ্যেতি নিত্যম্। ন বিদ্যতে হ্যন্যথা তস্য পন্থাস্তং মত্বা কবিরাস্তে প্রসন্নঃ।” “ক্ষেত্রজ্ঞস্যেশ্বরজ্ঞানাদ্বিশুদ্ধিঃ পরমা মতা। অয়ন্ত পরমো ধম্মো যদযোগেনাত্মদর্শনম্॥ আত্মজ্ঞঃ শোকসন্তীণো ন বিভেতি কৃতশ্চন। মৃত্যোঃ সকাশান্ববণাদগবান্যক তাদ্ভয়াৎ॥ ন জায়তে ন ম্রিয়তে ন বধ্যো ন চ ঘাতকঃ। ন বধ্যো বন্ধকারী বা ন মুক্তো ন চ মোক্ষদঃ। পুরুষঃ পরমাত্মা তু যদতোহৃদসচ্চ তৎ॥”
দ্বিজাতি ইহার লাভেই কৃতকৃত্য হন, অন্য প্রকারে নহে‘। ‘যে ব্যক্তি এইরূপ নিজ বুদ্ধি দ্বারা সর্বভূতে আত্মদর্শন করেন, তিনি প্রথমে সর্ব্বসাম্য লাভ করেন, অর্থাৎ সর্বত্র সমদর্শন লাভ করেন, পরে শাশ্বত ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন‘। ‘আত্ম- দর্শনসম্পন্ন পুরুষ কর্ম্মপাশে আবদ্ধ হন না, কিন্তু আত্মদর্শন-বিহীন পুরুষ সংসারে প্রবেশ করে‘। ‘মনুষ্য কৰ্ম্মদ্বারা বন্ধনদশা প্রাপ্ত হয়, আর বিদ্যা দ্বারা মুক্তি লাভ করে, এই কারণেই পারদর্শী যতিগণ কর্মানুষ্ঠানে বিরত থাকেন। স্থিরবুদ্ধি প্রাচীনগণ জ্ঞানকে মুক্তিসাধন বলিয়া থাকেন, অতএব বিশুদ্ধ জ্ঞানের সাহায্যে সর্ব্বপ্রকার পাতক হইতে বিমুক্ত হয়‘। ‘বিদ্বান্ পুরুষ এইরূপে মৃত্যুর প্রভাব অবগত হইয়া জ্ঞানবলে অবিনাশী তেজঃ(ব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হন, ব্রহ্মলাভের আর দ্বিতীয় পথ নাই। কবি(বিশেষজ্ঞ) তাহা অবগত হইয়া প্রসন্ন(নিশ্চিন্ত) থাকেন‘। পরমেশ্বরের তত্ত্বজ্ঞানে জীবের যে শুদ্ধি(স্বরূপপ্রকাশ), তাহাই পরম শুদ্ধি। আর যোগবলে যে, আত্মদর্শন, তাহাই তাহার পরম ধৰ্ম্ম। আত্মজ্ঞ পুরুষ শোকোত্তীর্ণ হন, এবং মৃত্যু(মরণের কারণ), মরণ, অথবা অন্য কোন প্রকারে উদ্ভূত ভয়েও ভীত হন না। আত্মা জন্মে না, মরে না, বধ্য নয়, বধের কারণও নয়, এবং নিজে বধ্য নয়, অপরের বন্ধনকারীও নয়, মুক্তও নয়, মুক্তিদাতাও নয়, পুরুষ (জীব) স্বরূপতঃ পরমাত্মাই বটে, তদতিরিক্ত যাহা কিছু, সে সমস্তই অসৎ‘।
এবং, কতিস্মৃতীতিহাসাদ্যং জ্ঞানস্যৈব মোক্ষসাধনত্বাবগমাদ্যুজ্যত এবোপনি- ষদারম্ভঃ। ২
কিঞ্চ, উপনিষৎসমাখ্যয়ৈব জ্ঞানস্যৈব পরমপুরুষার্থসাধনত্বমবগম্যতে। তথা হি—উপনিষদিতি উপ-নি-পূর্ব্বস্থ্য সদের্বিশরণগত্যবসাদনার্থস্য রূপমাচক্ষতে। উপনিষচ্ছন্দেন ব্যাচিখ্যাসিত-গ্রন্থ প্রতিপাদ্যবস্তুবিষয়া বিদ্যোচ্যতে, তাদর্থ্যাৎ গ্রন্থোহপি উপনিষৎ। যে মুমুক্ষবো দৃষ্টানুশ্রবিক-বিষয়বিতৃষ্ণাঃ সন্ত উপনিষ- চ্ছন্দিত-বিদ্যাং তন্নিষ্ঠতয়া নিশ্চয়েন শীলয়ন্তি, তেষানবিদ্যাদেঃ সংসারবীজস্য বিশরণাদ্বিনাশাৎ পরব্রহ্মগময়িতৃত্বাদ গর্ভজন্মজরামরণাদ্যপদ্রবাবসাদয়িত্বাৎ উপনিষৎসমাখ্যয়াপ্যন্যকৃতাৎ পরং শ্রেয় ইতি ব্রহ্ম-বিদ্যোপনি দুচ্যতে। ৩
ননু ভবেদেবমুপনিষদারম্ভঃ, যদি বিজ্ঞানস্যৈব মোক্ষসাধনত্বং ভবেৎ; ন চৈতদস্তি; কৰ্ম্মণামপি মোক্ষসাধনত্বাবগযাৎ—“অপাম সোমমমৃতা অভুম।” “অক্ষয্যং হ বৈ চ তুর্ম্মাস্যযাজিনঃ সুকৃতং ভবতি” ইত্যাদিনা। ন ত্বেতদস্তি.
এই জাতীয় শ্রুতি স্মৃতি ইতিহাস ও পুরাণাদি শাস্ত্রে জানা যায় যে, জ্ঞানই মোক্ষলাভের একমাত্র সাধন; সুতরাং জ্ঞানপ্রতিপাদক উপনিষৎ শাস্ত্রের আরম্ভ নিশ্চয়ই যুক্তিযুক্ত হইতেছে। ১
আরও এক কথা, ‘উপনিষদ্’ এই নামকরণ হইতেও জানা যায় যে, জ্ঞানই পরম পুরুষার্থ মোক্ষের একমাত্র সাধন। দেখ, উপ+নি+সদ্ ধাতু হইতে ‘উপনিষদ্’ পদটী নিষ্পন্ন হইয়াছে। উপ-নি-পূর্ব্বক সদ্ ধাতুর অর্থ—বিশরণ (শিথিলীকরণ), গতি ও অবসাদন(অসামর্থ্য সম্পাদন)। আমরা যে গ্রন্থের (শ্বেতাশ্বতরোপনিষদের) ব্যাখ্যা করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, সেই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বস্তু-বিষয়ক বিদ্যা উপনিষদ্ শব্দে বুঝাইয়া থাকে। উক্ত বিদ্যার প্রতিপাদন করাই এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য, এই কারণে গ্রন্থও উপনিষদ্ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। ৩
[এখন পূর্ব্বোক্ত উপনিষদ্ অর্থের বিবৃতি প্রদত্ত হইতেছে।] যে সকল মুমুক্ষু পুরুষ ঐহিক ও পারলৌকিক বিষয়ভোগে তৃষ্ণারহিত হইয়া তন্ময়তা সহকারে নিশ্চয় বুদ্ধিতে উপনিষৎ-শব্দবাচ্য বিদ্যার অনুশীলন করে, নিরন্তর চিন্তা করে, তাহাদের সংসারবীজ অবিদ্যা প্রভৃতি দোষনিচয় বিধ্বস্ত করিয়া দেয়, পর- ব্রহ্মকে প্রাপ্ত করায় এবং গর্ভবাস, জন্ম, জরা ও মরণাদি সকল উপদ্রবের অবসান ঘটায় বলিয়া সর্ব্বাপেক্ষা পরম শ্রেয়োরূপ ব্রহ্মবিদ্যা উপনিষদ্ নামে অভিহিত হয়। পরম শ্রেয়োরূপ ব্রহ্মবিদ্যা অর্থেই ‘উপনিষদ্’ নামের প্রবৃত্তি হইয়াছে। ৩
এখানে প্রশ্ন হইতে পারে যে, যদি ব্রহ্মবিজ্ঞানই মোক্ষের একমাত্র উপায় বলিয়া নির্দ্ধারিত হয়, তবে তৎপ্রতিপাদক উপনিষদের আরম্ভ অবশ্যই সঙ্গত হইতে পারে, কিন্তু তাহাত হয় নাই; বরং শাস্ত্রপাঠে জানা যায় যে, কৰ্ম্মসমূহও মোক্ষের সাধন।[যথা দেবতারা বলিতেছেন] “আমরা সোমরস পান করিয়াছি, সেইজন্য অমর হইয়াছি’, ‘যাহারা চাতুষ্মাস্যযাজী, তাহাদের অক্ষর পুণ্য হয়’
শ্রুতিস্ম তবিরোধাৎ ন্যায়বিরোধাঞ্চ। শ্রুতিবিরোধস্তাবৎ—“তদ্যথেয় ‘কম্মচিতো লোকঃ ক্ষীয়তে, এবমেবামুত্র পুণ্যচিতে লোকঃ ক্ষীয়তে।” “হমেবং বিদ্বানমৃত ইহ ভবতি, নান্যঃ পন্থা বিদ্যুতেহয়নায়।” “ন কম্মণা ন প্রজয়া ধনেন ত্যাগে- নৈকেহমুতত্বমানশুঃ।” “এবা হোতে অদতা যজ্ঞরূপাঃ, অষ্টাদশোক্তমববং যেস্ কৰ্ম্ম।” “এতচ্ছেয়ো বেহভিনন্দন্তি মঢা জরামৃত্যুং তে পুনরেবাপিযন্তি।” “নাস্তা কৃতঃ কৃতেন।”
“কর্মণা বধ্যতে জন্ত্ববিদ্যয়া চ বিমুচ্যতে। তস্মাৎ কষ্ম ন কুর্বন্তি যতয়ঃ পারদশিনঃ!! অজ্ঞানমলপূর্ণত্বাৎ পুবাণে’ মল্লিনঃ স্মৃতঃ। তৎক্ষয়ারৈ ভবেন্নুকিন্নান্যথা কর্মকোটিভিঃ ॥ পজয়া কৰ্ম্মণা মুক্তিদ্ধনেন চ সতাং ন হি। ত্যাগেনৈ‘কন মুক্তিঃ স্যাদভাবে ভ্রমন্যহো!! কম্মোদয়ে কম্মফলানুরাগান্তথানুষ্যন্তি ন তরন্তি মৃত্যুম্।
ক্বচিৎ নিরাশ্রয়ং ক্বচিৎ নিরাশ্রয়ং ন নিরাশ্রয়ং ক্বচিৎ। তস্য পদাৎ॥”
ইত্যাদি। না-এরূপ আপত্ত হইতে পারে না। কারণ, তোমার আপত্তি প্রতি- বিরুদ্ধ, স্মৃতিবিরুদ্ধ, এবং যুক্তিবিরুদ্ধও বটে। প্রথমতঃ শ্রুতিবিরোধ[প্রদর্শিত হইতেছে-] ‘ইহ কালে কৃষিপ্রভৃতি কৰ্ম্ম দ্বারা সঞ্চিত লোক অর্থাৎ ভোগ্য শস্যাদি যেমন[ভোগের দ্বারা] ক্ষয় প্রাপ্ত হয়, পরকালেও তেমনই পুণ্যাজ্জিত স্বর্গাদি লোক[ভোগ-দ্বারা] ক্ষয়প্রাপ্ত হয়‘। ‘সেই এই আত্মাকে জানিয়া ইহলোকেই বিমুক্ত হয়, মোক্ষরাজ্যে যাইবার আর অন্য পথ নাই‘। ‘প্রধান ঋষিগণ কৰ্ম্ম দ্বারা নয়, সন্তান দ্বারা নয়, এবং ধনের দ্বাবাও নয়, একমাত্র ত্যাগের দ্বাবাই অমৃতত্ব লাভ করিয়াছিলেন‘। ‘এই সকল যজ্ঞরূপ ভেলা অজ্ঞান-সাগর উত্তরণের পক্ষে সুদৃঢ় নহে, যাহাতে অধমকল্পে অষ্টাদশ ঋত্বিকসাধ্য কর্ম্মের বিধি উক্ত হইয়াছে।’ ‘যে সকল মূঢ় ব্যক্তি এই কৰ্ম্মকেহ শ্রেয় বলিয়া অভিনন্দিত করে, তাহারা নিশ্চয়ই পুনরায় জরা-মরণ-দুঃখ প্রাপ্ত হয়‘। ‘কৃত কৰ্ম্মদ্বারা অকৃত অ-জন্য) মোক্ষ হয় না।’
[ এখন স্মৃতিবিরোধ প্রদর্শিত হইতেছে—] ‘মনুষ্য কৰ্ম্ম দ্বাবা আবদ্ধ হয়, আর বিদ্যা দ্বারা মুক্ত হয়, সেই কারণে পারদর্শী যতিগণ কৰ্ম্মানুষ্ঠান করেন না। অজ্ঞান-মলে পরিপূর্ণ বিধায় পুরাণসংসার মলিন বলিয়া বিজ্ঞাত। সেই মলক্ষয়ে মুক্তিলাভ হয়, নচেৎ কোটি কোটি কৰ্ম্ম দ্বাবাও মুক্তি হয় না। সন্তান, ধনলাভ, কিংবা কৰ্ম্মানুষ্ঠান, এ সকলের দ্বারা মুক্তি হয় না। একমাত্র কৰ্ম্মত্যাগেই মুক্তি হয়, অন্যথা কেবল সংসারে পরিভ্রমণ হয় মাত্র। কৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা কৰ্ম্মফলে সেইরূপ অনুরাগ বৃদ্ধি পায়, যাহাতে মৃত্যুপাশ অতিক্রম করিতে পারে না। বিদ্বান্ পুরুষ জ্ঞানময় নিত্যজ্যোতি ব্রহ্ম লাভ করেন, তাঁহাকে পাইবার আর দ্বিতীয় পথ
“এবং ত্রয়ীধৰ্ম্মমনুপ্রপন্না গতাগতং কামকামা লভন্তে।” শ্রমার্থমাশ্রমাশ্চাপি বর্ণানাং পরমার্থতঃ। “আশ্রমৈন চ বেদৈশ্চ যজ্ঞৈঃ সাখ্যৈর তৈস্তথা। উগ্রৈস্তপোভিবিবিধৈর্দানৈর্নানাবিধৈরপি। ন লভন্তে তথাত্মানং লভন্তে জ্ঞানিনঃ স্বয়ম!! ত্রয়ীধৰ্ম্মমধৰ্ম্মার্থং কিংপাকফলসন্নিভম্। নাস্তি তাত সুখং কিঞ্চিদত্র দুঃখশতাকুলে। তস্মান্মোক্ষায় যত তাং কথং সেব্যা ময়া ত্রয়ী। অজ্ঞানপাশবন্ধত্বাদমুক্তঃ পুরুষঃ মৃতঃ ॥ জ্ঞানাত্তস্থ্য নিত্তিঃ স্যাৎ প্রকাশাত্তমসো যথা। তস্মাজ জ্ঞানেন মুক্তিঃ স্নাদজ্ঞানস্য পরিক্ষয়াং ॥ এতানি দানানি ‘তপা-সি যজ্ঞাঃ সত্যঞ্চ তীর্থাশ্রমকৰ্ম্মযোগাঃ। স্বর্গার্থমেবাশুভমবঞ্চ জ্ঞানং ধ্রুবৎ শান্তিকরং মহার্থম ॥
নাই। ‘ভোগাভিলাষী সুকবিবা এইরূপে বেদোক্ত কর্ম্মেয় শরণাপন্ন হইয়া সংসারে যাতায়াত লাভ করে।’ ‘ব্রাহ্মণাদি বর্ণের সম্বন্ধে বিহিত আশ্রমসমূহ প্রকৃত- পক্ষে কেবল ক্লেশপ্রদ মাত্র।’ ‘ব্রহ্মচর্য্যাদি আশ্রম, বেদপাঠ, যজ্ঞসমূহ, সাংখ্য- যোগ, ব্রতপালন, বিবিধপ্রকার উগ্র তপস্যা, নানাবিধ দান, এ সকলের দ্বারা সেই আত্মাকে লাভ করা যায় না, কিন্তু জ্ঞানীরা নিজেই(অর্থাৎ কর্ম্মাদির সাহায্য না লইয়াই) লাভ করিয়া থাকেন।’
‘হে তাত, অধৰ্ম্মকর ত্রয়ীধৰ্ম্ম কিংপাক(মহাকাল) ফলের তুল্য।(১) দুঃখশতসঙ্কুল সেই কর্ম্মে কিছুমাত্র সুখের সম্ভাবনা নাই। অতএব মোক্ষের জন্য যত্নপরায়ণ আমি কিরূপে সেই ত্রয়ীধর্ম্মের সেবা করিব? পুরুষ অজ্ঞানপাশে আবদ্ধ বলিয়া ‘অমুক্ত’ নামে কথিত হয়, অতএব জ্ঞানোদয়ে অজ্ঞান বিধ্বস্ত হইলে তাহার মুক্তি সিদ্ধ হয়,’ ‘নানাবিধ ব্রত, দান, তপস্যা, যজ্ঞ, সত্যনিষ্ঠা,
(১) তাৎপর্য্য—কিংপাক(মাকাল ফল) যেমন বাহিরে অতি সুন্দর, দর্শন মাত্রই মন আকর্ষণ করে, কিন্তু উহার অভ্যন্তরটা অতীব কুরূপ, দেখিলেই ঘৃণার উদ্রেক হয়, তেমনি বেদোক্ত সকাম কৰ্ম্মগুলিও অভীষ্ট ফল প্রদান করে বলিয়া আপাত-মনোহর, কিন্তু বিচার করিলে দেখা যায় যে, ঐ সকল কর্ম্মের ফল যত বড়ই হউক না কেন, সমস্তই পরিমিত সীমাবদ্ধ ও ক্ষয়শীল। ভোগ করিতে করিতে সমস্ত কৰ্ম্মফলই ক্ষয় হইয়া যায়; সুতরাং তখন বড়ই ক্লেশদায়ক হয়। পক্ষান্তরে জ্ঞানফল মুক্তি। মুক্তিতে তারতম্য দোষ নাই, এবং ক্ষয়ের ভয়ও নাই। এইজন্য বিবেকী পুরুষেরা কম্মানুষ্ঠানে বিরত থাকেন, এবং জ্ঞানপথ অবলম্বন করেন। জ্ঞান ব্যতীত যে মুক্তির আর অন্য পথ নাই, ইহা যুক্তি ও প্রমাণসিদ্ধ।
যজ্ঞৈদ্দেবত্বমাপ্নোতি তপোতিরব্রহ্মণঃ পদম্। দানেন বিবিধান্ ভোগান্ জ্ঞানেন মোক্ষমাপুয়াৎ ॥ ধম্মবজ্জা ব জজন্দ্ধং পাপবজ্জা রজেদধঃ। দ্বয়ং জ্ঞানাসিনা ‘ছত্বা বিদেঃ শান্তিমূর্ত্তি ॥ তাজ ধম্মমন্মক উভে সনানকে আজ। উভে সত্যান ত ত্যক্তা যেন তাজসি তৎ তাজ ॥”
এবং শ্রুতিস্মৃতিবিরোধান্ন কংসাদনমমৃতত্বম। ন্যায়বিরোধাচ্চ-কন্মসাধনত্বে মোক্ষস্য চতুর্দিঘক্রিয়াস্তভাবাদনিশ্যত্বং স্যাৎ। “যৎ কৃতকং, তদনিত্যং” ইতি কর্ম্মসাধ্যস্য নিত্যত্বাদর্শনাৎ। নিতান্ত মোক্ষঃ সব্বব্যদিভিরভ্যপগম্যতে। তথা চ শ্রুতিঃ চাতৃস্মাস্তপ্রকরণে--“প্রজামনু প্রজায়সে তদু তে মর্ত্যান্বতম্” ইতি। কিঞ্চ, সুকৃতমিতি সুকৃতস্যাত্ময়ত্বমুচ্যতে। সুকৃতশব্দশ্চ কর্ম্মণি। নানুবং
তীর্থ ও আশ্রমোচিত কম্ম, এ সমস্তই স্বর্গফলপ্রদ; সে ফল অশুভ(দুঃখ- মিশ্রিত) ও অধ্রুব। জ্ঞানফল ধ্রুব(সুনিশ্চিত), শান্তিপদ ও মহৎ।’ ‘যজ্ঞের দ্বারা দেবত্ব প্রাপ্ত হয়; তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মপদ পর্য্যন্ত লাভ করা যায়, এবং দানের ফলে বিবিধ ভোগপ্রাপ্তি হয়, জ্ঞানের দ্বারা মুক্তিপ্রাপ্তি হয়।’ ‘জীব ধর্ম্মবজ্জুতে আবদ্ধ হইয়া ঊর্দ্ধ গমন করে, পাপ রজ্জুতে ‘নিবন্ধ হইয়া অদে(নিম্ন যোনিতে) গমন করে,(অতএব) জ্ঞানরূঢ় খদ্গারা পুণ্য-পাপময় রজ্জুদ্বয় ছেদন করিয়া এবং দেহাভিমান রহিত করিয়া শান্তি(মুক্তি) লাভ করে।’ ‘ধর্ম্ম ও অধর্ম্ম ত্যাগ কর, সত্য মিথ্যা উভয়ই ত্যাগ কর, এবং সত্য মিথ্যা উভয় ত্যাগ করিয়া যাহা দ্বারা ত্যাগ করিতেছে, তাহাও(বিবেকসাধনও) ত্যাগ কর।’ এই জাতীয় শ্রুতি-স্মৃতির বিরুদ্ধ বলিয়া কম্মকে মোক্ষসাধন বলিতে পারা যায় না। যক্তিবিবোধও ইহার অপর কারণ। মুক্তি যদি কৰ্ম্মসাধ্য অর্থাৎ কম্মের ফল হয়, তাহা হইলে, নিশ্চয়ই উহা নির্দিষ্ট চতুর্বিধ কর্মফলের অন্তর্গত হইবে; সুতরাং মুক্তির অনিত্যত্ব দোষ ঘটিতে পারে(২)। কেন না, যাহাই কৃতক— ক্রিয়ানিষ্পন্ন, তাহাই অনিত্য, এই অব্যভিচারী নিয়মানুসারে ক্রিয়াসম্পাদ্য পদার্থ- মাত্রেবই অনিত্যতা দেখা যায়। অথচ সকল বাদীরাই মোক্ষের নিত্যতা স্বীকার করিয়া থাকে। চাতুর্মাস্য ব্রতপ্রকরণে ঐ প্রকার শ্রুতিও রহিয়াছে। যথা— ‘হে মর্ত্য(মানব), তুমি যে, সন্তানরূপে পুনরায় জন্মধারণ কর, তাহাই তোমার
(২) ক্রিয়াফল চারি প্রকার, ১। উৎপাদ্য, ২। বিকাৰ্য্য, ৩। সংস্কার্য্য, ৪। প্রাপ্য। অবিদ্যমান বস্তু ক্রিয়া দ্বারা অভিব্যক্ত হইলে, তাহা হয় উৎপাদ্য। যেমন ঘটপটাদি কায্য। এক বস্তুকে অন্য আকারে পরিণত করাকে বলে বিকাৰ্য্য। যেমন হারকে বলয় করা। দোষাপনয়ন বা গুণাধান দ্বারা হয় সংস্কার্য্য, যেমন মলিন দর্পণকে ঘর্ষণ দ্বারা উজ্জ্বল করা। ক্রিয়াদারা অপ্রাপ্তকে পাওয়ার নাম প্রাপ্য। যেমন গমন ক্রিয়া দ্বারা গ্রামান্তর বা পর্ব্বত প্রাপ্য হয়।
३
তহি কৰ্ম্মণাৎ দেবাদিপ্রাপ্তিহেতুত্বেন বন্ধহেতুত্বমের। সত্যম্; স্বতো বন্ধুহেতু- ত্বমের। তথা চ শ্রুতিঃ “কৰ্ম্মণা পিতৃলোকঃ।” “সর্ব্ব এতে পুণ্যলোকা ভবন্তি।” “ইষ্ঠাপূর্ত্তং মন্যমানা বরিষ্ঠং নান্যচ্ছেয়ো বেদয়ান্তে প্রমূঢ়াঃ। নাকস্য পৃষ্ঠে তে সুকতেহনুভূত্বেমং লোকং হীনতরং বা বিশন্তি ॥ এবং কমু নিস্নেহা যে কেচিৎ পারদর্শিনঃ। বিজয়সুতং পরমো ন তস্য কস্মাৎ পরঃ ॥”
বিদায়োঽস্মিন্ পুরুষো ন তু কস্মদস্যঃ স্মৃতঃ ॥”
“এবং তদ্বৈধর্ম্মমপ্রপন্না গতাগতং কামকামা লভন্তে” ইতি। ৪
যদা পুনঃ ফলনিরপেক্ষমীশ্বরার্থং কম্মানুতিষ্ঠন্তি, তদা মোক্ষসাধন-জ্ঞান সাধ- নান্তঃকরণস্তুদ্ধিসাধনপারম্পর্য্যেণ মোক্ষসাধনং ভবতি। তথাহ ভগবান্—
“ব্রহ্মণ্যাধায় কম্মাণি সঙ্গং ত্যক্তা করোতি যঃ। লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবান্তসা॥ কায়েন মনসা বুদ্ধ্যা কেবলৈরিন্দ্রিয়ৈরপি। যোগিনঃ কস্ম কুৰ্ব্বন্তি সঙ্গং ত্যক্তাত্মশুদ্বয়ে॥
অমৃতত্ব? ইত্যাদি। আরও এক কথা,[অক্ষয়ং হ বৈ চাতুস্মাস্যযাজিনঃ সুকৃতং ভবতি”—এই শ্রুতিতে] সুরুতের অক্ষয়ত্ব কথিত হইয়াছে। ‘সুকৃত’ শব্দের অর্থ কম্ম।[কম্ম কখনই নিত্যফলপ্রদ হইতে পারে না]। জিজ্ঞাসা করি, তবে কম্ম সকল কি দেবাদিভাব প্রাপ্তি করায় বলিয়া কেবল বন্ধেরই কারণ? হ্যাঁ, কম্মসকল স্বভাবতঃ বন্ধেবই কারণ। সেইরূপ শ্রুতি এই—‘কৰ্ম্ম দ্বারা পিতৃলোক লাভ হয়, ইহারা সকলেই পুণ্যলোকভাগী হয়।’ ‘অত্যন্ত মূঢ়গণ ইষ্টাপূর্ত্তকেই সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করে, এতদপেক্ষা অন্য কিছু শ্রেয়ঃসাধন আছে বলিয়া জানে না। তাহারা স্বর্গলোকে পুণ্যফল ভোগ করিয়া শেষে এই মনুষ্য- লোকে কিংবা এতদপেক্ষা হীনতর লোকে(ভোগভূমিতে) প্রবেশ করে।’ ‘যে কোনও পারদর্শী পুরুষ এই প্রকার কর্মানুষ্ঠানে আসক্তিশূন্য হইয়া থাকেন।’ ‘পুরুষ(জীব) বিদ্যাময় বলিয়াই প্রসিদ্ধ, কিন্তু জ্ঞানময় বলিয়া নহে।’ বেদ- নিহিত কৰ্ম্মানুষ্ঠানে রত সকাম পুরুষগণ এই প্রকারে গতাগত লাভ করে, অর্থাৎ কর্মফল ভোগের জন্য ইহলোকে ও পরলোকে কেবল যাতায়াত করিয়া থাকে, কখনও শান্তি লাভ করে না’ ইত্যাদি। ৪
কিন্তু যখন ফল-নিরপেক্ষভাবে কেবল পরমেশ্বর তৃপ্তির জন্য কৰ্ম্ম অনুষ্ঠিত হয়, তখন সেই সকল কৰ্ম্মই সাধকের চিত্তশুদ্ধি জন্মায়। শুদ্ধচিত্তে মোক্ষোপ- যোগী তত্ত্বজ্ঞানের সঞ্চার হয়; সুতরাং সেই সকল নিষ্কাম কৰ্ম্ম মোক্ষসিদ্ধির উপায় হইয়া থাকে। ভগবান্ শ্রীরঙ্কও সে কথা বলিয়াছেন—‘যে ব্যক্তি ফলা- সক্তি পরিত্যাগপূর্ব্বক ব্রহ্মার্পণদ্ধিতে কম্মানুষ্ঠান করে, পত্রপত্র যেমন জলে লিপ্ত হয় না, তেমনি সে ব্যক্তিও পাপে লিপ্ত হয় না।[এখানে পাপশব্দে পাপ পুণ্য দুইই বুঝিতে হইবে।] যোগিগণ ফলাসক্তি পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল
যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ। যত্তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুঘ মদপণম্ ॥ শুভাশুভফলৈরেবং মোক্ষ্যসে কৰ্ম্মবন্ধনঃ। সন্ন্যাসযোগযুক্তাত্মা বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি ॥” ইতি ॥ মোক্ষে ক্রমং শুদ্ধভাবে মোক্ষাভাবং কর্ম্মভিশ্চ তচ্ছুদ্ধিং দশয়তি
“অনুচানস্ততো যজঃ কন্যাসী ততঃ পরম্। ততো জ্ঞানিত্বমভ্যেতি যোগী মুক্তিং ক্রমান্নভেৎ ॥ অনেকজন্মসংসারচিতে পাপসমুচ্চয়ে। নাক্ষীণে জায়তে পুংসাং গোবিন্দাভিমুখী মতিঃ ॥ জন্মান্তরসহস্রেস্ তপোজ্ঞানসমাধিভিঃ। নবাণাং ক্ষীণপাপানাং কৃষ্ণে ভক্তিঃ প্রজায়তে ॥ পাপকস্মাশয়ো হ্যত্র মহামুক্তিবিরোধকৃৎ। তস্যৈব শমনে যত্নঃ কার্য্যঃ সংসারভীরুণা ॥ সুবর্ণাদিমহাদান-পুণ্যতীর্থাবগাহনৈঃ। শারীরৈশ্চ মহাক্লেশৈঃ শাস্ত্রোক্তৈস্তাচ্ছ’মা ভবেৎ ॥
চিত্তশুদ্ধির নিমিত্ত দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি দ্বারা কর্ম্ম করিয়া থাকেন। হে কুন্তিনন্দন, তুমি যাহা কর, যাহা ভোজন কর, যাহা হোম কর, যাহা দান কর ও যাহা তপস্যা কর, সে সমস্ত আমাতে(পরমেশ্বরে) সমাণ কর। এইরূপ করিলে, শুভাশুভ ফলপ্রদ কর্ম্মময় বন্ধন হইতে তুমি বিমুক্ত হইবে, এবং ফল সন্ন্যাস হৃদয়ে সুপ্রতিষ্ঠ করিয়া বিমুক্ত হইয়া আমাকে প্রাপ্ত হইবে।’
বিষ্ণুধর্ম্মেও এই ভাবেই মোক্ষের পারস্পর্য্যক্রম, চিত্তশুদ্ধির অভাবে মুক্তির অভাব এবং কৰ্ম্ম দ্বারা চিত্তের বিশুদ্ধতা প্রদর্শিত হইয়াছে।—
প্রথমে বেদাধ্যায়ী, পরে যাজ্ঞিক, তাহার পর কৰ্ম্মসন্ন্যাসী(কর্মফলত্যাগী) হইবে, অনন্তর জ্ঞানলাভে অধিকারা হইবে, এই প্রকার ক্রমানুসারে যোগী পুরুষ মুক্তিলাভ করেন। অনেক জন্মসঞ্চিত কর্ম্মরাশি ক্ষীণ না হইলে জীবগণের গোবিন্দাভিমুখী প্রতি জন্মে না। সহস্র সহস্র জন্মাজ্জিত তপস্যা, জ্ঞান ও সমাধি- যোগানুষ্ঠান দ্বারা যাহাদের পাপ-ক্ষয় হয়, সেই সকল মনুষ্যেরই শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি হয়। জগতে পাপ-বাসনাই পরামুক্তি লাভের প্রবল প্রতিপক্ষ, অতএব সংসারভীরু লোকদিগের পক্ষে সেই পাপবাসনা ক্ষয়ের জন্য সমধিক যত্ন করা আবশ্যক। সুবর্ণাদি-দানরূপ মহাদান, পবিত্রতীথে অবগাহন, এবং শরীরসাধ্য শাস্ত্রোক্ত কঠোর ক্লেশ স্বীকার, এ সকলের দ্বারা পাপবাসনার প্রশমন হয়।
দেবতাশ্রুতিসচ্ছাস্ত্রশ্রবণৈঃ পুণ্যদর্শনৈঃ। গুরুশুক্রযণৈশ্চব পাপবন্ধঃ প্রশাম্যতি ॥” -যাজ্ঞবল্ক্যোহপি শুদ্ধ্যপেক্ষাং তৎসাধনঞ্চ দর্শয়তি— “কর্তব্যাশয়শুদ্ধিস্তু ভিক্ষুকেণ বিশেষতঃ। জ্ঞানোৎপত্তিনিমিত্তত্বাং স্বতন্ত্রীকরণায় চ॥ মলিনো হি যথাদর্শো রূপালোকস্য ন ক্ষমঃ। তথাহবিপক্ককরণ আত্মজ্ঞানস্য ন ক্ষমঃ ॥ আচার্য্যোপাসনং বেদশাস্ত্রার্থস্থ্য বিবেকিতা। সৎকৰ্ম্মণাননুষ্ঠানং সঙ্গঃ সদ্ভিগিরঃ শুভাঃ ॥ স্ব্যালোকালম্ভবিগমঃ সর্ব্বভূতাত্মদর্শনম্। ত্যাগঃ পরিগ্রহাণাঞ্চ জীর্ণকাষায়ধারণম্ ॥ বিষয়েন্দ্রিয়সংরোধস্তন্দ্রালস্যবিবজ্জনম্। শরীরপরিসংখ্যানং প্রবৃত্তিঘঘদর্শনম্ ॥ নীরজস্তমসা সত্ত্বশুদ্ধিনিস্পৃহতা শমঃ। এতৈরুপায়ৈঃ সংশুদ্ধ-সত্ত্বযোগ্যমূর্ত্তি ভবেৎ ॥ যতো বেদাঃ পুরাণানি বিদ্যোপনিষদস্তথা। শ্লোকাঃ সূত্রাণি ভাষ্যাণি যচ্চান্যদ্বাত্মযং ক্বচিৎ ॥
দেবতার আরাধন, শ্রুতি ও সৎশাস্ত্র শ্রবণ, পুণ্যতীর্থাদিদর্শন এবং গুরুশুশ্রূষা, এ সকলের দ্বারাও পাপময় প্রতিবন্ধক প্রশমিত হয়।’ যাজ্ঞবল্ক্যও মুক্তিলাভে চিত্তশুদ্ধির আবশ্যকতা ও তদুপায় প্রদর্শন করিয়াছেন— ‘চিত্তশুদ্ধি সকলেরই কর্তব্য, বিশেষতঃ ভিক্ষুকের(সন্ন্যাসীর)। কারণ, চিত্তশুদ্ধি বা বাসনাক্ষয়ই জ্ঞানোৎপত্তির উপায়, এবং তাহাতেই জীবের স্বাতন্ত্র্য সিদ্ধ হইয়া থাকে। মলিন দর্পণ যেমন রূপ গ্রহণে অক্ষম, তেমনি অন্তঃকরণ পক না হইলে, সেই অন্তঃকরণও আত্মজ্ঞানে সমর্থ হয় না। আচার্য্যোপাসনা, বেদ ও বেদমূলক শাস্ত্রার্থবিচার, সৎকম্মের অনুষ্ঠান, সাধুসঙ্গ, সৎকথা শ্রবণ, স্ত্র.মূর্ত্তির দর্শন ও স্পর্শন ত্যাগ, সর্ব্বভূতে আত্মদর্শন, পরকীয় দ্রব্য স্বীকার না করা, জীর্ণ গৈরিক বস্ত্রপরিধান, বিষয়-সেবা হইতে ইন্দ্রিয়-নিরোধ, তন্ত্রা ও আলস্য ত্যাগ, দেহতত্ত্ব নিরূপণ এবং সকাম-কর্ম্মে দোষদর্শন, রজঃ ও তমোগুণকে পরাভূত করিয়া চিত্তে সত্ত্বের উদ্রেক, নিস্পৃহতা ও ইন্দ্রিয়-সংযম, এ সকলের দ্বারা শুদ্ধসত্ব যোগী বিমুক্ত হন। কেন না, বেদ, পুরাণ, জ্ঞানপ্রকাশক উপনিষদ্, শ্লোক(সংক্ষিপ্তা; র্থক বেদবাক্য), সূত্র(সংক্ষিপ্তাকার বাক্য), ভাষ্য(১), যে কোন প্রকার
(১) ভাষ্য একপ্রকার ব্যাখ্যা। তাহার লক্ষণ—“সূত্রস্থং পদমাদায় পদৈঃ সূত্রানুসারিভিঃ। স্বপদানি চ বর্ণ্যন্তে ভাষ্যং ভাষ্যবিদো বিদুঃ।”
বেদানুবচনং যজ্ঞো ব্রহ্মচর্য্যং তপো দমঃ। শ্রদ্ধোপবাসঃ স্বাতন্ত্র্যমাত্মনো জ্ঞানহেতবঃ ॥” তথাচাথর্ব্বণে বিশুদ্ধ্যপেক্ষমাত্মজ্ঞানং দর্শয়তি— “জন্মান্তরসহস্রেযু যদা ক্ষীণান্তু কিবিষাঃ। তদা পশ্যতি যোগেন সংসারচ্ছেদনং মহৎ ॥”
“যস্মিন্বিশুদ্ধে বিরজে চ চিত্তে য আত্মবৎ পশ্যন্তি যতয়ঃ ক্ষীণদোষাঃ।” “তমেতং বেদানুবচনেন ব্রাহ্মণা বিবিদিষন্তি যজ্ঞেন দানেন তপসানাশকেন” ইতি বৃহদারণ্যকে বিবিদিযাহেতুত্বং যজ্ঞাদীনাং দর্শয়তি। ৫
ননু—“বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ।”
“তপো বিদ্যা চ বিপ্রস্য নৈঃশ্রেয়সকরং পরম্”।
ইত্যাদিনা কৰ্ম্মণামপ্যমৃতত্বপ্রাপ্তিহেতুত্বমবগম্যতে। সত্যমবগম্যত এব তদ পেক্ষিতশুদ্ধিদ্বারেণ, ন চ সাক্ষাৎ। তথাহি “বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ” “তপো বিদ্যা চ ‘বিপ্রস্থ্য নৈঃশ্রেয়সকরং পরম্” ইত্যাদিনা জ্ঞানকম্মণোনিঃশ্রেয়সহেতুত্বমভিধায়,
বাজ্ময়(শাস্ত্র), এবং বেদপাঠ, যজ্ঞানুষ্ঠান, ব্রহ্মচর্য্য, তপস্যা, ইন্দ্রিয় দমন, শাস্ত্র ও গুরুবাক্যে বিশ্বাস, উপবাস, ও স্বাতন্ত্র্য(অপরের অপেক্ষারাহিত্য), এ সমুদয় আত্মজ্ঞানলাভের উপায়।
অথর্ব্ববেদীয় উপনিষদেও আত্মজ্ঞানে চিত্তবিশুদ্ধির কথা উক্ত আছে—
‘সহস্র সহস্র জন্মের পর যখন পাপরাশি ক্ষীণ হয়, তখনই সংসারচ্ছেদকারী উত্তম উপায় দর্শনগোচর হয়।’ ‘দোষক্ষয়ের পর শুদ্ধ চিত্ত যে সকল যতি সব্বভূতে আত্মতুল্য দৃষ্টি লাভ করেন।” ব্রাহ্মণগণ বেদ পাঠ, যজ্ঞ, দান, তপস্যা ও ভোগত্যাগের দ্বারা সেই এই আত্মাকে জানিতে ইচ্ছা করেন বা জানিবেন।’ এই বৃহদারণ্যকবাক্যে প্রদর্শিত হইয়াছে যে, বিবিদিষা বা ব্রহ্মজিজ্ঞাসা সমুৎপত্তির প্রতি যজ্ঞাদির অনুষ্ঠানই কারণ। ৫
এখানে প্রশ্ন হইতেছে যে, বিদ্যা ও অবিদ্যা অর্থাৎ জ্ঞান ও কৰ্ম্ম এই উভয়কে যিনি জানেন’, এবং তপস্যা ও বিদ্যা(উপাসনা), এ উভয়ই ব্রাহ্মণের সব্বোত্তম মুক্তিসাধন’ ইত্যাদি বাক্যে কম্মও যে, মুক্তিসাধন, তাহা বেশ জানা যাইতেছে। এ কথার উত্তরে বলা যাইতেছে যে, কৰ্ম্ম যে, মুক্তিলাভের উপায়, ইহা সত্য বটে, কিন্তু কৰ্ম্ম সাক্ষাৎ সম্বন্ধে মুক্তির সাধন নহে, পরন্তু মুক্তিলাভ করিতে হইলে চিত্তশুদ্ধির অপেক্ষা আছে, কৰ্ম্মই চিত্তশুদ্ধির উপায়, এইরূপ পরম্পরা সম্বন্ধে কৰ্ম্মকে চিত্তশুদ্ধির উপায় বলা হইয়াছে। অভিপ্রায় এই যে, “বিদ্যাং চ অবিদ্যাং চ” ইত্যাদি শ্রুতিতে, এবং “বিদ্যা কৰ্ম্ম চ বিপ্রস্থ্য” ইত্যাদি স্মৃতিবাক্যে প্রথমতঃ জ্ঞান ও কৰ্ম্মকে মুক্তিসাধন বলা হইয়াছে, অনন্তর শ্রোতার জানিতে আকাঙ্ক্ষা হয় যে, জ্ঞান ও কৰ্ম্ম কি প্রকারে মুক্তি সম্পাদক হয়? সেই আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তির
কথমনয়োস্তদ্ধেতুত্বমিত্যাকাঙ্ক্ষায়াং “তপসা কল্মষং হন্তি বিদ্যয়ামৃতমশ্নুতে। অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্থা বিদ্যয়ামৃতমশ্নুতে” ইতি বাক্যশেষেণ কম্মণঃ কল্মযক্ষয়হেতুত্বং বিদ্যায়া অমৃতত্বপ্রাপ্তিহেতুত্বং প্রদর্শিতম্। যত্র তু শুদ্ধ্যাদ্যবান্তরকাৰ্য্যানুপদেশঃ, তত্রাপি শাখান্তরোপসংহারন্যায়েনোপসংহারঃ কর্তব্যঃ। ননু “কুর্ব্বন্নেহে কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতং সমাঃ” ইতি যাবজ্জীবকর্মানুষ্ঠাননিয়মে সতি কথং বিদ্যায়া মোক্ষ- সাধনত্বম্? উচ্যতে-কম্মণ্যধিকৃতস্যায়ং নিয়মো নানধিকৃতস্যানিযোজ্যস্য ব্রহ্ম- বাদিনঃ। তথাচ বিদুষঃ কৰ্ম্মানধিকারং দর্শয়তি শ্রুতিঃ “নৈতদ্বিধানৃষিণা বিধেয়ো ন রুচ্যতে বিধিনা শব্দচারঃ,”
“এতদ্ধ স্ম বৈ তৎ পূর্ব্বে বিদ্বাংসোহগ্নিহোত্রং ন জুহবাঞ্চক্রিরে।” “এতং বৈ তমাত্মানং বিদিত্বা ব্রাহ্মণাঃ পুত্রৈষণায়াশ্চ বিত্তৈষণায়াশ্চ লোকৈষণায়াশ্চ ব্যুত্থায়ার্থ
উদ্দেশ্যে-ঐ দুই বাক্যের শেষভাগে পৃথক্ করিয়া বলিয়াছেন যে, প্রথম পস্যা (কম্ম) দ্বারা দুরুত-ক্ষয় করে, পশ্চাৎ বিদ্যা দ্বারা মুক্তিলাভ করে, আর অবিন্যা- মূলক কৰ্ম্ম-দ্বারা মৃত্যু অতিক্রম করিয়া বিদ্যা দ্বারা মুক্তিলাভ করে। উক্ত বাক্যের শেষাংশে কর্মের পাপধ্বংসকারিতা, আর বিদ্যার মুক্তিহেতুত্ব প্রদর্শিত হইয়াছে। আর যে সকল কম্মোপদেশস্থ’ল কর্মের অবান্তর ফল চিত্তশুদ্ধি প্রভৃতির উল্লেখ নাই, সে সকল স্থলেও ‘শাখান্তরোপসংহার’ ন্যায়ানুসারে(২) উক্ত অবান্তর ফলের উপসংহার(সংগ্রহ) করা আবশ্যক। প্রশ্ন হইতেছে যে, ‘কর্মানুষ্ঠান সহকারেই শত বৎসর জীবিত থাকিবে, অর্থাৎ সম্পূর্ণ আয়ুষ্কালব্যাপী কর্মানুষ্ঠান করিবে’ এই শ্রুতিতে যখন যাবজ্জীবন কর্মানুষ্ঠানের অবশ্যকর্তব্যতা নিয়মিত হইয়াছে, তখন কৰ্ম্ম বরহিত বিদ্যা(জ্ঞান) কিরূপে মোক্ষহেতু হইতে পারে? এতদুত্তরে বলা যাইতেছে যে, যাহারা কম্মানুষ্ঠানে অধিকারী, তাহাদের পক্ষেই ঐরূপ ব্যবস্থা নিয়মিত হইয়াছে, কিন্তু যাহারা অধিকারবিমুক্ত ব্রহ্মবাদী, তাহারা ত নিয়োগের অযোগ্য(অনিযোজ্য), সুতরাং তাহাদের সম্বন্ধে কর্মানুষ্ঠানের নিয়ম হইতেই পারে না। দেখ, শ্রুতিও কৰ্ম্মানুষ্ঠানে জ্ঞানীর অনধিকার প্রদর্শন করিতেছে,-“বিদ্বান্ পুরুষ ঋষিগণকর্তৃক কর্মানুষ্ঠানে নিযোজ্য নহে, এবং শাস্ত্র- শাসিত হইয়া কোন বিধি দ্বারাও অবরুদ্ধ হন না। এই জনই পূর্ববর্তী জ্ঞানি- গণ অগ্নিহোত্র হোম করেন নাই।’ ‘ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষগণ সেই এই আত্মাকে অব- গত হইয়া পুত্রৈষণা(সন্তান কামনা), বিত্তৈষণা(ধনকামনা), ও লোকৈষণা (স্বর্গাদিলোক কামনা) হইতে বিশেষভাবে উত্থিত হইয়া অর্থাৎ ঐ ত্রিবিধ
(২) বেদান্তদর্শনের তৃতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় পাদে ‘শাখান্তরোপসংহার’ ন্যায় বিশদভাবে বর্ণিত আছে। তাহার সার মৰ্ম্ম এই—এক জাতীয় কোন উপাসনা বা কৰ্ম্ম যদি বেদের বিভিন্ন শাখায় বিহিত থাকে, এবং তাহার ফল ও অনুষ্ঠান-প্রণালী যদি শাখাভেদে ন্যূনাধিক দৃষ্ট হয়, তাহা হইলে অন্য শাখোক্ত অধিক অংশগুলি আহরণ করিয়া ন্যূনতা পরিহার করিতে হয়। ইহার বিশেষ কথা সেখানে দ্রষ্টব্য।
ভিক্ষাচর্য্যং চরন্তি। এতদ্ধ স্ম বৈ তদ্বিদ্বাংস আহুঃ ঋষয়ঃ কাবষেয়াঃ কিমর্থা বয়মধ্যেয্যামহে, কিমর্থা বয়ং যক্ষ্যামহে, স ব্রাহ্মণঃ কেন স্যাদ, যেন স্যাত্তে- নেদৃশ এবেতি।” যথাহ ভগবান্—
“যস্বাত্মরতিরেব স্যাদাত্মতৃপ্তশ্চ মানবঃ। আত্মন্যেবচ সংতুষ্টস্তস্য কার্য্যং ন বিদ্যতে ॥ নৈব তস্য কৃতেনার্থো নাকৃতেনেহ কশ্চন। ন চাস্য সর্বভূতেষু কশ্চিদর্থব্যপাশ্রয়ঃ ॥” তথাচাহ ভগবান্ পরমেশ্বরো লৈঙ্গে কালকূটোপাখ্যানে- “তেন তেনৈব বিপ্রস্থ্য ত্যক্তসঙ্গস্থ্য দেহিনঃ। কর্তব্যং নাস্তি বিপ্রেন্দ্রা অস্তি চেত্তত্ত্ববিন্ন চ ॥ ইহ লোকে পরে চৈব কর্তব্যং নাস্তি তস্য বৈ। জীবন্মুক্তো যতস্তু স্যাদ্ ব্রহ্মবিৎ পরমার্থতঃ ॥ জ্ঞানাভ্যাসরতো যস্তু সর্ব্বতত্ত্বার্থবিৎ স্বয়ম্। কর্তব্যাভাবমৃৎসৃজ্য জ্ঞানমেবাধিগচ্ছতি ॥
কামনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করিয়া ভিক্ষাচর্য্যা(সন্ন্যাস) অবলম্বন করেন‘। (৩)। বিদ্বান্ কাবষেয় ঋষিগণ এই কথাই বলিয়াছেন—‘আমরা কিসের জন্য অধ্যয়ন করিব? কিসের উদ্দেশ্যে আমরা যজ্ঞ করিব? সেই ব্রহ্মনিষ্ঠ কি প্রকার হইবেন? তিনি যে প্রকার হইবেন, তাহাতে এই প্রকারই হইবেন, অর্থাৎ সর্ব্বত্যাগী হইবেন।’ স্বয়ং ভগবান্ যাহা বলিয়াছেন—‘যে মানব আত্মাতে রমণ করেন, আত্মাতেই পরিতৃপ্ত থাকেন, এবং আত্মাতেই সন্তুষ্ট হন, তাহার পক্ষে আর করণীয় কোন কৰ্ম্ম নাই। কর্ম্মের অনুষ্ঠানেও তাহার কোন প্রয়োজন নাই, এবং অননুষ্ঠানেও কোন প্রত্যবায় নাই। সর্ব্বভূতের কোথাও তাহার কোন প্রয়োজন সিদ্ধির অপেক্ষা নাই।’
ভগবান্ পরমেশ্বরও লিঙ্গপুরাণে কালকূট উপাখ্যানে এইরূপ কথাই বলিয়া- ছেন—‘হে বিপ্রবরগণ, যে ব্রাহ্মণ এবংবিধ জ্ঞানপ্রভাবে দেহধারী হইয়াও আসক্তি রহিত হন, তাহার কর্ত্তব্য কিছুই নাই, আর যদি কর্তব্যবোধই থাকে, তাহা হইলে সে লোক তত্ত্ববিদ্ নয়। যেহেতু ব্রহ্মবিদ্ পুরুষ জীবিতাবস্থায়ই মুক্ত হন, সেই হেতু ইহলোক বা পরলোকের জন্য তাহার আর কিছু করণীয় থাকে না। নিত্য জ্ঞানানুশীলনে রত ও বৈরাগ্যসম্পন্ন পরমার্থ-তত্ত্বজ্ঞ পুরুষ কর্ত্তব্য-
১৬
বর্ণাশ্রমাভিমানী যস্তত্ত্বা জ্ঞানং দ্বিজোত্তমাঃ। অন্যত্র রমতে মূঢ়ঃ সোহজ্ঞানী নাত্র সংশয়ঃ ॥” ‘ক্রোধো ভয়ং তথা লোভো মোহো ভেদো মদস্তমঃ। ধম্মাধর্ম্মৌ চ তেষাং হি তদ্বশাচ্চ তনুগ্রহঃ ॥ শরীরে সতি বৈ ক্লেশঃ সোহবিদ্যাৎ সংত্যজেৎ ততঃ। অবিদ্যাং বিদ্যয়া হিত্বা স্থিতস্যৈবেহ যোগিনঃ ॥ ক্রোধাদ্যা নাশমায়ান্তি ধম্মাধর্ম্মৌ চ দেহজৌ। তৎক্ষয়াচ্চ শরীরেণ ন পুনঃ সংপ্রযুজ্যতে। স এব মুক্তঃ সংসারাদুঃখত্রয়নিবর্জিতঃ ॥”
তথা শিবধর্ম্মোত্তরে—“জ্ঞানামৃতস্য তৃপ্তস্য কৃতকৃত্যস্য যোগিনঃ।
নৈবাস্তি কিঞ্চিৎ কর্ত্তব্যমস্তি চেন্ন স তত্ত্ববিৎ ॥
লোকদ্বয়েন কর্ত্তব্যং কিঞ্চিদস্য ন বিদ্যতে।
ইটৈব স বিমুক্তঃ স্যাৎ সম্পূর্ণঃ সমদর্শনঃ ॥”
তস্মাদ্বিদুষঃ কর্ত্তব্যাভাবাদবিদ্যাদ্বিষয় এবায়ং কুর্ব্বন্নেবেত্যাদিকর্ম্মনিয়মঃ। ৬ কুর্ব্বন্নেবেতি চ নায়ং কর্ম্মনিয়মঃ, কিন্তু বিদ্যামাহাত্ম্যং দর্শয়িতুং যথাকামং
চিন্তা পরিত্যাগপূর্ব্বক বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভ করেন। হে দ্বিজোত্তমগণ, যে মূঢ় লোক বর্ণাশ্রমাভিমানী হইয়া জ্ঞানানুশীলন পরিত্যাগপূর্ব্বক অন্যত্র রতি অনুভব করে, সে ব্যক্তি যে অজ্ঞানী, ইহাতে সংশয় নাই। সেই সকল অজ্ঞানান্ধ লোকের সর্ব্বদা ক্রোধ, ভয়, লোভ, মোহ, ভেদবৃদ্ধি, মদ, তমঃ ও ধৰ্মাধম্মচিত্তা প্রবল থাকে, তদনুসারে তাহাদের পুনরায় শরীর-পরিগ্রহ বা জন্মধারণ হইয়া থাকে। শরীর থাকিলেই ক্লেশ থাকে, এইজন্য যোগী পুরুষ অবিদ্যা বা ভ্রান্তিজ্ঞান বর্জন করিবে। বিদ্যাপ্রভাবে অবিদ্যা ত্যাগ করিয়া এই দেহে অব- স্থানকালেই তাহার ক্রোধাদি দোষনিচয় বিনষ্ট হয়, এবং ধর্মাধর্মও বিনাশপ্রাপ্ত হয়। সে সকল ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে পুনরায় আর শরীর-সংযোগ ঘটে না। তখন সেই পুরুষই সাংসারিক ত্রিবিধ দুঃখরহিত হইয়া মুক্তনামে উক্ত হয়।’ শিব- ধর্মোত্তরেও সেইরূপ উক্তি আছে-“জ্ঞানময় অমৃতলাভে তৃপ্ত ও কৃতকৃত্য যোগীর কিছুমাত্র কর্তব্য নাই; যদি থাকে, তবে সে তত্ত্ববিদ্ নহে। তাহার ইহ- লোকের বা পরলোকের জন্য কিছুমাত্র করণীয় নাই। সর্ব্বত্র সমদর্শী পরিপূর্ণ সেই পুরুষ ইহলোকেই বিমুক্ত হন।’ অতএব জ্ঞানীর কর্তব্য না থাকায় বলিতে হইবে যে, “কুর্ব্বন্নেবেহ” ইত্যাদি বাক্যোক্ত কৰ্ম্মানুষ্ঠানের অবশ্যকর্তব্যতা নিয়ম কেবল অবিদ্বানের পক্ষেই প্রযোজ্য, জ্ঞানীর পক্ষে নহে। ৬ বিশেষতঃ “কুর্ব্বন্নেব”(কর্ম্ম করিতে করিতেই) এটা নিয়মবিধি নহে, অর্থাৎ মনুষ্যকে যে, সারাজীবন কর্ম্ম করিতেই হইবে, এরূপ ‘নিয়ম’ এখানে উপদিষ্ট হয়
কর্মানুষ্ঠানমেব দ্রষ্টব্যম্। এতদুক্তম্ভবতি-যাবজ্জীবং যথাকামং পুণ্যপাপাদিকং কুর্ব্বত্যপি বিদুষি ন কৰ্ম্মলেপো ভবতি বিদ্যাসামর্থ্যাদিতি। তথাহি-“ঈশা- বাস্যমিদং সর্ব্বম্” ইত্যারভ্য “তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ” ইতি বিদুষঃ’ সর্ব্বকৰ্ম্ম- ত্যাগেনাত্মপালনমুক্তা অনিযোজ্যে ব্রহ্মবিদি ত্যাগকর্তব্যতোক্তিরপ্যযুক্তৈবোক্তেতি মত্বা চকিতঃ সন্ বেদো বিদুষস্ত্যাগকর্তব্যত্বমপি নোক্তবান্। কুর্ব্বন্নেবেহ লোকে বিদ্যমানং পুণ্যপাপাদিকং কৰ্ম্ম যাবজ্জীবৎ জিজীবিষেৎ, ন পুণ্যাদিকং ত্যক্তা তৃষ্ণীমবতিষ্ঠেৎ। এবং তাবৎ কস্মাণি কুর্ব্বত্যপি বিদুষি ত্বয়ি যতো যাবজ্জীবানু- ষ্ঠানাদন্যথাভাবঃ-স্বরূপাৎ প্রচ্যুতিঃ পুণ্যাদিনিমিত্তসংসারান্বয়ো নাস্তি, অথবা ইতঃ কৰ্ম্মানুষ্ঠানোত্তরকালভাব্যন্যথাভাবঃ সংসার’ন্বয়ো নাস্তি। যস্মাত্বয়ি বিন্যস্তং
নাই; পরন্তু বিদ্যার মহিমা প্রদর্শনের জন্য কর্মানুষ্ঠানে জ্ঞানীর স্বেচ্ছাতন্ত্রতাই কথিত হইয়াছে। ইহা দ্বারা এই কথা বলা হইতেছে যে, জ্ঞানী পুরুষ ইচ্ছা করিলে যাবজ্জীবন পুণ্যপাপাদি করিলেও বিদ্যাপ্রভাবে তাহাতে কৰ্ম্মলেপ অর্থাৎ কর্মের ফলাফল সম্বন্ধ সংঘটিত হয় না। দেখ, ঈশোপনিষদে প্রথমতঃ ‘ব্রহ্ম দ্বারা সমস্ত জগৎ আচ্ছাদন করিবে, অর্থাৎ সমস্ত জগতে ব্রহ্মভাব দর্শন করিবে’, এইরূপে বাক্যারম্ভ করিয়া পরে বলিয়াছেন-‘কৰ্ম্ম-ত্যাগ বা সন্ন্যাস দ্বারা আত্ম- রক্ষা করিবে।’ এখানে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ব্রহ্মবিদ্ পুরুষকে সর্ব্ব কৰ্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক আত্ম-পালনের উপদেশ করিয়া, নিয়োগের অযোগ্য সেই ব্রহ্মবিদ্ পুরুষেই যে, পুনরায় কৰ্ম্ম পরিত্যাগের উপদেশ করা, তাহা নিশ্চয়ই অসঙ্গত হইবে, ইহা মনে করিয়াই যেন বেদ ভয়ে ভয়ে জ্ঞানীর পক্ষে কৰ্ম্মত্যাগের কর্তব্যতা-উপদেশ পর্য্যন্ত করেন নাই(৫)। অভিপ্রায় এই যে, ইহলোকে পুণ্যপাপাদিরূপ যে সকল কৰ্ম্ম বিদ্যমান আছে, যাবজ্জীবন সে সকল কৰ্ম্ম করিয়াই জীবিত থাকিবে, কিন্তু পুণ্যাদি কৰ্ম্মঅনুষ্ঠানে বন্ধনের ভয় আছে, মনে করিয়া পুণ্যাদি কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া চুপ করিয়া থাকিবে না। এই প্রকারে কৰ্ম্ম সকল করিলেও, বিদ্যাসম্পন্ন তোমার এই কর্মানুষ্ঠানের ফলে অন্যথাভাব অর্থাৎ স্বরূপভ্রংশ হইবে না। ঐ সকল পুণ্যাদি কর্মের অনুষ্ঠাননিবন্ধন সংসারসম্ভাবনার ভয় নাই। অথবা ঐ কথার অর্থ এই যে, এই কর্মানুষ্ঠানের
(৫) যিনি ব্রহ্মের অদ্বয়ভাব ও জগতের অসারতা অবগত হইয়াছেন, তাহার পক্ষে কর্ম্মত্যাগ আপনা হইতেই হইয়া থাকে; সুতরাং তাহাকে আর কৰ্ম্ম- ত্যাগের উপদেশ করিতে হয় না। উপনিষদও সাক্ষাৎভাবে তাহা করে নাই। পরন্তু জ্ঞানের মহিমা কীর্তনের উদ্দেশ্যে এইমাত্র বলিয়াছে যে, জ্ঞানী লোক সম্পূর্ণ স্বাধীন, কর্মানুষ্ঠানে বাধ্য নহে, তথাপি সে যদি ইচ্ছা করে, তবে যাবজ্জীবনও কর্মানুষ্ঠান করিতে পারে। সে সকল কর্মে তাহার পুণ্য বা পাপ কিছুই হইবে না। আর ইচ্ছা না করিলে কৰ্ম্ম না করিতেও পার; তাহাতেও তাহার পাপ হইবে না।
ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে। তথাচ শ্রুত্যন্তরং, “ন লিপ্যতে কৰ্ম্মণা পাপকেন।” “এবংবিদি পাপং কৰ্ম্ম ন শ্লিষ্যতে”। “নৈনং কৃতাকৃতে তপতঃ।” “এবং হাস্য সর্ব্বে পাপ্মানঃ প্রদূয়ন্তে।”
দৈবজ্ঞ— “জ্ঞানাগ্নিঃ সর্ব্বকর্ম্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা।”
“জ্ঞানিনঃ সর্ব্বকর্ম্মাণি জীর্য্যন্তে নাত্র সংশয়ঃ। ক্রীড়ন্নপি ন লিপ্যেত পাটৈর্নানাবিধৈরপি॥”
শিবধর্ম্মোত্তরেহপি—“তস্মাজ্জ্ঞানাসিনা তূর্ণশেষং কর্ম্মবন্ধনম্। রেহাপ—তস্মাজজ্ঞানাসিনা তূণশেষং কৰ্ম্মবন্ধনম্। কামাকামকৃতং ছিত্বা শুদ্ধশ্চাত্মনি তিষ্ঠতি ॥ যথা বহ্নিস্থহাদীপ্তঃ শুষ্কমাদ্রঞ্চ নিৰ্দ্দহেৎ। তথা শুভাশুভং কৰ্ম্ম জ্ঞানাগ্নিদহতে ক্ষণাৎ ॥ পদ্মপত্রং যথা তোয়ৈঃ স্বস্থৈরপি ন লিপ্যতে। শব্দাদিবিষয়ান্তোভিস্তদ্বজ্ঞানী ন লিপ্যতে ॥ যদ্বন্মন্ত্রবলোপেতঃ ক্রীড়ন্ সর্পৈর্ন দশ্যতে। ক্রীড়ন্নপি ন লিপ্যেত তদ্বদিন্দ্রিয়পন্নগৈঃ ॥ মন্ত্রৌষধবলৈর্ষদ্বজ্জীর্য্যতে ভক্ষিতং বিষম্। তদ্বৎ সর্ব্বাণি পাপানি জীর্যন্তে জ্ঞানিনঃ ক্ষণাৎ ॥” ৭
পরে সংসারসম্বন্ধ হবে না। কেননা, ঈশ্বর-সমর্পিত কর্ম্ম তোমাতে লিপ্ত হইবে না।
এতদনুরূপ অন্য শ্রুতিও আছে—(জ্ঞানী পুরুষ) পাপ কৰ্ম্ম দ্বারা স্পৃষ্ট হন না। এই প্রকার জ্ঞানবান্ পুরুষে পাপকৰ্ম্ম সংশ্লিষ্ট হয় না।’ ‘কৃত বা অকৃত কৰ্ম্ম ইহাকে (জ্ঞানীকে) তাপ দেয় না।’ ‘ইহার সমস্ত পাপকৰ্ম্ম দগ্ধ হইয়া যায়‘।
লিঙ্গপুরাণে আছে ‘সেইরূপ জ্ঞানাগ্নিও সমস্ত কৰ্ম্ম ভস্মীভূত করিয়া থাকে। জ্ঞানীর সমস্ত কৰ্ম্ম যে জীর্ণ হয়, ইহাতে সংশয় নাই। জ্ঞানী নানাবিধ পাপ লইয়া ক্রীড়া করিলেও তাহা দ্বারা লিপ্ত হন না।’
শিবধর্মোত্তরেও আছে—‘সেই হেতু জ্ঞানরূপ খড়্গদ্বারা জ্ঞানাজ্ঞানকৃত কৰ্ম্ম- বন্ধন নিঃশেষরূপে ছেদন করিয়া বিশুদ্ধভাবে আত্মাতে অবস্থিতি করে। প্রদীপ্ত বিপুল হুতাশন যেমন শুষ্ক ও আর্দ্র ক.ষ্ঠরাশি দগ্ধ করে, তেমনি জ্ঞানাগ্নিও শুভাশুভ সমস্ত কৰ্ম্ম ক্ষণকালের মধ্যে দগ্ধ করে। পদ্মপত্র যেমন স্বগত জলের দ্বারা লিপ্ত(আর্দ্র) হয় না, জ্ঞানীও তেমন শব্দাদি বিষয়রূপ জলের দ্বারা লিপ্ত হন না। মন্ত্রশক্তিসম্পন্ন পুরুষ যেমন সর্পের সহিত ক্রীড়া করিয়াও তদ্দ্বারা দষ্ট হয় না, তেমনি জ্ঞানী পুরুষও ইন্দ্রিয়-সর্পের সহিত ক্রীড়া করিয়াও লিপ্ত হয় না, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের বশীভূত হয় না। ভক্ষিত বিষও যেমন মন্ত্র ও ঔষধবলে জীর্ণ হয়, তেমন জ্ঞানীরও সমস্ত কৰ্ম্ম জ্ঞানবলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ৭
তথা চ সূত্রকারঃ, “পুরুষার্থোহতঃশব্দাদিতি বাদরায়ণঃ” ইতি জ্ঞানস্যৈব পরম- পুরুষার্থহেতুত্বমভিধায় “শেষত্বাৎ পুরুষার্থবাদঃ” ইত্যাদিনা কৰ্ম্মাপেক্ষিত-কর্তৃ- প্রতিপাদকত্বেন বিদ্যায়াঃ কৰ্ম্মশেষত্বমাশঙ্ক্য “অধিকোপদেশাতু’ বাদরায়ণস্য” ইত্যাদিনা কর্তৃত্বাদিসংসারধর্মরহিতাপহতপাপ্মাদিরূপব্রহ্মোপদেশাৎ তদ্বিজ্ঞানপূর্ব্বি- কান্ত কর্মাধিকারসিদ্ধিং ত্বাশাসানস্য কর্মাধিকারহেতোঃ ক্রিয়াকারকফললক্ষণস্য সমস্তস্য প্রপঞ্চস্যাবিদ্যাকৃতস্য বিদ্যাসামর্থ্যাৎ স্বরূপোপমদদর্শনাৎ কর্মাধিকারো চ্ছিত্তি প্রসঙ্গাদ ভিন্নপ্রকরণত্বাদ্ভিন্নকার্য্যত্বাচ্চ পরস্পরবিকল্পঃ সমুচ্চয়োহঙ্গাঙ্গীভাবো
. সূত্রকার বেদব্যাসও “পুরুষার্থঃ অতঃ শব্দাৎ ইতি বাদরায়ণঃ” এই সূত্রে (৬) প্রথমতঃ জ্ঞানকেই পরম পুরুষার্থসিদ্ধির(মুক্তিলাভের) হেতু বলিয়া- ছেন, পরে “শেষত্বাৎ পুরুষার্থবাদঃ” ইত্যাদি(৭) সূত্রে কর্মে অপেক্ষিত অর্থাৎ কর্মেরই অঙ্গস্বরূপ কর্তার স্বরূপ প্রতিপাদন করায় বিদ্যা বা উপাসনা কর্মেরই অঙ্গ, এইরূপ আশঙ্কা করিয়া তৎপরিহার স্থলে “অধিকোপদেশাত্তু বাদরায়ণস্য” ইত্যাদি সূত্রে(৮) বলিয়াছেন-ব্রহ্ম কর্তৃত্বপ্রভৃতি সর্ব্বপ্রকার সংসারধর্মরহিত ও অপহতপাপ, তাদৃশ ব্রহ্মজ্ঞানপূর্ব্বক অধিকার পাইতে যাহারা ইচ্ছা করেন, তাহা- দের পক্ষে ক্রিয়াকারক-ফলাত্মক অবিদ্যাকৃত সমস্ত জগৎপ্রপঞ্চই সেই কৰ্ম্মাধি- কারের সম্পাদক। বিদ্যাপ্রভাবে সে সমস্তই বিমদ্দিত হইয়া যায়, সুতরাং জ্ঞানীর পক্ষে কর্মাধিকারেরও উচ্ছেদ সম্ভাবিত হয়। বিশেষতঃ কৰ্ম্ম ও বিদ্যা ভিন্ন- প্রকরণে পঠিত অর্থাৎ কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড সম্পূর্ণ পৃথক্, এবং তদুভয়ের কার্য্য বা ফলও পৃথক্-একরূপ নহে,(কর্মের ফল স্বর্গাদি ভোগ, আর বিদ্যার ফল মুক্তি বা ভোগনিবৃত্তি); অতএব বিদ্যা ও কর্মের বিকল্প, সমুচ্চয়(সহানু- ষ্ঠান) বা অঙ্গাঙ্গীভাব নাই(৯), ইহা প্রতিপাদন করিয়া, “অতএব অগ্নীন্ধ(৬) সূত্রের অর্থ-এখানে পুরুষার্থ অর্থ-মুক্তি। মুক্তিলাভের উপায় কি?-কৰ্ম্ম? না-জ্ঞান? তদুত্তরে বলা হইল-“অতঃ” এই জ্ঞান হইতেই পুরুষার্থ হয়। কারণ? যেহেতু শব্দ অর্থাৎ শ্রুতিবাক্য ঐরূপ বলিয়াছে। (৭) এটা আশঙ্কাসূত্র। সূত্রের তাৎপর্য্য এই যে, কৰ্ম্মমাত্রই কর্তা ও দেবতা প্রভৃতি সহায়-সাপেক্ষ; সুতরাং কর্তা দেবতা প্রভৃতি সেই সেই কর্ম্মের শেষ বা অঙ্গ। বেদান্তশাস্ত্রে ঐ সকল কৰ্ম্মাঙ্গ প্রতিপাদিত হইয়াছে বলিয়াই জ্ঞানপর শাস্ত্র পুরুষের উপযোগী, স্বরূপতঃ নহে। (৮) জীবে সাধারণতঃ কর্তৃত্বাদি ধৰ্ম্ম আরোপিত থাকে; ব্রহ্মে সে সকল ধর্ম্মের নিষেধ করা হইয়াছে। ব্রহ্মজিজ্ঞাসু লোকদিগের পক্ষে ক্রিয়া কারকাদি ধৰ্ম্মও নিষিদ্ধ হইয়াছে। (৯) বিকল্প অর্থ-হয় এটা, না হয় অন্যটা। হয় বিদ্যা অবলম্বন করিবে, না হয় কর্ম্মের আশ্রয় লইবে-এইরূপ। সমুচ্চয় অর্থ-সহানুষ্ঠান একত্র জ্ঞান ও কর্ম্মের অনুষ্ঠান। অঙ্গাঙ্গীভাব-হয় জ্ঞান প্রধান, কৰ্ম্ম তাহার অঙ্গ, না হয়, কৰ্ম্মই প্রধান, জ্ঞান তাহার অধীন, এইরূপ কল্পনা।
বা নাস্তীতি প্রতিপাদ্য, “অত এবাগ্নীন্ধনাদ্যনপেক্ষা” ইতি বিদ্যায়া এব পরম- পুরুষার্থহেতুত্বাদগ্নীন্ধনাদ্যাশ্রমকৰ্ম্মাণি বিদ্যায়াঃ স্বার্থসিদ্ধৌ নাপেক্ষিতব্যানীতি পূর্ব্বোক্তস্যাধিকরণস্য ফলমুপসংহৃত্য, অত্যন্তমেবানপেক্ষায়াং প্রাপ্তায়াং “সর্ব্বাপেক্ষা চ যজ্ঞাদিশ্রুতেরশ্ববৎ” ইতি নাত্যন্তমনপেক্ষা। উৎপন্না হি বিদ্যা ফলসিদ্ধিৎ প্রতি ন কিঞ্চিদন্যদপেক্ষতে, উৎপত্তিং প্রত্যপেক্ষত এব। “বিবিদিষন্তি যজ্ঞেন” ইতি শ্রুতেরিতি বিবিদিষা-সাধনত্বেন কৰ্ম্মণামুপযোগৎ দর্শিতবান্। তথা চ “নাবিশে- যাৎ।” “স্তুতয়েহনুমতির্ব্বা” ইতি সূত্রদ্বয়েন কুর্ব্বন্নেবেতি পদদ্বয়স্যাবিদ্বদ্বিষয়ত্বেন বিদ্যাস্তুতিত্বেন চার্থদ্বয়ং দর্শিতবান্। অত উক্তেন প্রকারেণ জ্ঞানস্যৈব মোক্ষ- সাধনত্বাদযুক্তঃ পরোপনিষদারম্ভঃ। ৮
ননু বক্ষ্য মিথ্যাত্বে সতি জ্ঞাননিবর্ত্ত্যেন জ্ঞানাদমৃতত্বং স্যাৎ, নচেতদস্তি।
নাদ্যনপেক্ষা” সূত্রে বলিয়াছেন-বিদ্যাই পরম পুরুষার্থসিদ্ধির হেতু; অতএব বিদ্যার স্বকার্য্যসাধনে অগ্নি ও কাষ্ঠাদিসাধ্য আশ্রমবিহিত কোন কর্ম্মের অপেক্ষা করে না, অর্থাৎ আশ্রমবিহিত কর্ম্মের সাহায্য না লইয়াই বিদ্যা স্বীয় কার্য্য- সম্পাদনে সমর্থ,-এইরূপে পূর্ব্বোক্ত অধিকরণের(১০) ফলোপসংহার করিয়া- বিদ্যাফলে কর্ম্মের সম্পূর্ণ অনাবশ্যকতা সম্ভাবনা হওয়ায় পুনরায় “সর্ব্বাপেক্ষা চ যজ্ঞাদিশ্রুতেরশ্বরবৎ” সূত্রে বলিয়াছেন যে, কম্মের একেবারেই যে অনপেক্ষা, তাহা নহে; পরন্তু বিদ্যা উৎপন্ন হইয়া আপনার ফল-সাধনের জন্য কাহারো অপেক্ষা করে না, কিন্তু আপনার উৎপত্তির জন্য নিশ্চয়ই কর্ম্মের অপেক্ষা করে। কারণ, ‘যজ্ঞদ্বারা জানিতে ইচ্ছা করেন’ এই শ্রুতি বিবিদিষা সাধনের জন্য কর্ম্মের উপযোগিতা প্রদর্শন করিতেছে। তাহার পর, “ন অবিশেষাৎ।” এং “স্তুতয়েহ- নুমতিব্বা” এই দুইটা সূত্রে “কুর্ব্বন্নেব” ইত্যাদি শ্রুতি বাক্যের এইরূপ অর্থদ্বয় প্রদর্শিত হইয়াছে যে, এই উপদেশ অজ্ঞজনদিগের জন্য, অধিকন্তু ইহা দ্বারা ব্রহ্ম- বিদ্যার প্রশংসাও সাধিত হইল। অতএব যথোক্ত যুক্তিপ্রমাণে প্রমাণিত হইল যে, জ্ঞানই মুক্তিলাভের প্রকৃষ্ট উপায়। জ্ঞান যখন মুক্তির প্রধান সাধন, তখন তদুপদেশক এই উপনিষদের আরম্ভ বা অবতারণা যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। ৮ এখন প্রশ্ন হইতেছে—জীবের বন্ধন যদি মিথ্যা হয়, তবেই উহা জ্ঞান দ্বারা নিবারিত বা বাধিত হইতে পারে; সুতরাং জ্ঞান দ্বারা অমৃতত্ত্ব লাভও
( ১০) অধিকরণ অর্থ—পঞ্চাশ ন্যায়।
‘বিষয়ো বিষয়শ্চ পূর্ব্বপক্ষস্তথোত্তরং। নির্ণয়শ্চেতি পঞ্চাঙ্গং শাস্ত্রৈহধিকরণং স্মৃতম্ ॥” ১। বিষয়—প্রতিপাদ্য বিষয়। ২। বিশয়—সংশয়। ৩। পূর্ব্বপক্ষ— আপত্তি উত্থাপন। ৪। উত্তর—আপত্তির খণ্ডন—প্রকৃত সিদ্ধান্ত স্থাপন। ৫। নির্ণয়—সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা স্থাপন। এইরূপ অধিকরণ লইয়া এক বা ততোহধিক সূত্র রচিত হয়।
প্রতিপন্নত্বাদ্বাধাভাবাৎ, যুগ্মদাদিস্বরূপত্বেনাত্মনো বিলক্ষণত্বে সাদৃশ্যাদ্যভাবাদধ্যা- সাসম্ভবাচ্চ। উচ্যতে-ন তাবৎ প্রতিপন্নত্বেন সত্যত্বং বক্তুং শক্যতে। প্রতিপত্তেঃ সত্যত্বমিথ্যাত্বয়োঃ সমানত্বাৎ। নাপি বাধাভাবাৎ সত্যত্বম্। বিধিমুখেন কারণ- মুখেন চ বাধসম্ভবাৎ। তথাহি শ্রুতিঃ প্রপঞ্চস্য মিথ্যাত্বং মায়াকারণত্বঞ্চ দর্শয়তি- “ন তু দ্বিতীয়মস্তি।” একত্বম্। নাস্তি দ্বৈতম্। কুতো বিদিতে বেদ্যং নাস্তি। “একমেবাদ্বিতীয়ম্।” “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্।” “একমের সস্নেহ নানাস্তি কিঞ্চন।” “একধৈবানুদ্রষ্টব্যম্।” “মায়ান্ত প্রকৃতিং বিদ্যাৎ” “মায়ী সৃজতে বিশ্বমেতৎ” “ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে।” ইত্যাদিভির্ব্বাক্যৈঃ।
“অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্। প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া॥
(মুক্তিলাভও) সম্ভাবিত হইতে পারে, কিন্তু বন্ধের মিথ্যাত্বই ত অসিদ্ধ। কারণ, বন্ধন বা জগৎপ্রপঞ্চ সকলেরই প্রতীতিসিদ্ধ, দ্বিতীয়তঃ ইহা বাধিত বা মিথ্যা (অসত্য) বলিয়াও নির্ণীত হয় নাই, তৃতীয়তঃ আত্মার প্রতীতি হয় ‘যুষ্মদ্ ‘অস্মৎ’(তুমি আমি) ইত্যাদিরূপে। যুষ্মদাদি প্রতীতি আত্মা ভিন্ন অন্যত্র কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না; কাজেই সর্ব্ববিলক্ষণ আত্মার সাদৃশ্য অন্য কোথাও নাই; সাদৃশ্যই অধ্যাস বা আরোপের নিদান; সেই সাদৃশ্যের অভাব নিবন্ধন অপর কোন বিষয়ের অধ্যাস বা আরোপ করাও সম্ভবপর হয় না, হয় না বলিয়াই বন্ধের মিথ্যাত্বও সিদ্ধ হয় না বা হইতে পারে না। ইহার উত্তরে বলা যাইতেছে, সত্য মিথ্যা উভয়ই প্রতীতির বিষয় হইয়া থাকে। প্রতীতির বিষয় বা প্রতিপন্ন হওয়া যখন সত্য মিথ্যা সকলের পক্ষেই সমান, তখন প্রতিপন্নত্ব নিবন্ধন বন্ধকে সত্য বলিতে পারা যায় না। আর বাধাভাব নিবন্ধনও সত্য হইতে পারে না। কেননা, সাক্ষাৎরূপে এবং কারণ মুখেও ইহার বাধ(মিথ্যাত্ব নিশ্চয়) সিদ্ধ হইতে পারে। দেখ, শ্রুতি সাক্ষাৎ সম্বন্ধেও বন্ধের মিথ্যাত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন, এবং মায়ামূলক বলিয়াও মিথ্যাত্ব প্রতিপাদন করিয়াছেন। মায়া নিজে মিথ্যা, তাহা হইতে যে কিছু, সমস্তই মিথ্যা- অসত্য; সুতরাং মায়ামূলক বন্ধনও অসত্য বা মিথ্যা, একথা শ্রুতি বিভিন্ন বাক্যে প্রদর্শন করিতেছেন। যথা-‘তাহার দ্বিতীয় কিছু নাই’ ‘একত্বই সত্য, দ্বৈত নাই, কেননা,[একত্ব] বিদিত হইলে অপর কিছু বেদ্য থাকে না,’ ‘একই অদ্বিতীয়’ ‘বিকার বা উৎপন্ন পদার্থ সকল কেবল বাক্যারব্ধ নামমাত্র’। ‘একই সত্য, জগতে নানা কিছু নাই’, ‘এক প্রকারেই দর্শন করিবে’ ‘মায়াকে প্রকৃতি(জগদুপাদান) ‘বলিয়া জানিবে’, মায়ী(মায়ার অধীশ্বর পরমেশ্বর) এই জগৎ সৃষ্টি করেন’, ইন্দ্র (পরমেশ্বর) মায়া দ্বারা বহুরূপে প্রকটিত হন’ ইত্যাদি বাক্যে[বন্ধের মিথ্যাত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে]। তাহার পর, অব্যয়াত্মা(নির্বিকাররূপ) আমি জন্মরহিত হইয়াও, এবং সর্বভূতের অধীশ্বর হইয়াও আত্ম-মায়াপ্রভাবে স্বীয় প্রকৃতিকে
অবিভক্তঞ্চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতং।” তথা চ ব্রাহ্মে পুরাণে-“ধৰ্মাধর্ম্মৌ জন্মমৃত্যু সুখদুঃখেযু কল্পনা। বর্ণাশ্রমাস্তথা বাসঃ স্বর্গে নরক এব চ ॥ পুরুষস্থ্য ন সন্ত্যেতে পরমার্থস্য কুত্রচিৎ। দৃশ্যতে চ জগদ্রূপমসত্যং সত্যবন্মষা ৷৷ তোয়বন্ম গতৃষ্ণা তু যথা মরুমরীচিকা। রৌপ্যবৎ কীকসং ভূতং কীকসং শুক্তিরেব চ। সর্পবদ্রজ্জুখণ্ডশ্চ নিশায়াং বেশ্মমধ্যগঃ ॥ এক এবেন্দুবদ্ব্যোনি তিমিরাহতচক্ষুষঃ। আকাশস্থ্য ঘটীভাবো নীলত্বং স্নিগ্ধতা তথা ॥ একশ সূর্য্যো বহুধা জলাধারেষু দৃশ্যতে। আভাতি পরমাত্মাপি সর্ব্বোপাধিয়ু সংস্থিতঃ ॥ দ্বৈতভ্রান্তিরবিদ্যাখ্যা বিকল্পো ন চ তত্তথা। পরত্র বন্ধাগারঃ স্যাৎ তেষামাত্মাভিমানিনাম্ ॥ আত্মভাবনয়া ভ্রান্ত্যা দেহং ভাবয়তঃ সদা। আপ্রজ্ঞৈরাদিমধ্যান্তৈভ্র মভূতৈস্ত্রিভিঃ সদা ॥
অবলম্বন করিয়া প্রাদুর্ভূত হই’, অবিভক্ত(বিভাগ রহিত) হইয়াও আমি বিভক্তের ন্যায় অবস্থিত আছি। ব্রহ্মপুরাণেও সেইরূপ আছে—
ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম, জন্ম মরণ, সুখ দুঃখ কল্পনা, বর্ণাশ্রমবিভাগ, এবং স্বর্গ-নরক-বাস এ সমস্ত পরমার্থ সত্য পুরুষে নাই, মরুভূমিতে যেমন মরীচিকা দর্শন হয়, এবং মৃগতৃষ্ণায় যেমন জল দর্শন হয়, তেমনি অসত্য জগৎও সত্যবৎ প্রতীত হয়। শুক্তি শুক্তিরূপে বর্তমান থাকিয়াও যেমন রৌপ্যাকারে প্রতীত হয়, এবং গৃহ- মধ্যগত রজ্জুখণ্ড যেমন রাত্রিকালে সর্পাকারে প্রকাশ পায়। তিমির রোগে বিকৃতচক্ষু ব্যক্তি যেমন আকাশে এক চন্দ্রকেও দুই দেখে, এবং আকাশের যেমন ঘনীভাব(নিবিড়তা), নীলতা ও স্নিগ্ধতা(মসৃণভাব) দৃষ্ট হয়,[জগৎ- প্রতীতিও তেমনই অসত্য]। একই সূর্য্য যেরূপ জলাধারভেদে বহু আকারে দৃষ্ট হয়, তদ্রূপ এক পরমাত্মাও বিভিন্ন উপাধিতে নানাকারে প্রতিভাত হয়। দ্বৈতবুদ্ধি কেবল অবিদ্যাজনিত বিকল্পমাত্র, বস্তুতঃ উহা সত্য নহে(১১)। যাহাবা ভ্রান্তিবশে দেহকে আত্মবুদ্ধিতে ভাবনা করে, সেই সকল দেহাত্মাভি- মানীর পরকালে বন্ধনাগার হয় অর্থাৎ পুনরায় জন্ম হয়। অজ্ঞ জীবের তিনটা
(১১) অর্থহীন শব্দ হইতে যে, একরকম প্রতীতি হয়, তাহার নাম বিকল্প। যেমন—অশ্বডিম্ব, আকাশ-কুসুম ইত্যাদি।
জাগ্রৎস্বপ্নসুষুপ্তৈস্ত ছাদিতং বিশ্বতৈজসম্। স্বমায়য়া স্বমাত্মানম্মোহয়েদ্ দ্বৈতরূপয়া ॥ গুহাগতং স্বমাত্মানং লভতে চ স্বয়ং হরিঃ। ব্যোম্নি বজানলজ্বালাকলাপো বিবিধাকৃতিঃ ॥ আভাতি বিষ্ণোঃ সৃষ্টিশ্চ স্বভাবো দ্বৈতবিস্তরঃ। শান্তে মনসি শান্তশ্চ ঘোরে মুঢ়ে চ তাদৃশঃ ॥ ঈশ্বরো দৃশ্যতে নিত্যং সর্ব্বত্র ন তু তত্ত্বতঃ। লোহমৃৎপিণ্ডহেয়াঞ্চ বিকারো নৈব বিদ্যতে ॥ * চরাচরাণাং ভূতানাং দ্বৈততা ন চ সত্যতঃ। সর্ব্বগে তু নিরাধারে দ্বৈতস্যাত্মনি সংস্থিতা ॥ অবিদ্যা দ্বিগুণাং সৃষ্টিং করোত্যস্পর্শয়ংশ তম্। সর্পস্য রজ্জুতা নাস্তি নাস্তি রজ্জৌ ভুজঙ্গতা। উৎপত্তিনাশয়োর্নাস্তি কারণং জগতোহপি চ। লোকানাং ব্যবহারার্থমবিদ্যেয়ং বিনিৰ্ম্মিতা ॥
অবস্থা-জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি। তন্মধ্যে জাগ্রদবস্থা প্রথম, স্বপ্নাবস্থা দ্বিতীয়, সুষুপ্তি অবস্থা তৃতীয়। এই অবস্থাত্রয়ই শান্তিময়, এবং এই অবস্থাত্রয়ের দ্বারাই এই জগৎ আচ্ছাদিত বা ব্যাপ্ত। তিনি নিজেই আপনাকে দ্বৈতরূপ নিজ মায়া দ্বারা বিমোহিত করেন, এবং নিজেই আবার হৃদয়-গুহাগত স্বস্বরূপ হরিকে (পরমাত্মাকে) লাভ করেন। আকাশে যেরূপ বজ্রাগ্নি ও তাহার শিখা প্রভৃতি নানাকারে প্রকাশ পায়, বিষ্ণুর স্বভাবপ্রসূত দ্বৈতসৃষ্টিও তেমনই প্রকটিত হয়। এই দ্বৈত জগতের স্বভাব এই যে, মন শান্ত-সত্ত্ব গুণসম্পন্ন হইলে ঈশ্বরও তাহার নিকট শান্তরূপে প্রকাশ পান, আবার মন ঘোর(রজোগুণসম্পন্ন) হইলে অথবা তমোগুণসম্পন্ন হইলে, পরমেশ্বরও তাহার নিকট ঘোর ও মূঢ়রূপে প্রকাশ পাইয়া থাকেন, কিন্তু কখনই প্রকৃত স্বরূপে প্রকাশ পান না। স্থ.বর জঙ্গম কোন ভূতের পক্ষেই দ্বৈতভাব পরমার্থ সত্য নহে। জগৎ সর্ব্বব্যাপী নিরাধার চৈতন্য- রূপী পরমাত্মাতে অবস্থিত। অবিদ্যা(মায়াশক্তি) আত্মাকে অবলম্বন করিয়াই স্থূল সূক্ষ্ম দ্বিবিধ সৃষ্টি রচনা করিয়া থাকে। সর্পে যেমন রজ্জুতা(রজ্জুধৰ্ম্ম) নাই, এবং রজ্জুতে যেমন ভুজঙ্গভাব নাই, তেমনই জগতেও উৎপত্তি ও বিনা- শের কোন কারণ নাই(১২)। লোকব্যবহার সম্পাদনের নিমিত্ত এই অবিদ্যা
(১২) যাহা সত্য, তাহারই জন্ম ও মৃত্যু হইয়া থাকে। অসত্য পদার্থের যখন কোন অস্তিত্বই নাই, তখন তাহার আবার জন্ম মরণ কি? রজ্জুতে সর্প- ভ্রম হয়, রজ্জুজ্ঞানে সেই ভ্রম বিনষ্ট হয়। সেই মিথ্যা সর্পের জন্ম মৃত্যু শুদ্ধ
২৪
এষা বিমোহিনীত্যুক্তা দ্বৈতাদ্বৈতস্বরূপিণী। অদ্বৈতং ভাবয়েব্রহ্ম সকলং নিষ্কলৎ সদা ॥ ‘আত্মজ্ঞঃ শোকসন্তীর্ণো ন বিভেতি কুতশ্চন। মৃত্যোঃ সকাশান্মরণাদথবান্যকৃতান্তয়াৎ ॥ ন জায়তে ন ম্রিয়তে ন বধ্যো ন চ ঘাতকঃ। ন বদ্ধো বন্ধকারী বা ন মুক্তো ন চ মোক্ষদঃ। পুরুষঃ পরমাত্মা তু যদতোহন্যদসচ্চ তৎ। এবং বুদ্ধা জগদ্রূপং বিষ্ণোর্মায়াময়ং মৃষা ॥ ভোগসঙ্গাদ ভবেন্মুক্তস্ত্যক্ত্বা সর্ব্ববিকল্পনাম্। ত্যক্তসর্ব্ববিকল্পশ স্বাত্মস্থং নিশ্চলং মনঃ ॥ কৃত্বা শান্তো ভবেদযোগী দগ্ধেন্ধন ইবানলঃ। এষা চতুর্বিংশতিভেদভিন্না মায়া পরা প্রকৃতিস্তৎসমুখৌ। কামক্রোধৌ লোভমোহৌ ভয়ঞ্চ বিষাদশোকৌ চ বিকল্পজালম্ ॥
নিৰ্ম্মিত হইয়াছে, দ্বৈতাদ্বৈতরূপা এই মায়া বিশ্ববিমোহিনী বলিয়া উক্ত হইয়াছে। পূর্ণ ব্রহ্মকে সদা নিরবয়ব অদ্বৈতরূপে ভাবনা করিবে। আত্মজ্ঞ পুরুষ শোকাতীত, তিনি মৃত্যুর নিকটে ভয় পান না, এবং মরণ(দেহ-ত্যাগ) বা অন্য কোন প্রকার আগন্তুক ভয়েও ভীত হন না। আত্মা জন্মে না, মরে না, অপরের বধ্য বা ঘাতকও হয় না। আত্মা বদ্ধ নহে, বন্ধনকর্তাও নহে, এবং মুক্ত বা মুক্তিপ্রদও নহে। পুরুষ(জীবাত্মা) বস্তুতঃ পরমাত্মাই; তদ্ভিন্ন যাহা কিছু, সমস্তই অসৎ(মিথ্যা), এইরূপে জগৎকে বিষ্ণুর মায়াময় মিথ্যা ভাবনা করিয়া সমস্ত বিকল্প পরিত্যাগ- পূর্ব্বক ভোগাশক্তি হইতে বিরত হইবে। যোগী পুরুষ সমস্ত কল্পনা পরিত্যাগ- পূর্ব্বক মনকে নিশ্চলভাবে আত্মস্থ করিয়া দগ্ধেন্ধন অগ্নির ন্যায় শান্ত হইবেন। জগতের মূলপ্রকৃতি এই মায়া চতুর্বিংশতি ভাগে বিভক্ত(১৩)। সেই মায়া হইতেই কাম ক্রোধ, লোভ মোহ, ভয়, বিষাদ, শোক ও অপরাপর বিকল্পরাশি
কল্পনামাত্র, বাস্তবিক নহে। মিথ্যা জগতের জন্ম-নাশব্যবহারও কেবল কল্পনা- মাত্র—অসত্য, সুতরাং তাহার কারণ থাকাও সম্ভবপর হয় না।
“(১৩) প্রকৃতির চতুর্বিংশতি ভেদ যথা—(১) সত্ত্ব-রজস্তমোগুণাত্মিকা মূল প্রকৃতি। ২। মহত্তত্ত্ব(ইহার অপর নাম বুদ্ধি)। ৩। অহঙ্কার(অভিমান), ৪। পঞ্চ তন্মাত্র—শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধতন্মাত্র। ৫। একাদশ ইন্দ্রিয়— মন, শ্রোত্র, ত্বক্, চক্ষু, রসনা, ও ঘ্রাণ(নাসিকা) এবং বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু ও উপস্থ। ৬। পঞ্চভূত—আকাশ, বায়ু, তেজঃ, জল ও পৃথিবী। প্রকৃতি এই চব্বিশ প্রকারে জগৎ রচনা করিয়া থাকে।
ধৰ্মাধর্ম্মেী সুখদুঃখে চ সৃষ্টিবিনাশপাকৌ নরকে গতিশ্চ। বাসঃ স্বর্গে জাতয়শ্চাশ্রমাশ্চ রাগদ্বেষৌ বিবিধা ব্যাধয়শ্চ ॥ কৌমারতারুণ্যজরাবিয়োগ-সংযোগ-ভোগানশন-ব্রতানি। ইতীদমীদৃগ্বিদয়ং নিধায় তৃষ্ণীমাসীনঃ সুমতিঞ্চ বিদ্বান্ ॥ তথা চ শ্রীবিষ্ণুধর্মে ষড়ধ্যায্যাম্— “অনাদিসম্বন্ধবত্যা ক্ষেত্রজ্ঞেয়মবিদ্যয়া। যুক্তঃ পশ্যতি ভেদেন ব্রহ্ম তত্ত্বাত্মনি স্থিতম্ ॥” পশ্যত্যাত্মানমন্যচ্চ যাবদ্বৈ পরমাত্মনঃ। তাবৎ সম্ভাম্যতে জন্তুর্মোহিতো নিজকমুণা ॥ সংক্ষীণাশেষকর্মা তু পরং ব্রহ্ম প্রপশ্যতি। অভেদেনাত্মনঃ শুদ্ধং শুদ্ধত্বাদক্ষয়ো ভবেৎ ॥ অবিদ্যা চ ক্রিয়াঃ সর্ব্বা বিদ্যা জ্ঞানং প্রচক্ষতে। কর্মণা জায়তে জন্তুর্বিদ্যয়া চ বিমুচ্যতে ॥ অদ্বৈতং পরমার্থো হি দ্বৈতং তদ্ভিন্ন উচ্যতে। পশুতির্য্যন্মনুষ্যাখ্যং তথৈব নৃপ নাবকং ॥ চতুর্বিধোহপি ভেদোহয়ং মিথ্যাজ্ঞাননিবন্ধনঃ। অহমন্যোহপরশ্চায়-মমী চাত্র তথা পরে ॥
প্রাদুর্ভূত হয়, এবং ধৰ্ম্ম, অধর্ম্ম, সুখ, দুঃখ, সৃষ্টি, বিনাশ, নরকে গতি, স্বর্গবাস, নানাপ্রকার জন্ম, আশ্রমভেদ, রাগ, দ্বেষ, বিবিধ ব্যাধি, কৌমার, যোবন, জরা, সংযোগ, বিয়োগ, ভোগ, অভোগ ও ব্রতসমূহ নিষ্পন্ন হয়, এবংবিধ জ্ঞানসম্পন্ন বিদ্বান্ সমস্ত ত্যাগ করিয়া মৌনাবলম্বনপূর্ব্বক অবস্থান করিবেন।”
ষড়ধ্যায়ী বিষ্ণুধর্ম্মেও এইরূপ আছে—“ক্ষেত্রজ্ঞসংজ্ঞক জীব অনাদি মায়ার সহিত সংযুক্ত হইয়া আত্মস্বরূপে অবস্থিত ব্রহ্মে ভেদদর্শন করিয়া থাকে। প্রাণী যে পর্য্যন্ত পরমাত্মা হইতে পৃথবুদ্ধিতে আপনাকে ও অপর সকলকে দর্শন করে, সেই পর্য্যন্ত বিমূঢ় জীব নিজ কৰ্ম্মানুসারে সংসারে পরিভ্রমণ করে। কিন্তু যাহার কর্মসকল সম্পূর্ণরূপে ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছে, সেই পুরুষ আপনার সঙ্গে অভিন্নরূপে শুদ্ধ ব্রহ্মদর্শন করেন, এবং শুদ্ধ বলিয়াই অক্ষয় হন।
সমস্ত ক্রিয়াকেই অবিদ্যা বলে, আর বিদ্যাকেই জ্ঞান বলে। মানুষ ক্রিয়া (কৰ্ম্ম) দ্বারা বন্ধন প্রাপ্ত হয়, আর বিদ্যা দ্বারা মুক্ত হয়। অদ্বৈতই পরমার্থ (সত্য), দ্বৈত তাহা হইতে ভিন্ন অর্থাৎ অপরমার্থ। পশু, তির্য্যক্, মনুষ্য ও নারকী, এই চতুর্বিধ ভেদই মিথ্যাজ্ঞান-জনিত। আমি অন্য, অপরে আমা হইতে অন্য, এবং ইহারা অপর, এ সমস্ত দ্বৈত বা ভেদপ্রতীতিই অজ্ঞান অর্থাৎ অজ্ঞানের
অজ্ঞানমেতদ্বৈতাখ্যমদ্বৈতং ক্রয়তাং পরম্। মম ত্বহমিতি প্রজ্ঞা-বিযুক্তমবিকল্পবৎ ॥ ‘অবিকার্য্য-মনাখ্যেয়মদ্বৈতমনুভূয়তে। মনোবৃত্তিময়ং দ্বৈতমদ্বৈতং পরমার্থতঃ ॥ মনসো বৃত্তয়স্তস্মাদ্ধৰ্ম্মাধম্মনিমিত্তজাঃ। নিরোদ্ধব্যাস্তন্নিরোধে দ্বৈতং নৈবোপপদ্যতে ॥ মনোদৃষ্টমিদং সর্ব্বং যৎ কিঞ্চিৎ সচরাচরম্। মনসো হ্যমনী ভাবে দ্বৈতাভাবং তদাপ্নুয়াৎ ॥ কৰ্ম্মণো ভাবনা যেয়ং সা ব্রহ্মপরিপন্থিনী। কর্মভাবনয়া তুল্যং বিজ্ঞানমপজায়তে ৷৷ তাদৃগ ভবতি বিজ্ঞপ্তির্যাদৃশী খলু ভাবনা। ক্ষয়ে তস্যাঃ পরং ব্রহ্ম স্বয়মের প্রকাশতে ৷৷
ফল। অতঃপর অদ্বৈততত্ত্ব শ্রবণ কর। অদ্বৈতে আমি আমার ইত্যাদি বুদ্ধি থাকে না, বিকল্পজ্ঞানও স্থান পায় না, উহা বিকাররহিত ও বর্ণনার অযোগ্য; উহা এইরূপেই অনুভূত হইয়া থাকে। দ্বৈতপ্রপঞ্চ কেবলই মনোময় অর্থাৎ মনের কল্পনামাত্র, অদ্বৈতই পরমার্থ। এই জন্যই ধম্ম ও অধর্ম্মরূপ নিমিত্তবশে মনের যে, নানাবিধ বৃত্তি(চিন্তা), সে সকল বৃত্তির নিরোধ করা আবশ্যক। মনোবৃত্তির নিরোধ হইলে আর দ্বৈতসত্তা থাকে না। এই চরাচর সমস্ত জগৎই মনোদৃষ্ট অর্থাৎ মনের কল্পিত; মনের অমনীভাব হইলে অর্থাৎ মনের সংকল্প- বিকল্প-স্বভাব বিরত হইলে, তখন অদ্বৈতভাব উপলব্ধি-গোচর হয়(১৪)। এই যে, কৰ্ম্মভাবনা অর্থাৎ কৰ্ম্মানুষ্ঠানচিন্তা, ইহা ব্রহ্মলাভের পরিপন্থী; কেন না,[কম্মাসক্ত লোকের জ্ঞানও ঠিক কৰ্ম্মভাবনারই অনুরূপ হইয়া থাকে। যে প্রকার ভাবনা হয়, বিজ্ঞানও তদনুরূপ হইয়া থাকে। সেই কম্যভাবনার ক্ষয় হইলে পর ব্রহ্ম আপনা হইতেই প্রকাশ পাইয়া থাকেন। হে মানবেন্দ্র, জীব ও
(১৪) দৃশ্যমান জগতের সৃষ্টি দুই প্রকার—এক ঈশ্বর-সৃষ্টি, অপর জীব- সৃষ্টি। ঈশ্বরসৃষ্ট জগৎ সকলের পক্ষেই সমান বা একরূপ। জীব স্বীয় প্রাক্তন সংস্কারবশে সেই ঈশ্বরসৃষ্ট জগতের উপর নানাপ্রকার বৈচিত্র্য সৃষ্টি করিয়া থাকে। তাহার ফলে একই বস্তুকে বিভিন্ন লোকে বিভিন্ন আকারে ভোগ করিতে বাধ্য হয়। মানসিক সংকল্পভেদে একই বস্তুকে বিভিন্ন লোকে বিভিন্ন রকমে দেখে ও ভোগ করে। মনের সেই সংকল্পশক্তি নিরুদ্ধ হইলে আর ভোগ- বৈচিত্র্য আসিতে পারে না।
| পরাত্মনো মনুষ্যেন্দ্র বিভাগোহজ্ঞানকল্পিতঃ। |
|---|
| ক্ষয়ে তস্যাত্মপরয়োরবিভাগোহত এব হি ॥ |
| আত্মা ক্ষেত্রজ্ঞসংজ্ঞো হি সংযুক্তঃ প্রাকৃতৈগুণৈঃ। |
| তৈরেব বিগতঃ শুদ্ধঃ পরমাত্মা নিগদ্যতে ॥” |
| তথা চ শ্রীবিষ্ণুপুরাণে—“পরমাত্মা ত্বমেবৈকো নান্যোহস্তি জগতঃ পতে। তবৈষ মহিমা যেন ব্যাপ্তমেতচ্চরাচরম্ ॥ |
| যদেতদ্দশ্যতে মূর্ত্তমেতজ্ঞানাত্মনস্তব। ভ্রান্তিজ্ঞানেন পশ্যন্তি জগদ্রূপমযোগিনঃ ॥ |
| জ্ঞানস্বরূপমখিলং জগদেতদবুদ্ধয়ঃ। অর্থস্বরূপং পশ্যন্তো ভ্রাম্যন্তে মোহসংপ্লবে ॥ |
| যে তু জ্ঞানবিদঃ শুদ্ধচেতসস্তে খিলং জগৎ। জ্ঞানাত্মকং প্রপশ্যন্তি ত্বদ্রূপং পারমেশ্বরম্ ॥ |
| অহং হরিঃ সর্ব্বমিদং জনাৰ্দ্দনো নান্যত্ততঃ কারণকাৰ্য্যজাতম্। |
| ঈদৃঙ্মনো যস্য ন তস্য ভূয়ো ভবোদ্ভবা দ্বন্দ্বদা ভবন্তি ॥ জ্ঞানস্বরূপমত্যন্তং নির্ম্মলং পরমার্থতঃ। তদেবার্থস্বরূপেণ ভ্রান্তিদর্শনতঃ স্থিতম্ ॥ |
| জ্ঞানস্বরূপো ভগবান্ যতোহসাবশেষমূর্ত্তি নতু বস্তুভূতঃ। ততো হি শৈলাদ্ধিধরাদিভেদান্ জানীহি বিজ্ঞানবিজন্তিতানি ॥ |
পরমাত্মার বিভাগ অজ্ঞান-কল্পিত, সেই অজ্ঞান অপনাত হইলে তাহাতেই জীব ও পরমাত্মার অবিভাগ সিদ্ধ হয়। আত্মা প্রকৃতিসম্ভূত গুণে সম্বদ্ধ হইয়া ক্ষেত্রজ্ঞ নাম লাভ করে; সেই ক্ষেত্রজ্ঞই যখন সেই সকল গুণ পরিত্যাগ করিয়া বিশুদ্ধ হয়, তখন পরমাত্মা নামে অভিহিত হয়।’
বিষ্ণুপুরাণেও সেইরূপ কথা আছে—‘হে জগৎপতে, পরমাত্মা তুমিই একমাত্র সত্য, অপর কিছুই নাই—অসত্য। তোমারই এই মহিমা, যাহা চরাচর জগতে পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে। এই যে, স্থূল জগৎ দৃষ্ট হইতেছে, অসৎ যোগিগণ তোমার সম্বন্ধে ভ্রান্তিবশতই ইহা দর্শন করে। অল্পবুদ্ধি লোকেরা ভ্রমবশতঃ জ্ঞানস্বরূপ এই জগৎকে বস্তুভূত মনে করিয়া সংসারে পরিভ্রমণ করে। কিন্তু যাহারা শুদ্ধচিত্ত জ্ঞানী, তাহারা দেখেন এই সমস্ত জগৎই জ্ঞানময় তোমার পারমেশ্বর রূপ। ‘যে জন জানে, আমি, হরি, জনার্দ্দন ও কার্য্যকারণভাবাপন্ন এই সমস্ত জগৎ তাঁহা হইতে অন্য বা পৃথক্ কিছু নহে, তাহার পুনর্ব্বার শীতোষ্ণ ও সুখদুঃখাদি দ্বন্দ্বজাত পীড়া হয় না। অত্যন্ত নিৰ্ম্মল পরমার্থসত্য যে জ্ঞান(ব্রহ্ম), তাহাই শান্তি- দর্শনের ফলে বিষয়াকারে অবস্থিত দৃষ্ট হয়। অনন্তমূর্ত্তি এই ভগবান্ শুদ্ধ জ্ঞানস্বরূপ, তিনি কোনও জড় বস্তু নহে। জানিবে, তাহা হইতেই শৈল, সমুদ্র, পৃথিবী প্রভৃতি
বস্তুস্তি কিং কুত্রচিদাদিমধ্যপর্যন্তহীনং সততৈকরূপম্। যচ্চান্যথা ত্বং দ্বিজ যাতি ভূয়ো ন তত্তথা তত্র কুতোহি তত্ত্বম্। মহী ঘটত্বং ঘটতঃ কপালিকা কপালিকাচূর্ণরজস্ততোহণঃ। জনৈঃ স্বকৰ্ম্মস্তিমিতাত্মনিশ্চয়ৈরালক্ষ্যতে ব্রূহি কিমত্র বস্তু ॥ তস্মিন্ ন বিজ্ঞানমুতেস্তি কিঞ্চিৎ ক্বচিৎ কদাচিং দ্বিজ বস্তুজাতম। বিজ্ঞানমেকং নিজকর্মভেদবিভিন্নচিত্তৈর্ব্বহুধাহভ্যুপেতম্ ॥ জ্ঞানৎ বিশুদ্ধং বিমলং বিশোকমশেষলোভাদিনিরস্তসঙ্গম্। একং স’দকং পরমঃ পরেশঃ স বাসুদেবো ন সতোহন্যদস্তি ॥ সদ্ভাব এবং ভবতো ময়োক্তো জ্ঞানং যথা সত্যমসত্যমন্যৎ। এতত্ত্ব যৎ সংব্যবহারভূতং তত্রাপি চোক্তং ভুবনাশ্রিতং তে ॥ অবিদ্যাসঞ্চিতং কৰ্ম্ম তচ্চাশেষেযু জন্তুষু। আত্মা শুদ্ধোহক্ষরঃ শান্তো নির্গুণঃ প্রকৃতেঃ পরঃ ॥
প্রবদ্যপচয়ে। ন স্ত একস্যাখিলজন্তুরু।
যদু কালাস্তরেণাপি নাথসংজ্ঞামুপেতি দৈব ॥
পরিণামাদিসম্ভূতং ততঃ নৃপ তচ্চ কিম্।
যদ্যন্যোহস্তি পরঃ কোহপি মতঃ পাণিবসত্তনঃ ॥
বিভাগ সকল বুদ্ধি-বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রকটিত হইয়াছে। কোথাও এমন বস্তু আছে কি? যাহা আদি মধ্য ও অন্ত বজ্জিত এবং সর্ব্বদা একরূপ। হে দ্বিজ, পৃথিবীতে যাহা অন্যথাত্ব(রূপান্তর) প্রাপ্ত হয়, তাহাত সেরূপ নহে; সুতরাং তাহাতে বস্তুত্বও থাকে না, যে সকল লোক স্বীয় কৰ্ম্ম দ্বারা আত্মার স্বরূপজ্ঞান নিঃসংশয়রূপে উদ্বুদ্ধ করিয়াছে, তাহারা দেখেন-প্রথমে পৃথিবী, পরে ঘটভাব, ঘটের পরে আবার কপালিকা(ঘটের পৃথক্ দুইটা অংশ), অনন্তর, ক্রমশঃ চূর্ণ(খোলা) ধলি ও অণু(অতি সূক্ষ্ম ভাব)। বল দেখি, ইহার মধ্যে কোনটা বস্তু(অবিকারী)? অতএব হে দ্বিজ, বিজ্ঞান বা মানস সংকল্প ব্যতীত কোথাও কোনও বস্তু নাই। প্রাক্তন নিজ নিজ কর্মানুসারে বিভিন্নপ্রকার চিত্তবৃত্তি- সম্পন্ন মনুষ্যেরা একমাত্র বিজ্ঞানকেই বহুপ্রকারে গ্রহণ করিতেছে। রাগ দ্বেষাদি মলরহিত, শোকসম্পর্কশূন্য, সদাই একরূপ একমাত্র জ্ঞানই সেই সর্বোত্তম পরমেশ্বর বাসুদেব, যাঁহার অতিরিক্ত আর কিছু নাই। আমি তোমাকে এই প্রকারে জগতের সদ্ভাব বা স্থিতির নিয়ম বলিলাম, এবং জ্ঞানই যে, একমাত্র সত্য, অপর সকলই অসত্য, একথাও বলিয়াছি। আর এই যে, জাগতিক লোকব্যবহার, তদ্বিষয়েও বক্তব্য বলিয়াছি। কৰ্ম্ম মাত্রই অজ্ঞানপ্রসূত; তাহা সকল প্রাণীতেই আছে। আত্মা কিন্তু স্বভাবতই শুদ্ধ, নির্বিকার, নির্গুণ শান্ত ও প্রকৃতির অতীত। সর্ব্ব প্রাণীতে বিরাজমান আত্মা এক, তাহার বৃদ্ধি ও
তদেযোহহময়ং চান্যো বক্তমেবমপীষ্যতে। যদা সমস্তদেহেষু পুমানেকো ব্যবস্থিতঃ ॥ তদা হি কো ভবান্ সোহহমিত্যেতদ্বিপ্রলন্তনম্। ত্বং রাজা শিবিকা চেয়ং বয়ং বাহাঃ পুরঃসরাঃ। অয়ঞ্চ ভবতো লোকো নসদেতৎ ত্বয়োচ্যতে। বস্তু রাজেভি যল্লোকে যচ্চ রাজভটাত্মকম্ ॥ তথাহন্যে চ নৃপত্বঞ্চ তত্তৎসঙ্কল্পনাময়ম্। অনাশী পরমার্থশ্চ প্রাজ্ঞৈরভ্যপগম্যতে ॥ পরমার্থস্ত ভূপাল সংক্ষেপাৎ ক্রয়তাং মম। একো ব্যাপী সমঃ শুদ্ধো নির্গুণঃ প্রকৃতেঃ পরঃ ॥ জন্মবুদ্ধ্যাদিরহিত আত্মা সর্ব্বগতোহব্যয়ঃ। পরো জ্ঞানময়ঃ সদ্ভিনামজাত্যাদিভিঃ প্রভুঃ ॥ ন যোগবান্ ন যুক্তোহভূন্নৈব পার্থিব যোক্ষ্যতি। তস্যাত্মপরদেহেষু সংযোগো হেক এব যৎ। বিজ্ঞানং পরমার্থোহসৌ দ্বৈতিনোহতথ্যদর্শিনঃ। এবমেকমিদং বিদ্বন্নভেদি সকলং জগৎ ॥
অপচয় নাই। হে বাজন, যাহা কোন কালেও পরিণামাদি অবস্থাভেদে নামান্তর প্রাপ্ত হয় না, তাহাই যথার্থ বস্তু; সে বস্তুটী কি? তে পাথিবসত্তম, যদি আমার অতিরিক্ত আরও কিছু থাকিত, তাহা হইলেই ইনি, আমি, অমুক, অন্য-ইত্যাদি কথা বলিলেও বলা যাইত। যখন সমস্ত জগতে একই পুরুষ বিদ্যমান রহিয়াছেন, তখন আপনি, তিনি বা আমি কে? এবংবিধ ব্যবহার কেবল প্রতারণামাত্র অর্থাৎ ঐরূপ ব্যবহার অর্থহীন শব্দমাত্র। তুমি রাজা, এই তোমার শিবিকা (পাল্কী), আমরা অগ্রগামী বাহক, আর তোমার এই পরিজন, এ সমস্ত অসত্য বলা হইয়াছে। ব্যবহার ক্ষেত্রে যে, রাজা, রাজভট(ভট অর্থ-বীর), নৃপত্ব, এবং আরও যে সকল বস্তু বলা হয়, সে সমস্তই অসৎ-কেবল সংকল্পময়। হে ভূপাল, প্রাজ্ঞ জনেরা যাহাকে অবিনাশী পরমার্থ বলিয়া স্বীকার করেন, সেই পরমার্থ বস্তু বলিতেছি, আমার নিকট শ্রবণ কর। সব্বব্যাপী, সর্ব্বত্র সমান, শুদ্ধ নির্গুণ, জন্ম ও বৃদ্ধিরহিত এবং প্রকৃতির অতীত সর্ব্বগত অব্যয় আত্মা এক। হে পার্থিব, সেই আত্মা সর্ব্বাতিশায়ী মহান, সর্বশক্তিসম্পন্ন ও জ্ঞান স্বরূপ। তিনি নাম ও জাতি প্রভৃতি ধর্ম্মের সহিত কখনও সংযুক্ত হন নাই, বর্তমানেও নাই, এবং ভবিষ্যতেও যুক্ত হইবেন না। নিজের এবং পরের দেহে তাঁহার একই সংযোগ,(নূতন নূতন সংযোগ হয় না), এই প্রকার যে জ্ঞান, তাহাই যথার্থ জ্ঞান, দ্বৈতবাদীরা অসত্যদর্শী অর্থাৎ ভ্রান্তিবশে ভেদ দর্শন করিয়া থাকে। এইরূপ অর্থাৎ কেবল সংকল্পময় অসত্য বলিয়াই এই সমস্ত জগৎ ভেদ-
৩০
বাসুদেবাভিধেয়স্য স্বরূপং পরমাত্মনঃ। নিদাঘোহপ্যুপদেশেন তেনাদ্বৈতপরোভবৎ ॥ ‘সর্বভূতান্যভেদেন স দদশ তদাত্মনঃ। তথা ব্রহ্ম ততো মুক্তিমবাপ পরমাং দ্বিজ ॥ সিতনীলাদিভেদেন যথৈকং দৃশ্যতে নভঃ। ভ্রাতৃদৃষ্টিভিরাত্মাপি তথৈকঃ সন্ পৃথক্ পৃথক্ ॥ একঃ সমস্তং যদিহাস্তি কিঞ্চিত্তদচুতো নাস্তি পরং ততোহন্যৎ। সোহহৎ স চ ত্বং স চ সর্বমেতদাত্মস্বরূপং ত্যজ ভেদমোহম্ ॥ ইতীরিতস্তেন স রাজবৰ্য্যস্তত্যাজ ভেদং পরমার্থদৃষ্টিঃ। স চাপি জাতিস্মরণাপ্তবোধস্তত্রৈব জন্মন্যপবর্গমাপ ॥
তথা লৈঙ্গে— “তস্মাদজ্ঞানমলো হি সংসারঃ সর্বদেহিনাম্। পরতন্ত্রে স্বতন্ত্রে চ ভিদাভাবাদ্বিচারতঃ ॥ একত্বমপি নাস্ত্যেব দ্বৈতং তত্র কুতোহস্ত্যহো॥ একং নাস্ত্যথ মর্ত্যঞ্চ কুতো মৃতসমুদ্ভবঃ। নান্তঃপ্রজ্ঞো বহিঃপ্রজ্ঞো ন চোভয়ত এব চ॥
শূন্য ও এক, এবং ইহা বাসুদেবনামক পরমাত্মার স্বরূপ, তদতিরিক্ত নহে। হে দ্বিজ, সাধক নিদাঘও অদ্বৈতোপদেশের ফলে অদ্বৈততত্ত্বে বিশ্বাসবান্ হইয়া- ছিলেন, তখন আপনার সঙ্গে অভিন্নভাবে সর্ব্বভূত দর্শন করিয়াছিলেন; এবং অভিন্নরূপে ব্রহ্মদর্শন করিয়া পরা মুক্তি(নির্ব্বাণ) লাভ করিয়াছিলেন। ভ্রান্তদৃষ্টি লোকেরা একই আকাশকে যেমন সিত নীলাদিভেদে নানাকার দর্শন করে, ঠিক তেমন আত্মা এক হইলেও, তাহাকে পৃথক্ পৃথক্ দর্শন করিয়া থাকে। এ জগতে যাহা কিছু আছে, তৎসমস্তই এক অচ্যুত(ভগবান্), তদতিরিক্ত আর কিছু নাই। আমি তৎস্বরূপ, তুমিও তৎস্বরূপ এবং এ সকলই সেই আত্ম- স্বরূপ, অতএব ভেদবুদ্ধিকৃত মোহ ত্যাগ কর। সেই নৃপবর এইরূপ উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া পরমার্থদৃষ্টি লাভ করত ভেদবুদ্ধি ত্যাগ করিয়াছিলেন, এবং তিনিও পূর্ব্বজন্ম স্মরণের ফলে তত্ত্ববোধ প্রাপ্ত হইয়া সেই জন্মেই মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন।”
লিঙ্গপুরাণেও সেইরূপ আছে—‘সেই হেতু সমস্ত দেহীরই এই সংসার অজ্ঞান- সম্ভূত; কারণ, বিচার করিলে দেখা যায় যে, মায়া-পরতন্ত্র জীব ও স্বতন্ত্র পরমাত্মার কোনই প্রভেদ নাই, অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়ই স্বরূপতঃ এক বস্তু। বস্তুতঃ একত্ব বলিয়াও তাহার কোন ধম্ম নাই, তাহাতে দ্বৈতসত্তার আর সম্ভাবনা কি? একও নাই, মর্ত্যও(মরণশীলও) নাই; সুতরাং মৃত্যুর সম্ভাবনাই
ন প্রজ্ঞানঘনত্ত্বেবং ন প্রজ্ঞোহপ্রজ্ঞ এব সঃ। বিদিতে নাস্তি বেদ্যঞ্চ নির্ব্বাণং পরমার্থতঃ ॥ অজ্ঞানতিমিরাৎ সর্ব্বং নাত্র কাৰ্য্যা বিচারণা। জ্ঞানঞ্চ বন্ধনঞ্চৈব মোক্ষো নাপ্যাত্মনো দ্বিজাঃ ॥ ন হোষা প্রকৃতিজীবো বিকৃতিশ্চ বিকারতঃ। বিকারো নৈব মায়ৈষা সদসদ্ব্যক্তিবজ্জিতা ॥”
তথাহি ভগবান্ পরাশরঃ—“অস্মাদি জায়তে বিশ্বমত্রৈব প্রবিলীয়তে। গবান্ পরাশরঃ—“অস্মাদ্ধি জায়তে বিশ্বমত্রৈব প্র স মায়ী মায়য়া বদ্ধঃ করোতি বিবিধাস্তনুঃ ॥ ন চাত্রৈবং সংসরতি ন চ সংসারয়েৎ পরম্। ন কর্তা নৈব ভোক্তা চ নচ প্রকৃতি পুরুষৌ ॥ ন মায়া নৈব চ প্রাণাশ্চেত্যং পরমার্থতঃ। তস্মাদজ্ঞানমূলো হি সংসারঃ সর্ব্বদেহিনাম ॥
বা কোথায়।(১৫)[শ্রুতি বলিয়াছেন] পরমেশ্বরের অন্তরেও প্রজ্ঞা(জ্ঞান) নাই, বাহিরেও প্রজ্ঞা নাই, এবং ভিতর বাহির উভয়ত্রও প্রজ্ঞা নাই। তিনি প্রজ্ঞানের পরিণতি নহেন, এবং তিনি প্রকৃষ্ট জ্ঞানসম্পন্নও নহেন, অথবা প্রজ্ঞাহীন জড় পদার্থও নহেন, তিনি সম্পূর্ণরূপে অনির্বচনীয়। তিনি বিদিত হইলে আর কিছু জানিবার থাকে না, তখন প্রকৃত নির্ব্বাণ(মুক্তি) হয়। তিমির এক প্রকার চক্ষুরোগ। তিমির রোগ হইলে লোকে ভুল দেখে, যাহা যেরূপ নয়, তাহাকেও সেরূপ দেখে। অজ্ঞানও ঠিক তিমির রোগের মত এক বস্তুকে অন্য বস্তু বলিয়া দর্শন করায়, এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মে নানাপ্রকার বিভেদ দর্শন করায়, এ বিষয়ে আর বিতর্ক নাই। হে দ্বিজগণ, আত্মার প্রকৃত পক্ষে জ্ঞান, বন্ধন, মুক্তি, এ সব কিছুই নাই। এই প্রকৃতি, বিকৃতি, বিকৃতির বিকার বা জীব কিছুই নাই, এ সমস্তই সদসদাত্মকরূপে নির্ব্বাচনের অযোগ্য।’ ভগবান্ পরাশরও এইরূপই বলিয়াছেন—‘এই পরমেশ্বর হইতে বিশ্ব প্রাদু- ভূত হয় এবং তাহাতেই আবার বিলীন হয়। মায়াধীশ্বর তিনিই মায়া দ্বারা আবদ্ধ(বশীভূত) হইয়া নানাবিধ শরীর পরিগ্রহ করেন, অর্থাৎ জীবভাবে নানা দেহ ধারণ করেন। বাস্তবিক পক্ষে তিনি নিজেও সংসারী হন না, এবং অপ- রকেও সংসারে প্রেরণ করেন না। তিনি কর্তা নহে, ভোক্তা নহে, প্রকৃতি বা পুরুষও নহে, মায়া কিংবা প্রাণও নহে; পরমার্থতঃ তিনি শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ। এই
(১৫) ব্রহ্ম স্বভাবতই গুণক্রিয়াদিরহিত নির্বিশেষ, সুতরাং তাহাতে একত্ব প্রভৃতি কোন ধর্ম্ম বা বিশেষণ থাকা সম্ভবপর হয় না। তাহার পর, যাহার সত্তা আছে, তাহারই জন্ম মৃত্যু সম্ভবপর হয়, ব্রহ্ম যখন সৎ বা অসৎ কোনরূপেই নির্বচনীয় নহে, তখন তাহার জন্ম-মৃত্যু ব্যবহারও হইতে পারে না
নিত্যঃ সর্ব্বগতো হ্যাত্মা কূটস্থো দোষবর্জিতঃ। একঃ স ভিদ্যতে শক্ত্যা মায়য়া ন স্বভাবতঃ ॥ তস্মাদদ্বৈতমেবাহুর্মুনয়ঃ পরমার্থতঃ। জ্ঞানস্বরূপমেবাহুর্জগদেত দ্বিচক্ষণাঃ ॥ অর্থস্বরূপমজ্ঞানাঃ পশ্যন্ত্যন্যে কুদৃষ্টয়ঃ। কূটস্থো নির্গুণো ব্যাপী চৈতন্যাত্মা স্বভাবতঃ ॥ দৃশ্যতে হ্যর্থরূপেণ পুরুষৈর্ভ্রান্তদৃষ্টিভিঃ। যদা পশ্যন্তি চাত্মানং কেবলং পরমার্থতঃ ॥ মায়ামাত্রমিদং দ্বৈতং তদা ভবতি নিবৃতঃ। তস্মাদিজ্ঞানমেবাস্তি ন প্রপঞ্চো ন সংসৃতিঃ ॥”
এবং শ্রুত্যাদিনা নামাদিকারণত্বোপন্যাসমুখেন স্বরূপেণ চ বাধিতত্বাৎ প্রপঞ্চস্য মিথ্যাত্বমবগম্যতে। অস্থূলাদিলক্ষণস্য ব্রহ্মণস্তদ্বিপরীতস্থূলাকারো মিথ্যা ভবিতুমর্হতি। যথৈকস্য চন্দ্রমসস্তদ্বিপরীতদ্বিতীয়াকারস্তদ্বৎ॥ ৯
তথাচ সুধাকরেণ—“ন স্থানতোঽপি পরস্যোদ্যমলিঙ্গং” ইতি দর্পকপাদ্যং।
কারণে সমস্ত দেহীর সংসারই(জন্ম মরণাদি) কেবল অজ্ঞানমূলক, সত্য নহে। আত্মা স্বভাবতঃ নিত্য সার্বব্যাপী কূটস্থ(নির্বিকার) এবং সব্বদোষবর্জিত। তিনি এক হইয়াও মায়াশক্তিপ্রভাবে বিভিন্ন ভাবে প্রকটিত হন, ঐ সকল তাহার স্বাভাবিক রূপ নহে। সেই অদ্বৈতকেই পরমার্থ সত্য বলিয়া থাকেন, এবং বিবেকিগণ এই জগৎকে জ্ঞানস্বরূপ বলিয়া নিদ্দেশ করিয়া থাকেন। যাহারা মুনি বা বিচক্ষণ নহে, অসুদ্ধি সেই সকল লোকই অজ্ঞানবশতঃ ভোগ্য বস্তু দর্শন করিয়া থাকেন। স্বভাবতঃ নির্গুণ নির্বিকার সর্ব্বব্যাপী চৈতন্যরূপী আত্মাকেই (ব্রহ্মকেই) অসদ্বুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষেরা বিষয়াকার দর্শন করে। যখন আত্মাকে বস্তুতঃ কেবল অর্থাৎ নির্বিশেষভাবে দর্শন করে, এবং এই দ্বৈত জগৎকেও কেবল মায়ারূপে নিরীক্ষণ করে, পুরুষ তখনই নির্বৃত হয় অর্থাৎ শান্তিময় মুক্তি প্রাপ্ত হয়। অতএব একমাত্র বিজ্ঞান বা চৈতন্যরূপী ব্রহ্মই আছে—সত্য, প্রপঞ্চ (জগৎ) ও সংসার নাই—অর্থাৎ অসৎ॥” ৯
এই জাতীয় শ্রুতি স্মৃতি প্রমাণে উল্লিখিত হইয়াছে যে, নামরূপাত্মক জগৎপ্রপঞ্চ মায়াময়—‘বাচারম্ভণমাত্র,’ সুতরাং বাধিত। মায়াপ্রসূত দৃশ্যমাত্রই যে, মিথ্যা অসত্য, ইহা অবধারিত। এই জগৎপ্রপঞ্চও যখন প্রতিক্ষণেই রূপান্তরিত হয়—একরূপে থাকে না, তখন ইহা স্বরূপতও বাধিত বা মিথ্যা বলিয়া অবধারিত হয়। পক্ষান্তরে ব্রহ্মে স্থূলত্বাদি ধৰ্ম্ম নাই, নাই বলিয়াই ব্রহ্ম নিত্য সত্য। প্রপঞ্চ যখন তদ্বিপরীত—স্থূলত্বাদি ধর্মযুক্ত, তখন তাহা সত্যের ও বিপ- রীত—মিথ্যা বা অসত্য হওয়াই সঙ্গত। যেমন এক চন্দ্রের দ্বিতীয় আকার অর্থাৎ
উপাধিতশ্চ বিরুদ্ধরূপদ্বয়াসম্ভবান্নির্বিশেষমেব ব্রহ্মেত্যুপপাদ্য, “ন ভেদাৎ” ইতি শ্রুতিবলাৎ কিমিতি সবিশেষমপি ব্রহ্ম নাভ্যুপগম্যতে? ইত্যাশঙ্ক্য, “ন প্রত্যেক- মতদ্বচনাৎ” ইত্যুপাধিভেদস্য শ্রুত্যৈব বাধিতত্বাদভেদশ্রুতিবলাৎ সবিশেষস্য গ্রহণাযোগান্নির্বিশেষমেবেত্যুপপাদ্য “অপি চৈবমেকে” ইতি ভেদনিন্দাপূর্বকং অভেদমেবৈকে শাখিনঃ সমামনন্তি-“মনসৈবেদমাপ্তব্যম্।” “নেহ নানান্তি কিঞ্চন।” “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি য ইহ নানের পশ্যতি।” “একধৈবানুদ্রষ্টব্যম্” ইতি। “ভোক্তা ভোগ্যং প্রেরিতারঞ্চ মত্বা সর্ব্বং প্রোক্তং ত্রিবিধৎ ব্রহ্মমেতৎ” ইতি সব্বভোগ্যভোক্ত নিয়ন্ত লক্ষণস্য প্রপঞ্চস্য ব্রহ্মৈকস্বভাবতা অভিধীয়ত ইতি পুনরপি নির্বিশেষপক্ষে দৃঢ়ীকৃতে কিমিত্যেকস্বরূপস্যোভয়স্বরূপাসম্ভবে নাকারমেব ব্রহ্মাবধাৰ্য্যতে, ন পুনর্বিপরীতম্? ইত্যাশঙ্ক্য “অরূপবদেব হি তৎপ্রধানত্বাৎ” ইতি রূপাদ্যাকাররহিতমেব ব্রহ্মাবধারয়িতব্যম্। কস্মাৎ? তৎপ্রধানত্বাৎ।
‘দ্বিত্বদর্শন মিথ্যা, ইহাও ঠিক তেমনই। স্বয়ং ব্রহ্মসূত্রকারও(বেদব্যাসও) ‘স্থান বা উপাধিসম্পর্ক বশতও যে, পরমাত্মার উভয় ভাব(সগুণ-নির্গুণ ভাব) হয় না, শ্রুতির সর্ব্বত্রই এ কথা আছে,’ এই সূত্রে প্রথমতঃ বিরুদ্ধ ধম্মদ্বয়ের(সগুণ- নির্গুণত্বের) অসম্ভাবনা হেতু ব্রহ্ম নির্বিশেষ’, এই সিদ্ধান্ত সংস্থাপন করিয়াছেন, পরে ‘ন ভেদাৎ’ এই সূত্রে ভেদবোধক শ্রুতি অনুসারে ব্রহ্মের সবিশেষ ভাবই বা স্বীকার করা হয় না কেন? এইরূপ আশঙ্কা উত্থাপন করিয়া “ন প্রত্যেকমতদ্বচনাৎ” সূত্রে বলা হইয়াছে যে, উপাধিকৃত বিভাগ যখন শ্রুতি দ্বারাই বাধিত, অর্থাৎ সাক্ষাৎ শ্রুতিই যখন উপাধিজনিত বিভাগকে অসত্য বলিয়া প্রতিপাদন করিতেছে, তখন শ্রুতি অনুসারে আর ব্রহ্মের সবিশেষ ভাব গ্রহণ করিতে পারা যায় না, সুতরাং ব্রহ্ম সবিশেষ নহে—নির্বিশেষ, এইরূপ সিদ্ধান্ত স্থাপন করিয়াছেন। পুনরায় “অভেদ- মেবৈকে শাখিনঃ সমামনন্তি”(কোন কোন শাখী অভেদই নির্দেশ করিয়া থাকেন), এইসূত্রে ‘মনের দ্বারাই তাহাকে লাভ করিতে হইবে,’ ‘ইহাতে কিছুমাত্র ভেদ নাই; যিনি ইহাতে ভেদের মত দর্শন করেন, তিনি মৃত্যুর পর মৃত্যু প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ পুনঃ পুনঃ মৃত্যুগ্রস্ত হন,’ ‘একরূপেই তাহাকে দেখিতে হইবে,’ ভোক্তা, ভোগ্য ও প্রেরিতাকে(নিয়ন্তাকে) জানিয়া, এই তিনকেই এক ব্রহ্মস্বরূপ বলিয়া জানিবে।’ ইত্যাদি শ্রুতিতে ভেদনিন্দাপূর্ব্বক অভেদপক্ষই পরমার্থ বলিয়া অবধারিত হইতেছে, এই বলিয়া ব্রহ্মের নির্বিশেষ ভাবই দৃঢ় করা হইয়াছে। পুনরায় আশঙ্কা হইল যে, একরূপ ব্রহ্মের উভয়াকারবাদ শ্রুতিবাধিত বলিয়া অস্বীকৃত হয় হউক, কিন্তু তাহাতে ব্রহ্মের নিরাকারতা নিশ্চয় হয় কিরূপে? তদ্বিপরীত অনেকাকারতাও হইতে পারে? এইরূপ আশঙ্কার পর, “অরূপব- দেব হি তৎপ্রধানত্বাৎ” সূত্রে বলা হইয়াছে যে, শ্রুতিপ্রামাণ্যানুসারে তাহাকে অরূপ(নিরাকার) বলিয়াই অবধারণ করিতে হইবে। তাহার কারণ এই যে, ঐ সকল স্থলে ব্রহ্মই প্রধান ভাবে প্রতিপাদিত হইয়াছে।[যথা—] ‘[ব্রহ্ম]
“অস্থূলমনহহস্বমদীর্ঘশব্দমরূপমব্যয়ম্।” “আকাশে। বৈ নামরূপয়োন্নিৰ্ব্বহিতা, তে যদন্তরা তদ্ব্রহ্ম।” “তদেতদব্রহ্মাপূর্ব্বমনপরমনন্তরমবাহ্যম্” “অয়মাত্মা ব্রহ্ম সর্বানুভূঃ, ইত্যেতদনুশাসনম্”-ইত্যেবমাদীনি নিষ্প্রপঞ্চব্রহ্মাত্ম তত্ত্ব প্রধানানি। ইতরানি কারণব্রহ্মবিষয়াণি, ন তৎপ্রধানানি। তৎপ্রধানান্যতৎপ্রধানেভ্যো বলীয়াংসি ভবন্তি। অতস্তৎপরশ্রুতি প্রতিপন্নত্বাৎ নির্বিশেষমেব ব্রহ্মাবগন্তব্যং, ন পুনঃ সবিশেষম্, ইতি নিব্বিশেষক্ষমুপপাদ্য, কা তর্হ্যাকারবিষয়াণাং শ্রুতীনাং গতিরিত্যাকাক্ষায়াং “প্রকাশবচ্চাবৈয়র্থ্যাৎ” ইতি-চন্দ্রসূর্য্যাদীনাং জলাদ্যপাধি- কৃতনানাত্ববচ্চ ব্রহ্মণোহপ্যুপাধিকৃতনানাত্বরূপস্য বিদ্যমানত্বাৎ তদাকারবতো ব্রহ্মণ আকারবিশেষোপদেশ উপাসনাথো ন বিরুধ্যতে। এবমবৈয়র্থ্যং নানাকারব্রহ্ম- বিষয়াণাং বাক্যানামিতি ভেদশ্রুতীনামৌপাধিকব্রহ্মবিষয়ত্বেনাবৈয়র্থ্যমুক্ত্বা, পুনরপি নির্বিশেষমের ব্রহ্মেতি দঢ়য়িতুম্ “আহ চ তন্মাত্রম্” ইতি। “স যথা সৈন্ধবঘনোহনন্তরোহবাহ্যঃ কৃৎস্নো রসঘন এব। এবং বা অরেহয়মাত্মানন্ত-
স্কুল নয়, অণু নয়, হম্ব বা দীর্ঘ নয়, এবং শব্দ স্পর্শ রূপ রস রহিত,’ ‘আকাশই নাম ও রূপের নির্বাহক। সেই নাম ও রূপ যাহার মধ্যবর্তী, তাহা ব্রহ্ম।’ ‘সেই ব্রহ্ম কারণ নহে, কার্য্য নহে, এবং তাহার অন্তর ও বাহ্য নাই, অর্থাৎ তাহার ভিতব বাহির কিছু নাই।’ ‘এই আত্মা সকল বস্তুর অনুভবিতা, ইহাই অনুশাসন বা বেদের আদেশ,’ ইত্যাদি ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যে নিষ্প্রপঞ্চ ব্রহ্মই প্রধান; নির্বিশেষ ব্রহ্ম প্রতিপাদনেই এই সকল বাক্যের মুখ্য তাৎপর্য্য। অপরাপর শ্রুতিবাক্য ব্রহ্মের কারণতা-বোধকমাত্র অর্থাৎ ব্রহ্মের কারণতা প্রতিপাদনেই ঐ সকল বাক্যের প্রধান তাৎপর্য্য, ব্রহ্ম-প্রতিপাদনে নহে। যে বাক্যের যে অর্থ প্রধান বা তাৎপর্য্যের বিষয়, অতৎপর বাক্য অপেক্ষা সেই সকল তৎপর বাক্যই বলবান্। এই নিয়মানুসারে ব্রহ্মের স্বরূপ-প্রতিপাদক বাক্য অপেক্ষা ব্রহ্ম-কারণতা প্রতি- পাদক বাক্যগুলি ব্রহ্মনিরূপণ বিষয়ে দুর্ব্বল। দুর্ব্বল চিরকালই প্রবলের নিকট পরাজিত হয়, অতএব বলবৎ শ্রুতিপ্রমাণ অনুসারে ব্রহ্মকে নিব্বিশেষ বলিয়াই অবগত হইতে হইবে, কিন্তু সবিশেষ নহে। এইরূপে নির্বিশেষ ব্রহ্মপক্ষ স্থাপন করিয়াছেন। পরে সাকার ব্রহ্মপ্রতিপাদক শ্রুতিগুলির গতি কি হবে? এই- রূপ আশঙ্কার উত্তরে “প্রকাশবচ্চাবৈয়র্থ্যাৎ”(প্রকাশের ন্যায় অর্থাৎ আলোকের ন্যায় সার্থকতা) এই সূত্রে বলা হইয়াছে যে, প্রকাশস্বভাব চন্দ্র-সূর্যাদির যেমন জলাদি উপাধিতে প্রতিবিম্বাকারে অনেকত্ব হয়, তেমনি ব্রহ্মেরও উপাধি সম্বন্ধ বশতঃ নানাত্ব সংঘটিত হয়, ঐরূপ সাকার ব্রহ্ম উপাসনা কার্য্যে বিশেষ উপযোগী; উপযোগী বলিয়াই শ্রুতিতে উপাসনার্থ সাকার ব্রহ্মের উপদেশ বিরুদ্ধ নহে। নানাকার ব্রহ্মপ্রতিপাদক ভেদশ্রুতি সমূহের এইরূপে অবৈয়র্থ্য (সার্থকতা) প্রতিপাদন করিয়া পুনরায় ব্রহ্মের নির্বিশেষপক্ষ দৃঢ়তর করিবার অভিপ্রায়ে “আহ চ তন্মাত্রম্” সূত্রের অবতারণা করিয়াছেন। এই সূত্রে ‘সৈন্ধব
রোহবাহ্যঃ কৃৎস্নঃ প্রজ্ঞানঘন এব” ইতি শ্রুত্যুপন্যাসেন বিজ্ঞানব্যতিরিক্ত-রূপান্তরা- ভাবমুপন্যস্য “দর্শয়তি চাতো অপি স্মর্য্যতে” ইতি। “অথাত আদেশো নেতি নেতি।” “অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি।” “যতোবাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ।” “প্রত্যস্তমিতভেদং যৎ সত্তামাত্রমগোচরং। বচনামাত্ম- সংবেদ্যং তজজ্ঞানং ব্রহ্মসংজ্ঞিতম্ ॥ বিশ্বস্বরূপবৈরূপ্যং লক্ষণং পরমাত্মনঃ” ইত্যাদিশ্রুতিস্মৃত্যুপন্যাসমুখেন প্রত্যস্তমিতভেদমেব ব্রহ্মেত্যুপপাদ্য “অতএব চোপমা সূর্য্যকাদিবৎ” ইতি। যতএব চৈতন্যমাত্ররূপো নেতি নেত্যাত্মকো বিদিতা- বিদিতাভ্যামন্যো বাচামগোচরঃ প্রত্যস্তমিতভেদো বিশ্বস্বরূপবিলক্ষণরূপঃ পরমাত্মা অবিদ্যোপাধিকো ভেদঃ। অতএব চাস্যোপাধিনিমিত্তামপারমার্থিকীৎ বিশেষ- বত্তামভিপ্রেত্য জলসূর্য্যাদিরিবেত্যুপমা দীয়তে মোক্ষশাস্ত্রেষু। ১০
আকাশমেকং হি যথা ঘটাদিষু পৃথক্ পৃথক্। তথাত্মৈকো হ্যনেকশ্চ জলাধারেষিবাংশুমান ॥”
লবণপিণ্ড যেমন কেবলই লবণ-রসময়—অন্তরে বাহিরে সর্ব্বত্রই একরস, ঠিক তেমনই এই আত্মাও একমাত্র প্রজ্ঞানঘন, ইহার অন্তবে ও বাহিরে জ্ঞানাতিরিক্ত আর কিছুই নাই।” এই প্রকার শ্রুতির উল্লেখপূর্ব্বক ব্রহ্মের বিজ্ঞানাতিরিক্ত যে, কোন রূপ নাই, তাহা প্রতিপাদন করিয়া “দর্শয়তি চাতো অপি স্মর্য্যতে” এই সূত্রের অবতারণা করিয়াছেন। এখানেও—‘অতঃপর শ্রুতির আদেশ’ এই যে, ‘ব্রহ্ম ইহা নহে ইহা নহে,’ ‘তিনি বিদিত(বিজ্ঞাত বস্তু) হইতে অন্য, এবং অবিদিত হইতেও পৃথক্, অর্থাৎ তিনি বিদিত বা অবিদিত পদার্থ হইতে সম্পূর্ণ অন্যরূপ।’ ‘বাক্যসমূহ না পাইয়া যাহা হইতে মনের সহিত ফিরিয়া আইসে অর্থাৎ যাহাকে বাক্যে ব্যক্ত করা যায় না, এবং মনেও ধারণা করা সম্ভব হয় না।’ ‘যাহা সর্ব্বপ্রকার ভেদবর্জিত, বাক্যের অগোচর শুদ্ধ সত্তামাত্র(অস্তিত্বমাত্র), বুদ্ধিমাত্রগম্য সেই জ্ঞানই ব্রহ্ম নামে অভিহিত। বিশ্বরূপের বৈপরীত্যই পরমাত্মার(ব্রহ্মের) লক্ষণ বা স্বরূপ।’ ইত্যাদি শ্রুতি ও স্মৃতি প্রমাণ প্রদর্শন পূর্ব্বক “অতএব চোপমা সূর্য্যকাদিবৎ” সূত্র নির্দেশ করিয়াছেন। এখানেও বলিয়াছেন যে, পরমাত্মা যেহেতু শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ ‘নেতি নেতি’ নিষেধা- ত্মক, এবং বিদিত ও অবিদিত হইতে পৃথক্, সর্ব্ববিধ ভেদরহিত, ও জগৎ প্রপঞ্চের ঠিক বিপরীতলক্ষণ, এবং যেহেতু তাহার ভেদ বা বিভাগ অবিদ্যা- উপাধিকৃত, সেই হেতুই পরমাত্মার ঔপাধিক বিশেষ বিশেষ অবস্থায় আকরবত্তা জ্ঞাপনের জন্য মোক্ষশাস্ত্রে জলসূর্য্যাদি(জল প্রতিবিম্বাদি) দৃষ্টান্ত গৃহীত হইয়া থাকে। ১০ ‘বিভিন্ন ঘটে একই আকাশ যেরূপ ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়, এবং একই সূর্য্য যেরূপ ভিন্ন ভিন্ন জলাধারে পৃথক্ পৃথক্ ভাবে প্রকাশ পায়, সেইরূপ এক আত্মাও বিভিন্ন উপাধিতে পৃথক্ পৃথক্ রূপে প্রকটিত হয়।’ ‘সর্ব্বভূতের আত্মা
“এক এব তু ভূতাত্মা ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ। একধা বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবৎ ॥” যথা হ্যয়ং জ্যোতিরাত্মা বিবস্বানপো ভিন্না বহুধৈকোহনুগচ্ছন্। উপাধিনা ক্রিয়তে ভেদরূপো দেবঃ ক্ষেত্রেঘেবমজোহয়মাত্মা ॥”
ইতি দৃষ্টান্তবলেনাপি নির্বিশেমের ব্রহ্মেত্যুপপাদ্য “অম্বুবদগ্রহণাৎ” ইত্যা- জনোহমূর্তত্বেন সব্বগতত্বেন জলসূর্য্যাদিবৎ মর্ত্তসংভিন্নদেশস্থিতত্বাভাবাদ- দৃষ্টান্ত-দাষ্টান্তিকয়োঃ সাদৃশ্যং নাস্তীত্যাশঙ্ক্য “বুদ্ধিহ্রাসভাক্তম্” ইতি। ন হি দৃষ্টান্তদাষ্টান্তিকয়োর্বিবক্ষিতাংশং মুক্তা সর্ব্বসারূপ্যং কেনচিদ্দর্শয়িতুং শক্যতে। সর্ব্বসারূপ্যে দৃষ্টান্তদাষ্টান্তিকভাবোচ্ছেদ এব স্যাৎ। বৃদ্ধিহ্রাসভাক্তমত্র বিব- ক্ষিতম্। জলগতসূর্য্য প্রতিবিম্বং জলবৃদ্ধৌ বদ্ধতে, জলহ্রাসে চ হ্রসতি, জলচলনে চলতি, জলভেদে ভিদ্যত ইত্যেবং জলধর্মানুবিধায়ি ভবতি, ন তু পরমার্থতঃ সূর্য্যস্য তত্ত্বমস্তি। এবং পরমার্থতোহবিকৃতমেকরূপমপি সদ্রহ্ম দেহাদ্যপাধ্যন্ত-
এক হইয়াও বিভিন্ন ভূতে(প্রাণিদেহে) অবস্থান করায় জল-প্রতিবিম্বিত চন্দ্রবিশ্বের ন্যায় কখনও একরূপে, কখনও অনেকরূপে দৃষ্ট হইয়া থাকে।’ ‘এই জ্যোতির্ময় সূর্য্য এক হইয়াও যেমন ভিন্ন ভিন্ন জলের অনুগত হইয়া অর্থাৎ বিভিন্ন জল-ভাজনে প্রতিবিম্বিত হইয়া উপাধি দ্বারা বিভিন্ন আকার প্রাপ্ত হয়, জন্মরহিত প্রকাশমান এই আত্মাও তেমনই দেহভেদে বিভিন্নাকারে প্রকটিত হয়, ‘[তাহাতে তাহার একত্বের হানি হয় না।]’ এই জাতীয় দৃষ্টান্তের সাহায্যেও ব্রহ্মের নিব্বি- শেষ ভাব সমর্থন করিয়া “অম্বুদগ্রহণাৎ” সূত্রে আশঙ্কা করিয়াছেন যে, আত্মা যখন অমূর্ত্ত(মূর্ত্তিরহিত) এবং সর্ব্বগত অর্থাৎ সর্ব্বব্যাপী, তখন জলসূর্য্যাদির ন্যায় মূর্ত্ত বা সাবয়বরূপে দেহবিশেষে স্থিতি ও প্রতিবিম্বন কিছুই সম্ভবপর হয় না; সুতরাং দৃষ্টান্ত ও দাষ্টান্তিকের মধ্যে সাদৃশ্য নাই; অতএব উক্ত জলসূয্যাদি দৃষ্টান্ত অসিদ্ধ? এই আশঙ্কা পরিহারের নিমিত্ত “বৃদ্ধিহ্রাসভাণ্ডং” বলা হইয়াছে। উহার অভিপ্রায় এই যে, দৃষ্টান্ত ও দাষ্টান্তিক(যাহাকে উপলক্ষ করিয়া দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হয়), এতদুভয়ের মধ্যে যে যে অংশ সমান—অনুরূপ, সেই সেই অংশে তুলনা প্রদর্শন করাই বক্তার অভিপ্রেত(বিবক্ষিত), সেই বিবক্ষিত অংশ ত্যাগ করিয়া সর্ব্বাংশে সাদৃশ্য প্রদর্শন করা কাহারও পক্ষেই সম্ভব হয় না। কারণ, সব্বাংশে সমান হইলে দৃষ্টান্তদাষ্টান্তিকভাবই চলিয়া যায়, ঐ দুইটা একই হওয়া উচিত হয়। • জলসূর্য্যাদি দৃষ্টান্তস্থলে বৃদ্ধি-হ্রাসভাগিত্ব প্রদর্শনই বিবক্ষিত, অর্থাৎ জলগত সূর্য্যপ্রতিবিম্ব যেমন জলের বৃদ্ধিতে বৃদ্ধি পায়, আবার জলের হ্রাসে হ্রাস পায় (কমিয়া যায়), এবং জলের চলনে(স্পন্দনে) স্পন্দিত হয় ও জলের বিভাগে বিভক্ত হয়, সূর্য্য ঐ সকল জলধর্ম্মের অনুকরণ করে মাত্র, কিন্তু প্রকৃতপক্ষেই সেই সেই অবস্থা প্রাপ্ত হয় না। সূর্য্যের ঐ সকল অবস্থা যেরূপ বাস্তবিক নহে, এই-
ভাবাৎ ভজত এবোপাধিধর্মান্ বৃদ্ধিহ্রাসাদীন্—ইতি বিবক্ষিতাংশপ্রতিপাদনেন দৃষ্টান্তদাষ্টান্তিকয়োঃ সামঞ্জস্যমুক্ত্বা “দর্শনাচ্চ” ইতি—
“পুরশ্চক্রে দ্বিপদঃ পুরশ্চক্রে চতুষ্পদঃ, পুরঃ স পক্ষী ভূত্বা পুরঃ পুরুষ আবিশৎ।” “ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে।” মায়াং তু প্রকৃতিৎ বিদ্যাৎ, “মায়িনং তু মহেশ্বরম্।” “মায়ী সৃজতে বিশ্বমেতৎ।” “একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা।” “রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব।” “একো দেবঃ সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ঃ ॥” “এতমের সীমানং বিদার্য্যৈতয়া দ্বারা প্রাপদ্যত।” “স এষ ইহ প্রবিষ্ট আনখাগ্রেভ্যঃ ॥”
“তৎ সৃষ্ট্বা তদেবানুপ্রাবিশৎ” ইত্যাদিনা পরস্যৈব ব্রহ্মণ উপাধিযোগং দর্শয়িত্বা নির্বিশেষমেব ব্রহ্ম, ভেদস্ত জলসূর্য্যাদিবদৌপাধিকো মায়ানিবন্ধন ইত্যুপসংহৃত- বান্। ১১
কিঞ্চ, ব্রহ্মবিদামনুভবোহপি প্রপঞ্চবাধকঃ। তেষাৎ নিষ্প্রপঞ্চাত্মদর্শনস্য বিদ্য- মানত্বাৎ। তথাহি তেষামনুভবং দর্শয়তি “যস্মিন্ সর্ব্বাণি ভূতান্যাত্মৈবাভূদ্বিজা- নতঃ। তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ ॥” “বিদিতে বেদ্যং
উপাধিগত বৃদ্ধি-হ্রাসাদি ধম্মসকল(অবস্থাসমূহ) যেন ভজনাই করে, এইভাব প্রদর্শন করাই এ স্থলে শ্রুতির অভিপ্রেত অর্থ, এবং এই বিবক্ষিত অংশেই দৃষ্টান্ত প্রদর্শন। সূত্রকার এইভাবে শ্রুতিপ্রদর্শিত দৃষ্টান্ত দাষ্টান্তিকের সাদৃশ্যবিষয়ে সামঞ্জস্য বিধান করিয়াছেন, পরে “দর্শনাচ্চ” এই সূত্রাংশে ‘পরম পুরুষ প্রথমে দ্বিপাদ, চতুষ্পাদ দেহ-গৃহ রচনা করিলেন; তিনি পক্ষী হইয়া সেই দেহে প্রবেশ করিলেন,’ ‘মায়াকে প্রকৃতি বলিয়া জানিবে, আর মায়াধীশ্বরকে মহেশ্বর(পরমেশ্বর) বলিয়া জানিবে।’ ‘মায়াদীশ্বর এই জগৎ সৃষ্টি করেন।’ ‘সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা ব্রহ্মও বিভিন্ন ঔপাধিক রূপের অনুরূপ হইয়াছেন।’ “একই দেব সমস্ত ভূতের অভ্যন্তরে গুপ্তভাবে আছেন।” ‘সেই পরমেশ্বর এই সীমা (ব্রহ্মরন্ধ্র) বিদীর্ণ করিয়া সেই পথেই দেহ মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন।’ ‘তিনি এই দেহে নখাগ্রপর্য্যন্ত প্রবিষ্ট হইলেন।’ ‘আকাশাদি ভূতবর্গ সৃষ্টি করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন।’ ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা পরব্রহ্মেরই দেহাদি উপাধিসম্বন্ধ প্রদর্শন করিয়া বুঝাইয়াছেন যে, ব্রহ্ম স্বরূপত নিব্বিশেষই সত্য, তাহার ভেদ কেবল জলসূর্য্যাদির ন্যায় মায়ারূপ উপাধির সহিত সম্বন্ধবশতঃ সংঘটিত হয়, ইহাই ঐ প্রসঙ্গের উপসংহারে বলিয়াছেন। ১১ অপিচ, যাঁহারা ব্রহ্মবিদ্ বলিয়া প্রসিদ্ধ, তাঁহাদের অনুভবও জগৎপ্রপঞ্চের বাধক অর্থাৎ মিথ্যাত্বে প্রমাণ। কারণ, আত্মা যে, নিষ্প্রপঞ্চ(নির্বিশেষ), তাহা তাঁহাদের প্রত্যক্ষীকৃত রহিয়াছে। শ্রুতি তাহাদের ঐরূপ অনুভব প্রদর্শন করিয়া থাকেন—‘যে অবস্থায় জ্ঞানী পুরুষের সমস্ত ভূতই আত্মা হইয়া যায় অর্থাৎ আত্মস্বরূপে প্রতিভাত হয়। সেই একত্বদর্শীর তদবস্থায় মোহই বা কি, শোকই বা কি? একত্বদর্শীর নিকট ভেদসাপেক্ষ শোক মোহ স্থান
নাস্তীতি।” “এবং নির্ব্বাণ-মনুশাসনম্।” “যত্র বা অন্যদিব স্যাৎ, তত্রান্যোহন্যৎ পশ্যেৎ ॥” “যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈবাহভূৎ, তৎ কেন কং পশ্যেৎ ॥”
“যদেতদদৃশ্যতে মূর্তমেতজ্ঞানাত্মনস্তব। ভ্রান্তিজ্ঞানেন পশ্যন্তি জগদ্রূপমযোগিনঃ ॥ যে তু জ্ঞানবিদঃ শুদ্ধচেতসস্তেহখিলং জগৎ। জ্ঞানাত্মকং প্রপশ্যন্তি তদ্রূপং পারমেশ্বরম্ ॥ নিদাঘোহপ্যুপদেশেন তেনাদ্বৈতপরোহভবৎ। সর্বভূতান্যশেষেণ দদর্শ স তদাত্মনঃ। তথা ব্রহ্ম ততো মুক্তিমবাপ পরমাং দ্বিজ। অত্রাত্মব্যতিরেকেণ দ্বিতীয়ং যো ন পশ্যতি। ব্রহ্মভূতঃ স এবেহ বেদশাস্ত্র উদাহৃতঃ ॥”
ইত্যেবং শ্রুতিস্মৃতিযুক্তিতোহনুভবতশ্চ প্রপঞ্চস্য বাধিতত্বাদত্যন্তবিলক্ষণা- নামসদৃশরূপাণাং মধুরতিকশ্বেতপীতানামপি পরস্পরাধ্যাসদর্শনাদ্ অমূর্ত্তে- হপ্যাকাশে তলমলিনতাদ্যধ্যাসদর্শনাদ্ আত্মানাত্মনোরত্যন্তবিলক্ষণয়োমূর্ত্তা
পায় না।’ ‘আত্মাকে জানিলে আর কিছু জ্ঞাতব্য থাকে না।’ ‘নিব্বাণের এইরূপ উপদেশ।’ ‘যখন অন্যের মত থাকে, অর্থাৎ ভেদ দর্শন থাকে, তখনই অন্যে অন্যকে দেখে। আর যখন ইহার(জ্ঞানীর) সমস্তহ আত্মস্বরূপে প্রতিভাত হয়, তখন কে কাহার দ্বারা কাহাকে দেখিবে? তখন দ্রষ্ট-দৃশ্য-দর্শন-ব্যবহার বিলুপ্ত হইয়া যায়।[স্মৃতিশাস্ত্রও বলিতেছে-] ‘হে ভগবন্, এই যে, মূর্ত(আকারসম্পন্ন) জগৎ দেখা যাইতেছে, ইহা কেবল জ্ঞানময় যে তুমি, তোমাকে না জানার ফল, যোগজ জ্ঞানবিহীন পুরুষেরা ভ্রান্তিজ্ঞানের বশে তোমাকে না দেখিয়া জগৎ দেখে। কিন্তু যাহারা শুদ্ধচিত্ত জ্ঞানী, তাহারা সমস্ত জগৎ সেই জ্ঞানাত্মক পরমেশ্বরের রূপ বলিয়া দর্শন করেন। নিদাঘও(তন্নামক ব্যক্তিও) সেই উপদেশের ফলে অদ্বৈত- পরায়ণ হইয়াছিলেন। হে দ্বিজবর, তিনি সমস্ত ভূতবর্গকে আত্মস্বরূপ দর্শন করিয়াছিলেন, অনন্তর ব্রহ্ম দর্শন করেন, তাহার পর পরামুক্তি(নির্ব্বাণ) লাভ করেন। যে ব্যক্তি জগতে আত্মাতিরিক্ত দ্বিতীয় কিছু দর্শন না করে, বেদশাস্ত্রে তিনি ব্রহ্মভূত বলিয়া উক্ত হইয়াছেন।’ এই জাতীয় শ্রুতি, স্মৃতি, যুক্তি ও অনুভব অনুসারে যেহেতু জগৎপ্রপঞ্চ বাধিত, যেহেতু অত্যন্ত বিসদৃশ ও বিরুদ্ধ- স্বভাব মধুর তিক্তাদি রসের এবং শ্বেতপীতাদি বর্ণের পরস্পর অভেদাধ্যাস দেখিতে পাওয়া যায়, এবং যেহেতু নিরাকার আকাশেও তল-মলিনত্বাদি ধর্ম্মের অধ্যাস বা আরোপ দৃষ্ট হয়, সেই হেতুই মূর্তামূর্তরূপে(সাকার ও নিরাকার ভাবে) অত্যন্ত বিলক্ষণরূপ আত্মা ও অনাত্মা দেহাদিরও অধ্যাস সম্ভবপর হয়, এইজন্য এবং
ধ্যায়ঃ] শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ।
৩৯
মূর্ত্তয়োরপি তথা সম্ভবাৎ, স্থূলোহহং কৃশোহহমিতি দেহাত্মনোরধ্যাসা- নুভবাৎ—
“হন্তা চেন্মন্যতে হন্তুং হতশ্চেন্মন্যতে হতম্। উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে ॥”
ইত্যাদিশ্রুতিস্মৃতিদর্শনাৎ “য এবং বেত্তি হন্তারম্।” “প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি” ইতি স্মৃতিদর্শনাচ্চ অধ্যাসস্য প্রহাণায়াত্মৈকত্ববিদ্যাপ্রতিপত্তয়ে উপনিষদা- রভ্যতে ॥ ১২
‘আমি স্থূল আমি কৃশ’ ইত্যাদিরূপে ঐ উভয়ের অধ্যাস অনুভবসিদ্ধ বলিয়া,— আর ‘হন্তা যদি আপনাকে বধ করিতে ইচ্ছুক মনে করে, এবং হত পুরুষও যদি আপনাকে, হত বলিয়া মনে করে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে যে, তাহারা উভয়েই আত্মাকে জানে না, কারণ আত্মা হনন ক্রিয়ার কর্ত্তাও নহে, এবং কৰ্ম্মও নহে,’ ইত্যাদি প্রমাণ দৃষ্টে এবং ‘যে ইহাকে হন্তা বলিয়া জানে,’ ‘প্রকৃতিকর্তৃক - ক্রিয়মাণ’ ইত্যাদি স্মৃতিপ্রমাণ অনুসারেও জানা যায় যে, আত্মা ও অনাত্মার অধ্যাস অবশ্য স্বীকার্য্য, সেই অধ্যাস অপনয়নের জন্য এবং আত্মার একত্ববিজ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে এই উপনিষৎ শাস্ত্র আরব্ধ হইতেছে। ১২
90
শাঙ্করভাষ্যোপেতা[ প্রথমোহ
শান্তিপাঠঃ। ওঁম্ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥ সহ নাববতু সহ নৌ ভুনক্তু সহ বীর্য্যং করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্ত মা বিদ্বিষাবহৈ ॥ ওঁম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ ওঁম্ হরিঃ ওঁম্ ॥ ॥ ওঁম্ পরমাত্মনে নমঃ ॥
ওঁ ব্রহ্মবাদিনো বদন্তি—কিং কারণং ব্রহ্ম কুতঃ স্ম জাতাঃ।
সরলার্থঃ। প্রণম্য গুরুপাদাজং স্মৃত্বা শঙ্করভাষিতম্। শ্বেতাশ্বতর-সদ্ব্যাখ্যা সরলাখ্যা বিতন্যতে ॥[ব্রহ্মবাদিন ঋষয়ঃ মিলিতাঃ সন্তঃ অন্যোন্যং প্রপচ্ছুঃ। প্রশ্নপ্রকরানাহ—ব্রহ্মবাদিন ইত্যাদি।] ব্রহ্মবাদিনঃ(ব্রহ্মবদনশীলা ঋষয়ঃ) বদন্তি (মিলিতাঃ সন্তঃ পরস্পরং পৃচ্ছন্তি—) হে ব্রহ্মবিদঃ, কারণং(কারণতয়া প্রসিদ্ধং) ব্রহ্ম কিং?(কিংলক্ষণম্?) অথবা ব্রহ্ম কিং কারণম্?(নিমিত্তৎ, উপাদানং, উভয়াত্মকং বা?)[ইত্যেকঃ প্রশ্নঃ]। কুতঃ(কস্মাৎ কারণবিশেষাৎ)[বয়ং] জাতাঃ(উৎপন্নাঃ) স্ম(ভবেম)?[উৎপন্নাশ্চ] কেন(কারণবিশেষেণ) জীবাম(জীবনং ধারয়াম)?[অন্তকালে] ক(কুত্র) চ সংপ্রতিষ্ঠাঃ(স্থিতিং লভেমহি)? কেন(শক্তিবিশেষেণ) অধিষ্ঠিতাঃ(পরিচালিতাঃ সন্তঃ) সুখে- তরেষু(দুঃখেষু, যদা সুখেষু ইতরেষু দুঃখেষু চ) ব্যবস্থাং(নিয়মং) বর্তামহে (অনুসরাম)?[ইত্যপরে চত্বারঃ প্রশ্না বিচারবিষয়াঃ]।
ব্রহ্মবাদী ঋষিগণ একদা একত্রিত হইয়া পরস্পর জিজ্ঞাসা করিলেন—] হে ব্রহ্মবাদিগণ, জগৎকারণ ব্রহ্ম কি প্রকার? অথবা ব্রহ্ম জগতের কিরূপ কারণ?—নিমিত্ত কারণ? উপাদান কারণ? অথবা নিমিত্ত-উপাদান উভয় কারণ?[এই একটা প্রশ্ন]। আমরা কোথা হইতে জন্মিয়াছি? জন্মের পর কাহার সাহায্যে জীবিত আছি? বিনাশের পর কোথায় যাইয়া স্থিতি লাভ করিব? এবং কাহার দ্বারা পরিচালিত হইয়া সুখ-দুঃখভোগের নিয়মাধীন হইয়া চলিতেছি?[এই চারিটী অপর প্রশ্ন] ॥১।১৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। ব্রহ্মবাদিনো বদন্তীত্যাদি শ্বেতাশ্বতরাণাম্ মন্ত্রোপনিষৎ। তস্যা অল্পগ্রন্থা বৃত্তিরারভ্যতে। ব্রহ্মবাদিনো বদন্তীত্যাদি। ব্রহ্মবাদিনঃ ব্রহ্মবদনশীলাঃ সর্ব্বে সম্ভূয় বদন্তি-কিং কারণং ব্রহ্ম। কিমিতি স্বরূপবিষয়োহয়ং প্রশ্নঃ। অথবা কারণং ব্রহ্ম?-অহোস্বিৎ কালাদি-কালস্বভাব ইতি বক্ষ্যমাণম্? অথবা কিং কারণং ব্রহ্ম-সিদ্ধিরূপমপাদানভূতং কিমিত্যর্থঃ? অথবা বৃংহতি বৃংহয়তি
জীবাম কেন ক চ সম্পতিষ্ঠাঃ।
তস্মাদুচ্যতে পরং ব্রহ্মেতি শ্রুত্যৈব নির্ব্বচনান্নিমিত্তোপাদানয়োরুভয়োর্বা প্রশ্নঃ- কিং কারণং ব্রহ্মেতি। কিং ব্রহ্ম কারণং? আহোস্বিৎ কালাদি? অথবা অকারণমেব? কারণত্বেইপি কিং নিমিত্তম্? উত্তোপাদানম্? অথবোভয়ম্? তদ্বা কিংলক্ষণমিতি বক্ষ্যমাণপরিহারানুরূপেণ তন্ত্রেণাবৃত্ত্যা বা প্রশ্নে-হপি সংগ্রহঃ কর্তব্যঃ, প্রশ্নাপেক্ষত্বাৎ পরিহারস্য। কুতঃ স্ম জাতাঃ-কুতো বয়ং কার্য্যকরণ-
ভাষ্যানুবাদ।—“ব্রহ্মবাদিনো বদন্তি” ইত্যাদি উপনিষদ্ হইতেছে শ্বেতাশ্বতরশাখীয় মন্ত্রোপনিষদ্(১)। আমরা তাহার অনতি বিস্তীর্ণ বৃত্তি (ব্যাখ্যা) আরম্ভ করিতেছি— ব্রহ্মবাদিনো বদন্তীত্যাদি। ব্রহ্মবাদিগণ-যাহারা ব্রহ্মবিষয়ক আলোচনায় তৎপর, তাহারা সকলে মিলিত হইয়া বলিতে লাগিলেন-পরস্পর জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন-হে ব্রহ্মবিদ্গণ,[আপনারা বলুন,] জগৎকারণ ব্রহ্ম কিরূপ? অর্থাৎ ব্রহ্মের স্বরূপ কি প্রকার? এটা ব্রহ্মের স্বরূপবিষয়ক প্রশ্ন। অথবা, জগতের কারণ কি ব্রহ্ম? কিংবা কাল প্রভৃতি? যাহা “কালঃ স্বভাবঃ” ইত্যাদি বাক্যে বলা হইবে। অথবা, ব্রহ্ম কোন কারণ?-স্বতঃসিদ্ধ ব্রহ্ম কি জগতের উপাদান কারণ? অথবা, যেহেতু বৃদ্ধি প্রাপ্ত হন, এবং[অপরকেও] বর্দ্ধিত করেন, সেই হেতু পর ব্রহ্ম(নিরতিশয় বৃহৎ ও সকলের বৃদ্ধির কারণ) বলা হয়, স্বয়ং শ্রুতিই এইরূপ নাম নির্ব্বাচন করিয়াছেন, তাহা হইতে বুঝা যায় যে, ইহা নিমিত্ত কারণ ও উপাদান কারণ বিষয়ক প্রশ্ন, অথবা তদুভয় সম্বন্ধেই প্রশ্ন। প্রশ্নের আকার এইরূপ-ব্রহ্ম কি নিমিত্ত কারণ? অথবা উপাদান কারণ? কিংবা নিমিত্ত ও উপাদান উভয় প্রকার কারণ?[উক্ত বিভিন্ন পক্ষানুসারে “কিং কারণং ব্রহ্ম” এই বাক্যোক্ত প্রশ্নের বিশ্লেষণ এইরূপ-] জগতের কারণ কি ব্রহ্ম? অথবা কাল ও স্বভাব প্রভৃতি? অথবা ব্রহ্ম আদৌ কারণই নয়? আর কারণ হইলেও নিমিত্ত কারণ? কিংবা উপাদান কারণ? অথবা উভয় কারণই? এবং তাহার লক্ষণই বা কি? পরে এই সকল প্রশ্নের যেরূপ পরিহার করা হইবে, তদনুসারে প্রশ্নের মধ্যেও একত্রে বা পৃথক্ পৃথরূপে[কতক বিষয়গুলি] সংগ্রহ করিয়া লইতে হইবে, কারণ, প্রশ্ন ও পরিহার একরূপ হওয়া আবশ্যক, অর্থাৎ প্রশ্নের অনুরূপই উত্তর হইয়া থাকে। ১
(১) কৃষ্ণ যজুর্ব্বেদের বহু শাখা আছে। তন্মধ্যে একটা শাখার নাম ‘কঠ’। কঠ শাখার মন্ত্রভাগেও কতকগুলি উপনিষদ্ আছে, ব্রাহ্মণভাগেও আছে। আলোচ্য উপনিষদ্ খানা যে, কঠশাখীয় মন্ত্রভাগের অন্তর্গত, তাহাই এখানে ভাষ্যকার ‘মন্ত্রোপনিষদ্’ কথায় বলিয়া দিয়াছেন।
বন্তো জাতাঃ? স্বরূপেণ জীবানামুৎপত্যাদ্যসম্ভবাৎ। তথা চ শ্রুতিঃ “ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিৎ।” “জীবাপেতং বাব কিলেদং ম্রিয়তে, ন জীবো ম্রিয়তে” ইতি, “জরামৃত্যু শরীরস্য”, “অবিনাণী বা অরেহয়মাত্মানুচ্ছিত্তিধৰ্ম্মা” ইতি। , তথা চ স্মৃতিঃ—“অজঃ শরীরগ্রহণাৎ স জাত ইতি কীর্ত্যতে” ইতি। কিঞ্চ, জীবাম কেন—কেন বা বয়ং সৃষ্টাঃ সন্তো জীবাম? ইতি স্থিতিবিষয়ঃ প্রশ্নঃ। ক চ সম্প্রতিষ্ঠাঃ প্রলয়কালে স্থিতাঃ। অধিষ্ঠিতা নিয়মিতাঃ কেন সুখেতরেষু সুখদুঃখেষু—বর্তামহে ব্রহ্মবিদো ব্যবস্থাম্—হে ব্রহ্মবিদঃ, সুখদুঃখেষু ব্যবস্থাং কেনাধিষ্ঠিতাঃ সন্তোহনুবর্তামহ ইতি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়নিয়মহেতুঃ কিমিতি প্রশ্নসংগ্রহঃ ॥ ১।১॥
[ দ্বিতীয় প্রশ্ন—“কুতঃ স্ম জাতাঃ”—দেহেন্দ্রিয়াদিসম্পন্ন আমরা কোথা হইতে জন্মিয়াছি? নিত্য জীবাত্মার স্বরূপতঃ(স্বাভাবিক ভাবে) উৎপত্তি প্রভৃতি সম্ভব হয় না, এইজন্য[‘বয়ং’ অর্থে দেহেন্দ্রিয়াদিসম্পন্ন—দেহী বুঝিতে হইবে।] সেইরূপ শ্রুতিও আছে—‘বিশেষদর্শী পুরুষ জন্মেও না, মরেও না।’ ‘জীব- পরিত্যক্ত এই শরীর মরে, কিন্তু জীব মরে না।’ ‘জরা ও মৃত্যু শরীরের ধর্ম্ম।’ ‘অরে মৈত্রেয়ি, এই আত্মা অবিনাশী ও অনুচ্ছেদ্য অর্থাৎ বিনষ্ট না হওয়াই ইহার স্বভাব।’ সেইরূপ স্মৃতিবাক্যও আছে—‘জন্মরহিত আত্মাই শরীরগ্রহণ বশতঃ ‘জাত’ বলিয়া উক্ত হয়।’
আরও এক প্রশ্ন—আমরা সৃষ্ট হইয়া কাহার দ্বারা জীবন ধারণ করি? এটা স্থিতিবিষয়ক প্রশ্ন। তাহার পর, প্রলয়কালে আমরা কোথায় স্থিতি লাভ করি? এবং কাহার দ্বারা নিয়মিত(পরিচালিত) হইয়া আমরা সুখদুঃখ- ব্যবস্থার অনুসরণ করিয়া থাকি?(২)॥ ১।১ ॥
(২) তাৎপর্য্য এই যে, জগতে সুখ ও দুঃখের বিভাগ চিরপ্রসিদ্ধ। সুখ সকলেরই প্রিয়, এবং দুঃখ সকলেরই অপ্রিয়। সুখ চায় না, বা দুঃখ চায়, এমন জীব জগতে নাই। তথাপি লোক যে, দুঃখকর পথে পদার্পণ করে, নিশ্চয়ই ইহার পশ্চাতে কোন এক মহাশক্তির ইঙ্গিত বা প্রেরণা আছে। জিজ্ঞাসা হইল—সেই মহাশক্তিটা কে?
কালঃ স্বভাবো নিয়তির্যদৃচ্ছা ভূতানি যোনিঃ পুরুষ ইতি চিন্ত্যা। সংযোগ এযাং ন ত্বাত্মভাবা- দাত্মাপ্যনীশঃ সুখদুঃখহেতোঃ ॥১।২॥
সরলার্থঃ।[ সম্প্রতি ব্রহ্মকারণবাদং দ্রঢ়য়িতুং তৎপ্রতিপক্ষভূতান্ বাগাদীন নিরাকরোতি কালইত্যাদিনা।] কালঃ(সর্ব্বভূতানাং পরিণামহেতুঃ) যোনিঃ(কারণং)? তথা স্বভাবঃ (পদার্থানাং কার্যনিয়ামিকা শক্তিঃ) যোনিঃ? নিয়তিঃ(পুণ্যপাপাত্মকং প্রাক্তনং কৰ্ম্ম)[যোনিঃ]? অথবা যদৃচ্ছা(আকস্মিকী প্রাপ্তিঃ), ভূতানি (পৃথিব্যাদীনি), পুরুষঃ(বিজ্ঞানাত্মা-জীবঃ),[এতেষামন্যতমৎ প্রত্যেকং বা] যোনিঃ(কারণং)? ইতি চিন্ত্যা(চিন্তনীয়ং, নৈব কারণমিতি ভাবঃ]। তথা এষাং(কালাদীনাং) সংযোগঃ(সংঘাতঃ সম্মেলনং) তু (অপি) ন[যোনিঃ];[কুতঃ?] আত্মভাবাৎ(এতদধ্যক্ষস্য চেতনস্যা- ত্মনো বিদ্যমানত্বাদিত্যর্থঃ)।[তহি আত্মৈব কারণমস্তু? নেত্যাহ] সুখদুঃখ- হেতোঃ(পুণ্যপাপাত্মকস্য কৰ্ম্মণঃ) অনীশঃ(অপ্রভুঃ-কর্মপরতন্ত্রঃ) আত্মা (জীবঃ) অপি[ন যোনিঃ]।[কালাদীনামচেতনত্বাৎ অ’চতন প্রবৃত্তেশ্চ চেতনাধীনত্বাৎ এতদন্যতমস্য তৎসংযোগস্থ্য বা নৈব মূলকারণত্বম্, তথা কর্মাধী- নতয়া চেতনস্যাপি জীবাত্মনঃ নৈব মূলকারণত্বসম্ভব ইত্যাশয়ঃ] ॥১।২৷৷ মূলানুবাদ।[সম্প্রতি ব্রহ্মকারণবাদ দৃঢ় করিবার অভিপ্রায়ে কাল- প্রভৃতির কারণতাবাদ খণ্ডন করিতেছেন—] সব্ববস্তুর বিকারকারী কাল, স্বভাব(নিয়মিত বস্তুশক্তি) নিয়তি, যদৃচ্ছা(আকস্মিক ঘটনা), পৃথিব্যাদি ভূতবর্গ ও পুরুষ(জীবাত্মা), ইহাদের প্রত্যেকটা বা কোন একটা মূল কারণ কি না, তাহা চিন্তনীয় অর্থাৎ ইহারা মূল কারণ নহে। ইহাদের পরস্পর সংযোগও কারণ নহে; কেন না, ইহাদের কার্য্যে চেতন আত্মার সাহায্য অপেক্ষিত। এইরূপ চেতন আত্মাও যখন স্বীয় সুখদুঃখের হেতুভূত পুণ্য ও পাপ কর্ম্মের অধীন, তখন সেও মূল কারণ হইতে পারে না॥১।২॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং কালাদানি ব্রহ্মকারণবাদ-প্রতিপক্ষভূতানি বিচারবিষয়ত্বেন দর্শয়তি—কালঃ স্বভাব ইতি। যোনিশব্দঃ সম্বধ্যতে। কালো যোনিঃ কারণং স্যাৎ। কালো নাম সর্ব্বভূতানাং বিপরিণামহেতুঃ। স্বভাবঃ— স্বভাবো নাম পদার্থানাং প্রতিনিয়তা শক্তিঃ—অগ্নেরৌষ্ণ্যমিব। নিয়তিঃ অবিষমপুণ্যপাপলক্ষণং কৰ্ম্ম, তদ্বা কারণম্? যদৃচ্ছা আকস্মিকী প্রাপ্তিঃ। ভূতানি
ভাষ্যানুবাদ। এখন[তৃতীয় শ্রুতিতে] ব্রহ্মকারণবাদের অর্থাৎ ব্রহ্মই জগতের মূল কারণ, এই সিদ্ধান্তের বিরোধী বাদসকল বিচার্য্য বিষয়রূপে
আকাশাদীনি বা যোনিঃ। পুরুষো বা বিজ্ঞানাত্মা যোনিঃ। ইতি ইখমুক্ত প্রকারেণ কিং যোনিরিতি চিন্ত্যা চিন্ত্যং নিরূপণীয়ম্। কেচিদ্ যোনিশব্দং প্রকৃতিং বর্ণয়ন্তি। তস্মিন্ পক্ষে কিংকারণং ব্রহ্মেতি পূর্ব্বোক্তং কারণপদমত্রাপ্যনুসন্ধেয়ম্।
প্রদর্শন করিতেছেন—‘কালঃ স্বভাব’ ইত্যাদি। মূলে উক্ত ‘যোনি’ শব্দটী প্রত্যেকের সঙ্গে সম্বদ্ধ হইবে।[যোনি অর্থ—কারণ।] জগতের মূল কারণ কি কাল? অথবা স্বভাব? কিংবা নিয়তি? অথবা যদৃচ্ছা? না, আকাশাদি ভূতবর্গ? কিংবা পুরুষ? এই বিষয়ে চিন্তা করিতে হইবে, বিচার দ্বারা সত্য নিরূপণ করিতে হইবে। এখানে যাহা দ্বারা সর্ব্বভূতের বিপর্যম ‘বা রূপান্তর সংঘটিত হয়, তাহার নাম কাল। স্বভাব অর্থ—পদার্থগত নির্দিষ্ট শক্তি, যেমন অগ্নির উষ্ণতা। নিয়তি অর্থ—পুণ্যপাপাত্মক কর্ম্ম। যদৃচ্ছা অর্থ—আকস্মিক সংঘটন। ভূত—আকাশাদি পঞ্চভূত। পুরুষ অর্থ—বিজ্ঞানাত্মা বুদ্ধিপ্রধান জীবাত্মা। কেহ কেহ এখানে যোনিশব্দের সাংখ্যোক্ত প্রকৃতি বা অব্যক্ত অর্থ বর্ণনা করেন। সে পক্ষে প্রথমোক্ত ‘কারণ’ শব্দটী আকর্ষণ করিয়া ‘যোনি’ শব্দের সহিত মিলিত করিতে হইবে,[যোনি—সাংখ্যোক্ত প্রকৃতি, তাহা কারণ কি?] অতঃপর কাল ও স্বভাব প্রভৃতির অকারণভাব প্রদর্শন করিতেছেন— “সংযোগ এযাম্” ইত্যাদি। তাৎপর্য্য এই যে,[ প্রথমে প্রশ্ন হইল যে,] কাল ও স্বভাব প্রভৃতির প্রত্যেকে কারণ? অথবা উহাদের সমূহ বা সমষ্টি কারণ? কাল প্রভৃতির প্রত্যেকে কারণ হইতে পারে না, কেন না, তাহা প্রত্যক্ষবিরুদ্ধ। ব্যব- হার ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশকাল প্রভৃতি সংহত(মিলিত) হইয়াই কার্য্যকরণে সমর্থ হয়, অসংহত ভাবে নহে; এবং কাল প্রভৃতির সংযোগও কারণ নহে, অর্থাৎ কাল প্রভৃতি জড়পদার্থগুলি পরস্পরের সহিত সম্মিলিত হইলেই যে, কার্য্য সম্পাদন করিতে পারে, তাহাও নহে; কারণ, সমূহ বা সংহতিমাত্রই পরার্থ— পরের উপকার সাধনই সম্মিলিত ভাবের প্রধান প্রয়োজন; কাজেই সংযোগ বা সংহতি হয়—সেই প্রধানের শেষ(অঙ্গ), আর যাহার উদ্দেশ্যে সংহত হয়, সে হয় শেষী(অঙ্গী বা প্রধান)। আত্মাই ঐ সংযোগের শেষীরূপে যখন বিদ্যমান রহি- য়াছে, তখন অস্বতন্ত্র(পরাধীন) জড়সংযোগ কখনই নিয়মিতভাবে সৃষ্টিস্থিতি- প্রলয়রূপ কার্য্য সাধনে সমর্থ হইতে পারে না(৩)। ভাল, তাহা হইলে আত্মা ত
(৩) তাৎপর্য্য এই যে, জগতে যাহা কিছু সংহত-পরস্পরের সংযোগ- সমন্বিত, সে সমস্তই পরার্থ-পরের উপকার বা অপকার সাধনই তাহার মুখ্য উদ্দেশ্য। গৃহ, শয্যা ও আসন প্রভৃতি তাহার উদাহরণ। গৃহ প্রভৃতি বস্তুগুলি সংহত-কতকগুলি অবয়বের সম্মিলনে সম্ভূত; অথচ সে সমস্তই চেতন মনুষ্যাদির উপকারে পরিসমাপ্ত, নিজের কোন প্রকার উপকারের অপেক্ষা রাখে না। এইরূপ কাল প্রভৃতির সংযোগজ সংঘাতও নিশ্চয়ই পরার্থ হইবে, সেই পর বস্তুটী অসংহত হওয়া আবশ্যক, নচেৎ অনবস্থাদোষ ঘটে। সেই অসংহত বস্তুই আত্মা। আত্মার উপকারার্থই জড়ের সংঘাত হইয়া থাকে। এই কারণে পরাধীন সংযোগকে মূল কারণ বলা অসঙ্গত হয়।
তে ধ্যানযোগানুগতা অপশ্যন্
তত্র কালাদীনামকারণত্বং দর্শয়তি-সংযোগ এষামিত্যাদিনা। অয়মর্থঃ- কিং কালাদীনি প্রত্যেকং কারণং? উত তেষাৎ সমূহঃ? ন চ প্রত্যেকং কালাদীনাং কারণত্বং সম্ভবতি, দৃষ্টবিরুদ্ধত্বাৎ। দেশকালনিমিত্তানাং সংহ- তানামের লোকে কার্যকরত্বদর্শনাৎ। ন চাপ্যেষাং কালাদীনাং সংযোগঃ সমহঃ কারণম্। সমূহস্য সংহতেঃ পরার্থত্বেন শেষত্বেন শেষিণ আত্মনো বিদ্যমানত্বাদ- স্বাতন্ত্র্যাৎ সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়নিয়মলক্ষণ-কার্য্যকরণত্বাযোগাৎ। আত্মা তহি কারণং স্যাদেব, অত আহ-আত্মাপ্যনীশঃ সুখদুঃখহেতোরিতি। আত্মা জীবোহপ্য- নীশঃ অস্বতন্ত্রো ন কারণম্। অস্বাতন্ত্র্যাদের চাত্মনোহপি সৃষ্ট্যাদিহেতুত্বং ন সম্ভবতীত্যর্থঃ। কথমনীশত্বম্? সুখদুঃখহেতোঃ সুখদুঃখহেতুভূতস্থ্য পুণ্যাপুণ্য- লক্ষণস্থ্য কৰ্ম্মণো বিদ্যমানত্বাৎ, কর্মপরবশত্বেনাস্বাতন্ত্র্যাচ্চ। ত্রৈলোক্যসৃষ্টিস্থিতি- নিয়মে সামর্থ্যং ন বিদ্যত এবেত্যর্থঃ। অথবা সুখদুঃখাদিহেতুভূতস্যাধ্যাত্মিকাদি- ভেদভিন্নস্য জগতোহনীশো ন কারণম্ ॥ ১।২ ॥
নিশ্চয়ই কারণ হইতে পারে? তদুত্তরে বলিতেছেন-আত্মাদ্যনীশ ইত্যাদি। অস্বা- ধীন(অনীশঃ) আত্মা-জীবাত্মাও কারণ নহে। অস্বাতন্ত্র্যনিবন্ধনই জীবাত্মাব পক্ষেও সৃষ্টি প্রভৃতি কার্য্যের কারণ হওয়া সম্ভবপর হয় না। জীবাত্মার অস্বাতন্ত্র্য কেন? যেহেতু সুখদুঃখের কারণ-পুণ্য ও পাপ কৰ্ম্ম বিদ্যমান রহিয়াছে; সেই হেতুই জীব কম্মপরবশ; কৰ্ম্মপরবশ বলিয়াই স্বতন্ত্র নহে; সেই কারণেই যথানিয়মে ত্রিলোকের সৃষ্টি ও সংরক্ষণাদি কার্য্যে তাহার সামর্থ্য নাই। অথবা, আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক জগৎই জীবের সুখদুঃখ-হেতু। অস্বাধীন জীব কখনই আপনার সুখদুঃখপ্রদ জগতের কারণ হইতে পাবে না।[জীব কারণ হংলে আপনার সুখপ্রদ করিয়াই জগৎ সৃষ্টি করিত, দুঃখপ্রদ করিত না] ॥১।২৷৷
সরলার্থঃ।[তে চৈবং কালাদীনাৎ কারণত্বং নিরাকৃত্যাপি মূলকারণং নিরূপযিতুমপারয়ন্তঃ ধ্যানযোগেন তদ্ বুবুধিরে ইত্যাহ—তে ধ্যানেত্যাদি]।
তে(ব্রহ্মবাদিনঃ) ধ্যানযোগানুগতাঃ(ধ্যানমেব যোগঃ, তং অনুগতাঃ তত্রনিরতাঃ সন্ত ইত্যর্থঃ), স্বগুণৈঃ(সত্ত্বরজস্তমোভিঃ, তৎকার্য্যৈঃ বুদ্ধাদিভিব্বা) নিগুঢ়াং(আবৃতাৎ—ততো বিবেকেন গ্রহীতুমশক্যাং); দেবাত্মশক্তিং(দেবস্য স্বয়ং প্রকাশমানস্য) আত্মনঃ(পরমাত্মনঃ) শক্তিং(কার্য্যকারিণীং মায়াং ঈশ্বরাধীনা- মিতি ভাবঃ), অপশ্যন্(কারণমিতি বিজ্ঞাতবন্তঃ)। যঃ একঃ তানি(উক্তানি) কালাত্মযুক্তানি(কালাদি-পুরুষপর্য্যন্তানি) নিখিলানি কারণানি(কারণরূপেণ বিতকিতানি) অধিতিষ্ঠতি(পরিচালয়তি),[তস্য শক্তিমিত্যাশয়ঃ] ॥১।৩৷৷
মূলানুবাদ। সেই সকল ব্রহ্মবাদী[তর্ক দ্বারা মূল কারণ নিরূপণে অসমর্থ হইয়া] ধ্যানস্থ হইলেন। সেই ধ্যানযোগের সাহায্যে স্বপ্রকাশ পরমাত্মার স্বগুণাবৃত শক্তিকে কারণ বলিয়া বুঝিতে পারিলেন। যে এক বস্তু (পরমাত্মা) কাল হইতে আত্মাপর্য্যন্ত পূর্ব্বোক্ত কারণসমূহকে পরিচালিত করেন, [তাঁহার শক্তিকে দর্শন করিয়াছিলেন ॥ ১।৩ ॥
দেবাভ্যাংশক্তিং স্বগুণৈর্নিগূঢ়াম্।
শাঙ্করভাষ্যম্। এবং পক্ষান্তরাণি নিরাকৃত্য প্রমাণান্তরাগোচরে বস্তুনি প্রকারান্তরমপশ্যন্তো ধ্যানযোগানুগমেন পরমমূলকারণং স্বয়মেব প্রতিপেদিরে- ইত্যাহ-তে ধ্যানযোগেতি। ধ্যানং নাম চিত্তৈকাগ্র্যৎ, তদেব যোগ;- যুজ্যতেহনেনেতি ধ্যাতব্যস্বীকারোপায়ঃ, তমনুগতাঃ সমাহিতা অপশ্যন্ দৃষ্টবন্তঃ দেবাತ್ಮশক্তিমিতি। পূর্ব্বোক্তমেব প্রশ্নসমুদায়পরিহারাণাং সূত্রম্ উত্তরত্র প্রত্যেকৎ প্রপঞ্চয়িষ্যতে। তত্রায়ং প্রশ্নসংগ্রহঃ-কিং ব্রহ্ম কারণং? আহোস্বিৎ কালাদি? তথা কিং কারণং ব্রহ্ম? আহোস্বিৎ কার্য্যকারণবিলক্ষণম্? অথবা কারণং বা অকারণং বা? কারণত্বেহপি কিমুপাদানম্? উত নিমিত্তম্? অথবোভয়কারণং? ব্রহ্ম কিংলক্ষণং? অকারণং বা ব্রহ্ম কিংলক্ষণমিতি। তত্রায়ং পরিহার:-ন কারণং, নাপ্যকারণং, ন চোভয়ং, নাপ্যনুভয়ং, ন চ নিমিত্তং, ন চোপাদানং, ন চোভয়ম্। এতদুক্তং ভবতি-অদ্বিতীয়স্য পরমাত্মনো ন স্বতঃ কারণত্বম্ উপাদানত্বং নিমিত্তত্বঞ্চ। ১
ভাষ্যানুবাদ। —তাহারা সম্ভাবিত পক্ষসমূহ এইরূপে খণ্ডন করিয়া অন্য কোনও প্রমাণের অবিষয়, অর্থাৎ প্রত্যক্ষাদি কোন প্রমাণে যাহাকে জানিতে পারা যায় না, সেই মূল কারণ বস্তুটী জানিবার আর উপায়ান্তর না দেখিয়া ধ্যানযোগের অনুশীলনে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন তাহারা নিজেরাই মূল কারণ বুঝিতে পারিলেন, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—তে ধ্যান- যোগেতি।
ধ্যান অর্থ চিত্তের একাগ্রতা(একই বিষয়ে চিত্ত-প্রবণতা), তাহাই যোগ অর্থাৎ ধ্যেয় বস্তু আয়ত্ত করিবার উপায়। যাহা দ্বারা চিত্তসংযোজন করা যায়, তাহাই যোগশব্দের অর্থ;[সুতরাং ধ্যানও যোগমধ্যে পরিগণ্য]। তাহারা সেই ধ্যানযোগের অনুগত—সমাহিত(সমাধিযুক্ত) হইয়া[জগতের মূল কারণরূপে] দেবাত্ম-শক্তিকে দর্শন করিলেন। পূর্ব্বে কথিত প্রশ্ন-পরিহারের সূত্ররূপে যাহা উক্ত হইয়াছে, ইতঃপর তাহাই এক একটা করিয়া বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইবে। সেই উক্তিগুলির সংক্ষেপার্থ এইরূপ—প্রথম প্রশ্ন—ব্রহ্মই কারণ অথবা কাল প্রভৃতি কারণ? দ্বিতীয় প্রশ্ন—ব্রহ্ম কি কারণ? না—কার্য্য-কারণভাব- রহিত? তৃতীয় প্রশ্ন—ব্রহ্ম কি কারণ? না—অকারণ? চতুর্থ প্রশ্ন—কারণ হইলেও, উপাদান কারণ? কিংবা নিমিত্ত কারণ? অথবা উভয় কারণ? পঞ্চম প্রশ্ন—ব্রহ্ম কারণ হইলেই বা তাহার লক্ষণ(স্বরূপ) কিরূা? আর অকারণ হইলেই বা তাহার লক্ষণ কিরূপ? এই সকল প্রশ্নের পরিহার বা সমাধান এইরূপ—ব্রহ্ম কারণ নয়, অকারণও নয়, উভয়রূপও নয়, অনুভবরূপও নয়, এবং তিনি নিমিত্ত নয়, উপাদানও নয়, অথবা উভয়াত্মকও নয়। এই কথা বলা হইতেছে যে, অদ্বিতীয় পরমাত্মার(পর ব্রহ্মের) স্বরূপতঃ কারণতা বা উপাদান-নিমিত্তভাব কিছুই নাই।) সে সমস্তই ঔপাধিক। ১
যদুপাধিকমস্য কারণত্বাদি, তদেব কারণং নিমিত্তমুপপাদ্য তদেব প্রযোজকং নিষ্কষ্য দর্শয়তি—দেবাত্মশক্তিমিতি। দেবস্য দ্যোতনাদিযুক্তস্য মায়িনো মহেশ্বরস্য পরমাত্মন আত্মভূতামস্বতন্ত্রাং—ন সাখ্যপরিকল্পিতপ্রধানাদিবৎ পৃথগ্ভূতাং স্বতন্ত্রাং শক্তিং কারণমপশ্যন্। দর্শয়িষ্যতি চ—
“মায়ান্তু প্রকৃতিং বিদ্যাত্মানিনন্ত মহেশ্বরম্ ॥” ইতি
তথা ব্রাহ্মে—“এষা চতুর্বিংশতিভেদভিন্না মায়া পরা প্রকৃতিস্তৎসমুখা।” • তথা চ— “ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরং।” ইতি
স্বগুণৈঃ প্রকৃতিকার্য্যভূতৈঃ পৃথিব্যাদিভিশ্চ নিগূঢ়াৎ সংবৃতাম্, কার্য্যাকাবেণ কারণাকারস্যাভিভূতত্বাৎ কাৰ্য্যাৎ পৃথকস্বরূপেণোপলব্ধ মযোগ্যামিত্যর্থঃ। তথা চ প্রকৃতিকার্য্যত্বং গুণানাং দর্শয়তি ব্যাসঃ-“সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ” ইতি। কোহ’সী দেবঃ? যস্যেয়ং বিশ্বজননী শক্তিরভ্যুপগম্যতে? ইত্যত্রাহ-যঃ কারণানীতি। যঃ কারণানি নিখিলানি তানি পূর্ব্বোক্তানি কালাত্মযুক্তানি কালাত্মভ্যাং যুক্তানি কালপুরুষসংযুক্তানি স্বভাবাদীনি ‘কালঃ
যে উপাধিসহযোগে ব্রহ্মের কারণত্বাদি ঘটে, বস্তুতঃ তাহাই নিমিত্ত কারণ; একথা সমর্থনপূর্ব্বক তাহারই প্রযোজকতা পৃথক্ করিয়া দেখাইতে- ছেন-“দেবাত্মশক্তিম্” ইত্যাদি। স্বপ্রকাশ মায়াধীশ্বর পরমেশ্বর পরমাত্মার আত্মভূতা-অস্বতন্ত্রা, কিন্তু সাংখ্যশাস্ত্রোক্ত প্রধান বা প্রকৃতির ন্যায় স্বতন্ত্রা নহে, পরন্তু পরমেশ্বরের অধীনা শক্তিকে(মায়াকে) তাঁহারা কারণরূপে দর্শন করিয়াছিলেন।[এই দৃষ্টা শক্তি যে মায়া, তাহা] ‘মায়াকে প্রকৃতি(জগৎকারণ) বলিয়া জানিবে, এবং মায়ীকে(মায়াযুক্তকে) মহেশ্বর বলিয়া জানিবে’ এই বাক্যে প্রদর্শিত হইবে। ব্রহ্মপুরাণে কথিত আছে-“মহত্তত্ত্ব প্রভৃতি চতুর্বিংশতি ভাগে বিভক্ত। এই মায়াই পরা প্রকৃতি।” এবং[ভগবানও বলিয়াছেন-] ‘প্রকৃতি(মায়া) আমার অধ্যক্ষতায় (প্রেরণার ফলে) চরাচর সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়া থাকেন।’[সেই শক্তিটী] স্বগুণে সত্ত্বরজস্তমোনামক স্বকীয় গুণে ও স্বীয় কার্য্য(প্রকৃতিজাত) পৃথিব্যাদি দ্বারা নিগূঢ়া অর্থাৎ আবৃতা বা আচ্ছাদিতা। কারণমাত্রই স্বীয় কার্য্য দ্বারা আবৃত থাকে, কারণের আকারটা কার্য্যের আকারে লুক্কায়িত থাকে; সেই কারণে কাৰ্য্যবস্তু হইতে কারণ বস্তুটাকে পৃথক্ করিয়া ধরিতে পারা যায় না। গুণসমূহ যে, প্রকৃতিজাত, তাহা বেদব্যাস দেখাইয়াছেন-‘সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণ প্রকৃতি হইতে সম্ভূত’ ইত্যাদি।[ পূর্ব্বে যে ‘দেবাত্মশক্তি’ বলা হইয়াছে,] এই দেবতাটা কে? যাঁহার এই বিশ্ব-জননী শক্তি স্বীকার করা হইতেছে? তদুত্তরে বলিতেছেন-“যঃ কারণানি” ইত্যাদি। যে এক অদ্বিতীয় পরমাত্মা পূর্ব্বোক্ত কালাত্মযুক্ত-কাল ও আত্মসহ- কৃত অর্থাৎ কাল ও পুরুষসমন্বিত “কালঃ স্বভাবঃ” ইত্যাদি মন্ত্রোক্ত সমস্ত
স্বভাবঃ’ ইতিমন্ত্রোক্তান্ধিতিষ্ঠতি নিয়ময়তি একোহদ্বিতীয়ঃ পরমাত্মা, তস্য শক্তিং কারণমপশ্যন্নিতি বাক্যার্থঃ। ২ অথবা দেবাত্মশক্তিং দেবতাত্মনা ঈশ্বররূপেণাবস্থিতাং শক্তিম্। তথা চ— “সর্ব্বভূতেষু সর্ব্বাত্মন্ যা শক্তিরপরা তব। “সর্ব্বভূতেষু সর্ব্বাত্মন্ যা শক্তিরপরা তব। গুণাশ্রয়া নমস্তস্যৈ শাশ্বতায়ৈ পরেশ্বর ॥ যাহতীতাহগোচরা বাচাং মনসাং চাবিশেষণা। জ্ঞানধ্যানপরিচ্ছেদ্যা তাং বন্দে দেবতাং পরাম্ ॥” ইতি প্রপঞ্চয়িষ্যতি স্বভাবাদীনামকারণত্বমজ্ঞানস্যব কারণত্বং “স্বভাবমেকে কবয়ো বদন্তি” ইত্যাদি। “মায়ী সৃজতে বিশ্বমেতৎ।” “একো রুদ্রো ন দ্বিতীয়োহবতস্তে।” “একো বর্ণো বহুধা শক্তিযোগাৎ” ইত্যাদি। স্বগুণৈরীশ্বরগুণৈঃ সর্বজ্ঞত্বাদিভির্ব্বা সত্ত্বাদিভির্নিগূঢ়াং কার্য্যকারণবিনির্ম্মুক্তপূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মাত্ম- নৈবানুপলভ্যমানাম্। কোহসৌ দেবঃ? যঃ কারণানীত্যাদি পূর্ববৎ। অথবা দেবস্য পরমেশ্বরস্যাত্মভূতাং তু জগদুদয়স্থিতিলয়হেতুভূতাং ব্রহ্মবিষ্ণুশিবাত্মিকাং শক্তিমিতি। তথাচোক্তম্—
“শক্তয়ো যস্য দেবস্য ব্রহ্মবিষ্ণুশিবাত্মিকাঃ।” ইতি। “ব্রহ্মবিষ্ণুশিবা ব্রহ্মন্ প্রধানা ব্রহ্মশত্রুঃ।” ইতি চ। স্বগুণৈঃ সদ্গুরুস্তমোভিঃ। সগুণেন বিষ্ণুঃ, রজসা ব্রহ্মা, তমসা মহেশ্বরঃ,
কারণের অধিষ্ঠাতা অর্থাৎ ঐ সকল কারণকে যিনি যথানিয়মে পরিচালিত করেন, তাঁহার শক্তিকে দর্শন করিয়াছিলেন। ইহা হইল উক্ত বাক্যের প্রকৃত অর্থ। ২
উক্ত বাক্যের অন্য প্রকার অর্থ এইরূপ-[দেবাত্মশক্তিং-] দেবাত্মা- প্রকাশময় আত্মা-পরমেশ্বর, তদ্রূপে অবস্থিতা শক্তিকে[দর্শন করিলেন]। এ বিষয় প্রমাণ এই-‘হে সর্ব্বাত্মন্(সর্ব্বয়) পরমেশ্বর, তোমার যে, সর্ব্বভূতে অবস্থিত গুণাশ্রিত অপরা শক্তি, সেই চিরন্তন শক্তির উদ্দেশে নমস্কার। যাহা বাক্যের অতীত, এবং মনের অগোচর, এবং জ্ঞান ও ধ্যানগম্য নির্বিশেষে পরাদেবতা, তাহাকে বন্দনা করি।’ ইত্যাদি। আর স্বভাবাদি যে, কারণ নহে, অজ্ঞানই মূল কারণ, তাহা শ্রুতিই ‘কোন কোন কবি স্বভাবকে কারণ বলেন,’ ‘মায়ী(পরমেশ্বর) এই বিশ্ব সৃষ্টি করেন,’ ‘এক রুদ্রই আছেন, দ্বিতীয়ের অপেক্ষা করেন না।’ ‘এক বর্ণ[যেমন] শক্তিবলে অনেক বর্ণ সৃষ্টি করেন’ ইত্যাদি ইত্যাদি বাক্যে বিবৃত করিবেন।[স্বগুণেঃ] ঈশ্বরীয় সর্বজ্ঞত্বাদি সত্ত্বধৰ্ম্ম দ্বারা নিগূঢ়’, অর্থাৎ কার্য্য-কারণ ভাব রহিত পূর্ণ আনন্দ- স্বরূপ অদ্বিতীয় ব্রহ্মস্বরূপে যাহার উপলব্ধি হয় না,[এমন শক্তিকে দর্শন করিয়াছিলেন]। এই দেব কে?[উত্তর-] যিনি কারণ সমূহকে ইত্যাদি। ইহার অর্থ পূর্বানুরূপ। অথবা দেবশব্দবাচ্য পরমেশ্বরের আত্মভূতা এবং জগতের উৎপত্তি স্থিতি ও লয়ের হেতুভূতা ব্রহ্ম-বিষ্ণু শিবাত্মিকা শক্তিকে।-সেইরূপ উক্তিও আছে-‘ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব যে দেবের শক্তি।’ হে ব্রহ্মন্, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব যাঁহার শক্তি’ ইত্যাদি। স্বগুণ অর্থ-সত্ত্বাদি গুণ, তন্মধ্যে সত্ত্বগুণে বিষ্ণু, বজোগুণে ব্রহ্মা এবং তমোগুণে মহেশ্বর(শিব), ইঁহারা সত্ত্বাদিগুণ সম্বন্ধ
সত্ত্বাদ্যপাধিসম্বন্ধাৎ স্বরূপেণ নিরুপাধিকপূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মাত্মনৈবানুপলভ্যমানাঃ পরস্যৈব ব্রহ্মণঃ সৃষ্ট্যাদিকার্য্যং কূর্ব্বন্তোহবস্থাভেদমাশ্রিত্য-শক্তিভেদব্যবহারঃ, ন পুনস্তত্বভেদমাশ্রিত্য। তথা চোক্তম্—
“সর্গস্থিত্যন্তকারিণীং ব্রহ্মবিষ্ণুশিবাত্মিকাম্।
স সংজ্ঞাৎ যাতি ভগবানেক এব জনার্দ্দনঃ ॥”
ইতি প্রথমমীশ্বরাত্মনা মায়িরূপেণাবতিষ্ঠতে ব্রহ্ম। স পুনর্মূর্ত্তিরূপেণ ত্রিধা ব্যবতিষ্ঠতে। তেন চ রূপেণ সৃষ্টিস্থিতিসংহারনিয়মনাদি কাৰ্য্যং করোতি। তথা চ শ্রুতিঃ পরস্য শক্তিদ্বারেণ নিয়মনাদিকার্য্যং দর্শয়তি—“লোকানীশত ঈশনীভিঃ প্রত্যঞ্জনাস্তিষ্ঠতি সঞ্চুকোপ, অন্তকালে সংসৃজ্য বিশ্বা ভুবনানি গোপাঃ” ইতি। ঈশনীভির্জননীতিঃ পরমশক্তিভিরিতি বিশেষণাৎ। “ব্রহ্মবিষ্ণু- শিবা ব্রহ্মন্ প্রধানা ব্রহ্মশক্তয়ঃ।” ইতি স্মৃতেঃ পরমশক্তিভিরিতি পরদেবতানাং গ্রহণম্। ৪
অথবা দেবাত্মশক্তিমিতি—দেবশ্চ আত্মা চ শক্তিশ্চ যস্য পরস্য ব্রহ্মণোহবস্থা- ভেদাঃ, তাং প্রকৃতিপুরুষেশ্বরাণাং স্বরূপভূতাং ব্রহ্মরূপেণাবস্থিতাং পরাৎপরতরাং শক্তিং কারণমপশ্যন্নিতি। তথাচ ত্রয়াণাং স্বরূপভূতং প্রদর্শয়িষ্যতি—
বশতই উপলব্ধির বিষয় হন, কিন্তু স্বরূপতঃ উপাধিশূন্য পরিপূর্ণ আনন্দস্বরূপ এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মরূপে উপলব্ধিগোচর হন না, না হইয়া পরব্রহ্মেরই করণীয় সৃষ্টি স্থিতি সংহার কার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকেন। উক্ত প্রকার অবস্থাভেদেই ইহাদের ভেদব্যবহার, কিন্তু তত্ত্বভেদ(বস্তুভেদ) অনুসারে নহে। সেইরূপই উক্তি আছে—‘সেই একই ভগবান্ জনার্দ্দন সৃষ্টিস্থিতি-প্রলয় কার্য্যে ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব সংজ্ঞা প্রাপ্ত হন।’ ব্রহ্ম প্রথমতঃ মায়াসম্বন্ধবশে ঈশ্বররূপে অবস্থান করেন। তিনিই পুনরায় মূর্তি ধারণ করিয়া তিন প্রকারে(ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবরূপে) অবস্থান করেন। সেই মূর্ত্তরূপে তিনি সৃষ্টি স্থিতি সংহার ও পরিচালনাদি কার্য্য করিয়া থাকেন। সেইরূপ শ্রুতিও—ব্রহ্মের শক্তি দ্বারা নিয়মনাদি(পরিচালনাদি) কার্য্য প্রদর্শন করিতেছে—‘পরমেশ্বর জননানুকূল পরাশক্তির সাহায্যে সমস্ত জগৎ শাসন করেন, রক্ষা করেন এবং অন্তকালে সংহার করেন,’ এখানে ঈশনী অর্থ—জন্ম হেতু পরমা শক্তি; সেই শক্তি দ্বারা—বিশেষিত করায়[বুঝা যায় যে, ব্রহ্মই শক্তি দ্বারা সৃষ্টি প্রভৃতি কার্য্য নিয়মিত করিয়া থাকেন]। ‘হে ব্রহ্মন্, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব, ইহারা ব্রহ্মের প্রধান শক্তি’ এই স্মৃতি বাক্যানুসারে বুঝা যায় যে, শ্রুতিকথিত ‘পরমা শক্তি’ শব্দে পর দেবতার (পরমাত্মারই) গ্রহণ,[অন্যের নহে]। ৪ অথবা[‘দেবাত্মশক্তিং’ কথার অর্থ এইরূপ—] দেব, আত্মা ও শক্তি যে পর ব্রহ্মের অবস্থাভেদ, প্রকৃতি পুরুষ ও ঈশ্বরের স্বরূপভূতা, অথচ ব্রহ্মরূপে অবস্থিতা পরাৎপরতরা(সর্ব্বোত্তম), সেই শক্তিকে কারণরূপে দর্শন করিয়াছিলেন। ব্রহ্ম যে, প্রকৃতি, পুরুষ(আত্মা) ও ঈশ্বর এই তিনের স্বরূপভূত, তাহা—
೯
“ভোক্তা ভোগ্যং প্রেরিতারঞ্চ মত্বা সর্ব্বং প্রোক্তং ত্রিবিধং ব্রহ্মমেতৎ।” “ত্রয়ং যদা বিন্দতে ব্রহ্মমেতৎ” ইতি। স্বগুণৈব্রহ্মপরতন্ত্রৈঃ প্রকৃত্যাদিবিশেষণৈরুপাধিভি- নিগূঢ়াম্। তথা চ দর্শয়িষ্যতি “একো দেবঃ’ সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ঃ” ইতি। “তং দুর্দ্দর্শং গূঢ়মনুপ্রবিষ্টম্।” “যো বেদ নিহিতং গুহায়াম্।” “ইহৈব সন্তং ন বিজানন্তি দেবাঃ” ইতি শ্রুত্যন্তরম্। যঃ কারণানীতি পূর্ব্ববৎ। ৫
অথবা দেবাত্মনো দ্যোতনাত্মনঃ প্রকাশস্বরূপস্য জ্যোতিষাং জ্যোতীরূপস্য প্রজ্ঞানঘনস্বরূপস্য পরমাত্মনো জগদুদয়স্থিতিলয়নিয়মনবিষয়াৎ শক্তিং সামর্থ্যমপশ্য- ন্নিতি, স্বগুণৈঃ স্বব্যষ্টিভূতৈঃ সর্বজ্ঞসর্ব্বেশিতৃত্বাদিভিন্নিগূঢ়াৎ তত্তদ্বিশেষরূপেণা- বস্থিতত্বাৎ স্বরূপেণ শক্তিমাত্রেণানুপলভ্যমানাম্। তথা চ মানান্তরবেদ্যাং শক্তিং দর্শয়িষ্যতি—
“ন তস্য কার্য্যং করণঞ্চ বিদ্যতে, ন তৎসমশ্চাত্যধিকশ্চ দৃশ্যতে।
পরাশ্য শক্তিবিবিধৈব শ্রয়তে স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ” ইতি ॥
সমানমন্যৎ। কারণং দেবাত্মশক্তিমিতি প্রশ্নে পরিহারে চ যে যে পক্ষভেদাঃ
ধ্যায়ঃ]
শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ। কালাত্মযুক্তান্যধিতিষ্ঠত্যেকঃ ॥ ১।৩ ॥ তমেকনেমিং ত্রিবৃতং ষোড়শান্তং শতার্দ্ধারং বিংশতিপ্রত্যরাভিঃ। অষ্টকৈঃ ষড়ভির্বিশ্বরূপৈকপাশং ত্রিমার্গভেদং দ্বিনিমিত্তৈকমোহম্ ॥ ১৪৪ ॥
৫১
প্রদর্শিতাস্তে সর্ব্বে সংগৃহীতাঃ। উত্তরত্র সর্ব্বেষাং প্রপঞ্চনাৎ, অপ্রস্ততস্য প্রপঞ্চনা- যোগাৎ প্রশ্নোত্তরদর্শনাচ্চ, সমাসব্যাসধারণস্থ্য চ বিদুষামিষ্টত্বাৎ। তথাচোক্তম্ “ইষ্টং হি বিদুষাং লোকে সমাসব্যাসধারণম্” ইতি। তথা চ শ্রুত্যন্তরে সকৃৎশ্রুতস্য গোপামিতি পদস্য ব্যাখ্যাভেদঃ শ্রুত্যৈব প্রদর্শিতঃ—“অপশ্যং গোপামিত্যাহ। ‘প্রাণা বৈ গোপা ইতি। অপশ্যং গোপামিত্যাহ। অসৌ বা আদিত্যো গোপা ইতি।” “অথ কম্মাদুচ্যতে পরং ব্রহ্ম” ইত্যারভ্য “বৃংহতি বৃংহয়তি তস্মাদুচ্যতে পরং ব্রহ্ম” ইতি সকৃৎশ্রুতস্য ব্রহ্মপদস্য নিমিত্তোপাদানরূপেণাথভেদঃ শ্রত্যৈব দর্শিতঃ ॥ ১।৩ ॥
সংগ্রহ করা হইল।[এ সকল অর্থ কলপোল কল্পিত নহে, কারণ,] পরে এ সমস্ত কথাই বিস্তৃত ভাবে বর্ণিত হইয়াছে; অথচ অপ্রস্তাবিত বিষয়ের বিস্তৃতি বিধান যখন হইতেই পারে না,[তখন বুঝিতে হইবে যে, উল্লিখিত পক্ষগুলি শ্রুতির অভিপ্রেত, আমাদের কল্পিত নহে]। ‘জগতে প্রতিপাদ্য বিষয়ের সংক্ষেপে ও বিস্তৃত ভাবে অবধারণ করা, অর্থাৎ প্রথমে সংক্ষেপে বলিয়া পরে তাহারই সবিস্তারে বর্ণনা করা বিদ্বান্ লোকদিগের অভিমত,’ এই উক্তি অনুসারে জানা যার যে, সংক্ষেপ-বিস্তারে তত্ত্ব নির্দ্ধারণ করা জ্ঞানিগণের অভি- প্রেত। অন্য শ্রুতিতেও এইরূপ আছে। সেখানে একবারমাত্র উক্ত একই ‘গোপা’ কথার বহুপ্রকার অর্থ স্বয়ং শ্রুতিও প্রদর্শন করিয়াছেন। যথা— “অপশ্যৎ গোপামিত্যাহ”—এ কথার অর্থ একবার বলিলেন—“প্রাণা বৈ গোপা” প্রাণ সমূহই গোপা। পুনরায় “অবশ্যং গোপাং” এই কথারই অর্থ করিলেন— ‘এই আদিত্যই গোপা’ ইতি। অন্যত্র আবার “কম্মাদুচ্যতে ব্রহ্ম ইতি?” এইরূপে আরম্ভ করিয়া বলিলেন—যেহেতু নিজে বৃদ্ধি পান, এবং অপরের বৃদ্ধি কারক, সেই হেতু ব্রহ্মকে ‘পর ব্রহ্ম’ সর্ব্বাপেক্ষা মহৎ বলা হইয়া থাকে ইতি। এখানেও শ্রুতি নিজেই একবাব মাত্র শ্রুত ‘ব্রহ্ম’ শব্দের নিমিত্ত কারণ ও উপাদান কারণরূপে অর্থভেদ প্রদর্শন করিয়াছেন।[এখানে বৃদ্ধি পান(বৃংহতি) পক্ষে নিমিত্ত কারণ, আর বৃদ্ধি করান(বৃংহয়তি) পক্ষে উপাদান কারণ বলা হইয়াছে] ॥ ১।৩॥
সরলার্থঃ। -[বস্তুত একরূপমপি তং মায়য়া প্রাপ্তানেকরূপতয়া সংসার- চক্ররূপেণ নিরূপয়িতুমাহ-] তমেকনেমিমিত্যাদি। একনেমিং-[নেমিঃ রথচক্রস্য প্রান্তভাগঃ, স এব সর্ব্বাধারঃ।] একা(সংসারবীজরূপা মায়া নেমিঃ সর্ব্বাধারো যস্য, তং), ত্রিবৃতং(ত্রিভিঃ সত্ত্বরজস্তমোগুণৈঃ বাতপিত্তশ্লেষ্মভির্বা) আবৃতং ব্যাপ্তং), ষোড়শান্তং(একাদশেন্দ্রিয়াণি পঞ্চ ভূতানি চেতি ষোড়শ বিকারাঃ, ষোড়শ কলা বা অন্তঃ অবসানং বিস্তারসমাপ্তিঃ স্বরূপৎ বাযস্য, তং), শতাদ্ধারং-(শতার্দ্ধং-শঞ্চাশৎ; পঞ্চাশৎ বিপর্যয়াশক্তিতুষ্টিসিদ্ধিসংজ্ঞকাঃ প্রত্যয়ভেদাঃ অরাঃ চক্রশলাকা যস্য, তং), বিংশতিপ্রত্যরাতিঃ-(ইন্দ্রিয়াণি দশ, তেষাং বিষয়াঃ শব্দস্পর্শাদয়শ্চ দশ ইতি বিংশতিঃ প্রত্যরাঃ অরাণাং দার্ড্যায় স্থাপিতাঃ কীলকাঃ, তাভিঃ-ইতঃ)(যুক্তং)। ষড়ভিঃ(ষটপ্রকারৈঃ) অষ্টকৈঃ (প্রকৃত্যষ্টকং, ধাত্বষ্টকং, অণিমাদ্যৈশ্বর্য্যাষ্টকং, ধৰ্ম্মজ্ঞানাদি ভাবাষ্টকং, ব্রহ্মপ্রজা- পত্যাদি দেবাষ্টকং, দয়াদ্যাত্মগুণাষ্টকং,(এতৈঃ)[যুক্তং], বিশ্বরূপৈকপাশং- (বিশ্বরূপঃ কাম্যবিষয়ভেদাৎ নানারূপঃ) কামঃ একঃ মুখ্যঃ পাশঃ-বন্ধনরজ্জুঃ যস্য, তং), ত্রিমার্গভেদং(ত্রয়ঃ মার্গভেদাঃ ধর্মাধর্মজ্ঞানরূপাঃ, কৰ্ম্ম-জ্ঞান-ভক্তি- রূপা বা যস্য, তং) দ্বিনিমিত্তৈকমোহং-(দ্বয়োঃ সুখদুঃখয়োঃ নিমিত্তং- কারণভূতঃ একঃ মুখ্যঃ মোহঃ অনাত্মসু দেহেন্দ্রিয়াদিয় অভিমানরূপঃ যস্য, তং) তং(কারণং)[অপশ্যন্ ইতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। অথবা ‘অধীম’ ইত্যুত্তরমন্ত্রস্থ- ক্রিয়াপদেন সম্বন্ধঃ। বিপর্যয়াশক্তিতুষ্টিসিদ্ধিপ্রভৃতীনাং স্বরূপভেদা ভাষ্য’তা জ্ঞাতব্যাঃ।] ॥১১৪॥
মূলানুবাদ।—[তাহারা ধ্যানযোগে যে কারণটি দর্শন করিয়াছিলেন, তাহা স্বরূপতঃ একরূপ হইলেও মায়া দ্বারা অনেকরূপে প্রকটিত হয়, এই জন্য সংসার- চক্ররূপে তাহার নির্দেশ করিতেছেন—] একনেমি, ত্রিবৃত ষোড়শান্ত, পঞ্চাশটি অরযুক্ত(চক্রশলকাযুক্ত), বিংশতিপ্রকার প্রত্যয় ও ছয় প্রকার অষ্টকযুক্ত, এবং বিশ্বরূপ(জগৎবৈচিত্র্য) যাহার পাশ বা বন্ধনরজ্জু, যাহাকে পাইবার পথ তিন প্রকার, এবং সুখ দুঃখের নিমিত্ত যেখানে মোহের বিকাশ, এবস্তুত সেই কারণ বস্তু তাহারা[দর্শন করিয়াছিলেন, অথবা পর শ্লোকোক্ত ‘অধীম’ (জানি) ক্রিয়ার সহিত সম্বন্ধ]।[মূলস্থ নেমি অর্থ—রথচক্রের প্রান্তভাগ, যাহা মাটী স্পর্শ করে। ত্রিবৃত অর্থ—সত্ত্বরজঃ ও তমোগুণ, অথবা বাত, পিত্ত, শ্লেষ্মা। ষোড়শান্ত—অন্ত অর্থ এখানে নাভিচক্রের বাহিরের অংশ। অর অর্থ—চক্রের শলাকা। প্রত্যয় অর্থ—চক্রশলাকার দৃঢ়তা-সম্পাদনের জন্য যে সকল খিল দেওয়া হয়, তাহা। এতদতিরিক্ত ষোড়শ, পঞ্চাশৎ(শতাদ্ধ), অষ্টক, প্রভতির বিভাগ ও সেই সকলের প্রকৃত স্বরূপ ভাষ্যানুবাদে দ্রষ্টব্য] ॥১।৪৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।—এবংতাবৎ “দেবাত্মশক্তিং” “যঃ কারণানি নিখিলানি কালাত্মনা যুক্তান্যধিতিষ্ঠত্যেকঃ” ইতি একস্যাদ্বিতীয়স্য পরমাত্মনঃ স্বরূপেণ শক্তি- রূপেণ চ নিমিত্তকারণোপাদানকারণত্বং মায়িত্বেনেশ্বররূপত্বং দেবতাত্মত্বসর্ব্বজ্ঞত্বাদি-
রূপত্বং, অমায়িত্বেন সত্যজ্ঞানানন্দাদ্বিতীয়রূপত্বঞ্চ সমাসেন শ্রুত্যর্থাভ্যামভিহিতম্। ইদানীৎ তমেব সর্বাত্মানং দর্শয়তি কার্য্যকারণয়োরনন্যত্বপ্রতিপাদনেন। “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ং মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্” ইতি নিদর্শনেনাদ্বিতীয়া- পূর্ব্বানপর-নেতিনেত্যাত্মকবাগগোচরাশনোয়াদ্যসংস্পৃষ্টপ্রত্যস্তমিতভেদ-চিকৎসদানন্দ- ব্রহ্মাত্মত্বং প্রদর্শয়িতুমনাঃ প্রকৃত্যৈব প্রপঞ্চভ্রান্তামবস্থাং প্রাপ্তস্য পরব্রহ্মণ ঈশ্বরা- ত্মনঃ সর্বজ্ঞত্বাপহতপাপ্যাদিরূপেণ দেবতাত্মনা ব্রহ্মাদিরূপেণ কাৰ্য্যাদিরূপেণ বৈশ্বানরাদিরূপেণ চ মোক্ষাপ্রক্ষিতশুদ্ধ্যর্থাৎ “স যদি পিতৃলোককামঃ” ইতি ‘বিশ্বৈশ্বর্য্যার্থাং “মাং বা নিত্যং শঙ্করং বা প্রয়াতি।” ইত্যাদি দেবতা- সাযুজ্যপ্রাপ্ত্যর্থাৎ বৈশ্বানর প্রাপ্ত্যর্থাঞ্চোপাসনার্থামশেষলৌকিকবৈদিককর্মপ্রসিদ্ধিং দর্শয়তি চ। যদি কার্য্যকারণরূপেণ স্বরূপেণ চিকিৎসদানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মাত্মনা চ ব্যব- স্থিতং ন স্যাৎ, তদা ভোগ্যভোক্তনিয়ন্ত্রভাবে সংসার-মোক্ষয়োরভাব এব স্যাৎ।
ভাষ্যানুবাদ।—প্রথম মন্ত্রোক্ত “দেবাত্মশক্তিং” ও “যঃ কারণানি নিখিলানি কালাত্মনা যুক্তানি অধিতিষ্ঠতি একঃ” এই দুইটী শ্রুতিবাক্যের যথোক্ত প্রকার ব্যাখ্যা দ্বারা সংক্ষেপতঃ বলা হইল যে, এক অদ্বিতীয় পরমাত্মাই স্বরূপে(চৈতন্যরূপে) নিমিত্ত কারণ, এবং শক্তিরূপে (মায়াপ্রাধান্যে) উপাদান কারণ। তিনিই আবার মায়িকরূপে (মায়া দ্বারা উপহিত ভাবে) ঈশ্বর, দেবতা ও সর্ব্বজ্ঞত্বাদি শব্দবাচ্য হন, আর অমায়িকরূপে(মায়াসম্বন্ধশূন্য শুদ্ধ চৈতন্যরূপে) এক অদ্বিতীয় সত্য জ্ঞান আনন্দেরে প্রতিভাত হন। এখন কার্য্য ও কারণের অনন্যত্ব বা অভিন্নত্ব প্রতিপাদন দ্বারা সেই পরমাত্মারই সর্ব্বাত্মভাব প্রদর্শন করিতেছেন। ‘বিকার (কার্য্য বস্তু) ঘটপটাদি কেবল বাক্যারব্ধ নামমাত্র, মৃত্তিকাই সত্য’ এই উত্তম উদাহরণ দ্বারা সমর্থিত যে, পর ব্রহ্মের অদ্বিতীয়(দ্বিতীয়রহিত—এক), কার্য্য- কারণভাবশূন্য ‘নেতি নেতি’ রূপে সর্ব্বনিষেধাত্মক, এবং বাক্যের অগোচর, ক্ষুধাতৃষ্ণাবিবর্জিত, সর্ব্বপ্রকার ভেদরহিত সৎচিৎ আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মাত্মভাব (ব্রহ্মের যথার্থ স্বরূপ), তাহা প্রতিপাদন করিতে অভিলাষী হইয়া—প্রকৃতি দ্বারা ভ্রান্তিময় অবস্থা প্রাপ্ত পরব্রহ্মের উপাসনার জন্য যত প্রকার লৌকিক ও বৈদিক কর্ম্মপদ্ধতি প্রসিদ্ধ আছে, তাহা প্রদর্শন করিতেছেন। বিশেষ এই যে, মোক্ষোপযোগী চিত্তশুদ্ধির জন্য তাহাকে সর্ব্বজ্ঞত্ব নিষ্পাপত্বাদিগুণযুক্ত ঈশ্বর ভাবে, নানাবিধ ঐশ্বর্য্য(ভোগসম্পদ) পাইবার উদ্দেশ্যে তাহাকে দেবতাভাবে ব্রহ্মারূপে কিংবা ইন্দ্রচন্দ্রাদিরূপে, অথবা ‘আমাকে বা শঙ্করকে প্রাপ্ত হয়’ ইত্যাদি প্রমাণানুসারে দেবতার সহিত সাযুজ্য প্রাপ্তির আশায়, অথবা বৈশ্বানরত্ব লাভের জন্য বৈশ্বানররূপে তাহার উপাসনা করিয়া থাকে। পরমাত্মা কার্য্যাকারে অবস্থানকালেও যদি স্বরূপে—অদ্বিতীয় সৎচিৎ আনন্দ ব্রহ্মভাবে বিদ্যমান না থাকে, তাহা হইলে ভোক্তৃ ভোগ্যভাবের অভাব হয়, অর্থাৎ
অধিকারিণোহভাবেন সাধনভূতস্য প্রপঞ্চস্যাভাবাৎ। তৎরূপদাতুশ্চেশ্বরস্যাভাবাৎ। তথা সংসারাদিভূতমীশ্বরং দর্শয়তি—সংসারমোক্ষস্থিতবন্ধহেতুরিতি। তথা চ সংসারমোক্ষয়োরভাব এব স্যাৎ, তৎসিদ্ধ্যর্থং প্রপঞ্চাদ্যবস্থানং দর্শয়তি—
“এবং পাদং নোৎক্ষিপতি সলিলাদ্ধংস উচ্চরন্।
স চেদবিন্দদানন্দং ন সত্যং নানৃতং ভবেৎ ॥”
সনৎসুজাতেহপি “একং পাদং নোৎক্ষিপতি”—ইত্যাদি। তথা চ শ্রুতিঃ “পাদোহস্য বিশ্বা ভূতানি ত্রিপাদস্যামৃতং দিবি” ইতি। ১
তত্র প্রথমেন মন্ত্রেণ সর্ব্বাত্মানং ব্রহ্মচক্রং দর্শয়তি, দ্বিতীয়েন নদীরূপেণ। তমেকেতি। য একঃ কারণানি নিখিলানি অধিতিষ্ঠতি, তমেকনেমিম্-যোনিঃ কারণম্ অব্যাকৃতমাকাশং পরমব্যোম মায়া প্রকৃতিঃ শক্তিঃ তমোহবিদ্যা ছায়া অজ্ঞানং অনূতং অব্যক্তমিত্যেবমাদিশব্দৈরভিলপ্যমানা একা কারণাবস্থা নেমিরিব
কে কোন বিষয় ভোগ করিবে, ইহার নিয়ামক থাকে না, নিয়ামক না থাকিলে সংসার ও মুক্তি উভয়েরই অভাব হইতে পারে। আর অধিকারের নিয়ম না থাকায় অধিকারীরও অভাব হইতে পাবে। অধিকারীর অভাবে সাধন জগতেরও বিলোপ হইবার সম্ভাবনা; কারণ, সাধনোচিত ফলদাতা ঈশ্বরের অভাবে, কে সে ফলের ব্যবস্থা করিবে? ঈশ্বরই যে, সংসারাদি লাভের হেতু, তাহা ‘ঈশ্বরই সংসার, মোক্ষ, স্থিতি ও বন্ধের হেতু’ এই শাস্ত্রবাক্য প্রদর্শন করিতেছে। ঈশ্বরের অভাবে সংসার ও মোক্ষ উভয়েরই অভাব হইতে পারে। সংসার ও মোক্ষ সিদ্ধির জন্যই জগৎপ্রপঞ্চের স্থিতি, তাহা নিম্নলিখিত বাক্যও প্রদর্শন করিতেছে—‘হংস যখন জল হইতে উড্ডয়ন করে, তখন একটা মাত্র চরণ উপরে উঠায় না, অর্থাৎ উভয় পা-ই উৎপেক্ষণ করে, এইরূপ সেই সাধক যদি আনন্দ লাভ করে, অর্থাৎ ব্রহ্মানন্দ প্রাপ্ত হয়, তখন তাহার সত্য মিথ্যা দুই থাকে না।’ সনৎস্থজাত পর্ব্বেও “একং পাদং নোৎক্ষিপতি” ইত্যাদি বচনটী পঠিত আছে। সেইরূপ শ্রুতিও আছে--‘তাহার(ব্রহ্মের) একপাদ হইতেছে এই বিশ্বপ্রপঞ্চ, আর তাহার তিন পাদ(অংশ) অমৃতময় স্বপ্রকাশরূপে রহিয়াছে, অর্থাৎ জগতের বাহিরে আছে‘। ১
পরবর্তী দুইটা মন্ত্রের মধ্যে প্রথম মন্ত্রে সর্ব্বাত্মক ব্রহ্মচক্ররূপে(ব্রহ্মাণ্ডচক্র- রূপে), আর দ্বিতীয় মন্ত্রে তাহাকেই নদীরূপে প্রদর্শন করিতেছেন-“তম্ একনেমিং” ইত্যাদি। যে এক পরমাত্মা সমস্ত কারণের অধিষ্ঠাতা, তিনিই একনেমি। যোনি, কারণ, অব্যাকৃত, আকাশ, পরম ব্যোম, মায়া, প্রকৃতি, শক্তি, তমঃ অবিদ্যা, ছায়া, অজ্ঞান, অনূত ও অব্যক্ত ইত্যাদি শব্দে যাহার উল্লেখ করা হয়, তাহাই জগতের কারণাবস্থা বা বীজভাবাপন্ন তাহাই একনেমি-(রথ-
নেমিঃ সর্ব্বাধারো যস্যাধিষ্ঠাতুরদ্বিতীয়স্য পরমাত্মনঃ, তমেকনেমিম্। ত্রিবৃতং- ত্রিভিঃ সত্ত্বরজস্তমোভিঃ প্রকৃতিগুণৈবৃতম্। ষোড়শকো বিকারঃ পঞ্চ ভূতান্যেকা- দশেন্দ্রিয়াণি অন্তোহবসানং বিস্তারসমাপ্তির্যস্যাত্মনঃ, তং ষোড়শান্তম্। অথবা প্রশ্নোপনিষদি “যস্মিন্নেতাঃ ষোড়শকলাঃ প্রভবন্তি” ইত্যারভ্য “স প্রাণাৎ শ্রদ্ধাম্” ইত্যাদিনা প্রোক্তা নামান্তাঃ ষোড়শকলা অবসানং যস্যেতি। অথবা একনেমি- মিতি কারণভূতাব্যাক্তাবস্থাহভিহিতা। তৎকার্য্যসমষ্টিভূতবিরাট্সূত্রদ্বয়ৎ, তদ্ব্যষ্টি- ভূত-ভূরাদিচতুৰ্দ্দশভুবনানি অন্তেহবসানং যস্য প্রপঞ্চাত্মনাহবস্থিতস্য, তং ষোড়শান্তম্। শতাদ্ধারং-পঞ্চাশৎ প্রত্যয়ভেদা বিপর্যয়াশক্তিতুষ্টিসিদ্ধ্যাখ্যা অরা ইব যস্য, তং শতাদ্ধারম্। ২
চক্রের প্রান্তভাগনেমি) নেমির ন্যায় সকলের আশ্রয়স্বরূপ যাহার-যে অদ্বিতীয় অধিষ্ঠাতা(পরিচালক) পরমাত্মার, তিনিই একনেমি। ত্রিবৃতং-প্রকৃতির সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনটা গুণের দ্বারা আবৃত(দর্শনের অযোগ্য)। ষোড়শান্তুম্-পঞ্চভূত ও একাদশ ইন্দ্রিয়, এই ষোড়শ প্রকার প্রাকৃতিক বস্তু যে পরমাত্মার অন্ত-অবসান অর্থাৎ বিস্তারের পরিসমাপ্তিস্থান, তিনি ষোড়শান্ত। অথবা ‘যাহাতে এই ষোড়শ কলা প্রতিষ্ঠা লাভ করে’ এই হইতে আরম্ভ করিয়া ‘তিনি প্রাণ সৃষ্ট করিলেন, প্রাণ হইতে শ্রদ্ধা সৃষ্টি করিলেন’ ইত্যাদিরূপে প্রশ্নোপনিষদে উক্ত প্রাণ হইতে নামপর্য্যন্ত ষোড়শ কলা(৪)। যাহার অন্ত-অব- সান-স্থান,[তিনি ষোড়শাৎ]। অথবা এখানে ‘একনেমি’ কথায় জগতের মূলকারণ অব্যক্তাবস্থা অভিহিত হইয়াছে। অব্যক্তাবস্থা অব্যাক্তাবস্থা ও বীজাবস্থা একই অর্থ। অব্যাক্তত বীজাবস্থা হইতে উৎপন্ন-তাহারই ব্যক্তাবস্থা-সমষ্টিভূত বিরাট ও সূত্রাত্মা এই দুই, এবং ইহারই ব্যষ্টিভূত পৃথিব্যাদি চতুৰ্দ্দশ ভুবন, প্রপঞ্চরূপে বিদ্যমান এই সমস্ত যে-পরমান্নার অন্ত-অবসান, তিনি ষোড়শান্ত।
শতাদ্ধারং—বিপর্যয়, অশক্তি, তুষ্টি ও সিদ্ধি নামক পঞ্চাশটী(শতের অর্দ্ধ) প্রত্যয়ভেদ(বিভিন্ন প্রকার জ্ঞান) অরের ন্যায় যাহার, তিনি শতোদ্ধার। [ রণচক্রের শলাকার নাম ‘অর’]।[পঞ্চাশ প্রকার প্রত্যয়ভেদ যথা—] বিপর্যয় জ্ঞান পাঁচ প্রকার—তমঃ, মোহ, মহামোহ, তামিস্র, ও অন্ধতামিস্র। অষ্টাবিংশতি রকম অশক্তি, নয় প্রকার তুষ্টি, আট প্রকার সিদ্ধি, এ সকলের সমষ্টিতে প্রত্যয়ভেদ বা বুদ্ধিবিভাগ পঞ্চাশ প্রকার। ২
(৪) প্রশ্নোপনিষদে ষষ্ঠ প্রশ্নে ষোড়শ কলার কথা আছে। সেখানে— প্রাণ, শ্রদ্ধা, আকাশ, বায়ু, তেজঃ, জল, পৃথিবী, ইন্দ্রিয়, মনঃ, অন্ন(ভোগ্য বস্তু), বীয্য, তপস্যা, মন্ত্র, কৰ্ম্ম(যজ্ঞাদি), লোক(স্বর্গলোক প্রভৃতি), ও নাম এই ষোড়শ প্রকার বস্তুরে ‘কলা’ নামে অভিহিত করা হইয়াছে। ‘কলা’ অর্থ— কং—ব্রহ্ম লীয়তে আচ্ছাদ্যতে যয়া, সা কলা। ক=ব্রহ্ম, যাহা দ্বারা লীন (আচ্ছাদিত হয়) তাহার নাম কলা।
পঞ্চ বিপর্যয়ভেদাঃ-তমো মোহো মহামোহস্তামিস্রো হ্যন্ধতামিস্র ইতি। অশক্তিরষ্টাবিংশতিধা তুষ্টিন্ন বধা। অষ্টধা সিদ্ধিঃ। এতে পঞ্চাশৎ প্রত্যয়ভেদাঃ। তত্র তমসো। ভেদোহষ্টবিধঃ। অষ্টস্থ প্রকৃতিঘনাত্মষু আত্মপ্রতিপত্তিবিষয়- ভেদেনাষ্টবিধত্ব প্রতিপত্তেঃ। মোহস্য চাষ্টবিধো ভেদঃ। অণিমাদিশক্তির্ম্মোহঃ। দশবিধো মহামোহঃ। দৃষ্টানুশ্রবিকশব্দাদিবিষয়েষু পঞ্চসু পঞ্চসু অভিনিবেশো মহামোহঃ। দৃষ্টানুশ্রবিকভেদেন তেষাং দশবিধত্বম্। তামিস্রোহষ্টাদশবিধঃ। দৃষ্টানুশ্রবিকেষু দশসু বিষয়েষষ্টবিধৈরৈশ্বর্য্যৈঃ প্রযতমানস্য তদসিদ্ধৌ যঃ ক্রোধঃ, স তামিস্রোহভিধীয়তে। অন্ধতামিস্রোহপ্যষ্টাদশবিধঃ। অষ্টবিধৈশ্বর্য্যে দশসু বিষয়েষু ভোগ্যত্বেনোপস্থিতেষু অর্দ্ধভুক্তেষু মৃত্যুনা হ্রিয়মাণস্য যঃ শোকো জায়তে- মহতা ক্লেশেনৈতে প্রাপ্তাঃ, ন চৈতে ময়োপভুক্তাঃ, প্রত্যাসন্নশ্চায়ৎ মরণকাল ইতি,
পূর্ব্বোক্ত-তমঃ আবার আট প্রকার। অনাত্মা(জড়) প্রকৃতি আট ভাগে বিভক্ত, সেই অনাত্মা আট প্রকার প্রকৃতিতে লোকের আত্মবুদ্ধি হইয়া থাকে, [ইহা তমঃ ভ্রমঃ]। তমের বিষয় আট প্রকার হওয়ায় মোহকেও আট প্রকার ধরা হয়। মোহও আট প্রকার। অণিমা প্রভৃতি ঐশ্বর্য্য আট প্রকার, সুতরাং তজ্জনিত মোহও আট প্রকার(৫)। মহামোহ দশ প্রকার। কারণ, ঐহিক ও পারলৌকিক যে, দশ প্রকার শব্দাদি বিষয়, তদ্বিষয়ে যে, অভিনিবেশ (আসক্তিবিশেষ), বিষয়-ভেদানুসারে তাহাও দশ প্রকার। তামিস্র অষ্টাদশ প্রকার। কেন না, অণিমাদি অষ্টবিধ ঐশ্বর্য্য দ্বারা দৃষ্ট ও আনুশ্রবিক অর্থাৎ ঐহিক ও পারলৌলিক শব্দাদি দশ প্রকার বিষয় আয়ত্ত করিতে যত্নশীল ব্যক্তির সিদ্ধি লাভে বাধা ঘটিলেই ক্রোধের সঞ্চার হয়, সেই ক্রোধই তামিস্র নামে কথিত হইয়া থাকে। অন্ধতামিশ্রও অষ্টাদশ প্রকার। অষ্ট প্রকার ঐশ্বর্য্য ও দশ প্রকার বিষয়(শব্দাদি ভোগ্যরূপে উপস্থিত হইবার পর পর, কিংবা অর্দ্ধভুক্ত অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইবার মত হয়, তাহা হইলে ঐ ব্যক্তিব হৃদয়ে যে, শোক উপস্থিত হয়—আমি বহু ক্লেশে এই সকল বিষয় প্রাপ্ত হইয়াছি, অথচ এ সকল বিষয় আমি ভোগ করিতে পারিলাম না, আমার মরণ
“অণিমা নবিমা প্রাপ্তিঃ প্রাকাম্যং মহিমা তথা। ঐশিত্বং চ বশিষ্ঠং চ যত্র কামাবসায়িতা ॥”
অণিমা অর্থ—পরমাণুর ন্যায় সূক্ষ্ম হওয়া। লঘিমা—তুলার মত লঘু হওয়া। প্রাপ্তি—হস্ত দ্বারা চন্দ্রমণ্ডল স্পর্শ করিতে পারা। প্রাকাম্য—ইচ্ছার ব্যাঘাত না হওয়া। মহিমা—পর্ব্বতের ন্যায় মহত্ত্ব লাভ করা। ঈশিত্ব—প্রভূত্ব। বশিত্ব— সকলকে বশে রাখিতে পারা। যত্রকামাবসারিতা—কোন প্রকারেও ইহার ব্যাঘাত না হওয়া।
সোহন্ধতামিস্র ইত্যুচ্যতে। বিপর্যয়ভেদা ব্যাখ্যাতাঃ। অশক্তিরষ্টাবিংশতিধোচ্যতে। একাদশেন্দ্রিয়াণাং অশক্তয়ঃ মুকত্ববধিরত্বপ্রভৃতয়ো বাহ্যাঃ। অন্তঃকরণস্য পুরুষার্থযোগ্যতাতুষ্টীনাং বিপর্যয়েণ নবধা অশক্তিঃ। সিদ্ধীনাং ‘বিপর্যয়েণাষ্টধা অশক্তিঃ। ৩
তুষ্টিন্ন বধা। প্রকৃত্যুপাদানকালভাগ্যাখ্যাশ্চতস্রঃ, বিষয়োপরমাৎ পঞ্চ। কশ্চিৎ প্রকৃতিপরিজ্ঞানাৎ কৃতার্থোহস্মীতি মনুতে। অন্যঃ পুনঃ পারিব্রাজ্য- লিঙ্গং গৃহীত্বা কৃতার্থোহস্মীতি মন্যতে। অপরঃ পুনঃ প্রকৃতিপরিজ্ঞানেন কিং? আশ্রমাদ্যপাদানেন বা কিং? বহুনা কালেনাবশ্যং মুক্তির্ভবতীতি মত্বা পরিতুষ্যতি। কশ্চিৎ পুনর্মন্যতে—বিনা ভাগ্যেন ন কিঞ্চিদপি প্রাপ্যতে, যদি মমাস্তি ভাগ্যং, ততো ভবত্যেবাত্রৈব মোক্ষ ইতি পরিতুষ্যতি। বিষয়াণাম্ অর্জনমশক্যমিতি উপরম্য তুষ্যতি। শক্যতে দ্রষ্টুমার্জিতুমর্জিতস্য রক্ষণমশক্য-
কাল নিকটবর্তী, এইরূপে যে, পরিদেবনা, তাহার নাম অন্ধতামিস্র। এই পর্যন্ত বিপর্য্যভেদ ব্যাখ্যাত হইল। এখন আটাশ প্রকার অশক্তিভেদ প্রদর্শিত হইতেছে-[অশক্তি দুই প্রকার-বাহ্য ও আন্তর,[তন্মধ্যে] পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মন, এই একাদশ ইন্দ্রিয়ের যে, মূকত্ব, বধিরত্ব ও অন্ধত্ব প্রভৃতি অশক্তি, তাহা বাহ্য, আর অন্তঃকরণের যে, পুরুষার্থ লাভের(ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ প্রাপ্তির) যোগ্যতারূপ তুষ্টি, তাহার বৈপরীত্যে আন্তর অশক্তি নয় প্রকার। আবার সিদ্ধির বৈপরীত্যেও অশক্তি আট প্রকার[সমষ্টিতে অশক্তি-২৮]। ৩
তুষ্টি নয় প্রকার-প্রকৃতি, উপাদান, কাল ও ভাগ্য, এই চারি প্রকার, আর বিষয়ের ভোগনিবৃত্তিতে পাঁচ প্রকার। যথা-১। কেহ মনে করে- প্রকৃতি-তত্ত্ব যখন জানিয়াছি, তখন আমি কৃতার্থ হইয়াছি, আমার আর কিছুই করণীয় নাই।[ইহা প্রকৃতিনামক তুষ্টি]। ২। অন্যে আবার সন্ন্যাস- চিহ্ন(দণ্ড কমণ্ডলু প্রভৃতি) গ্রহণ করিয়াই, আমি কৃতার্থ হইয়াছি বলিয়া মনে করে। ইহা উপাদাননামক তুষ্টি। ৩। অপরে আবার মনে করে- প্রকৃতি-তত্ত্ব জানিলেই বা কি হবে, আর আশ্রমাদি(সন্ন্যাসাদি) গ্রহণেই বা কি হবে, কাল পূর্ণ হইলে অবশ্যই মুক্তি হইবে, ইহা মনে করিয়া কেহ কেহ পরিতুষ্ট থাকে। ইহা কালনামক তুষ্টি। ৪। কেহ মনে করে-ভাগ্য ব্যতীত কিছুই পাওয়া যায় না, যদি ভাগ্যে থাকে, তবে আমার ইহ জন্মেই মুক্তি হইবে। ইহা ভাবিয়াই তুষ্ট থাকে।[ইহা ভাগ্যনামক তুষ্টি]। অভিমত বিষয় উপার্জ্জন করা বড় দুষ্কর, এই মনে করিয়া কেহ বিরত হইয়া সন্তুষ্ট থাকে। কেহ বা বিষয় অর্জন করা ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভবপর হইলেও উহা রক্ষা করা দুষ্কর, এই মনে করিয়া বিষয় পরিত্যাগপূর্ব্বক পরিতুষ্ট
৮
মিতি উপরম্য পরিতুষ্যতি। সাতিশয়ত্বাদিদোষদর্শনেনোপরম্যাপরস্তুষ্যতি। বিষয়াঃ সুতরামেবাভিলাষং জনয়ন্তি, ন চ তদ্ভোগাভ্যাসে তৃপ্তিরুপজায়তে।
“ন জাতু কামঃ কামানামুপভোগেন শাম্যতি।
হবিষা কৃষ্ণবর্ম্মে ব ভূয় এবাভিবর্দ্ধতে ॥” ইতি।
তস্মাদলমনেন পুনঃপুনরসন্তোষকারণেনোপভোগেন, ইত্যেবং সঙ্গদোষদর্শ- নাহপরম্য কশ্চিৎ তুষ্যতি। নানুপহত্য ভূতান্যপভোগঃ সম্ভবতি। ভুতোপ- ঘাতভোগাচ্চাধর্ম্মঃ। অধৰ্ম্মান্নরকাদিপ্রাপ্তিরিতি হিংসাদোষদর্শনাৎ কশ্চিদুপরম্য তুষ্যতি। প্রকৃত্যুপাদানকালভাগ্যাশ্চতস্রঃ, বিষয়াণামার্জনরক্ষণবিষয়দোষ- সঙ্গহিংসাদোষাৎ পঞ্চ তুষ্টয়ঃ, ইতি নব তুষ্টয়া ব্যাখ্যাতাঃ। ৪
সিদ্ধয়োহভিধীয়ন্তে-উহঃ শব্দোহধ্যয়নমিতি তিস্রঃ সিদ্ধয়ঃ। দুঃখ- বিঘাতাস্তিস্রঃ। সুহৃৎপ্রাপ্তিদ্দানমিতি সিদ্ধিদয়ম্। উহঃ-তত্ত্বং জিজ্ঞাসমানস্য উপদেশমন্তরেণ জন্মান্তরসংস্কারবশাৎ প্রকৃত্যাদিবিষয়ং জ্ঞানমুৎপদ্যতে, সেয়মূহো নাম প্রথমা সিদ্ধিঃ। শব্দো নাম অভ্যাসমন্তরেণ শ্রবণমাত্রাদ যজজ্ঞানমুৎপ- দ্যুতে, সা দ্বিতীয়া সিদ্ধিঃ। অধ্যয়নং নাম শাস্ত্রাভ্যাসাদ যজ জ্ঞানমুৎপদ্যতে, সা হয়। অপরে আবার বিষয়ভোগে সাতিশয়ত্ব দোষ(ন্যূনাধিক্য দোষ) দর্শন করিয়া, তাহা হইতে বিরত হইয়া পরিতোষ লাভ করে। কেহ কেহ বা, বিষয় সকল কেবলই ভোগপিপাসা বৃদ্ধি করে, পুনঃ পুনঃ বিষয়ভোগেও তৃপ্তি জন্মে না; কেন না-‘কাম্য বিষয় সংভোগে কখনও কাম(ভোগতৃষ্ণা) প্রশমিত হয় না, বরং ঘৃত সংযোগে অগ্নির ন্যায়[বিষয় ভোগে কামনা] আরও অধিক বুদ্ধি পাইয়া থাকে।’ অতএব বারংবার অসন্তোষজনক বিষয়ভোগে প্রয়োজন নাই-এইরূপে আসক্তি দোষ দর্শনের ফলে বিষয়বিরতি মাত্রে সন্তুষ্ট হইয়া থাকে। কেহ আবার, কোন ভূতের(প্রাণীর) পীড়া না দিয়া উপভোগ সম্ভব হয় না; প্রাণি পীড়নপূর্ব্বক ভোগে অধৰ্ম্ম হয়, অধর্ম্মে নরক প্রাপ্তি ঘটে, এই ভাবে হিংসাদোষ দর্শন করত কেহ কেহ ভোগ হইতে বিরত হইয়া সন্তোষ লাভ করে। প্রকৃতি, উপাদান, কাল ও ভাগ্যনামক পূর্ব্বোক্ত চার, আর বিষয়ের অর্জনে, রক্ষণে, বিষয়-দোষ-দর্শনে, সঙ্গ ও ভূত হিংসায় দোষ দর্শনের ফলে পাঁচ, সমষ্টিতে নয় পকার তুষ্টি ব্যাখ্যাত হইল। ৪
এখন সিদ্ধি বলা হইতেছে—উহ, শব্দ ও অধ্যয়ন এই তিন, দুঃখবিঘাত অর্থাৎ ত্রিবিধ দুঃখের হানি তিন, এবং সুহৃৎপ্রাপ্তি ও দান এই দুই,[সমষ্টিতে আর্ট প্রকার সিদ্ধি]। তন্মধ্যে উহ—তত্ত্বজিজ্ঞাসু ব্যক্তির যে, গুরূপদেশ ব্যতিরেকেও জন্মান্তবীণ সংস্কার বশে প্রকৃতিপ্রভৃতি বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞান জন্মে, তাহা উহনামক প্রথম সিদ্ধি। শব্দ অর্থ—বিনা অভ্যাসেও—পুনঃ পুনঃ অনুশীলন ব্যতিরেকেও কেবল শব্দশ্রবণমাত্রে যে, জ্ঞান সমুৎপন্ন হয়, তাহা শব্দনামক দ্বিতীয় সিদ্ধি। অধ্যয়ন অর্থ শাস্ত্রানুশীলনের ফলে যে, জ্ঞান উৎপন্ন হয়,
তৃতীয়া সিদ্ধিঃ। আধ্যাত্মিকস্যাংধিবৌতিকস্যাধিদৈবিকস্য ত্রিবিধদুঃখস্য ব্যুদাসাৎ শাতোষ্ণাদিজ-দুঃখসহিষ্ণোস্তিতিক্ষোর্যজ জ্ঞানমুৎপদ্যতে, তস্যাধ্যাত্মিকাদিভেদাৎ সিদ্ধেস্ত্রৈবিধ্যম্। সুহৃদং প্রাপ্য যা সিদ্ধিজ্ঞানস্থ্য, সা সুহৃৎপ্রাপ্তিন্নাম সিদ্ধিঃ। আচার্য্য-হিতবস্তু প্রদানেন যা সিদ্ধির্বিদ্যায়াঃ, সা দানং নাম সিদ্ধিঃ। এবমষ্টবিধা সিদ্ধিব্ব্যাখ্যাতা। এবং বিপর্যয়শক্তি তুষ্টিসিদ্ধ্যাখ্যাঃ পঞ্চাশৎ প্রত্যয়ভেদা ব্যাখ্যাতাঃ। এবং ব্রাহ্মপুরাণে কল্পোপনিষদ্ব্যাখ্যানপ্রদেশে যষ্টিতন্ত্রাধ্যায়ে পঞ্চাশৎ প্রত্যয়ভেদাঃ প্রতিপাদিতাঃ।
অথবা “পঞ্চাশক্তিরূপিণঃ” ইতি পরস্য যা শক্তয়ঃ পুরাণে স্বরূপত্বেনাভিমতাঃ, পঞ্চাশচ্ছক্তয় অরা ইব যস্য, তং শতাদ্ধারম্। বিংশতিপ্রত্যরাঃ—দশেন্দ্রিয়াণি, তেষাঞ্চ বিষয়া শব্দস্পর্শরূপরসগন্ধ-বচনাদানবিহরণোৎসর্গানন্দাঃ। পূর্ব্বোক্তা- নামরাণাং প্রত্যরা যে প্রতিবিধীয়ন্তে কীলকাঃ অরাণাং দার্ঢ্যায়, তে প্রত্যরা উচ্যন্তে, তৈঃ প্রত্যরৈযুক্তং। অষ্টকৈঃ ষড়ভিযুক্তমিতি যোজনীয়ম্। “ভূমিরাপোহনলো বায়ুঃ খং মনো বুদ্ধিরেব চ।
অহঙ্কার ইত্যর্থং যে ভিন্ন। প্রকৃতিরষ্টদা॥”
তাহা অধ্যয়ননামক তৃতীয় সিদ্ধি। দুঃখ ত্রিবিধ-আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক। এই তিন প্রকার দুঃখ উপেক্ষা করিতে পারিলে, শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্বজ দুঃখ সহ্য করিবার ক্ষমতা-তিতিক্ষা উপস্থিত হয়, তদবস্থায় তাহার যে জ্ঞান উদিত হয়, তাহা আধ্যাত্মিকাদি-বিভাগ হইতে জাত বলিয়া দুঃখ-বিঘাতাখ্য সিদ্ধিও তিন প্রকার। সুহৃদ্ অর্থাৎ সমধর্মী লোকপ্রাপ্তির ফলে যে, জ্ঞান সিদ্ধি (জ্ঞানোৎপত্তি) হয়, তাহা সুহৃৎপ্রাপ্তিনামক সিদ্ধি। আচার্য্যকে(জ্ঞান- দাতাকে) তাহার প্রিয় বস্তু দান করিয়া যে, বিদ্যাসিদ্ধি(বিদ্যালাভ), তাহা দাননামক সিদ্ধি। এইরূপে আট প্রকার সিদ্ধি বর্ণিত হইল। ব্রহ্মপুরাণে কল্প-উপনিষদের ব্যাখ্যা প্রদত্ত হইয়াছে। সেখানে এই প্রকারে অর্থাৎ বিপর্যয়াশক্তি তুষ্টি ও সিদ্ধির কথিতপ্রকার বিভাগানুসারে পঞ্চাশ প্রকার প্রত্যয়ভেদ বর্ণিত হইয়াছে।
অথবা(পক্ষান্তরে ‘শতার্দ্ধার’ কথার অর্থ এইরূপ)। “পঞ্চাশৎ-শক্তিরূপিণঃ।” এই পুরাণ-বচনে যে পঞ্চাশটী শক্তি তাঁহার স্বরূপভূত বলিয়া অভিহিত হইয়াছে, সেই পঞ্চাশটা শক্তি যাহার অরস্থানীয়, তিনি শতার্দ্ধার;(তাহাকে-)। পূর্ব্বোক্ত অর বা চক্রবর্তীাসমূহের দৃঢ়তা রক্ষার জন্য যে সমস্ত কীলক বা খিল সংযোজিত হয়, সে সকলকে ‘প্রত্যর’ বলা হয়। এস্থলে দশ ইন্দ্রিয়, এবং উহাদের বিষয়- শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ, ও বচন, গ্রহণ, বিচরণ(চলা ফেরা), মলত্যাগ, ও আনন্দ, এই দশ-সমষ্টিতে এই বিংশতিপ্রকার প্রত্যয়যুক্ত। আর ছয় প্রকার অষ্টকযুক্ত। তন্মধ্যে ১। ভূমি, জল, অনল(তেজঃ), বায়ু, আকাশ, মনঃ, বুদ্ধি
পঞ্চস্রোতোহম্বুং পঞ্চযোন্যগ্রবক্রাং পঞ্চপ্রাণোর্মিং পঞ্চবুদ্ধ্যাদিমূলাম্। পঞ্চাবর্ত্তাং পঞ্চদুঃখৌঘবেগাম্ পঞ্চাশদ্ভেদাং পঞ্চপর্ব্বাধীমঃ॥ ১৫৫॥
ইতি প্রকৃত্যষ্টকম্। ত্বকচর্মমাংসরুধিরমেদোহস্থিমজ্জাশুক্রাণি ধাত্বষ্টকম্। অণিমাদ্যৈশ্বর্যাষ্টকম্। ধর্মজ্ঞানবৈরাগ্যৈশ্বর্যাধৰ্ম্মাজ্ঞানাবৈরাগ্যানৈশ্বর্য্যাখ্য-ভাবা- ষ্টকম্। ব্রহ্ম প্রজাপতিদেবগন্ধর্ব্বযক্ষরাক্ষসপিতৃপিশাচা দেবাষ্টকম্। অষ্টাবাত্ম- গুণা জ্ঞেয়াঃ,-দয়া সর্বভূতেষু, ক্ষান্তিরনসুয়া, শৌচমনায়াসো মঙ্গলমকার্পণ্য- মস্পৃহেতি গুণাষ্টকং ষষ্ঠম্। এতৈঃ ষড়ভিযুক্তং। বিশ্বরূপৈকপাশং-স্বর্গপুত্রান্না- দ্যাদিবিষয়ভেদাৎ বিশ্বরূপং, বিশ্বরূপো নানারূপঃ একঃ কামাখ্যঃ পাশোহস্যেতি বিশ্বরূপৈকপাশং। ধৰ্মাধৰ্ম্মজ্ঞানমার্গভেদা অস্যেতি ত্রিমার্গভেদম্। দ্বয়োঃ পুণ্য- পাপয়োনিমিত্তৈকমোহো দেহেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধিজাত্যাদিঘনাত্মস্বাত্মাভিমানোহস্যেতি দ্বিনিমিত্তৈকমোহম্। অপশ্যন্নিতি ক্রিয়াপদমনুবর্ততে। অধীম ইত্যুত্তরমন্ত্রসিদ্ধৎ বা ক্রিয়াপদম্ ॥ ১:৪ ॥
ও অহংকার, এই আটটা প্রকৃত্যষ্টক। ২।-ত্বক্, চৰ্ম্ম, মাংস, রুধির, মেদঃ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র, এই আটটা ধাতু-অষ্টক। ৩।-অণিমা প্রভৃতি ঐশ্বর্য্য এবং অধৰ্ম্ম, অজ্ঞান, অবৈরাগ্য ও অনৈশ্বর্য্য, এই আট প্রকার ভাবাষ্টক। ৫।- ব্রহ্মা, প্রজাপতি, দেব, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, রাক্ষস, পিতৃগণ ও পিশাচ, এই সকল দেবতা- ষ্টক। ৬।-আত্মার আট প্রকার গুণ-সর্ব্বভূতে দয়া, ক্ষমা, অনসূয়া(পরের সুখে দ্বেষ না করা), শৌচ, অনায়াস, মঙ্গল, অকার্পণ্য, ও অস্পৃহা, এই সকল গুণাষ্টক, এই ছয় প্রকার অষ্টকযুক্ত। বিশ্বরূপৈকপাশং-স্বর্গ, পুত্র ও অন্নাদি বিষয়ভেদে কামের বিশ্বরূপভাব বুঝিতে হইবে। বিশ্বরূপ-নানারূপ অর্থাৎ বিচিত্রাকার কাম যাহার এক(অদ্বিতীয়) পাশ(বন্ধনরজ্জু), তিনি বিশ্বরূপৈকপাশ। ত্রিমার্গভেদৎ-ধৰ্ম্ম, অধৰ্ম্ম ও জ্ঞান, এই তিনটি যাহার পথভেদ অর্থাৎ বিচরণ- ক্ষেত্র। দ্বিনিমিত্তৈকমোহং-সুখ দুঃখ এই দু‘য়ের নিমিত্তই যাহার মোহ, তিনি দ্বিনিমিত্তৈকমোহ। দেহ, ইন্দ্রিয়, মনঃ, বুদ্ধি, ও জাতি প্রভৃতি অনাত্ম- পদার্থে যে, আত্মাভিমান(আত্মভ্রম), তাহাই মোহ।[একনেমি প্রভৃতি বিশেষণান্বিত সেই শক্তিকে] ‘দর্শন করিয়াছিলেন’ এই পূর্ব্বোক্ত ক্রিয়ার সহিত ইহার সম্বন্ধ, অথবা পরবর্তী শ্রুতিতে যে, ‘অধীম’ ক্রিয়াপদ আছে, তাহার সহিত ইহার সম্বন্ধ ৷৷ ১:৪ ॥
সরলার্থঃ।—[অথেদানীং তমেব নদীরূপেণ দর্শয়তি—পঞ্চেতি]। পঞ্চস্রোতোহম্বুং(পঞ্চস্রোতাংসি চক্ষুঃপ্রভৃতীনি জ্ঞানেন্দ্রিয়াণি অম্বুনি (অম্বুতুল্যানি) যস্যাঃ নদ্যাঃ, তাং), পঞ্চযোন্যগ্রবক্রাং—পঞ্চভিঃ যোনিভিঃ
পঞ্চভূতৈঃ উগ্রাং দুস্তরাং, বক্রাং কুটিলাৎ চ, পঞ্চপ্রাণোৰ্ম্মিং(পঞ্চ প্রাণাঃ কর্মেন্দ্রিয়াণি বা উর্ময়ঃ তরঙ্গাঃ যস্যাঃ, তাং), পঞ্চবুদ্ধ্যাদিমূলাং(পঞ্চানাং বুদ্ধীনাং চাক্ষুষাদিজ্ঞানানাং আদিঃ কারণং মনঃ, তদেব মূলং, যস্যাঃ, তাং), পঞ্চাবর্তাৎ(পঞ্চ শব্দাদয়ো বিষয়াঃ আবর্তাঃ(জলভ্রমিরূপাঃ) যস্যাঃ, তাং), পঞ্চদুঃখৌঘবেগাং(পঞ্চ দুঃখানি গর্ভ-জন্ম-জরা-ব্যাধি-মরণজানি দুঃখানি ওঘবেগঃ স্রোতোবেগঃ যস্যাঃ, তাং), পঞ্চপর্ব্বাং(পঞ্চ-অবিদ্যাস্মিতারাগ- দ্বেষাভিনিবেশাঃ ক্লেশাঃ পর্ব্বাণি যস্যাঃ, তাং) এবং পঞ্চাশন্তেদাং(যথোক্ত- প্রকারপঞ্চাশন্তেদযুক্তাং, অথবা হৃৎপদ্মস্থ পঞ্চাশদ্দলমধ্যবত্তিনীং তাং) অধীমঃ (বয়ং স্মরাম ইত্যর্থঃ) ॥১।৫৷’
মূলানুবাদ।—[অতঃপর সেই কারণ বস্তুকে নদীরূপে বর্ণনা করিতে- ছেন—] চাক্ষুষাদি পাঁচ প্রকার জ্ঞানধারাযুক্ত চক্ষুঃপ্রভৃতি পঞ্চেন্দ্রিয় যাহার জল, পঞ্চভূতরূপ যোনি দ্বারা যাহা উগ্র(ভীষণ—দুস্তরা) ও বক্রা, পঞ্চ প্রাণ বা কর্ম্মেন্দ্রিয় যাহার তরঙ্গরাশি, পাঁচ প্রকার জ্ঞানের আদি কারণ মন যাহার মূল, শব্দ প্রভৃতি পাঁচ প্রকার বিষয় যাহার আবর্ত্ত(জলভ্রমিস্থানীয়), গর্ভ, জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মরণজনিত দুঃখ যাহার স্রোতোবেগ, এবং অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ, এই পঞ্চ ক্লেশ যাহার পর্ব্ব, এইরূপে পঞ্চাশ প্রকার ভেদসম্পন্ন তাহাকে স্মরণ করিতেছি ॥১।৫॥
শাঙ্করভাষ্যম্। -পূর্ব্বং চক্ররূপেণ দর্শিতম্, ইদানীং নদীরূপেণ দর্শয়তি-পঞ্চস্রোতোহম্বুম্ ইতি। পঞ্চ স্রোতাৎসি চক্ষুরাদীনি জ্ঞানেন্দ্রিয়াণি অম্বুস্থানানি যস্যাস্তাং নদীৎ পঞ্চস্রোতোহম্বুম্-অধীম ইতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে। পঞ্চযোনিভিঃ কারণভূতৈঃ পঞ্চভূতৈরূগ্রাং বক্রাঞ্চ পঞ্চযোন্যগ্রবক্রাৎ। পঞ্চ প্রাণাঃ কর্ম্মেন্দ্রিয়াণি বাক্পাণ্যাদয়ো বা উর্ময়ো যস্যাস্তাং পঞ্চপ্রাণোর্মিং। পঞ্চবুদ্ধীনাং চক্ষুরাদিজন্যানাং জ্ঞানানামাদিঃ কারণং মনঃ, মনোবৃত্তিরূপত্বাৎ সর্ব্বজ্ঞানানাং। মনো মূলং কারণং যস্যাঃ সংসারসরিতস্তাম্। তথাচ মনসঃ সর্ব্বহেতুত্বং দর্শয়তি।
ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্ব মন্ত্রে যাহাকে চক্ররূপে দেখান হইয়াছে, এখন তাহাকেই আবার নদীরূপে প্রদর্শন করিতেছেন—পঞ্চস্রোতোহম্বুমিতি। চক্ষুঃ- প্রভৃতি পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় যাহার অম্বুস্থান(জলীয়) স্রোতঃ, সেই পঞ্চস্রোতোহম্বু নদীকে[আমরা স্মরণ করি(জানি)]। ‘অধীমঃ’(স্মরণ করি) এই ক্রিয়ার সম্বন্ধ সর্বত্র বুঝিতে হইবে। পঞ্চযোন্যগ্রবক্রাং—পাঁচটি যোনি অর্থাৎ কারণস্বরূপ পঞ্চভূত দ্বারা উগ্রা(ভীষণা) ও বক্রা। পঞ্চপ্রাণোর্মিং—পঞ্চ প্রাণ(প্রাণ অপানাদি), অথবা পঞ্চকর্ম্মেন্দ্রিয় বাক্পাণি প্রভৃতি যাহার ঊর্মি(ঢেউ), পঞ্চ বুদ্ধ্যাদিমূলাৎ—চক্ষুঃ প্রভৃতি পঞ্চ ইন্দ্রিয়জন্য জ্ঞানের আদি—কারণ হইতেছে মনঃ; কারণ, সমস্ত জ্ঞানই মনোবৃত্তির অধীন; অতএব সেই মন যাহার—যে সংসার- নদীর মূল কারণ, তাহাকে। মনই যে সকলের মূল, তাহা প্রদর্শন করিতেছেন—
“মনোবিজৃম্ভিতং সর্ব্বং যৎকিঞ্চিৎ সচরাচরম্। মনসো হ্যমনীভাবে দ্বৈতং নৈবোপলভ্যতে॥” ইতি।
পঞ্চ শব্দাদয়ো বিষয়া আবর্ত্তস্থানীয়াঃ তেষু বিষয়েষু প্রাণিনো নিমজ্জন্তীতি, যস্যাস্তাং পঞ্চাবত্তাম্। পঞ্চ গর্ভদুঃখ-জন্মদুঃখ-জরাদুঃখ-ব্যাধিদুঃখ-মরণদুঃখানি এব ওঘবেগো যস্যাস্তাং পঞ্চদুঃখৌববেগাম্। অবিদ্যাহস্মিতারাগদ্বেষাভিনিবেশাঃ পঞ্চ ক্লেশভেদাঃ পঞ্চ পর্ব্বাণ্যস্যাস্তাং পঞ্চপর্ব্বাম্ ইতি ॥ ১।৫ ॥
‘চরাচর যাহা কিছু, সে সমস্তই মনের কার্য্য(মন হইতে প্রকটিত হয়)। মনের যদি অমনীভাব হয় অর্থাৎ সংকল্পবিকল্পস্বভাব নষ্ট হয়, তাহা হইলে নিশ্চয়ই দ্বৈত জগতের উপলব্ধি রহিত হয়।’ পঞ্চাবর্তাং—শব্দাদি পাঁচ প্রকার বিষয় যাহার আবর্ত্ত(জলভ্রমিস্থানীয়), পঞ্চদুঃখৌঘবেগাং—গর্ভবাস, জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মরণ, এ সকল হইতে যে পাঁচ প্রকার দুঃখ হয়, তাহাই যাহার ওঘবেগ (স্রোতোবেগ), পঞ্চপর্ব্বাং—অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ, এই পাঁচ প্রকার ভাব যাহার পর্ব্ব(বৃদ্ধিকারণ), সেই সংসারনদীকে আমরা স্মরণ করিতেছি, অর্থাৎ আমরা তাহা অবগত আছি ॥ ১৫ ॥
সরলার্থঃ।—[ ইদানীং জীবস্য সংসারমোক্ষোপায়ৌ দর্শয়িতুমাহ— সর্ব্বাজীবে ইত্যাদি]। হংসঃ(হস্তি—সংসারং গচ্ছতীতি হংসঃ জীবঃ) আত্মানং (জীবাত্মানং) প্রেরিতারং(সর্ব্বনিয়ন্তারং পরমাত্মানং) চ পৃথক্(ভিন্নং) মত্বা(অন্যোহসৌ, অন্যোহহমস্মীতি জ্ঞাত্বা) সর্ব্বাজীবে(সর্ব্বেষাং ভূতানাং জীবনোপায়ে) সর্ব্বসংস্থে(সর্ব্বেষাৎ সংস্থা স্থিতিঃ প্রলয়ো বা যত্র, তস্মিন্), বৃহন্তে(বৃহতি অনাদিকালপ্রবৃত্তে মহতি) অস্মিন্ ব্রহ্মচক্রে(ব্রহ্মণো বিবত্তে সংসারচক্রে শরীরে বা)[অনাদিত্বাৎ চক্রত্বমিত্যাশয়ঃ।] ভ্রাম্যতে(অবিদ্যা- বশাৎ সুরনরাদিভাবেন পরিবর্ত্ততে ইতি ভাবঃ।)[অথবা যথোক্তবিশেষণে ব্রহ্মচক্রে,(ব্রহ্মণঃ প্রকাশস্থানে শরীরে) ভ্রাম্যতে ইত্যর্থঃ।][মোক্ষোপায়-, মাহ—] তেন(ঈশ্বরেণ) জুষ্টঃ(সেবিতঃ—ঈশ্বরাত্মনা আত্মানং জ্ঞাত্বা প্রীয়মাণঃ সন্) ততঃ(তস্মাৎ প্রীণনাৎ) অমৃতত্বং(মোক্ষং) এতি(প্রাপ্নোতি)[হংস ইতি শেষঃ।][অথবা মোক্ষোপায়মাহ পৃথগিতি]। পৃথক্(সংসারচক্রাৎ অন্যরূপং) আত্মানং(জীবাত্মানং) চ(এব—আত্মানমেব) প্রেরিতারং(সংসার-
প্রবর্ত্তকং পরমেশ্বরং) মত্বা(অভেদেন সাক্ষাৎকৃত্য) ততঃ(তস্মাৎ সাক্ষাৎ- কারাৎ হেতোঃ) তেন(পরমেশ্বরেণ) জুষ্টঃ(পরাং প্রীতিং প্রাপিতঃ) অমৃতত্ব- মেতি ইতি পূর্ব্ববৎ] ॥ ১।৬॥
মূলানুবাদ।—[অতঃপর সংসার ও মুক্তিলাভের কারণ প্রদর্শন করিতেছেন—] হংস(সংসারপথে গমন করে বলিয়া জীবাত্মার নাম হংস)। আপনাকে ও সর্ব্বনিয়ন্তা পূরমেশ্বরকে পৃথক্ মনে করায়, অর্থাৎ জীবাত্মা ও পর- মাত্মায় ভেদদর্শন করার ফলে—সর্ব্বভূতের জীবননির্ব্বাহক(ভোগভূমি) ও সকলের আশ্রয়স্থান বা প্রলয়স্থান এই বৃহৎ ব্রহ্মচক্রে—অনাদিকাল হইতে প্রবৃত্ত এই সংসারচক্রে, অথবা স্থূল দেহে কেবলই ভ্রাম্যমান হয়। সেই হংসই আবার সেই পরমেশ্বরের সহিত অভিন্নরূপে সেবিত অর্থাৎ পরমাত্মভাব প্রাপ্ত হইয়া অমৃতত্ব লাভ করে(মুক্ত হয়)।[শ্রুতির শেষার্দ্ধের অন্যপ্রকার অর্থ এইরূপ—] উক্ত ব্রহ্মচক্র হইতে পৃথক্ অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ আত্মাকেই প্রেরিতারূপে[পরমেশ্বরভাবে মনন করিয়া অর্থাৎ উভয়ের অভেদ প্রত্যক্ষ করিয়া, সেই প্রত্যক্ষেরই ফলে অমৃতত্ব লাভ করে] ॥ ১।৬॥
শাঙ্করভাষ্য।—এবং তাবন্নদীরূপেণ ব্রহ্মচক্ররূপেণ চ কার্যকারণাত্মকং ব্রহ্ম সপ্রপঞ্চমিহাভিহিতম্, ইদানীমস্মিন্ কার্যকারণাত্মকব্রহ্মচক্রে কেন বা সংসরতি, কেন বা মুচ্যত ইতি সংসারমোক্ষহেতু প্রদর্শনায়াহ—সর্ব্বাজীবইতি। সর্ব্বেষামাজীব- নমস্মিন্নিতি সর্ব্বাজীবে। সর্ব্বেষাং সংস্থা সমাপ্তিঃ প্রলয়ো যস্মিন্নিতি সর্ব্বসংস্থে। বৃহন্তেহস্মিন্ হংসো জীবঃ। হন্তি গচ্ছত্যধ্যানমিতি হংসঃ। ভ্রাম্যতে অনাত্ম- ভূতদেহাদিমাত্মানং মন্যমানঃ সুরনরতির্য্যগাদিভেদভিন্ন-নানাযোনিষু। এবং ভ্রাম্যমাণঃ পরিবর্ত্তত ইত্যর্থঃ। কেন হেতুনা নানাযোনিষু পরিবর্ত্তত ইতি, তত্রাহ—পৃথগাত্মানং প্রেরিতারঞ্চ মত্বেতি। আত্মানং জীবাত্মানং প্রেরিতার-
ভাষ্যানুবাদ।—কার্য্যকারণভাবাপন্ন জগৎপ্রপঞ্চের সহিত ব্রহ্মতত্ত্ব পূর্ব্বোক্ত প্রকারে নদীরূপে ও ব্রহ্মচক্ররূপে বর্ণিত হইয়াছে। কার্য্যকারণভাবাপন্ন এই ব্রহ্মচক্রে জীব কি কারণে সংসারী হয়, আর কি উপায়েই বা মুক্ত হয়,— সংসার ও মুক্তিলাভের কারণ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বলিতেছেন—“সর্ব্বাজীবে” ইতি। যাঁহাতে সকল জীবের আজীব জীবনধারণ(উৎপত্তি) হয়, এবং যাঁহাতে সকল জীবের সংস্থা—সমাপ্তি অর্থাৎ বিলয় হয়, এমন বৃহৎ এই সংসারচক্র হংস—সংসারপথে গমনশীল জীব দেহেন্দ্রিয় প্রভৃতিকে আত্মা মনে করিয়া সুর, নর তির্য্যক্(পশুপক্ষি প্রভৃতি) নানা যোনিতে ভ্রমণ করিতে বাধ্য হয়। এই প্রকারে ভ্রাম্যমাণ হইয়া যাতায়াত করিতে থাকে। কি কারণে নানা যোনিতে ভ্রমণ করে, তদুত্তরে বলিতেছেন—“পৃথক্ আত্মানং প্রেরিতারং চ মত্বা।” অর্থাৎ জীবাত্মাকে ও প্রেরিতা পরমেশ্বরকে পৃথক্ভাবে—‘আমি অন্য,
কেশ্বরং পৃথগ্ভেদেন মত্বা জ্ঞাত্বা—অন্যোহসাবদ্যোহহমস্মীতি জীবেশ্বরভেদদর্শনেন সংসারে পরিবর্ত্তত ইত্যর্থঃ। ১
কেন মুচ্যুত ইত্যাহ-জুষ্টঃ সেবিতস্তেন ঈশ্বরেণ চিৎসদানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মা- ত্মনা-অং ব্রহ্মাশ্মীতি সমাধানং কৃত্বেত্যর্থঃ। তেনেশ্বরসেবনাদমৃতত্বমেতি। যস্তু পূর্ণানন্দব্রহ্মরূপেণাত্মানমবগচ্ছতি, স মুচ্যতে। যস্তু পরমাত্মনোহন্যমাত্মানং জানাতি, স বধ্যত ইতি। তথা চ বৃহদারণ্যকে ভেদদর্শনস্য সংসারহেতুত্বৎ প্রদর্শিতম্-“য এবং বেদাহং ব্রহ্মাশ্মীতি, স ইংং সর্ব্বং ভবতীতি, তস্য হ ন দেবাশ্চনাভূত্যা ঈশতে। আত্মা হোষাং স ভবতি। অথ যোহন্যাং দেবতামুপা- স্তেহন্যোসাবন্যোহহমস্মীতি, ন স বেদ, যথা পশুরেবং স দেবানাম্” ইতি।
তথা চ শ্রীবিষ্ণুধর্ম্মে—
“পশ্যত্যাত্মানমন্যস্তু যাবদ্বৈ পরমাত্মন্নঃ। তাবৎ স ভ্রাম্যতে জন্তুর্ম্মোহিতো নিজকর্মণা ॥ সংক্ষীণাশেষকৰ্ম্মা তু পরং ব্রহ্ম প্রপশ্যতি। অভেদেনাত্মনঃ শুদ্ধং শুদ্ধত্ব্যদক্ষয়ো ভবেৎ ॥” ইতি ॥১ ৬৷৷
আর তিনি অন্য’ এই প্রকার ভিন্নভাবে মনে করিয়া—জানিয়া, অর্থাৎ জীবে ও ঈশ্বরে ঐরূপ ভেদ দর্শন করিয়া যাতায়াত করিয়া থাকে। ১।
কি কারণে মুক্ত হয়? তদুত্তরে বলিতেছেন-অদ্বিতীয় সৎচিৎ আনন্দ- স্বভাব ব্রহ্মই আমি, এইরূপে সেবিত হইয়া অর্থাৎ ঐ ভাবে সমাধি করিয়া, সেই ঈশ্বরসেবনের ফলে অমৃতত্ব(মুক্তি) লাভ করে। অভিপ্রায় এই যে, যে জীব পূর্ণ আনন্দঘন ব্রহ্মরূপে আপনাকে অবগত হয়, সে মুক্ত হয়, কিন্তু যে জীব আপনাকে পরমাত্মা হইতে অন্য বলিয়া জানে, সে বন্ধনদশা প্রাপ্ত হয়। দেখ, বৃহদারণ্যকোপ- নিষাদ ভেদদর্শনই সংসারের কারণরূপে প্রদর্শিত হইয়াছে-‘যে এইরূপ জানে যে, আমিই ব্রহ্ম, সে এই সর্ব্বময় হয়। দেবগণও তাহার অনিষ্ট সাধনে সমর্থ হয় না। কেননা, সে তাহাদেরও আত্মস্বরূপ হয়,[আত্মার অনিষ্টে কাহারও প্রবৃত্তি হইতে পারে না]। আর যে লোক আমি অন্য, আর আমার উপাস্য দেবতা অন্য, এই ভাবে অন্য দেবতার অর্থাৎ পৃথক্ বুদ্ধিতে দেবতার উপাসনা করে, সে জানে না-সে অজ্ঞ, গৃহস্থের যেমন পশু, সেও দেবতা- গণের নিকট তেমনই-পশুতুল্য।’ বিষ্ণুধর্ম্মেও সেইরূপ উক্তি রহিয়াছে- ‘জন্তু(অজ্ঞ লোক) যে পর্য্যন্ত আপনাকে পরমাত্মা হইতে অন্য বা পৃথক্ দর্শন করে, সে পর্য্যন্ত সে নিজ কৰ্ম্মফলে বিমোহিত হইয়া সংসারে পরিভ্রমণ করে। কিন্তু যে লোক নিঃশেষরূপ কর্মক্ষয় করত আপনার সঙ্গে অভিন্ন- রূপে বিশুদ্ধ পরব্রহ্ম দর্শন করে, সে নিজেও শুদ্ধ হয়, এবং তাহার মরণভয়ও চলিয়া যায়’ ॥ ১।৬॥
উদ্গীতমেতৎ পরমন্ত ব্রহ্ম তস্মিংস্ত্রয়ং সুপ্রতিষ্ঠাহক্ষরঞ্চ।, অত্রান্তরং ব্রহ্মবিদো বিদিত্বা লীনা ব্রহ্মণি তৎপরা যোনিমুক্তাঃ ॥১॥৭৷৷
সরলার্থঃ।—এতৎ(পূর্ব্বোক্তং) তু(পুনঃ) ব্রহ্ম(পরমাত্মা) উদ্গীতং (সকারণাৎ প্রপঞ্চাৎ উদ্ধৃত্য—পৃথকৃত্য কথিতং) পরমং(সর্ব্বোৎকৃষ্টমেবেত্যর্থঃ) অক্ষরং(অবিনাশি চ)। তস্মিন্(ব্রহ্মণি) ত্রয়ং[সুপ্রতিষ্ঠং],[তথা প্রপঞ্চস্যাপি] সুপ্রতিষ্ঠা(শোভনা প্রতিষ্ঠা স্থিতিঃ)।[অথবা, তস্মিন্ ত্রয়ং(সত্ত্ব-রজস্তমোগুণরূপং, ঋগাদিবেদত্রয়ং বা), তথা সুপ্রতিষ্ঠাক্ষরং (সর্ব্ববেদবীজভূতং—অক্ষরং প্রণবশ্চ)[আশ্রিতমিতি শেষঃ]। ব্রহ্মবিদঃ অত্র (দেহে) অন্তরং(অন্নময়াদিকোষেভ্যঃ ভেদং), অথবা অত্র(ব্রহ্মণি) অন্তরং (প্রবেশদ্বারং) বিদিত্বা(জ্ঞানোপায়ং লব্ধ।) তৎপরাঃ(ব্রহ্মসাধনপরাঃ সন্তঃ) ব্রহ্মণি লীনাঃ(ব্রহ্মীভূতাঃ, অতএব) যোনিমুক্তাঃ(পুনর্জন্মরহিতাঃ) [ভবন্তি]॥ ১॥।
মূলানুবাদ।—এই ব্রহ্ম জগৎপ্রপঞ্চ ও তৎকারণ অবিদ্যা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ বলিয়া বেদে বর্ণিত হইয়াছেন, এবং পরম ও অক্ষর(অবিকারী) বলিয়াও কথিত হইয়াছেন। তাঁহাতে ভোক্তা জীব, ভোগ্য জগৎ ও নিয়ন্তা পরমেশ্বর, এই তিন, অথবা ঋক্, যজুঃ, সাম, এই বেদত্রয় সুপ্রতিষ্ঠিত রহি- য়াছে। ব্রহ্মবিদ্ পণ্ডিতগণ, এই দেহে তাহার ভেদ অর্থাৎ তিনি দেহ হইতে ভিন্ন, ইহা অবগত হইয়া, অথবা এই ব্রহ্মে প্রবেশের দ্বারভূত উপযুক্ত সাধন উপলব্ধি করিয়া ব্রহ্মপরায়ণ হইয়া ব্রহ্মেতে বিলীন হন, এবং জন্মযাতনা হইতে মুক্ত হন ॥ ১॥৭ ॥
ননু তমেকযোনিমিত্যাদিনা সপ্রপঞ্চং ব্রহ্ম প্রতিপাদিতম্। তথা চ সতি অহং ব্রহ্মাস্মীতি ব্রহ্মাত্মপ্রতিপত্তাবপি সপ্রপঞ্চস্যৈব ব্রহ্মণ আত্মত্বেনাবগমাৎ “তং যথা যথোপাসতে তদেব ভবতি” ইতি সপ্রপঞ্চব্রহ্মপ্রাপ্তিরেব স্যাৎ। ততশ্চ প্রপঞ্চ-
ভাষ্যানুবাদ।—আপত্তি হইতেছে যে, “তম্ একনেমিং” ইত্যাদি মন্ত্রে ‘ব্রহ্মকে প্রপঞ্চসমন্বিত বলা হইয়াছে। তাহা হইলে স্বীকার করিতে হইবে যে, ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’(আমি ব্রহ্ম) এইরূপে ব্রহ্ম ও আত্মার ঐক্য প্রতীতিস্থলেও প্রপঞ্চযুক্ত ব্রহ্মকেই আত্মারূপে অনুভব করা হয়। তাহা হইলে, ‘তাহাকে যে- যে ভাবে উপাসনা করা হয়, উপাসক সেই সেই ভাবই প্রাপ্ত হয়’ এই শ্রুতি অনুসারে তাহাদের পক্ষে সপ্রপঞ্চ ব্রহ্ম প্রাপ্তিই হইতে পারে। তাহা হইলে,
স্যাপরিত্যাগান্ন মোক্ষসিদ্ধিঃ। ততশ্চ জুষ্টস্ততন্তেনামৃতত্বমেতীতি মোক্ষোপ- দেশোহনুপপন্ন এব, ইত্যাশঙ্ক্যাহ—উদ্গীতমিতি। সপ্রপঞ্চং ব্রহ্ম যদি স্যাৎ, ততো ভবত্যেব মোক্ষাভাবঃ। ন ত্বেতদস্তি। কস্মাৎ? যত উদ্গীতং উদ্ধৃত্য গীত- মুপদিষ্টং কার্য্যকারণলক্ষণাৎ প্রপঞ্চাদ্বেদান্তৈঃ। ১
“অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি।” “তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে।” “অস্থূলমশব্দমস্পর্শং” “স এষ নেতি নেতীতি” “ততো যদুত্তর- তরম্,” “অন্যত্র ধৰ্মাৎ।” “ন সন্ন চাসচ্ছিব এব” কেবলঃ।” “তমসঃ পরঃ।” “যতো বাচো নিবর্তন্তে।” “যত্র নান্যৎ পশ্যতি নান্যদ্বিজানাতি, স ভূমা।” “যোহ- শনায়াপিপাসে শোকং মোহং জরামত্যেতি।” “অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রো হ্যক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ।” “একমেবাদ্বিতীয়ম্।” “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্।” “নেহ নানাস্তি কিঞ্চন।” “একধৈবানুদ্রষ্টব্যম্।” ইত্যেবমাদিষু প্রপঞ্চাস্পৃষ্টমেব ব্রহ্মাব- গম্যত ইত্যর্থঃ। যত এবং প্রপঞ্চধর্মরহিতং ব্রহ্ম, অতএব পরমন্তু ব্রহ্ম। তু শব্দো-
তাহারা যখন প্রপঞ্চ পরিত্যাগ করিতে পারিল না, তখন তাহাদের পক্ষে প্রকৃত মোক্ষলাভ ও সিদ্ধ হইতে পারে না; অতএব “জুষ্টস্ততস্তেন” ইত্যাদি বাক্যোক্ত অমৃতত্ব প্রাপ্তির উপদেশ নিশ্চয়ই অনুপপন্ন হয়। এই আশঙ্কায় বলিতেছেন— “উদগীতম্” ইতি।[আপত্তির খণ্ডন—] ব্রহ্ম যদি প্রকৃতপক্ষেই সপ্রপঞ্চ হইত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই মোক্ষের অভাব বা অনুপপত্তি ঘটিত। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তাহা নহে। কারণ? যেহেতু[ব্রহ্ম] উদগীত—যেহেতু বেদান্তশাস্ত্রে(উপনিষদে) কার্য্যকারণভাবাপন্ন প্রপঞ্চ হইতে উদ্ধৃত করিয়া অর্থাৎ প্রপঞ্চ হইতে পৃথক্ করিয়া উপদিষ্ট হইয়াছেন। ১ যথা—‘তিনি বিদিত হইতে অন্য এবং অবিদিতের ও বাহিরে’, ‘তুমি তাহাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে, কিন্তু লোকে যাহাকে ‘ইদং’ বলিয়া প্রত্যক্ষ দৃশ্যভাবে উপাসনা করে, তাহাকে নহে।’ ‘তিনি স্থূল নহে, তিনি শব্দস্পর্শবিহীন।’ ‘সেই আত্মা ইহা নহে, ইহা নহে—সমস্ত প্রপঞ্চের অতীত’ ‘যাহা তাহারও পরবর্তী’, ‘যাহা ধর্ম্মের অন্যত্র’, ‘যাহা সৎ নহে, অসৎ নহে, কেবলই মঙ্গলময়’, ‘তমোগুণের বা মায়ার অতীত’, ‘যাহার নিকট হইতে বাক্যসমূহ ফিরিয়া আইসে।’ ‘যাহাতে অন্য কিছু দৃষ্ট হয় না, অন্য কিছু জ্ঞাত হয় না, তাহাই ভূমা(পরম মহৎ), যিনি ক্ষুধা পিপাসা, শোক মোহ, ভয় ও জরা অতিক্রম করেন’, ‘প্রাণ ও মনরহিত শুভ্র (বিশুদ্ধ) এবং অক্ষর ব্রহ্ম অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ‘। ‘এক অদ্বিতীয়।’ ‘বিকার’ অর্থাৎ জন্মশীল পদার্থসমূহ কেবল বাক্যারব্ধ নাম মাত্র’, ‘এই ব্রহ্মে কিছুমাত্র নানা—ভেদ নাই’, ‘একরূপেই দেখিতে হইবে’, ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যে ব্রহ্মকে প্রপঞ্চ-সংস্পর্শরহিত বলিয়াই জানা যায়। যেহেতু ব্রহ্ম এই প্রকারে প্রপঞ্চধর্ম্মরহিত, অতএব ব্রহ্ম পরম। মূলের ‘তু’ শব্দটা ‘এব’ অর্থে প্রযুক্ত;
হবধারণে। পরমমেব উৎকৃষ্টমেব, সংসারধর্মানাস্কন্দিতত্বাৎ। উদ্গীতত্বেন ব্রহ্মণ উৎকৃষ্টত্বাৎ। “তং যথা যথোপাসতে” ইতি ন্যায়েন উৎকৃষ্টব্রহ্মোপাসনাৎ উৎকৃষ্টমের ফলং মোক্ষাখ্যং ভবতোবেত্যভিপ্রায়ঃ। ২
নম্বেবং তর্হি ব্রহ্মণঃ প্রপঞ্চাসংসৃষ্টত্বে প্রপঞ্চস্যাপি ব্রহ্মাসংসর্গাৎ সাঙ্খ্যবাদ ইব প্রপঞ্চস্যাপি পৃথক্ সিদ্ধত্বেন স্বতন্ত্রত্বাৎ “বাচারম্ভণৎ বিকারো নামধেয়ম্” ইতি পারতন্ত্র্যাভ্যুপগমেন মিথ্যাত্মোপদেশপূর্ব্বকমদ্বিতীয়ব্রহ্মাত্মত্বেনোপদেশোহনুপপন্ন- শ্চেত্যাশঙ্ক্যাহ—তস্মিংস্ত্রয়মিতি। যদ্যপি ব্রহ্ম প্রপঞ্চাসংস্পৃষ্টং স্বতন্ত্রঞ্চ, তথাপি “প্রপঞ্চো ন স্বতন্ত্রঃ, অপি তু তস্মিন্নেব ব্রহ্মণি ত্রয়ং প্রতিষ্ঠিতং—ভোক্তা ভোগ্যৎ প্রেরিতারমিতি বক্ষ্যমাণং ভোগ্য ভোক্তৃ-নিয়ন্ত লক্ষণম্। অজা হ্যেকা ভোক্তৃ- ভোগ্যার্থযুক্তেতি—বক্ষ্যমাণং ভোক্তৃভোগ্যার্থরূপং চ, অন্যদ্বেদং শ্রুতিসিদ্ধং বিরাটসূত্রাভ্যাং কৃতনামরূপকৰ্ম্ম-বিশ্বতৈজসপ্রাজ্ঞ-জাগ্রৎ-স্বপ্নসুষুপ্তিরূপস্বরূপং প্রতিষ্ঠিতং রজ্জামিব সর্পঃ। যত এতস্মিন্ সর্ব্বং ভোক্ত্রাদিলক্ষণং প্রপঞ্চরূপং
সুতরাং অর্থ হইতেছে—ব্রহ্ম পরমই সর্ব্বোৎকৃষ্টই; কারণ, তিনি কোনপ্রকার সাংসারিক ধর্ম্মে আক্রান্ত নহে। অভিপ্রায় এই যে, পূর্ব্বোক্ত প্রকারে উদগীত বলিয়াই ব্রহ্ম উৎকৃষ্ট। উৎকৃষ্ট বলিয়াই তাহার উপাসনার ফলও উৎকৃষ্ট— মুক্তি। ২ ভাল, এইরূপ সিদ্ধান্ত হইলে, ব্রহ্ম যখন প্রপঞ্চের সহিত অসংসৃষ্ট-সর্ব্বপ্রকার সম্বন্ধরহিত, তখন প্রপঞ্চও নিশ্চয়ই ব্রহ্মের সহিত সম্বন্ধশূন্য। ফলে সাংখ্যসিদ্ধান্তের ন্যায় প্রপঞ্চকে স্বতঃসিদ্ধ স্বতন্ত্র বলিতে হইবে, তাহা হইলে বাচারম্ভণ শ্রুতি অনুসারে প্রপঞ্চের পরতন্ত্রতা(ঈশ্বরাধীনতা) স্বীকারপূর্ব্বক যে, মিথ্যাত্বোপদেশ, এবং নদনুসারে যে, অদ্বিতীয় ব্রহ্মের জীবাভিন্নত্বের উপদেশ, তাহা উপপন্ন বা সঙ্গত হইতে পারে না। এইরূপ আশঙ্কা করিয়া তাহার সমাধানের জন্য বলিতেছেন-তস্মিন্ ত্রয়মিতি। অভিপ্রায় এই যে, যদিও ব্রহ্ম প্রপঞ্চের সহিত অসংসৃষ্ট এবং স্বতন্ত্র, তথাপি জগৎপ্রপঞ্চ স্বতন্ত্র নহে। পরন্তু, ভোক্তা(জীব), ভোগ্য(প্রপঞ্চ) ও প্রেরিতা(ঈশ্বর), এই বলিয়া পরে যাহাদের নির্দেশ করা হইবে, সেই ভোক্তা, ভোগ্য ও প্রেরিতা তিনই সেই ব্রহ্মেই প্রতিষ্ঠিত(বর্তমান রহিয়াছে),[কাজেই প্রপঞ্চ স্বতন্ত্র নহে]। অথবা, পরবর্তী ‘ভোক্তৃ-ভোগ্যার্থ- যুক্তা’ বাক্যোক্ত ভোক্তা, ভোগ্য ও ভোগ এই তিন, কিংবা শ্রুতি-প্রসিদ্ধ বিরাটপুরুষ ও সূত্রাত্মা(হিরণ্যগর্ভ) যাহা রচনা করিয়াছেন, সেই তিন- নাম, রূপ ও কৰ্ম্ম, অথবা বিশ্ব, তৈজস ও প্রাজ্ঞ, কিংবা জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই তিন[সেই ব্রহ্মে] রজ্জুতে সর্পের ন্যায় প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে(৬)।
(৬) সূক্ষ্ম শরীরের সমষ্টি-উপহিত চৈতন্যের নাম সূত্রাত্মা ও হিরণ্যগর্ভ। স্থূল শরীরের সমষ্টি-উপহিত চৈতন্যের নাম বিরাট্ ও বৈশ্বানর। সূক্ষ্ম শরীরের
প্রতিষ্ঠিতম্, যত এতস্মিন্ সর্ব্বং ভোক্তাদিলক্ষণং প্রপঞ্চরূপৎ প্রতিষ্ঠিতৎ, যত এবাস্য ভোক্তাদিত্রয়াত্মকস্য প্রপঞ্চস্য ব্রহ্ম সুপ্রতিষ্ঠা শোভন- প্রতিষ্ঠা। ব্রহ্মণোহন্যস্য চলনাত্মকত্বাৎ চলপ্রতিষ্ঠাহন্যত্র। ব্রহ্মণোহচলত্বাদত্রাচল- প্রতিষ্ঠা। নম্বেবং তর্হি বিকারভূতপ্রপঞ্চাশ্রয়ত্বেন পরিণামিত্বাৎ দধ্যাদিবদনিত্যং স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—অক্ষরঞ্চেতি। যদ্যপি বিকারঃ প্রপঞ্চাশ্রয়ঃ, তথাপি অক্ষরং— ন ক্ষরতীত্যক্ষরম্। চ শব্দোহবধারণে, অবিনাশ্যের ব্রহ্ম। মায়াত্মকত্বাদ্বিকারস্য, বিকারাশ্রয়ত্বেহপ্যবিনাশ্যেব কূটস্থং ব্রহ্মাবতিষ্ঠত ইত্যভিপ্রায়ঃ। মায়াত্মকত্বঞ্চ প্রপঞ্চস্য পূর্ব্বমেব প্রপঞ্চিতম্। তস্মাৎ সর্ব্বাত্মকত্বেইপি ব্রহ্মণঃ প্রপঞ্চস্য মিথ্যাত্ম- কত্বেন ব্রহ্মণঃ প্রপঞ্চাসংসর্গাৎ পূর্ণানন্দব্রহ্মাত্মানং পশ্যতো মোক্ষাখ্যঃ পরম- পুরুষার্থো ভবতীত্যর্থঃ। ৩
যেহেতু ভোক্তা প্রভৃতি সমস্ত প্রপঞ্চ এই ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত, সেই হেতুই ভোক্তা, ভোগ্য ও প্রেরিতা এই ত্রিতয়সমন্বিত প্রপঞ্চের ব্রহ্মই উত্তম প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়। ব্রহ্ম ভিন্ন আর সমস্তই চলনাত্মক(অ-স্থিরস্বভাব, সুতরাং সে সকলে যে, প্রতিষ্ঠা বা স্থিতি, তাহাও চল অর্থাৎ চিরস্থায়ী নহে। ব্রহ্ম অচল, সুতরাং তাহাতে প্রতিষ্ঠাও অচল। ভাল, এরূপই যদি হয়, তাহা হইলে, ব্রহ্ম যখন বিকারাত্মক প্রপঞ্চের আশ্রয়, তখন ব্রহ্মেরও পরিণাম হওয়া সম্ভব; সুতরাং পরিণামস্বভাব দধি প্রভৃতির ন্যায় ব্রহ্ম ও অনিত্য হইতে পারে, এই আশঙ্কায় বলিতেছেন-“অক্ষরং চ” ইতি। যদিও প্রপঞ্চ বিকারস্বভাব হউক, তথাপি তিনি অক্ষর-যাহা স্বভাবচ্যুত হয় না। মূলের চ-শব্দটী ‘এব’ অর্থে; সুতরাং অর্থ হইতেছে যে, ব্রহ্ম অক্ষরই-নিশ্চয়ই অবিনাশী। কেননা, বিকার জিনিষটা মায়াত্মক; যাহা মায়ার পরিণাম, তাহাই বিকার- সম্পন্ন। ব্রহ্ম সমস্ত বিকার পদার্থের আশ্রয় হইয়াও অবিনাশী-কুটস্বরূপেই (নির্বিকার ভাবেই) অবস্থান করেন। ইহাই ঐ কথার অভিপ্রায়। প্রপঞ্চ যে, মায়াময়, তাহা পূর্ব্বেই প্রতিপাদিত হইয়াছে। অতএব ব্রহ্ম সর্বাত্মক বা সর্ব্বাশ্রয় হইলেও, প্রপঞ্চ মিথ্যা-মায়াময় বলিয়াই তাহার সহিত ব্রহ্মের অ-সংসর্গ বা অসম্বন্ধ সম্ভবপর হয়, এবং তন্নিবন্ধনই এক অদ্বিতীয় পূর্ণ ব্রহ্ম ও আত্মার অভেদদর্শী পুরুষের মোক্ষনামক পরম পুরুষার্থ লাভ সিদ্ধ হয়। ৩
ব্যষ্টি-উপহিত চৈতন্যের নাম তৈজস। স্থূল শরীরের ব্যষ্টি-উপহিত চৈতন্যের নাম- তৈজস। স্থূল শরীরের ব্যষ্টি-উপহিত চৈতন্যের নাম বিশ্ব। অজ্ঞানসমষ্টি উপ- হিত চৈতন্যের নাম—ঈশ্বর(জগৎকারণ) ও অন্তর্যামী। আর অজ্ঞান-ব্যষ্টি- উপহিত চৈতন্যের নাম—প্রাজ্ঞ। জাগ্রৎ স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থাত্রয় লোক- প্রসিদ্ধ।
কথং তহ্যাত্মানং পশ্যতো মোক্ষসিদ্ধিরিত্যত আহ-অত্রাস্মিন্ অন্নময়াদ্যা- নন্দময়ান্তে দেহে বিরাড়াদ্যব্যাকৃতান্তে বা প্রপঞ্চে পূর্ব্বপূর্ব্বোপাধিপ্রবিলয়েনোত্ত- রোত্তরমপি অশনায়াদ্যসংস্পৃষ্টং বাচামগোচরং ব্রহ্মবিদো বিদিত্বা, লীনা ব্রহ্মণি বিশ্বাদ্যপসংহারমুখেন লয়ং গতাঃ - অহং ব্রহ্মাস্মীতি ব্রহ্মরূপেণৈব স্থিতা ইত্যর্থঃ। তৎপরাঃ সমাধিপরাঃ, কিং কুর্ব্বন্তি? যোনিমুক্তা ভবন্তি-গর্ভজন্মজরামরণ- সংসারভয়ান্মুক্তা ভবন্তীত্যর্থঃ। তথা চ যোগিযাজ্ঞবল্ক্যো ব্রহ্মাত্মনৈবাবস্থিতৎ সমাধিং দর্শয়তি “যদর্থমিদমদ্বৈতমরূপং সর্ব্বকারণম্। আনন্দমমৃতং নিত্যং সর্ব্বভূতেষবস্থিতম্ ॥ তদেবানন্যধীঃ প্রাপ্য পরমাত্মানমাত্মনা। তস্মিন্ প্রলীয়তে ত্বাত্মা সমাধিঃ স উদাহৃতঃ ॥ ইন্দ্রিয়াণি বশীকৃত্য যমাদিগুণসংযুতঃ। আত্মমধ্যে মনঃ কুৰ্য্যাদাত্মানং পরমাত্মনি ॥
সেই আত্মদর্শীর মোক্ষসিদ্ধি কিরূপে হয়, তাহা বলিতেছেন-অন্নময় কোষ যাহার আদি, আর আনন্দময় কোষ যাহার অন্ত,(৭) সেই পঞ্চকোষাত্মক এই দেহে-অথবা বিরাট্(স্থূল সৃষ্টি) হইতে আরম্ভ করিয়া অব্যাকৃত(অনভি- ব্যক্ত প্রকৃতি) পর্যন্ত স্থূল-সূক্ষ্মাত্মক প্রপঞ্চে পূর্ব্ব পূর্ব্ব উপাধিসকল পর পর কারণে বিলীন করিয়া অশনায়াদি দ্বারা(ক্ষুধা পিপাসা প্রভৃতি আন্তর ধৰ্ম্ম দ্বারা) অসংসৃষ্ট, বাক্যের অগোচর ব্রহ্মকে বিদিত হইয়া ব্রহ্মবিদ্ পুরুষগণ ব্রহ্মে লীন- বিশ্বতৈজসাদি বিভাগ সংকোচপূর্ব্বক লয়প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ আমি ব্রহ্ম-এইভাবে ব্রহ্মরূপে অবস্থিত হইয়া তৎপর হন। ব্রহ্মাত্মবিষয়ে সমাধিসম্পন্ন হইয়া কি করেন? না, যোনিমুক্ত হন, অর্থাৎ গর্ভবাস, জন্ম, জরা, মরণ ও সংসার ভয় হইতে বিমুক্ত হন। যোগী যাজ্ঞবল্ক্যও সেইরূপে ব্রহ্মাত্মভাবে অবস্থিতিরূপ সমাধি প্রদর্শন করিতেছেন “জ্যোতির্ময় সর্ব্বকারণ নিত্যানন্দ অমৃতরূপ এই অদ্বৈত যাহার জন্য সর্ব্বভূতে বিদ্যমান রহিয়াছেন, অনন্যচিত্ত ব্যক্তি সেই সমাধি দ্বারা পরমাত্মাকে আত্মস্বরূপে প্রাপ্ত হইয়া নিজেও সেই পরমাত্মাতে বিলীন হয়, সেই লয়ই সমাধি নামে উক্ত। যমনিয়মাদি যোগাদিসম্পন্ন পুরুষ ইন্দ্রিয় সমূহকে বশীভূত করিয়া মনকে আত্মাতে স্থাপন করিবে, সেই জীবাত্মাকে আবার পরমাত্মাতে স্থাপন করিবে। তখন নিজেই
(৭) পঞ্চকোষ এইরূপ—স্থূলদেহ অন্নময় কোষ, কর্ম্মেন্দ্রিয় সহকৃত পঞ্চপ্রাণ প্রাণময় কোষ, কর্ম্মেন্দ্রিয় সহকৃত মনঃ মনোময় কোষ, জ্ঞানেন্দ্রিয় সহকৃত বুদ্ধি বিজ্ঞানময় কোষ, আর কারণশরীরে(অজ্ঞানে) প্রিয় মোদ প্রমোদ বৃত্তিযুক্ত সত্ত্বগুণ আনন্দময় কোষ।
সংযুক্তমেতৎ ক্ষরমক্ষরঞ্চ ব্যক্তাব্যক্তং ভরতে বিশ্বমীশঃ। অনীশশ্চাত্মা বধ্যতে ভোক্তৃভাবাৎ জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্ব্বপাশৈঃ ॥১॥৮৷৷
সরলার্থঃ। -[অথেদানীং জীবেশ্বরয়োরৌপাধিকং বিভাগং দর্শয়িত্বা পরমাত্মবিজ্ঞানাৎ মোক্ষং দর্শয়তি-সংযুক্তমিতি।] সংযুক্তং(পরস্পরং সম্বদ্ধং) ক্ষরং(বিনাশি), অক্ষরং(অবিনাশি) চ ব্যক্তাব্যক্তং(বিকারজাতং), [ব্যক্তং ক্ষরং, অব্যক্তং অক্ষরমিতি সম্বন্ধঃ]। এতৎ(ব্যক্তাব্যক্তাত্মকং) বিশ্বং (জগৎ) ঈশঃ(পরমেশ্বরঃ) ভরতে(বিভর্তি ধারয়তীত্যর্থঃ)। অনীশঃ (অবিদ্যাপরবশঃ) আত্মা(জীবঃ) ভোক্তৃভাবাৎ(ভোক্তৃত্বাভিমানাৎ) বধ্যতে(সংসারবন্ধনং প্রাপ্নোতি)। দেবং(স্বপ্রকাশং নিরুপাধিকং) ব্রহ্ম অতিন্নতয়া) জ্ঞাত্বা(সাক্ষাৎকৃত্য) সর্ব্বপাশৈঃ(সদৈঃ অবিদ্যাকামকৰ্ম্মাদিভিঃ পাশৈঃ বন্ধনহেতুভিঃ) মুচ্যতে(বন্ধনমুক্তো ভবতীতি ভাবঃ) ॥১৮॥
মূলানুবাদ।—পরস্পর সম্বন্ধভাবে বর্তমান ক্ষর ও অক্ষর(বিনাশী ও চিরস্থায়ী) ব্যক্তাব্যক্তময় অর্থাৎ কার্য্য-কারণাত্মক এই বিশ্বকে পরমেশ্বর পোষণ বা ধারণ করিয়া থাকেন। মায়ার অধীন জীবাত্মা ভোক্তৃভাব(ভোগকর্তৃত্ব) আরোপ করিয়া আবদ্ধ হয়, এবং স্বপ্রকাশ(নিরুপাধিক) ব্রহ্মকে জানিয়া কাম কর্ম্মাদি সমস্ত বন্ধনপাশ হইতে বিমুক্ত হয় ॥ ১॥৮ ॥
পরমাত্মা স্বয়ং ভূত্বা ন কিঞ্চিচ্চিন্তয়েত্ততঃ। তদা তু লীয়তে তস্মিন্ প্রত্যগাত্মন্যখণ্ডিতে। প্রত্যগাত্মা স এব স্যাদিত্যুক্তং ব্রহ্মবাদিভিঃ ॥” ইতি ॥ ১॥৭ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—নম্বদ্বিতীয়ে পরমাত্মন্যভ্যুপগম্যমানে জীবেশ্বরয়োরপি বিভাগাভাবাৎ লীনা ব্রহ্মণি ইতি জীবানাং ব্রহ্মৈকত্বপরা লয়শ্রুতিরনুপপন্নৈবেত্যা-
পরমাত্মভাব লাভ করিয়া তাহার পর আর কিছু চিন্তা করিবে না। তখন আত্মা (জীবাত্মা) অখণ্ড(নিরবয়ব) প্রত্যক্ আত্মাতে(পরমাত্মাতে) লীন হয়, এবং সে নিজেই প্রত্যক্ আত্মা হইয়া যায়, একথা ব্রহ্মবাদী ঋষিগণ বলিয়াছেন।” ইতি ॥ ১॥৭ ॥ ভাষ্যানুবাদ। এখন আপত্তি এই যে, পরমাত্মাকে অদ্বিতীয় বলিয়া স্বীকার করিলে, জীবেশ্বর-বিভাগইত থাকে না, জীবেশ্বর বিভাগ না থাকিলে জীবগণের ব্রহ্মৈকত্ববোধক ‘লীনা ব্রহ্মণি’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য নিশ্চয়ই অনুপপন্ন
শঙ্ক্য ব্যবহারাবস্থায়াৎ জীবেশ্বরয়োরুপাধিতো বিভাগং দর্শয়িত্বা তদ্বিজ্ঞানাদমৃতত্বং দর্শয়তি—সংযুক্তমেতদিতি। ব্যক্তং বিকারজাতং, অব্যক্তং কারণং, তদুভয়ং ক্ষরমক্ষরঞ্চ। ব্যক্তং ক্ষরং বিনাশি, অব্যক্তমক্ষরমবিনাশি, তদুভয়ং পরস্পরসংযুক্তং কার্য্যকারণাত্মকং বিশ্বং ভরতে বিভর্তি ঈশঃ ঈশ্বরঃ। তথাচাহ ভগবান্—
“ক্ষরঃ সর্ব্বাণি ভূতানি কূটস্থোহক্ষর উচ্যতে। উত্তমঃ পুরুষত্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃতঃ। যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ ॥” ইতি।
ন কেবলমীশ্বরো ব্যক্তাব্যক্তং ভরতে, অনীশশ, অনীশ্বরশ্চ স আত্মা অবিদ্যা- তৎকার্য্যভূত-দেহন্দ্রিয়াদিভির্ব্বধ্যতে ভোক্তৃভাবাৎ। এতদুক্তং ভবতি—পরস্পর- সংযুক্তব্যষ্টিসমষ্টিরূপ ঈশ্বরঃ। তদ্ব্যষ্টিভূতদেহেন্দ্রিয়াত্মকোহনীশো জীবঃ। এবং সমষ্টিব্যষ্ট্যাত্মকত্বেন জীবপরয়োরৌপাধিকস্য ভেদস্য বিদ্যমানত্বাৎ, তদুপাধ্যুপাসন- দ্বারেণ নিরুপাধিকমীশ্বরং জ্ঞাত্বা মুচ্যুত ইতি ভোক্ত্রাত্মৈক্যবাদে নানুপপন্নৎ কিঞ্চিদ্বিদ্যত ইতি। তথাচৌপাধিকমেব ভেদৎ দর্শয়তি ভগবান্ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—
বা অনর্থক হইয়া পরে। এই প্রকার আশঙ্কা করিয়া[তৎপরিহারার্থ] জীবেশ্বর- বিভাগের ঔপাধিকত্ব কথনপূর্ব্বক পরমাত্মবিজ্ঞানে অমৃতত্বলাভ প্রদর্শন করিতেছেন—“সংযুক্তমেতৎ” ইতি।
ব্যক্ত অর্থ প্রকৃতির বিকার বা কার্য্যবর্গ, অব্যক্ত অর্থ—কারণ(বিকারের উপাদান), এতদুভয় ক্ষর ও অক্ষর, তন্মধ্যে ব্যক্ত হইতেছে ক্ষর—বিনাশী, আর অব্যক্ত হইতেছে অক্ষর—অবিনাশী। এই উভয়ই পরস্পর সংযুক্ত,(কার্য্য- কারণভাবশূন্য হইয়া উহারা থাকে না।] ঈশ্বর(পরমেশ্বর) কার্য্যকারণভাবাপন্ন এই বিশ্বকে(জগৎ) ভরণ করেন। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণও সেইরূপ বলিয়াছেন—
‘সমস্ত ভূতকে বলে ক্ষর, আর কূটস্থ ব্রহ্মকে বলে অক্ষর। এতদতিরিক্ত হইতেছেন উত্তম পুরুষ(পুরুষোত্তম), যিনি ঈশ্বররূপে ত্রিলোকের অন্তরে থাকিয়া তাহা ধারণ ও পোষণ করিতেছেন।’ তিনি যে, ঈশ্বররূপে কেবল ভরণই করেন, তাহা নহে, পরন্তু তিনি অনীশ-অনীশ্বরভাবাপন্ন জীবাত্মারূপে অবিদ্যা ও অবিদ্যাজনিত দেহেন্দ্রিয়াদি দ্বারা ভোক্তৃভাব অবলম্বন করিয়া সংসারে বদ্ধও হন। এই কথা বলা হইতেছে যে, পরস্পরসংযুক্ত ব্যষ্টি সমষ্টি যাহার উপাধি, তিনি ঈশ্বর, আর কেবল ব্যষ্টি যাহার উপাধি, তিনি অনীশ্বর জীব। এইরূপে দেখা যায়, জীব ও পরমেশ্বরের ভেদ কেবল সমষ্টি ও ব্যষ্টিরূপ উপাধিকৃত। এই প্রকার ঔপাধিক ভেদ বিদ্যমান থাকায়, প্রথমে ঐ উপাধিযোগে উপাসনা করিতে হয়, এইরূপ সোপাধিক উপাসনা দ্বারা যোগ্যতা লাভের পর নিরুপাধিক পরমেশ্বর বিষয়ে জ্ঞান হয়, সেই জ্ঞানলাভের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি হয়; সুতরাং জীবও পরমাত্মার একত্ব সিদ্ধান্ত পক্ষে কিছুই অনুপপন্ন বা অসঙ্গত হইতেছে না। ভগবান্ যাজ্ঞবল্ক্য এইরূপ ঔপাধিক ভেদই প্রদর্শন করিতেছেন-
৭২
“আকাশমেকং হি যথা ঘটাদিষু পৃথগ্ ভবেৎ। তথাত্মৈকো হ্যনেকশ্চ জলাধারেঘিবাংশুমান্ ॥” তথা চ শ্রীবিষ্ণুধর্ম্মে—“পরাত্মনো মনুষ্যেন্দ্র বিভাগো হজ্ঞানকল্পিতঃ। ক্ষয়ে তস্যাত্মপরয়োর্বিভাগাভাব এব হি ॥ আত্মা ক্ষেত্রজ্ঞসংজ্ঞোহয়ং সংযুক্তঃ প্রাকৃতৈগু ণৈঃ। তৈরেব বিগতঃ শুদ্ধঃ পরমাত্মা নিগদ্যতে ॥ অনাদিসম্বন্ধবত্যা ক্ষেত্রজ্ঞোহয়মবিদ্যয়া। যুক্তঃ পশ্যতি ভেদেন ব্রহ্ম ত্বাত্মনি সংস্থিতম্ ॥”
তথা চ শ্রীবিষ্ণুপুরাণে—“বিভেদজনকে হজ্ঞানে নাশমাত্যন্তিকং গতে। আত্মনো ব্রহ্মণো ভেদমসন্তং কঃ করিষ্যতি ॥”
তথা চ বাশিষ্ঠে যোগশাস্ত্রে প্রশ্নপূর্ব্বকং দর্শিতম্— “যদ্যাত্মা নির্গুণঃ শুদ্ধঃ সদানন্দোহজরোহমরঃ। সংসৃতিঃ কস্য তাত স্যান্মোক্ষো বাহবিদ্যয়া বিভো ॥ ক্ষেত্রনাশঃ কথং তস্য জ্ঞায়তে ভগবন্, যতঃ। যথাবৎ সর্ব্বমেতন্মে বক্তুমর্হসি সাম্প্রতম্ ॥”
‘একই আকাশ যেমন ঘটাদি উপাধিতে পৃথক্ পৃথক্ হইয়া থাকে, এবং বিভিন্ন জলাধারে একই সূর্য্য যেরূপ[বিভিন্নাকারে প্রকাশ পায়,] সেইরূপ একই আত্মা[উপাধিভেদে] অনেক হয়।’ বিষ্ণুধর্ম্মেও সেইরূপ আছে—‘হে মানবেন্দ্র, পরমাত্মা ও জীবাত্মার বিভাগ কেবল অজ্ঞানকল্পিত, সেই অজ্ঞানের ক্ষয় হইলে পর জীব ও পরমাত্মার বিভাগও বিলুপ্ত হয়। আত্মা প্রকৃতিজাত গুণের(ধর্মাধর্ম প্রভৃতির) সহিত সংযুক্ত হইয়া এই ক্ষেত্রজ্ঞ সংজ্ঞা প্রাপ্ত হয়। পুনরায় সেই সকল গুণের সহিত বিমুক্ত হইলে শুদ্ধ নির্গুণ পরমাত্মা নামে কথিত হয়। এই ক্ষেত্রজ্ঞ(জীব) অনাদিকাল হইতে সম্বন্ধবতী অবিদ্যার সহিত সংযুক্ত হইয়া আত্মস্থ ব্রহ্মকেও ভিন্ন(জীব হইতে পৃথক্) দর্শন করে।’ বিষ্ণুপুরাণেও সেইরূপ আছে—জীবাত্মা ও পরমাত্মার’ ভেদজনক অজ্ঞান আত্যন্তিক বিনাশ প্রাপ্ত হইলে, আত্মা ও ব্রহ্মের মধ্যে যে, অসত্য ভেদ দৃষ্ট হয়, তাহা আর কে জন্মাইবে? কেহই নহে।’ যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণেও সেইরূপ প্রদর্শিত হইয়াছে।[রামচন্দ্র বশিষ্ঠদেবের নিকট প্রশ্ন করিতেছেন—] হে বিভো, আত্মা যদি নির্গুণ ও জরামরণবর্জিত শুদ্ধ সদানন্দস্বরূপ হয়, তাহা হইলে সংসার(জন্মমরণাদিভোগ) হয় কাহার? বিদ্যা দ্বারা মোক্ষই বা হয় কাহার? হে ভগবন্, প্রয়াণোন্মুখ জ্ঞানীর আত্যন্তিক দেহ নাশই বা কি প্রকারে জানা যায়? আপনি আমাকে ইহা যথাযথভাবে বলিতে সমর্থ, অর্থাৎ বলুন।’
| ধ্যায়ঃ | শ্বেতাশ্বতরোপানষৎ। |
|---|---|
| বংশিষ্ঠঃ— | “তস্যৈব নিত্যশুদ্ধস্য সদানন্দময়াত্মনঃ। অবচ্ছিন্নস্য জীবস্য সংস্কৃতিঃ কীর্ত্যতে বুধৈঃ ॥ এক এব হি ভূতাত্মা ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ। একধা বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবৎ ॥ ভ্রান্ত্যারূঢ়ঃ স এবাত্মা জীবসংজ্ঞঃ সদা ভবেৎ ॥” |
| তথা চ ব্রাহ্মে পুরাণে পরস্যৈবৌপাধিকং জীবাদিভেদং দর্শয়তি—কথং , তহৌপাধিকভেদেন বন্ধমক্ত্যাদিব্যবস্থেত্যাশঙ্ক্য দৃষ্টান্তপূর্ব্বকং ব্যবস্থাং দর্শয়তি— “একস্তু সূর্য্যো বহুধা জলাধারেষু দৃশ্যতে। আভাতি পরমাত্মা চ সর্ব্বোপাধিবু সংস্থিতঃ ॥ ব্রহ্ম সর্ব্বশরীরেষু বাহ্যে চাভ্যন্তরে স্থিতম্। আকাশমিব ভূতেষু বুদ্ধাবাত্মা ন চান্যথা ॥ এবং সতি যয়া বুদ্ধ্যা দেহোহহমিতি মন্যতে। অনাত্মন্যাত্মতা ভ্রান্ত্যা সা স্যাৎ সংসারবন্ধিনী ॥ সর্ব্বৈর্বিকল্পৈহীনস্তু শুদ্ধো বুদ্ধোহজরোহমরঃ। প্রশান্তো ব্যোমবদ্ব্যাপী চৈতন্যাত্মা সকৃৎপ্রভঃ ॥ |
তদুত্তরে বশিষ্ঠ বলিতেছেন-“সেই নিত্যশুদ্ধ(সর্ব্বদা নির্দোষ) সদানন্দ- ময় আত্মাই যখন অবিদ্যা দ্বারা অবছিন্ন(আবৃত) হইয়া জীবসংজ্ঞা প্রাপ্ত হয়, তখন তাহারই সংসার হয়, এ কথা বুধগণ বলিয়া থাকেন। একই ভূতাত্মা(সত্য আত্মা-ব্রহ্ম) প্রত্যেক ভূতে অবস্থান করায় জলপ্রতিবিম্বিত চন্দ্রের ন্যায় একরূপে ও বহুরূপে দৃষ্ট হয়। সেই পরমাত্মাই ভ্রান্তিযুক্ত হইয়া জীবসংজ্ঞা প্রাপ্ত হয়।’ ব্রহ্মপুরাণেও পরব্রহ্মেরই উপাধিকল্পিত জীবাদি বিভাগ প্রদর্শন করিতেছেন-তাহা হইলে, ঔপাধিক ভেদানুসারেই বা বন্ধ- মোক্ষের ব্যবস্থা(বিভাগনিয়ম) হয় কিরূপে? এইরূপ আশঙ্কা করিয়া দৃষ্টান্ত প্রদর্শনপূর্ব্বক বলিতেছেন-‘একই সূর্য্য যেমন বিভিন্ন জলাধারে বহু- প্রকার দৃষ্ট হয়, পরমাত্মাও তেমন সমস্ত উপাধিতে অবস্থান করত[বিভিন্না- কারে] প্রকাশ পাইয়া থাকেন। ব্রহ্মই সর্ব্ব শরীরে ভিতরে বাহিরে বিদ্যমান রহিয়াছেন। আকাশ যেরূপ পঞ্চ ভূতের মধ্যে অবস্থান করে, আত্মাও তেমন বুদ্ধিতে অবস্থিত হয়, অন্যথা নহে। বুদ্ধিতে আত্ম-বিকাশই যখন সত্যসিদ্ধান্ত, তখন অনাত্মাতে আত্মভ্রান্তিরূপ যে বুদ্ধি দ্বারা দেহকে ‘অহং’(আমি) মনে করে, সেই বুদ্ধিই সংসার-বন্ধের কারণ। সর্ব্বপ্রকার বিকল্পরহিত আত্মা কিন্তু শুদ্ধ, বুদ্ধ, অজর, অমর, প্রশান্ত, আকাশের ন্যায় ব্যাপক, নিত্য প্রকাশমান্ চৈতন্য-
১.
ধূমাভ্রধূলিভির্ব্যোম যথা ন মলিনীয়তে। প্রাকৃতৈরপরামৃষ্টো বিকারৈঃ পুরুষস্তথা ॥ • যথৈকস্মিন ঘটাকাশে জলৈধূমাদিভিযুতে। নান্যে মলিনতাং যান্তি দূরস্থাঃ কুত্রচিৎ ক্বচিৎ ॥ তথা দ্বন্দৈরনেকৈস্তু জীবে চ মলিনীকৃতে। একস্মিন্নাপরে জীবা মলিনাঃ সন্তি কুত্রচিৎ ॥”
তথা চ শুকশিষ্যো গৌড়পাদাচার্য্যঃ— কশিষ্যো গৌড়পাদাচার্য্যঃ— “যথৈকস্মিন্ ঘটাকাশে রজোধূমাদিভির্যুতে। ন সর্ব্বে সম্প্রযুজ্যন্তে তদ্বজ্জীবাঃ সুখাদিভিঃ ॥” ইতি।
তস্মাদদ্বিতীয়ে পরমাত্মন্যুপাধিতো জীবেশ্বরয়োজীবানাঞ্চ ভেদব্যবস্থায়াঃ সিদ্ধত্বান্ন বিশুদ্ধসত্ত্বোপাধেরীশ্বরস্যাবিশুদ্ধোপাধি-জীবগতা সুখদুঃখমোহাজ্ঞানাদয়ঃ।
তথা চ ভগবান্ পরাশরঃ—
“জ্ঞানাত্মকস্যাহমলসত্ত্বরাশেরপেতদোষস্য সদা স্ফুটস্য।
কিং বা জগত্যন্তি সমস্তপুংসামজ্ঞাতমস্যাস্তি হৃদি স্থিতস্য” ॥ ইতি। নাপি জীবান্তরগতসুখদুঃখমোহাদিনা জীবান্তরস্য বদ্ধস্য মুক্তস্য বা সম্বন্ধঃ।
স্বরূপ। আকাশ যেরূপ ধূম, মেঘ ও ধূলিরাশি দ্বারা মলিনীকৃত হয় না, সেইরূপ পুরুষও(আত্মাও) প্রাকৃত বিকারে সংস্পৃষ্ট হয় না। একটা ঘটাকাশ জল ও ধূমাদি দ্বারা আবৃত হইলেও দূরবর্তী অপর ঘটাকাশ সকল যেমন কোথাও কখনও মলিনতা প্রাপ্ত হয় না, তেমনি এক জীব সুখদুঃখাদি বহু দ্বন্দ্বভাব দ্বারা মলিনীকৃত হইলেও অপর জীবগণ কখনও মলিন হয় না।’ শুকদেবের শিষ্য গৌড়পাদ আচার্য্যও সেইরূপই বলিয়াছেন- “একটা ঘটাকাশ যেমন ধূলি ও ধূমরাশিদ্বারা সংস্পৃষ্ট হইলে, অপর ঘটাকাশ সকল তদ্দ্বারা লিপ্ত হয় না, ঠিক সেইরূপ সকল জীবও সুখাদি দ্বারা স্পৃষ্ট হয় না।’ অতএব অদ্বিতীয় পরমাত্মাতে উপাধিদ্বারা জীবেশ্বর-বিভাগ এবং জীবসমূহের ভেদব্যবহার সিদ্ধ হইতেছে। এইরূপ ঔপাধিক ভেদব্যবহার থাকাতেই অশুদ্ধ অর্থাৎ অবিদ্যো- পাধিক জীবগত সুখ দুঃখ মোহ ও অজ্ঞান প্রভৃতি দোষনিচয় বিশুদ্ধ সত্ত্বো- পাধিসম্পন্ন পরমেশ্বরে সংক্রামিত হয় না। ভগবান্ পরাশরও সেইরূপ বলিয়াছেন-‘নির্ম্মল সত্ত্বগুণের আকর, নিত্য নির্দোষ, সদা প্রকাশ স্বভাব এবং সমস্ত পুরুষের হৃদয়ে অবস্থিত জ্ঞানস্বরূপ এই পরমাত্মার জগতে অবিজ্ঞাত কি আছে?’[যেমন জীবগত সুখদুঃখাদির সহিত ঈশ্বরের সম্বন্ধ হয় না, তেমনি] এক জীবের সুখদুঃখাদির সহিত বদ্ধ বা মুক্ত অপর কোন জীবের সম্বন্ধ হয় না, অর্থাৎ এক জীবের সুখদুঃখে অপর কোন জীবই সুখী বা দুঃখী হয়
জ্ঞাজ্ঞৌ দ্বাবজাবীশনীশা- বজা হোকা ভোক্তৃভোগ্যার্থযুক্তা। অনন্তশ্চাত্মা বিশ্বরূপো হ্যকর্ত্তা ত্রয়ং যদা বিন্দতে ব্রহ্মমেতৎ ॥১॥৯৷৷
সরলার্থঃ।—[ইদানীং জীবেশ্বরয়োঃ সারূপ্য-বৈরূপ্যে ভাবদাহ—জ্ঞাজ্ঞৌ ইতি।] দ্বৌ(জীবেশ্বরৌ) জ্ঞাজ্ঞৌ(ঈশ্বরঃ জ্ঞঃ সর্ব্বজ্ঞঃ, জীবঃ অজ্ঞঃ অল্পজ্ঞঃ ইত্যাশয়ঃ), অজে।(জন্মরহিতৌ), ঈশনীশৌ(ঈশঃ—প্রভুঃ ঈশ্বরঃ, অনীশঃ জীবঃ)। একা(অন্যা মায়া) ভোক্তভোগ্যার্থযুক্তা(ভোক্তুঃ জীবস্য ভোগ্যসম্পাদনে নিযুক্তা)। আত্মা(জীবঃ স্বরূপতঃ) অনন্তঃ(দেশ- কালাদিপরিচ্ছেদশূন্যঃ) বিশ্বরূপঃ(বিশ্বং রূপং যস্য, সঃ) অকর্ত্তা হি(ভোগাদি- কর্তৃত্বরহিত এব)। যদা ত্রয়ং(জীবেশ্বরপ্রকতিতত্ত্বং) ব্রহ্মং(ব্রহ্ম) ইতি বিন্দতে(লভতে বিজানাতি),[তদা বীতশোকঃ ভবতীতি শেষঃ।] ॥ ১‘৯ ॥
মূলানুবাদ।[এখন জীব ও ঈশ্বরে প্রভেদ ও সাম্য প্রদর্শন করিতেছেন।] ঈশ্বর ও জীব, ইহারা উভয়ে জ্ঞ ও অজ্ঞ অর্থাৎ ঈশ্বর সর্ব্বজ্ঞ, আর জীব অল্পজ্ঞ, উভয়েই অজ জন্মরহিত, ঈশ্বর ঈশ—সকলের প্রভু, আর জীব অনীশ অর্থাৎ নিজের উপরেও প্রভুত্বহীন। একমাত্র অজা প্রকৃতি বা মায়া ভোক্তার ভোগ্যসম্পাদনে নিযুক্তা, অর্থাৎ একমাত্র প্রকৃতিই জীবের ভোগসম্পা- দনের জন্য ভোগ্য বস্তু সৃষ্টি করিয়া থাকে। নানাদেহে নানাপ্রকার নামে পরিচিত(বিশ্বরূপ) আত্ম’ স্বরূপতঃ অনন্ত ও অকর্ত্তাই, যখন সে ভোক্তা ভোগ্য ও ভোগ এই তিনকে, অথবা জীব ঈশ্বর ও প্রকৃতিকে ব্রহ্মভাবে দর্শন করে, [তখন সর্ব্ব পাশ হইতে বিমুক্ত হয়।] ॥ ১॥৯ ॥
উপাধিতো ব্যবস্থায়াঃ সম্ভবাৎ। অত একমুক্তৌ সর্ব্বমুক্তিরিতি ভবদুক্তস্য চোদ্যস্যানবকাশঃ ॥ ১।৮ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—কিঞ্চেদমপরং বৈলক্ষণ্যমিত্যাহ—জ্ঞাজ্ঞৌ দ্বাবিতি। ন কেবলং ব্যক্তাব্যক্তং ভরতে ঈশঃ, নাপ্যনীশঃ সন্ বধ্যতে জীবঃ, অপি তু জ্ঞাজ্ঞৌ—
না। কেন না, উপাধি দ্বারাই এইরূপ ব্যবস্থা সম্ভবপর হয়। এই কারণেই তুমি যে, আপত্তি করিয়াছিলে, একের মুক্তিতেই সকলের মুক্তি হয় না কেন? সে আপত্তিরও অবকাশ হয় না ॥ ১॥৮ ॥
ভাষ্যানুবাদ। জীবে ও ঈশ্বরে আরও যে, বৈলক্ষণ্য আছে, তাহা প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন—“জ্ঞাজ্ঞৌ দ্বৌ” ইতি। ঈশ্বর যে, কেবল ব্যক্ত ও অব্যক্ত জগতের পোষণ করেন, আর জীব যে, অনীশ অর্থাৎ মায়ার অধীন হইয়া কেবলই
জ্ঞ ঈশ্বরঃ, অজ্ঞা জীবঃ, তৌ অজৌ জন্মাদিরহিতৌ, ব্রহ্মণ এবাবিকৃতস্য জীবেশ্বরাত্মনাবস্থানাৎ।
তথা চ শ্রুতিঃ।—“পুরশ্চক্রে দ্বিপদঃ পুনশ্চক্রে চতুষ্পদঃ।
পুরঃ স পক্ষী ভূত্বা পুরঃ পুরুষ আবিশৎ ॥” ইতি।
“একস্তথা সর্ব্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং প্রতিরূপো বহ্নিশ্চ ॥” ইতি চ,
ঈশনীশৌ ছান্দসং হ্রস্বত্বম্। ১
নম্বদ্বৈতবাদিনো যদি ভোক্তৃভোগ্যলক্ষণপ্রপুঞ্চসিদ্ধিঃ স্যাৎ, তদা সর্ব্বেশঃ পরমেশ্বরঃ। অনীশো জীবঃ। সর্বজ্ঞঃ পরমেশ্বরঃ। অসর্ব্বজ্ঞো জীবঃ। সর্ব্বকৃৎ’ পরমেশ্বরঃ। অসর্ব্বকৃৎ জীবঃ। সর্ব্বভূৎ পরমেশ্বরঃ। দেহাদিভৃজ্জীবঃ। সর্বাত্মা পরমেশ্বরঃ। অসর্ব্বাত্মা জীবঃ। বিশ্বৈশ্বর্য্য আপ্তকামঃ পরমেশ্বরঃ। অল্পৈ- শ্বর্য্যোহনাপ্তকামো জীবঃ। সর্ব্বতঃ পাণিঃ সহস্রশীর্ষা, নিত্যোহনিত্যানাম্ ইত্যাদিনা জীবেশ্বরয়োর্বিলক্ষণব্যবহারসিদ্ধিঃ স্যাৎ। ন তু ভোক্তাদিপ্রপঞ্চ- সিদ্ধিরস্তি, স্বতঃ কূটস্থাপরিণাম্যদ্বিতীয়স্য বস্তুনো ভোক্তাদিরূপত্বাভাবাৎ। নাপি পরতঃ, ব্রহ্মব্যতিরিক্তস্য ভোক্তাদিপ্রপঞ্চহেতুভূতস্য বস্তুন্তরসদ্ভাবে
সংসারে আবদ্ধ থাকে, তাহা নহে, পরন্তু উহারা উভয়ে যথাক্রমে জ্ঞ ও অজ্ঞ— ঈশ্বর জ্ঞ(সর্ব্বজ্ঞ), আর জীব অজ্ঞ(অল্পজ্ঞ), তাহারা উভয়েই অজ জন্মাদিরহিত। কেন না, অবিকৃত ব্রহ্মই জীবরূপে ও ঈশ্বররূপে অবস্থান করেন। সেইরূপ শ্রুতি এই—‘প্রথমে তিনি দ্বিপদ ও চতুষ্পদ পুর(বাস গৃহ) নির্মাণ করিলেন। তিনিই পক্ষী হইয়া অর্থাৎ পক্ষী যেমন কুলায়ে প্রবেশ করে, ঠিক তেমনই, তিনি পুরুষরূপে দেহ-গৃহে প্রবেশ করিলেন।’ ‘সেইরূপ সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা এক পরমেশ্বরও প্রত্যেক রূপানুসারে বিভিন্ন রূপ (আকার বা ভাব) প্রাপ্ত হন।’ বৈদিক নিয়মানুসারে ‘ঈশানীশৌ’ পদের আকার হ্রস্ব হইয়া ‘ঈশনীশৌ’ হইয়াছে। ১
এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, অদ্বৈতবাদীর মতে যদি ভোক্ত-ভোগ্যাত্মক প্রপঞ্চের অস্তিত্বসিদ্ধ হয়, তাহা হইলেই—পরমেশ্বর সর্ব্বেশ্বর, আর জীব অনীশ(অপ্রভু), পরমেশ্বর সর্ব্বজ্ঞ, আর জীব অসর্ব্বজ্ঞ, পরমেশ্বর সর্ব্বকর্তা, আর জীব তদ্বিপরীত, পরমেশ্বর সকলের ভরণকারী, জীব কেবল দেহপোষক, পরমেশ্বর সর্বাত্মা, জীব তদ্বিপরীত, পরমেশ্বর সর্ব্বৈশ্বর্য্যসম্পন্নও আপ্তকাম, আর জীব অল্প ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন ও অনাপ্তকাম, এবং “সর্ব্বতঃ পাণিঃ” “সহস্রশীর্ষাঃ” “নিত্যো নিত্যানাং” ইত্যাদি বাক্য দ্বারা জীব ও ঈশ্বরের ভেদব্যবহার সিদ্ধ হইতে পারে সত্য, কিন্তু ভোক্তভোগ্যাদিরূপ প্রপঞ্চের অস্তিত্বই ত অসিদ্ধ; কারণ, স্বভাবতই যাহা কূটস্থ অপরিণামী(নির্বিকার) অদ্বিতীয় বস্তু(ব্রহ্ম), তাহার ত ভোক্তভাব প্রভৃতি ধর্ম স্বাভাবিক নহে। অপর বস্তুর সহযোগেও যে, ব্রহ্মের ভোক্ত ত্বাদি
দ্বৈতহানিরিত্যাশঙ্ক্যাহ—অজা হ্যেকা ভোক্তৃভোগ্যার্থযুক্তেতি। ভবেদয়মীশ্ব- রাজ্যবিভাগঃ, যদি প্রপঞ্চাসিদ্ধিরেব স্যাৎ, সিধ্যত্যেব প্রপঞ্চঃ। হি যম্মাদর্থে। যস্মাদজা প্রকৃতির্ন, জায়তে ইত্যজা সিদ্ধা প্রসবধৰ্ম্মিণী। “অজামেকাম্” “মায়ান্ত প্রকৃতিং বিদ্যাৎ।” “ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে।” “মায়া পরা প্রকৃতিঃ।” “সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।” ইত্যাদিশ্রুতিস্মৃতিসিদ্ধা বিশ্বজননী দেবাত্মশক্তিরূপৈকা স্ববিকারভূত-ভোক্তৃভোগভোগ্যার্থপ্রযুক্তা ঈশ্বরনিকট- বর্ত্তিনী কিংকুর্ব্বাণাহবতিষ্ঠতে। তস্মাৎ সোহপি মায়ী পরমেশ্বরো মায়োপাধি- সন্নিধেস্তদ্বানিব কার্য্যভূতৈদ্দেহাদিভিস্তদ্বদেব, বিভক্তৈর্ব্বা বিভক্ত ঈশ্বরাদিরূপেণাব- তিষ্ঠতে। তস্মাদেকস্মিন্নেকরসে পরমেহভ্যুপগম্যমানেহপি জীবেশ্বরাদিসব্ব- লৌকিক-বৈদিকসর্ব্বভেদব্যবহারসিদ্ধিঃ। ২
ন চ তয়োর্ব্বস্তন্তরস্য সম্ভাবাদ দ্বৈতবাদপ্রসক্তিঃ, মায়ায়া অনির্ব্বাচ্যত্বেন বস্তুত্বাযোগাৎ। তথাহ—
হইবে, তাহাও নহে; কারণ, ভোক্তত্বপ্রভৃতি জন্মাইতে পারে, জগতে ব্রহ্মাতিরিক্ত এমন কোন বস্তুই নাই। ব্রহ্মাতিরিক্ত বস্তু থাকিলেও অদ্বৈতবাদের ব্যাঘাত ঘটে, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন-‘অজা হোকা’ ইত্যাদি। একথার অভিপ্রায় এই যে, এই ঈশ্বরাদি বিভাগের অভাব অবশ্যই হইত, যদি প্রপঞ্চ নিশ্চয়ই অসিদ্ধ হইত। বাস্তবিক ত তাহা নহে; কারণ, প্রপঞ্চসিদ্ধি সুনিশ্চিত। মূলের ‘হি’ শব্দটা হেতু অর্থে প্রযুক্ত। যেহেতু জগৎপ্রসবিনী অজা-জন্মরহিত প্রকৃতি প্রমাণসিদ্ধ, অর্থাৎ “অজামেকাং” “মায়াং তু প্রকৃতিং বিদ্যাৎ” “ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে” “মায়া পরা প্রকৃতিঃ” “সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া” ইত্যাদি শ্রুতি স্মৃতি প্রমাণ- সিদ্ধা জগজ্জননী দেবাত্মশক্তিরূপা এক অজা নিজেরই বিকার বা পরিণামাত্মক ভোক্তা, ভোগ্য ও ভোগসম্পাদনরূপ প্রয়োজন সাধনে ব্যাপৃতা এবং ঈশ্বরের নিকটবর্ত্তিনী হইয়া কিংকরীরূপে(দাসীভাবে) অবস্থান করে, সেইহেতু মায়ো- পাধিযুক্ত সেই ঈশ্বর মায়ারূপ উপাধির সান্নিধ্যবশতঃ নিজেও যেন সেই রকমই হন, মায়াকার্য্য দেহাদির সান্নিধ্যবশতঃ যেন দেহের মতই এবং বিভক্ত পদার্থের সহযোগ থাকায় নিজেও বিভক্ত প্রপঞ্চের ন্যায় পৃথক্ হইয়াই যেন ঈশ্বরপ্রভৃতি ভাবে অবস্থান করেন। সেই কারণেই পরমাত্মাকে অনেকাংশরহিত অখণ্ড বলিয়া স্বীকার করিলেও, লোকবেদপ্রসিদ্ধ জীবেশ্বরাদি ভেদব্যবহার সমস্তই সিদ্ধ হয়। ২। • পরমাত্মার অতিরিক্ত মায়ারূপ স্বতন্ত্র বস্তুর স্বীকার করায় যে, দ্বৈতবাদ সম্ভাবিত হয়, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, মায়া সৎ বা অসৎরূপে অনির্ব্বাচ্য; সুতরাং তাহার বস্তুত্ব(সত্যতা) নাই(৭)। একথা অন্যেও বলিয়াছে ‘হে ভগ-
(৭) সদসৎরূপে অনির্ব্বাচ্য বলিবার অভিপ্রায় এই যে, যাহা সৎ, তাহা
“এযা হি ভগবন্মায়া সদসদ্ব্যক্তিবর্জিতা” ইতি। যম্মাদজৈব ভোক্তাদিরূপা, তস্মাৎ তৎস্বীকৃতস্য মিথ্যাসিদ্ধবস্তুত্বাসম্ভবাৎ অনন্তশ্চাত্মা। চশব্দোহবধারণে, অনন্ত এবাত্মা। অস্যন্তঃ পরিচ্ছেদঃ দেশতঃ কালতো বস্তুতোহপি ন বিস্তৃত- ইতি। বিশ্বরূপো বিশ্বমস্যৈব রূপমিতি, পরস্যাবিশ্বরূপত্বাৎ। “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্” ইতি। রূপস্য রূপিব্যতিরেকেণাভাবাৎ বিশ্বরূপত্বাদপ্যানন্ত্যং সিদ্ধমিত্যর্থঃ। হি শব্দো যম্মাদর্থে। যস্মাৎ বিশ্বরূপবৈশ্বরূপ্যং লক্ষণং পরমাত্মনঃ” ইত্যেবমাদিভিরাত্মনো বিশ্বরূপত্বমিত্যর্থঃ। যত এবানন্তো বিশ্বরূপ আত্মা, অতএব অকর্তা কর্তৃত্বাদিসংসারধর্মরহিত ইত্যর্থঃ। কদৈবমনন্তো বিশ্বরূপঃ কর্তৃত্বাদিসকলসংসারধৰ্ম্মবর্জিতো মুক্তঃ পূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মরূপেণৈবাবতিষ্ঠতে, ইত্যত্রাহ—ত্রয়ং যদা বিন্দতে ব্রহ্মমেতদিতি। ত্রয়ং ভোক্তা-ভোগ-ভোগ্যরূপম্।
বন্, এই মায়া সদসৎ-ব্যক্তিবর্জিত, অর্থাৎ মায়া সৎ-পদার্থরূপেও ব্যক্ত নয়, এবং অসৎ-রূপেও ব্যক্ত নয়,-সদসৎরূপে নিরূপণের অযোগ্য। যেহেতু অজাই(মায়াই) ভোক্তা ও ভোগ্যাদিরূপে অবস্থিত, সেই হেতুতেই অজাকল্পিত বস্তুমাত্রই মিথ্যা -অসত্য, কাজেই আত্মা অদ্বিতীয় অখণ্ড। ‘চ’ অর্থ অবধারণ। যেহেতু দেশ কাল ও বস্তু দ্বারা ইহার অন্ত-পরিচ্ছেদ(সীমা) হয় না, সেই হেতু আত্মা অনন্তই।[সেই আত্মাও] বিশ্বরূপ অর্থাৎ বিশ্ব(জগৎ) তঁহারই রূপ বা বিকাশ; কারণ, পরমাত্মা কখনই বিশ্বরূপ নহে(বিশ্বাকারে পরিণত নহে)। পরমাত্মা বিকার মাত্রই যখন বাক্যারব্ধ নামমাত্র-সত্য নহে, এবং রূপ বা আকৃতি যখন রূপী(আকৃতিমান্) হইতে পৃথক্ বা স্বতন্ত্র নহে, তখন বিশ্বরূপ বলিয়াই আত্মা অনন্ত(অসীম)। মূলের হি শব্দটা ‘যস্মাৎ’ অর্থে। যেহেতু বিশ্বরূপ- বৈশ্বরূপ্যই পরমাত্মার স্বরূপ বলিয়া অন্যত্র উক্ত হইয়াছে, সেই হেতুই পরমাত্মার বিশ্বরূপত্বও সিদ্ধ হয়। যেহেতু বিশ্বরূপ আত্মা অনন্ত, সেই হেতুই অকর্তা-সংসারসুলভ কর্তৃত্বাদি ধর্মরহিত। আত্মা কোন সময়ে অনন্ত বিশ্বরূপ এবং কর্তৃত্বাদি সর্ব্বপ্রকার সংসারধর্মবর্জিত মুক্ত ও পূর্ণ আনন্দস্বরূপ অদ্বিতীয় ব্রহ্মভাবে অবস্থান করে? তদুত্তরে বলিতেছেন-“ত্রয়ং যদা বিন্দতে ব্রহ্মমেতৎ” ইতি। ত্রয়-ভোক্তা, ভোগ্য ও ভোগ এই তিন। উক্ত তিনই মায়াময়, সেই
কখনও বিনষ্ট বা রূপান্তরিত হয় না, সৎ বস্তু চিরকাল একই রূপে থাকে। অজা প্রকৃতির পরিণাম ও বিলয় যখন প্রত্যক্ষসিদ্ধ, তখন উহাকে সৎ বলিতে পারা‘যায় না, পক্ষান্তরে অসতের যখন কোনরূপ কার্য্যকারিতাই সম্ভবপর হয়, না, আকাশ-কুসুমের ন্যায় কেবল কথামাত্র, অথচ জগৎ যখন ঐ প্রকৃতিরই ফল, তখন উহাকে অসৎ বলিতে পারা যায় না। এইজন্যই উহাকে অনির্ব্বাচ্য বলিতে হয়। অনির্ব্বাচ্য মাত্রই অবস্তু অসত্য।
ক্ষরং প্রধানমমৃতাক্ষরং হরঃ ক্ষরাত্মানাবীশতে দেব একঃ। তস্যাভিধ্যানাদ্ যোজনাৎ তত্ত্বভাবাদ- ভূয়শ্চান্তে বিশ্বমায়ানিবৃত্তিঃ ॥১॥১০॥
সরলার্থঃ। ইদানীং প্রকৃতিপরমেশ্বরয়োর্বৈলক্ষণ্যমুক্তা, তদ্বিজ্ঞানাদ- মৃতত্বপ্রাপ্তিং দর্শয়তি—ক্ষরমিত্যাদি। ক্ষরং(বিকারশীলং সর্ব্বং জগৎ) প্রধানং (প্রকৃতিঃ, তৎপরিণামরূপত্বাৎ জগতঃ)। অক্ষরং(অবিনাশি আত্মা জীবঃ) অমৃতৎ (মরণরহিতং ব্রহ্মরূপমিত্যর্থঃ)। হরঃ(অবিদ্যাদেঃ সংসারবীজস্য হরণাৎ হরঃ) একঃ দেবঃ(পরমেশ্বরঃ) ক্ষরাত্মানৌ(প্রকৃতি পুরুষৌ) ঈশতে(ইষ্টে—শাসনেন নিয়ময়তি)। তস্য(দেবস্য) ভূয়ঃ(পুনঃ পুনঃ) অভিধ্যানাৎ(সম্যক্ চিন্তনাৎ), যোজনাৎ(মনোনিবেশনাৎ), তত্ত্বভাবাৎ(অহং ব্রহ্মাস্মীতি প্রতিবোধাৎ) অন্তে (প্রারব্ধভোগাবসানে, যদা ব্রহ্মাত্মৈক্যজ্ঞানবেগায়াং) বিশ্বমায়ানিবৃত্তিঃ(সুখদুঃখ- মোহাত্মকসর্ব্বপ্রপঞ্চনিবৃত্তিঃ ভবতি—মুচ্যতে ইতি ভাবঃ) ॥ ১॥১০ ॥
মূলানুবাদ।—প্রধান অর্থাৎ জগৎপ্রকৃতি ক্ষর বিনাশশীল, আর মরণ- রহিত(জীবাত্মা) অক্ষর(পরব্রহ্মস্বরূপ)। সংসারের বীজভূত অবিদ্যাদিদোষ- হরণকারী এক(অদ্বিতীয়) দেব পরমাত্মা উক্ত ক্ষর ও আত্মাকে নিয়মিত করেন। সেই পরমাত্মার পুনঃ পুনঃ অভিধ্যান, তাহাতে চিত্তসংযোজন এবং আমি ব্রহ্ম এইরূপ তত্ত্বজ্ঞানোদয়ের পর প্রারব্ধ কর্ম্মের ফলভোগ শেষ হইলে বিশ্বমায়ার—সুখদুঃখমোহময় সংসারপ্রপঞ্চের নিবৃত্তি হয় ॥ ১॥১০ ॥
মায়াত্মকত্বাদধিষ্ঠানভূত-ব্রহ্মব্যতিরেকেণ নাস্তি, কিন্তু ব্রহ্মৈবেতি যদা বিন্দতে, তদা নিবৃত্তনিখিলবিকল্প-পূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মভাক্ কর্তৃত্বাদিসকলসংসারধম্মবর্জিতো বীতশোকঃ কৃতকৃত্যোহবতিষ্ঠত ইত্যর্থঃ। অথবা জ্ঞাজ্ঞাজাত্মক-জীবেশ্বর- প্রকৃতিরূপত্রয়ং ব্রহ্ম যদা বিন্দতে লভতে, তদা মুচ্যত ইতি। ব্রহ্মমিতি মকারান্তম্। “ব্রহ্মমেতু মাং মধুমেতু মাম্” ইতিবৎ ছান্দসম্ ॥১৷৷৯৷৷
কারণে আশ্রয়ভূত ব্রহ্মব্যতিরেকে উহাদের সত্তা নাই, উহারা অসৎ, ব্রহ্মই একমাত্র সৎ, ইহা যখন জানে, সেই সময় সর্ব্বপ্রকার ভেদবুদ্ধিবর্জিত, পূর্ণ আনন্দস্বরূপ অদ্বিতীয় ব্রহ্মভাবাপন্ন হয়, এবং তখন কর্তৃত্বাদি সংসারধর্মবর্জিত, শোকশূন্য ও কৃতকৃত্যভাবে অবস্থান করে। অথবা জ্ঞ, অজ্ঞ ও অজা, কিংবা জীব, ঈশ্বর ও প্রকৃতি, এই তিনকে যখন ব্রহ্মভাবে লাভ করে, তখন মুক্ত হয় মূলে ‘ব্রহ্মম্’ শব্দটী মকারান্ত(ব্রহ্ম-শব্দের ন্যায় ‘ব্রহ্মম্’ শব্দও আছে)। ‘ব্রহ্মম্ আমাকে প্রাপ্ত হউন, মধুম্ আমাকে প্রাপ্ত হউক,’ ইত্যাদি শব্দের ন্যায় ইহাও বেদপ্রসিদ্ধ শব্দ ॥ ১॥৯ ॥
জ্ঞাত্বা দেবং সর্ব্বপাশাপহানিঃ ক্ষীণৈঃ ক্লেশৈর্জন্মমৃত্যুপ্রহাণিঃ। তস্যাহভিধ্যানাস্তীয়ং দেহভেদে বিশ্বৈশ্বর্য্যং কেবল আপ্তকামঃ ॥ ১॥১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—জীবেশ্বরয়োর্বিভাগং দর্শয়িত্বা তদ্বিজ্ঞানাদমৃতত্বৎ দর্শিতৎ, ইদানীং প্রধানেশ্বরয়োর্বৈলক্ষণ্যং দর্শয়িত্বা তদ্বিজ্ঞানাদমৃতত্বৎ দর্শয়তি— ক্ষরং প্রধানমমৃতাক্ষরং হর ইতি। অবিদ্যাদেহরণাৎ পরমেশ্বরো হরঃ। অমৃতঞ্চ তদক্ষরং চ অমৃতাক্ষরম্, অমৃতং ব্রহ্মৈব ঈশ্বর ইত্যর্থঃ। স ঈশ্বরঃ ক্ষরাত্মানৌ প্রধান- পুরুষৌ ঈশতে ঈষ্টে, দেব একশ্চিৎসদানন্দাদ্বিতীয়ঃ পরমাত্মা। তস্য পরমাত্মনোহ- ভিধ্যানাৎ, কথং? যোজনাৎ—জীবানাৎ পরমাত্মসংযোজনাৎ, তত্ত্বভাবাদহং ব্রহ্মাস্মীতি, ভূয়শ্চাসকৃৎ অন্তে প্রারব্ধকর্মান্তে, যদ্বা স্বাত্মজ্ঞাননিষ্পত্তিরন্তঃ, তস্মিন্ স্বাত্মজ্ঞানোদয়বেলায়াং, বিশ্বমায়ানিবৃত্তিঃ—সুখদুঃখমোহাত্মকাশেষপ্রপঞ্চরূপ- মায়ানিবৃত্তিঃ ॥ ১॥১০ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এ পর্যন্ত জীব ও ঈশ্বরের বিভাগ প্রদর্শন করিয়া তদ্বি- বিষয়ক বিজ্ঞানে অমৃতত্ব প্রাপ্তি প্রদর্শিত(বর্ণিত) হইয়াছে। এখন প্রকৃতি ও ঈশ্বরের বিভাগ প্রদর্শন ও তদ্বিজ্ঞানে অমৃতত্ব প্রাপ্তি বর্ণিত হইতেছে-“ক্ষরং প্রধানমমৃতাক্ষরং হরঃ”। পরমেশ্বর অবিদ্যাদি হরণ করেণ বলিয়া হর-শব্দ- বাচ্য। যাহা অমৃত, তাহাই অক্ষর,[উভয়ের মিলনে হইল-অমৃতাক্ষর)। অর্থ এই যে, অমৃতময় ব্রহ্মই ঈশ্বর। চিৎসদানন্দ অদ্বিতীয় সেই এক দেবতা- পরমাত্মা পরমেশ্বর ক্ষরস্বভাব প্রধান ও পুরুষকে শাসন করেন অর্থাৎ যথাযথ- ভাবে নিয়মিত করেন। সেই পরমাত্মার অভিধ্যানে(চিন্তার ফলে),[অভি- ধ্যান] কি প্রকারে? না, যোজনে, অর্থাৎ জীবাত্মাকে পরমাত্মাতে সংযোজিত করায় এবং আমিই ব্রহ্ম, এইরূপ তত্ত্ববোধ উপস্থিত হইলে, পুনঃ পুনঃ এই সকল কর্ম্ম অনুষ্ঠিত হইলে, অন্তে প্রারব্ধ কৰ্ম্ম শেষ হইলে পর, অথবা অন্ত অর্থ-আত্ম- জ্ঞানের পরিসমাপ্তি, তাহা হইলে অর্থাৎ যে সময় আত্মজ্ঞান’ সমুদিত হয়, ঠিক সেই সময়েই বিশ্বমায়ার নিবৃত্তি হয়, অর্থাৎ সুখদুঃখমোহাত্মক সমস্ত সংসার- রূপ মায়ার নিবৃত্তি হয় ৷ ১৷৷১০ ॥
সরলার্থঃ। ইদানীং ব্রহ্মবিষয়কয়োঃ জ্ঞান-ধ্যানয়োঃ ফলভেদং দর্শয়তি— জ্ঞাত্বেতি। দেবং(প্রকাশময়ৎ পরমাত্মানং) জ্ঞাত্বা(অয়মহমস্মীতি সাক্ষাদনু- ভূয় স্থিতস্য সাধকস্য) সর্ব্বপাশাপহানিঃ(সর্ব্বেষাং পাশানাং অবিদ্যাদীনাং) অপ- হানিঃ(বিনাশঃ), তথা ক্লেশৈঃ(অবিদ্যাদিভিঃ) ক্ষীণৈঃ(ক্ষয়ংগতৈঃসদ্ভিঃ)
জন্মমৃত্যুপ্রহাণিঃ(অবিদ্যামূলকয়ো: জননমরণয়োঃ প্রকর্ষেণ বিনাশঃ[ভবতীতি শেষঃ। ইদং তাবৎ জ্ঞানফলমুক্তং, অথ ধ্যানফলমুচ্যতে-] তস্য(পরমাত্মন:) অভিধ্যানাৎ(অনুচিন্তনাৎ) দেহভেদে(স্কুলদেহপাতে সতি) তৃতীয়ং(বিশ্ব- বৈরাজাপেক্ষয়া তৃতীয়ং) বিশ্বৈশ্বর্য্যং(সবিশেষকার্য্যব্রহ্মরূপৎ)[অনুভূয়, ক্রমেণ] আপ্তকামঃ(সর্ব্বকামপরিসমাপ্তিং প্রাপ্তঃ সন্) কেবলঃ(নির্বিশেষব্রহ্মভাবং প্রাপ্তো ভবতি, মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ।)[অয়ং ভাবঃ-পরমাত্মানম্ অহমিতি বিজানতঃ পুরুষস্য প্রথমং অবিদ্যারূপ-পাশক্ষয়ো ভবতি, তৎক্ষয়ে চ কারণক্ষয়াৎ জন্মমরণয়োঃ সাক্ষাৎ নিবৃত্তিঃ জীবন্মুক্তির্ভবতীতি। ধ্যায়িনাং পুনঃ-তদভিধ্যানাৎ প্রথমং প্রারব্ধভোগসমাপ্তৌ দেহপাতঃ, অনন্তরং বিশ্বৈশ্বর্য্যলক্ষণকার্য্যব্রহ্ম- লোকে গমনং, তদনন্তরং সর্ব্বকামসমাপ্তিপূর্ব্বকং কৈবল্যং-মুক্তির্ভবতি। ততশ্চ জ্ঞানাৎ সাক্ষাৎ কৈবল্যলাভঃ, ধ্যানাৎ পুনঃ ক্রমেণেতি জ্ঞান-ধ্যানয়োঃ ফল- ভেদইত্যাশয়ঃ।] ॥ ১। ১১ ॥
মূলানুবাদ।[অতঃপর জ্ঞান ও ধ্যানের ফলভেদ প্রদর্শিত হইতেছে—] সেই পরমাত্মাকে জীবাত্মার সহিত অভিন্নরূপে জানিলে সাধকের সমস্ত বন্ধনপাশ অর্থাৎ বন্ধনের হেতুভূত অবিদ্যাদি দোষ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ঐ অবিদ্যাদি ক্লেশ ক্ষয়- প্রাপ্ত হইলে জন্ম ও মৃত্যু নিবৃত্ত হয়, অর্থাৎ জন্মমরণের প্রধান কারণ অবিদ্যা, সেই অবিদ্যার ক্ষয়ে পুনরায় আর জন্ম-মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে না, সঙ্গে সঙ্গেই তাহার মুক্তি—জীবমুক্তি হয়। আর যাহারা তাহার অভিধ্যান বা অনুচিন্তন করে, তাহারা[প্রারব্ধভোগ শেষ হইলে পর] প্রথম সর্ব্বপ্রকার ঐশ্বর্য্যময় তৃতীয় অবস্থা প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ ব্রহ্মলোক লাভ করে, পরে আপ্তকাম হইয়া কৈবল্য লাভ করিয়া থাকে অর্থাৎ তাহারা ক্রমমুক্তি লাভ করে] ॥ ১॥১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ইদানীং তদ্বিদস্তদ্ধ্যায়িনশ্চ তজজ্ঞানধ্যানকৃতৎ ফল- ভেদং দর্শয়তি—জ্ঞাত্বেতি। জ্ঞাত্বা দেবময়মহমস্মীতি। সর্ব্বপাশাপহানিঃ। পাশরূপাণাং সর্ব্বেষামবিদ্যাদীনামপহানিঃ। ক্ষীণৈরবিদ্যাদিভিঃ ক্লেশৈস্তৎ-
ভাষ্যানুবাদ। যাহারা তাহাকে চিন্তা করে—জানে, আর যাহারা তাহাকে ধ্যান করে, এখন তাহাদের উভয়ের জ্ঞান ও ধ্যানকৃত ফলভেদ প্রদর্শন করিতেছেন—জ্ঞাত্বেতি। আমিই এই দেব, এইরূপে দেবকে(পরমাত্মাকে) জানিয়া অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মাকে অভিন্নরূপে জানিলে, সর্ব্বপাশের হানি হয়, অর্থাৎ অবিদ্যা প্রভৃতি যে সমস্ত কারণে বন্ধন ঘটে, সেই অবিদ্যা প্রভৃতি জীবের পাশ স্বরূপ, জ্ঞানোদয়ে সে সমস্ত পাশ বিধ্বস্ত হইয়া যায়। অবিদ্যাপ্রভৃতি ক্লেশরাশি(৮) ক্ষীণ হইলে পর, অবিদ্যামূলক জন্মমৃত্যুর প্রহাণি হয়,—দুঃখের
(৮) ক্লেশ পাতঞ্জলের মতে পাঁচ প্রকার—“অবিদ্যাস্মিতারাগদ্বেষাভি- নিবেশাঃ পঞ্চ ক্লেশাঃ।” অবিদ্যা—অনাত্মা-দেহাদিতে আত্মবুদ্ধি। অস্মিতা— আত্মা ও বুদ্ধিকে এক বলিয়া মনে করা। রাগ—সুখাভিলাষ। দ্বেষ—দুঃখ বিষয়ে অনিচ্ছা‘। অভিনিবেশ—মরণত্রাস।
১১
কার্য্যভূত জন্মমৃত্যুপ্রহাণিঃ জননমরণাদিদুঃখহেতুবিনাশঃ। জ্ঞানফলং প্রদর্শিতম্। ১
ধ্যানে কিঞ্চিৎ ক্রমমুক্তিরূপং বিশেষমাহ-তস্য পরমেশ্বরস্যাভিধ্যানাদ্ দেহ- ভেদে শরীরপাতোত্তরকালমর্চ্চিরাদিনা দেবযানপথা গত্বা পরমেশ্বরসাযুজ্যং গতস্য তৃতীয়ং বিরাড় রূপাপেক্ষয়া অব্যাকৃতপরমব্যোমকারণেশ্বরাবস্থৎ বিশ্বৈশ্বর্য্যলক্ষণং ফলং ভবতি। স তদনুভূয় তত্রৈব নির্বিশেষমাত্মানং জ্ঞাত্বা কেবলো নিরস্তসমস্তৈ- ‘শ্বর্য্য-তদুপাধিসিদ্ধিরব্যাকৃতপরমব্যোমকারণেশ্বরাত্মকতৃতীয়াবস্থং বিশ্বৈশ্বর্য্যং হিত্বা আপ্তকাম আত্তকামঃ পূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মরূপোহবতিষ্ঠতে। এতদুক্তং ভবতি- সম্যদর্শনস্য তথাভূতবস্তুবিষয়ত্বেন নির্বিষয়পূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মবিষয়ত্বাৎ বিজ্ঞানা- নন্তরমবিদ্যাতৎকার্য্যপ্রহারেন পূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মস্বরূপোহবতিষ্ঠতে। ধ্যানস্য পুনঃ সহসা ন নিরাকারে বুদ্ধিঃ প্রবর্ত্তত ইতি--সবিশেষব্রহ্মবিষয়ত্বাৎ ‘তং যথা যথোপাসতে’ ইতি ন্যায়েন সবিশেষবিশ্বৈশ্বর্য্যলক্ষণব্রহ্মপ্রাপ্ত্যা বিশ্বৈশ্বর্য্যমনুভূয় নির্বিশেষপূর্ণা- নন্দব্রহ্মাত্মানং জ্ঞাত্বা কেবলাত্মকামোহবাপ্তাশেষপুমর্থো মুক্তো ভবতি। ২
নিদানভূত জন্ম ও মরণ প্রভৃতি অনর্থগুলির প্রণাশ ঘটে। ইহা জ্ঞানের ফল প্রদর্শিত হইল, ধ্যানের ফল পরে বলা যাইতেছে]। ১
ধ্যানের ফলে কিঞ্চিৎ বিশেষ আছে। ধ্যানের ফল ক্রমমুক্তি, তাহা বলিতেছেন। সাধক সেই পরমেশ্বরের অভিধানের ফলে(একাগ্রচিত্তে ধ্যান করিলে,) দেহপাতের(মরণের) পরক্ষণে অচ্চিরাদিক্রমে দেবযান পথে গমন করিয়া পরমেশ্বরের সাম্য লাভ করেন, অনন্তর তৈজস ও বিরাট্ পুরুষ অপেক্ষা তৃতীয় অবস্থা অর্থাৎ অপ্রকট কারণরূপী ঈশ্বরত্বরূপ বিশ্বৈশ্বর্য্য (সর্ব্বেশ্বরত্বরূপ) ফল প্রাপ্ত হন। তিনি সেখানে সেই পরমৈশ্বর্য্যপদ উপভোগ করিয়া নির্বিশেষ পরমাত্মাকে অবগত হইয়া কেবল হন-তখন সর্ব্বপ্রকার ঐশ্বর্য্য ও তদনুযায়ী ফলসিদ্ধি এবং পূর্ব্বপ্রাপ্ত পরম ব্যোমরূপী ঈশ্বরাত্মক তৃতীয়াবস্থারূপে অবস্থান করেন অর্থাৎ তখন তার সমস্ত কাম আত্মাতে পরিসমাপ্ত হয় এবং পূর্ণ আনন্দস্বরূপ অদ্বিতীয় ব্রহ্মরূপে অবস্থান করেন। অভিপ্রায় এই যে, যথার্থ বস্তুই তত্ত্বজ্ঞানের বিষয় হয়; অতএব অবিশেষ পূর্ণ আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মই তত্ত্বজ্ঞানের বিষয় হয়, সেই কারণেই তত্ত্বদর্শন হইলে পর অবিদ্যা ও অবিদ্যাকার্য্য সকল প্রণষ্ট হইয়া যায়, কাজেই তখন এক অদ্বিতীয় পূর্ণ আনন্দময় ব্রহ্মরূপে অবস্থান ঘটে। ধ্যানবুদ্ধি কখনও নিরাকার বিষয়ে সহজে প্রবৃত্ত হয় না, কাজেই সবিশেষ বা সগুণ ব্রহ্মবিষয়ে প্রথমে ধ্যান করিতে হয়। ঐরূপ ধ্যানে ‘তাঁহাকে যেমন যেমন ভাবে উপাসনা করে, তেমনই ফল পায়,’ এই শ্রুতিকথিত নিয়মানুসারে বিশ্ব-ঐশ্বর্যাত্মক সবিশেষ ব্রহ্ম প্রাপ্ত হয়; সেই বিশ্বৈ- শ্বর্য্য অনুভব করিয়া পরে নিব্বিশেষ পূর্ণ আনন্দময় ব্রহ্মাত্মাকে অবগত হয়, তাহার ফলে কেবল-পরম পুরুষার্থ মুক্তি প্রাপ্ত হয়। ২
তথা শিবধর্ম্মোত্তরে জ্ঞানধ্যানয়োর্ব্বিধৈশ্বর্য্যলক্ষণং কেবলাত্মাপ্তকামলক্ষণঞ্চ ফলং দর্শয়তি—
“ধ্যানাদৈশ্বর্য্যমতুষ্টমৈশ্বর্য্যাৎ সুখমুত্তমম্।
জ্ঞানেন তৎ পরিত্যাজ্য বিদেহো মুক্তিমাধবং” ॥ ইতি।
তথা চ দহরাদিসবিশেষ-সগুণোপাসকানাং “স যদি পিতৃলোককামো ভবতি, সঙ্কল্পাদেবাস্য পিতরঃ সমুস্তিষ্ঠন্তি” ইত্যাদিনা বিশ্বৈশ্বর্য্যলক্ষণং ফলং দর্শয়তি। তথা চ প্রশ্নোপনিষদি-“যঃ, পুনরেতং ত্রিমাত্রেণোমিত্যেতেনৈবাক্ষরেণ পরম- পুরুষমভিধ্যায়ীত, স তেজসি সূর্য্যে সম্পন্নঃ” ইত্যাদিনা পরমপুরুষমভিধ্যায়তো- হচ্চিরাদিমার্গোপদেশপূর্ব্বকম্ “স এতস্মাজ্জীবঘনাৎ পরাৎ পরং পুরিশয়ং পুরুষ- মীক্ষতে” ইতি ব্রহ্মলোকং গতস্য তত্রৈব সম্যগদর্শনলাভং দর্শয়িত্বা “তমোঙ্কারেণৈ- বায়তনেনান্বেতি বিদ্বান্, যত্তচ্ছান্তমজরমমৃতমভয়ং পরং চেতি” ইতি সম্যদর্শনেন মোক্ষ উপদিষ্টঃ-“তমেবং বিদ্বানমৃত ইহ ভবতি” ইতি বিদুষোহচ্চিরাদিগমনং বিনা ইহৈবামৃতত্বপ্রাপ্তিং দর্শয়তি। “অথাকাময়মানঃ” ইত্যারভ্য “ন তস্য প্রাণা উৎক্রামন্তি, ব্রহ্মৈব সন্ ব্রহ্মাপ্যেতি” ইত্যাদিনা বিনৈবোৎক্রান্তিং বিদুষো মোক্ষ
শিবধর্মোত্তরেও এইরূপই ধ্যানের ফল বিশ্বৈশ্বর্য, আর জ্ঞানের ফল আপ্ত- কামত্ব প্রদর্শন করিতেছেন-‘ধ্যানের ফল-অতুল ঐশ্বর্য্য, ঐশ্বর্য্যের ফল উত্তম সুখ। তত্ত্বজ্ঞানের দ্বারা ধ্যানলব্ধ ঐশ্বর্য্য ও সুখ পরিত্যাগপূর্ব্বক বিদেহ হইয়া মুক্তিলাভ করিবে।’ এইরূপ-‘সে যদি পিতৃলোকাভিলাষী হয়, তবে ইহার ইচ্ছামাত্রেই পিতৃগণ উপস্থিত হন’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যে প্রদর্শিত হইয়াছে যে, দহরবিদ্যাপ্রভৃতি উপাসনায় যাহারা রত, তাহাদের বিশ্বৈশ্বর্য্য-প্রাপ্তিরূপ ফল লাভ হয়। প্রশ্নোপনিষদও ‘যে লোক ত্রিমাত্রাত্মক ওঁম্ এই প্রণবাক্ষররূপে পরম পুনুষের ধ্যান করে, সে লোক তেজোময় সূর্য্যের সহিত মিলিত হয়’ ইত্যাদি বাক্যে পরম পুরুষের ধ্যানকারী ব্যক্তিদিগের(মৃত্যুর পর গমনের জন্য) অর্চ্চিরাদি পথের উপদেশ করিয়া ‘সেই লোকই হৃদয়স্থ পরাৎপর পুরুষকে দর্শন করে’ এই বাক্যে আবার ব্রহ্মলোকগামী ব্যক্তির সেখানেই(ব্রহ্মলোকেই) তত্ত্বজ্ঞানলাভের, বা ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার-লাভের কথা বলিয়াছেন, এবং তৎপরেই আবার ‘বিদ্বান্(জ্ঞানী) পুরুষ এই ওঙ্কাররূপ আলম্বনের সাহায্যেই-তাঁহাকে প্রাপ্ত হন, যিনি জরামরণভয়রহিত শান্ত পরম ও সব্বশ্রেষ্ঠ(ব্রহ্ম)।’ এই বাক্যে সম্যক্ জ্ঞানে মোক্ষ-ফল-প্রাপ্তি উপদিষ্ট হইয়াছে। অন্যত্র ‘তাহাকে(আত্মাকে) এইরূপে জানিলে ইহলোকেই অর্থাৎ বর্তমান দেহেই অমৃতত্ব লাভ করে’ এই বাক্যে অচ্চিরাদিপথে গমন ব্যতিরেকেও ইহলোকেই জ্ঞানীর মুক্তিলাভ প্রদর্শিত হইয়াছে। ‘পক্ষান্তরে, যিনি কামনারহিত নিষ্কাম’ এইরূপে বাক্যারম্ভের পর ‘তাহার(জ্ঞানীর) প্রাণ আর উৎক্রমণ করে না, অর্থাৎ এই দেহ হইতে আর লোকান্তরে প্রস্থান করে না, তিনি ব্রহ্মভাবে উদ্বুদ্ধ হইয়া ব্রহ্ম লাভ করেন’
উপদিষ্টঃ। “উদস্মাৎ প্রাণাঃ ক্রামন্ত্যাহো নেতি? নেতি হোবাচ যাজ্ঞবন্ধ্যঃ” ইতি প্রশ্নপূর্ব্বকমুৎক্রান্ত্যভাবো দর্শিতঃ। তথা চ ব্রাহ্মে পুরাণে জীবন্মুক্তিং গত্য- ভাবং চ দর্শয়তি—
“যস্মিন্ কালে স্বমাত্মানং যোগী জানাতি কেবলম্। তস্মাৎ কালাৎ সমারভ্য জীবন্মুক্তো ভবেদসৌ ॥ মোক্ষস্য নৈব কিঞ্চিৎ স্যাদন্যত্র গমনং ক্বচিৎ। স্থানং পরার্দ্ধমপরং যত্র গচ্ছন্তি যোগিনঃ ॥ অজ্ঞানবন্ধভেদস্তু মোক্ষো ব্রহ্মলয়স্থিতি ॥”
তথা দৈব্যে বিদুষো জীবন্মুক্তিং দর্শয়তি—
“ইহ লোকে পরে চৈব কর্তব্যং নাস্তি তস্য বৈ। জীবন্মুক্তো যতস্তস্মাৎ ব্রহ্মবিৎ পরমার্থতঃ ॥”
শিবধর্মোত্তরে—“বাঞ্ছাত্যয়েহপি কর্তব্যং কিঞ্চিদস্য ন বিদ্যতে। ইহৈব স বিমুক্তঃ স্যাৎ সম্পূর্ণঃ সমদর্শনঃ ॥”
তস্মাদুপাসকো দেহাহুৎক্রম্যাহচ্চিরাদিনা দেবযানেন বিশ্বৈশ্বর্য্যং ব্রহ্ম প্রাপ্য বিশ্বৈশ্বর্য্যমনুভূয় তত্রৈব কেবলং প্রত্যস্তমিতভেদ-পূর্ণানন্দাদ্বিভীয়ব্রহ্মাত্মানং জ্ঞাত্বা
ইত্যাদি বাক্যেও জ্ঞানীর পক্ষে উৎক্রমণ ব্যতিরেকেই মুক্তি উপদিষ্ট হইয়াছে। ‘ইহার(জ্ঞানীর) দেহ হইতে প্রাণ সকল কি উৎক্রমণ করে? অথবা করে না? [এতদুত্তরে] যাজ্ঞবাল্য বলিলেন—না—উৎক্রমণ করে না,’ এই স্থানেও প্রশ্নপূর্ব্বক উৎক্রমণের অভাব দেখান হইয়াছে। ব্রহ্মপুরাণেও সেইরূপেই জীবন্মুক্তি ও লোকান্তরগতির অভাব প্রদর্শন করিতেছেন— যোগী যে সময়ে আপন আত্মাকে কেবল অর্থাৎ বুদ্ধিপ্রবৃত্তির সম্পর্করহিত শুদ্ধস্বরূপ জানিতে পারে, সেই সময় হইতেই তিনি জীবন্মুক্ত হন। ধ্যানযোগীরা যে সকল উত্তম স্থানে গমন করে, মুক্ত পুরুষের সে সকল স্থানের কোথাও গমন হয় না। মোক্ষ অর্থ—অজ্ঞান-বন্ধনের ছেদন ও ব্রহ্মে বিলয় অর্থাৎ ব্রহ্মের সহিত মিলিয়া যাওয়া। লিঙ্গপুরাণেও জ্ঞানীর জীবন্মুক্তি প্রদর্শিত হইয়াছে ‘যিনি পরমার্থ ব্রহ্মতত্ত্বজ্ঞ, তিনি জীবন্মুক্ত; ইহলোকে বা পরলোকে তাহার কিছুমাত্র কর্তব্য নাই।’ শিবধর্মোত্তরে কথিত আছে—‘জ্ঞানীর যখন সমস্ত কামনা বিনষ্ট হইয়া যায়, তখন তাহার পক্ষে আর কিছুই কর্তব্য নাই। সর্ব্বত্র সমদর্শী পরিপূর্ণাত্মা সেই ব্যক্তি ইহলোকেই বিমুক্ত হয়।’
অতএব বুঝিতে হইবে, উপাসক পুরুষ(দেহপাতের পর) দেহ হইতে ঊর্দ্ধগামী হইয়া দেবযাননামক অর্চ্চিরাদিপথে সর্ব্বৈশ্বর্য্যময় ব্রহ্মলোকে গমন করে, সেই ঐশ্বর্য্য ভোগ করিয়া সেখানেই সর্ব্বপ্রকার ভেদবর্জিত পরিপূর্ণ আনন্দস্বরূপ বিশুদ্ধ আত্মতত্ত্ব অবগত হইয়া কেবল আপ্তকাম অর্থাৎ মুক্ত হয়।
✓
কেবলাত্মকামো মুক্তো ভবতি বিদ্বান্। নির্বিশেষপূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মবিজ্ঞানাদশেষ- গন্ত গন্তব্যগমনাদিভেদ প্রত্যস্তময়াদ্বিনৈবোৎক্রান্তিং দেবযানং চ ব্রহ্মজ্ঞানসমনন্তরং জীবন্মুক্তো ব্রহ্মজ্ঞানসমনন্তরং ব্রহ্মানন্দমনুভূয়াত্মরতিরাত্মতৃপ্ত আত্মনৈবান্তঃসুখোহ- ন্তরারামোহন্তর্জ্যোতিরাত্মক্রীড় আত্মরতিরাত্মমিথুন আত্মানন্দ ইহৈবস্বারাজ্যে ভূমি স্বে মহিষ্যমৃতোহবতিষ্ঠতে। তদ্ধেতুত্বাদ্বাহ্যবিষয়পরিত্যাগেন ব্রহ্মণ্যাধায় বাঘ্ননঃকায় নিষ্পাদ্যং শ্রৌতস্মার্তলক্ষণং কৰ্ম্ম কৃত্বা বিশুদ্ধসত্ত্বো যোগারূঢ়ো ভূত্বা শমাদিসাধন- সম্পন্নঃ।
ন হিনস্ত্যাত্মনাজ্ঞানং ততো যাতি পরাং গতিম্ ॥” ইতি স্মৃতেঃ ॥ ১॥১১॥
নির্বিশেষ পূর্ণ আনন্দস্বরূপ অদ্বিতীয় ব্রহ্মতত্ত্ব উপলব্ধি করার ফলে তাহার গন্তা (গমন কর্তা), গন্তব্য ও গমন প্রভৃতি সর্ব্বপ্রকার ভেদ বিলুপ্ত হইয়া যায়; সেই কারণে সেই জীবন্মুক্ত পুরুষ দেবযানপথে না যাইয়াই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া ব্রহ্মানন্দ অনুভব করিবার পর, আত্মাতেই তাহার রতি, তৃপ্তি, ক্রীড়া ও সুখের উদয় হয়, আনন্দ, আরাম ও জ্যোতিঃ(প্রকাশ) অন্তরে প্রকটিত হয়, এবং এখানেই স্বমহিমাময় ভূমা স্বারাজ্যে মুক্তভাবে অবস্থান ঘটে। এই অবস্থা লাভ করিতে হইলে বিষয়াশক্তি পরিত্যাগপূর্ব্বক শ্রুতিস্মৃতিবিহিত কায়িক বাচিক ও মানসিক সমস্ত কৰ্ম্ম ব্রহ্মে সমর্পণ করিয়া অনুষ্ঠান করিতে হয়, এবং শমদমাদি সাধনসম্পন্ন হইয়া সত্ত্বশুদ্ধি লাভপূর্ব্বক যোগারূঢ় হইতে হয়।[এ কথা ভগবানও বলিয়াছেন-] ‘যোগী পুরুষ দেহ ও মন সংযত করিয়া এবং আশীঃ-(অনাগত প্রিয় বস্তু প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা) ও পরদ্রব্যপ্রতিগ্রহ-পরিত্যাগপূর্ব্বক নির্জন স্থানে একাকী সর্ব্বদা আত্মযোগ অনুশীলন করিবে। যোগী এই ভাবে নিরন্তর আত্মযোগ অভ্যাস করিতে করিতে সমস্ত পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া অনায়াসে আত্যন্তিক ব্রহ্মানন্দ ভোগ করিয়া থাকেন। যাহার চিত্ত সর্ব্বদা যোগযুক্ত, তিনি সর্বত্র সমদর্শী হন, এবং আপনাকে সর্বভূতে ও সর্বভূতকে আপনাতে বিদ্যমান দর্শন করেন। যিনি ঈশ্বরকে সর্ব্বত্র সমভাবে বর্তমান দর্শন করেন, তিনি নিজে নিজকে হত করেন না, অর্থাৎ আপনার নিত্যত্ব অপলাপ করেন না, তাহার ফলে পরাগতি(মুক্তি) লাভ করেন,’ ইত্যাদি স্মৃতিবচনও এ বিষয়ে প্রমাণ ॥ ১॥১১ ॥
এতজ জ্ঞেয়ং নিত্যমেবাত্মসংস্থম্, নাতঃ পরং বেদিতব্যং হি কিঞ্চিৎ। ভোক্তা ভোগ্যং প্রেরিতারঞ্চ মত্বা সর্ব্বং প্রোক্তং ত্রিবিধং ব্রহ্মমেতৎ ॥ ১॥১২ ॥
সরলার্থঃ। নিত্যং(সর্ব্বদা) এব(নিশ্চয়ে) আত্মসংস্থং(স্বাত্মনি বর্তমানং স্বাত্মস্বরূপমিত্যর্থ:) এতৎ(ব্রহ্ম; জ্ঞেয়ং(বেদিতব্যম্), অতঃ (অস্মাৎ ব্রহ্মণঃ) পরং(অন্যৎ) কিঞ্চিৎ(কিমপি) হি(নিশ্চয়ে) বেদিতব্যং (জ্ঞাতব্যং) ন(নাস্তি)[পরমাত্মবিজ্ঞানেনৈব সর্ব্ববিজ্ঞাননিষ্পত্তিরিতি ভাবঃ।] [জ্ঞানপ্রকার উচ্যতে] ভোক্তা(জীবঃ), ভোগ্যং(সর্ব্বং জগৎ), প্রেরিতারং (অন্তর্যামিণং) চ, এতৎ ত্রিবিধং সর্ব্বং ব্রহ্মং প্রোক্তং(কথিতম্)। এতৎ ত্রয়ং ব্রহ্মৈবেতি বিজ্ঞেয়মিতি ভাবঃ]।[অত্র ব্রহ্মম্ ইতি মকারান্তং পদম্] ॥ ১॥১২ ॥
মূলানুবাদ। সর্ব্বদাই আত্মপ্রতিষ্ঠ আত্মস্বরূপে অবস্থিত এই ব্রহ্মকে জানিবে,[এই ব্রহ্মই একমাত্র জ্ঞাতব্য], ইহার অতিরিক্ত আর কিছু জ্ঞাতব্য নাই।[কিরূপে জানিতে হইবে, তাহা বলিতেছেন] ভোক্তা—জীব, ভোগ্য— জগৎ ও প্রেরিতা—ঈশ্বর, পূর্ব্বোক্ত এই তিনই ব্রহ্ম, এইরূপে জানিতে হইবে।] ॥ ১।১২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যস্মাজজ্ঞানানন্তরং পরমপুরুষার্থসিদ্ধিঃ, তস্মাৎ এতজ জ্ঞেয়মিতি। এতৎ প্রকৃতং কেবলাত্মাকাশব্রহ্মরূপং, নিত্যং নিয়মেন জ্ঞেয়ং। কিমত্রান্যসংস্থং? ন—স্বাত্মসংস্থং জ্ঞেয়ং, নানাত্মনি বাহ্যে। ক্রয়তে চ—
“তমাত্মস্থং যেহমুপশ্যন্তি ধীরা স্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্ ॥” ইতি।
তথা চ শিবধর্ম্মোত্তরে যোগিনামাত্মনি স্থিতিঃ—
ভাষ্যানুবাদ।—যেহেতু তত্ত্বজ্ঞানের পরই মুক্তিরূপ পরম পুরুষার্থ সিদ্ধ হয়, সেই হেতু প্রস্তাবিত এই কেবল(বিশুদ্ধ) আত্মাকাশস্বরূপ ব্রহ্মকে নিত্য— নিয়মপূর্ব্বক জানিবে। ভাল, তাহাকে কি অন্যসংস্থ—অন্যত্র অবস্থিতরূপে জানিতে হইবে? না,—আত্মসংস্থ—আত্মস্বরূপে অবস্থিত জানিতে হইবে, কিন্তু বাহ্য—অনাত্ম পদার্থে অবস্থিতরূপে নহে। এ কথা বেদেও শ্রুত হয়—‘যে সকল ধীর ব্যক্তি আত্মসংস্থ তাহাকে(পরমাত্মাকে) নিয়ত দর্শন করেন, তাহাদেরই শাশ্বত(অবিনশ্বর) শান্তি হয়, অপর সকলের হয় না।’ ইতি। শিবধর্মোত্তরেও এইরূপেই যোগিগণের আত্মাতে অবস্থানের কথা বর্ণিত আছে—
“শিবমাত্মনি পশ্যন্তি প্রতিমাসু ন যোগিনঃ। আত্মস্থং যঃ পরিত্যজ্য বহিঃস্থং যজতে শিবম্। হস্তস্থং পিণ্ডমৎসৃজ্যলিহ্যাৎ কুর্পরমাত্মনঃ। সর্ব্বত্রাবস্থিতং শান্তং ন পশ্যন্তীহ শঙ্করম্। জ্ঞানচক্ষুর্ব্বিহীনত্বাদন্ধঃ সূর্য্যং যথোদিতম্। যঃ পশ্যেৎ সর্ব্বগং শান্তং তস্যাধ্যাত্মস্থিতঃ শিবঃ। আত্মস্থং যে ন পশ্যন্তি তীর্থে মার্গন্তি তে শিবম্। আত্মস্থং তীথমুৎসৃজ্য বহিন্তীর্থাদি যো ব্রজেৎ। করস্থং স মহারত্নং ত্যক্তা কাচং বিমার্গতি ॥” ১
অথবা এতদ্যদরোক্ষং প্রত্যগাত্মরূপং, তন্নিত্যমবিনাশি স্বে মহিম্নি স্থিতং ব্রহ্মৈব জ্ঞেয়ম্। কস্মাৎ? হি শব্দো যম্মাদর্থে। যম্মান্নাতঃপরং বেদিতব্যমস্তি কিঞ্চিদপি। ক্রয়তে চ বৃহদারণ্যকে-“তদেতৎ পদনীয়মস্য সর্ব্বস্য যদয়মাত্মা” ইতি। কথমেতজজ্ঞেয়মিত্যাহ-ভোক্তা জীবঃ, ভোগ্যমিতরৎ, সর্ব্বংপ্রেরি- তান্তর্যামী পরমেশ্বরঃ। তদেতল্লিবিধং প্রোক্তং ব্রহ্মৈবেতি। ভোক্ত্রাদ্যশেষভেদ-
‘যোগিগণ শিবকে(পরমাত্মাকে) আত্মাতে দর্শন করেন, কিন্তু প্রতিমাতে নহে। যে লোক আত্মস্থ শিবকে পরিত্যাগ করিয়া বাহিরে(প্রতিমা প্রভৃতিতে) শিবের অর্চ্চনা করে, সে লোক হস্তস্থিত অন্নগ্রাস পরিত্যাগ করিয়া নিজের হস্ত- মূল লেহন করুক, অর্থাৎ শিবকে আত্মস্বরূপে চিন্তা না করিয়া বাহিরে প্রতিমা প্রভৃতিতে চিন্তা করা, আর হাতের গ্রাস ফেলিয়া শূন্য হস্ত লেহন করা উভয়ই তুল্য। অন্ধ যেমন আকাশে উদিত সূর্য্যকে দেখিতে পায় না, তেমনই অজ্ঞ লোকও জ্ঞানচক্ষু না থাকায়, জগতে সর্ব্বত্র বিদ্যমান শঙ্করকে দেখিতে পায় না। যিনি শিবকে সর্ব্বত্র বিদ্যমান প্রশান্তরূপে দেখিতে পান, শিব তাহারই আত্মাতে অবস্থিত(প্রকাশমান) হন। স্বশরীরস্থ তীর্থ পরিত্যাগ করিয়া যে লোক বাহিরের নানা তীর্থে গমন করে,[বুঝিবে,] সে লোক হাতের মহারত্ন পরিত্যাগ করিয়া—কাচের অন্বেষণ করিতেছে। ১ অথবা(উক্তবাক্যের অন্য প্রকার অর্থ এই) ‘এতদ্’-এই যে সাক্ষাৎ অনুভব- গোচর আত্মতত্ত্ব, তাহা নিত্য অর্থাৎ বিনাশরহিত স্বমহিমপ্রতিষ্ঠ ব্রহ্ম বলিয়াই জানিতে হইবে। কারণ? যেহেতু এতদতিরিক্ত আর কিছু বেদিতব্য(জ্ঞাতব্য) নাই। বৃহদারণ্যকেও শ্রুত আছে-‘তাহা এই সমস্ত জীবের গন্তব্য স্থান, যাহা আত্মা।’ ইহাকে কিরূপে জানিতে হইবে? তদুত্তরে বলিতেছেন-ভোক্তা-জীব, ভোগ্য-জীবভিন্ন সমস্ত(জড় পদার্থমাত্র), প্রেরিতা-অন্তর্যামী পরমেশ্বর, উক্ত এই তিন পদার্থ ব্রহ্মই। ইহার অভিপ্রায় এই যে, ভোক্তা ও ভোগ্যাদি সমস্ত প্রপঞ্চভেদ নিরস্ত করিয়া নির্বিশেষ ব্রহ্মকে আত্মরূপে জানিবে। কাবধেয় গীতায়
বহ্নের্যথা যোনিগতস্য মূর্ত্তি- র্ন দৃশ্যতে নৈব চ লিঙ্গনাশঃ। স ভূয় এবেন্ধনযোনিগৃহ্য- স্তদ্বোভয়ং বৈ প্রণবেন দেহে ॥ ১॥১৩ ॥
সরলার্থঃ। যথা যোনিগতস্য(স্বকারণভূতকাষ্ঠাশ্রিতস্য) বহেঃ(অগ্নেঃ) মূর্ত্তিঃ(দহনাত্মকং স্থূলং রূপং) ন দৃশ্যতে(চক্ষুগ্রাহ্যং ন ভবতি)। তস্য (বহ্নেঃ) লিঙ্গনাশঃ(লিঙ্গস্য রূপস্য দাহোষ্ণাদেঃ বিনাশঃ) চ(অপি) ন এব [ভবতীতি শেষঃ।] সঃ(বহ্নিঃ) এব(নিশ্চয়ে) ভূয়ঃ(পুনঃ) ইন্ধনযোনি- গৃহ্যঃ(ইন্ধনং—কাষ্ঠং এব যোনিঃ কারণং—আশ্রয়ো যস্য, তেন—মঘনেন গৃহ্যঃ- চক্ষুগ্রাহ্যঃ)[ভবতি]। তৎ উভয়ং বা(ইব—তদুভয়মিব)[বহ্ণিস্থানীয় আত্মা] দেহে(অধরারণিস্থানীয়ে) প্রণবেন(উত্তরারণিস্থানীয়েন)[মথনস্থানীয়েন মননেন গ্রাহ্যঃ ভবতীতি শেষঃ।] ॥ ১॥১৩ ॥
মূলানুবাদ। অগ্নির যোনি বা উৎপত্তিস্থান কাষ্ঠ। সেই কাষ্ঠগত অগ্নির স্বরূপ যেমন চক্ষুদ্বারা দেখা যায় না, এবং তাহার লিঙ্গ(অনুমাপক) দাহোষ্ণাদিরও বিনাশ হয় না, অর্থাৎ কাষ্ঠেতে যেমন অগ্নির স্থূল সূক্ষ্ম দুই ভাবই বিদ্যমান থাকে, অথচ চক্ষুগ্রাহ্য মাত্র হয় না। সেই অগ্নিই আবার ইন্ধনযোনি অর্থাৎ অগ্ন্যুৎপাদক কাষ্ঠ ঘর্ষণে চক্ষুগ্রাহ্য হয়, ঠিক তেমনই বহ্ণি ও বহ্ণিলিঙ্গের ন্যায় আত্মাও এই দেহে প্রণব দ্বারা মনন করিলে অনুভবগম্য হয়।[এখানে দেহ— অধরারণি, প্রণব—উত্তরারণি, মনন—মথন, আর আত্মা বহ্ণিস্থানীয় বুঝিতে হইবে] ॥ ১।১৩॥
প্রপঞ্চবিলাপনেনৈব নির্ব্বিশেষং ব্রহ্মাত্মানং জানীয়াদিত্যর্থঃ। তথাচোক্তং কাবষেয়গীতায়াম্—
“তত্ত্বা সর্ব্ববিকল্পাংশ স্বাত্মস্থং নিশ্চলং মনঃ।
ক্বথা শান্তো ভবেদ্যোগী দগ্ধেন ইবানলঃ ॥”
তথা চ শ্রীবিষ্ণুপুরাণে—“তস্যৈব কল্পনাহীনস্বরূপগ্রহণং হি যৎ। মনসা ধ্যাননিষ্পাদ্যঃ সমাধিঃ সোহভিধীয়তে ॥” ইতি ॥ ১॥১২ ॥
সেইরূপই কথিত আছে—‘যোগী পুরুষ সমস্ত বিকল্প(ভেদবুদ্ধি) পরিত্যাগপূর্ব্বক মনকে আত্মস্থ করিয়া, কাষ্ঠ দগ্ধ করিয়া অগ্নি যেরূপ শান্ত হয়, সেইরূপ শান্ত হইবে অর্থাৎ রাগদ্বেষাদিকৃত সমস্ত উদ্বেগ হইতে বিমুক্ত হইবেন।’ শ্রীবিষ্ণুপুরাণেও সেইরূপ আছে—ধ্যাননিষ্ঠ ব্যক্তির মনের দ্বারা যে, সেই পরমেশ্বরেরই কল্পনা- বিহীন—নির্বিশেষ স্বরূপের গ্রহণ, তাহাই সমাধি নামে কথিত হয় ॥’ ১৷৷১২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—ইদানীম্ “ওঁমিত্যেতেনৈবাক্ষরেণ পরম্পরুষমভিধ্যা- য়ীত।” “ওঁমিত্যাত্মানং যুঞ্জীত।” “ওঁমিত্যাত্মানং ধ্যায়ীত” ইতি শ্রুতেঃ আত্মানমন্বিষ্য পরাভিধ্যানে প্রণবন্য নিয়মাদভিধ্যানাঙ্গত্বেন প্রণবং দর্শয়তি— বহ্নের্যথেতি। বহ্নের্যথা যোনিগতস্য অরণিগতস্য মূর্ত্তিঃ স্বরূপং ন দৃশ্যতে মথনাৎ প্রাক্, নৈব চ লিঙ্গস্য সূক্ষ্মদেহস্য বিনাশঃ। স এবারণিগতোহগ্নিভূয়ঃ পুনঃ পুনরিন্ধনযোনিনা মথনেন গৃহ্যঃ। যোনিশব্দোহত্র কারণবচনঃ। ইন্ধনেন কারণেন পুনঃ পুনর্মথনাদগৃহ্যঃ। তদ্বোভয়ং। ইবার্থো বাশব্দঃ। তচ্চোভয়ং তদুভয়মিব মথনাৎ প্রাক্ ন গৃহ্যতে, মথনেন চ গৃহ্যতে। তদ্বদাত্মা বহ্নিস্থনীয়ঃ প্রণবেনোত্তরারণিস্থানীয়েন মথনাদগৃহ্যতে—দেহে অধরারণিস্থানীয়ে ॥ ১॥১৩ ॥
ভাষ্যানুবাদ।—অতঃপর, ‘ওম্’ এই অক্ষর দ্বারা পরমপুরুষ পরমাত্মাকে ধ্যান করিবে, ‘ওম্ ইত্যাকার ধ্যান করত আত্মবিষয়ে যোগ করিবে।’ ‘ওম্ ইত্যাকারে আত্মার ধ্যান করিবে’ ইত্যাদি শ্রুতিপ্রামাণ্যনুসারে জানা যায় যে, পরমাত্মার অন্বেষণে ধ্যান করিতে হইলে প্রণবের ধ্যানও একটা অপরিহার্য্য অঙ্গ; সেই কারণে এখন অভিধ্যানের অঙ্গরূপে প্রণবের নির্দেশ করিতেছেন— ‘বহ্ন্যথা’ ইত্যাদি।
বহ্ণি যতক্ষণ নিজের উৎপত্তিস্থান অরণিতে(কাষ্ঠেতে) অবস্থান করে ততক্ষণ প্রজ্বলিত হইবার পূর্ব্বপর্যন্ত যেমন তাহার মূর্ত্তি-স্থূলরূপ(জ্বলনাত্মক ভাব) দেখা যায় না, এবং তাহার লিঙ্গনামক সূক্ষ্মদেহেরও(বহ্ণিলিঙ্গ ধূম উষ্মাপ্রভৃতিরও) বিনাশ হয় না,(কেবল অদৃশ্য থাকে মাত্র)। কেন না, সেই কাষ্ঠগত অগ্নিই আবার পুনঃ পুনঃ স্বোৎপত্তিস্থান ইন্ধন দ্বারা মথন(ঘর্ষণ) করিলে গৃহ্য-গ্রহণযোগ্য-দর্শনযোগ্য হয়। এখানে ‘যোনি’ শব্দের অর্থ- কারণ, সুতরাং অর্থ হইতেছে যে, ইন্ধনরূপ কারণ দ্বারা পুনঃ পুনঃ মথনে গ্রহণযোগ্য হয়। “তদ্ বা উভয়ং” এ স্থলে বা-শব্দটী ইবার্থে(সাদৃশ্যবাচক)। বহ্ণি ও তাহার লিঙ্গ এতদুভয়ের ন্যায়[আত্মাও] মথনের পূর্ব্বে অনুভবযোগ্য হয় না, পরন্তু মথনের পর গ্রহণযোগ্য হয়। আভপ্রায় এই যে, বহ্ণিস্থানীয় আত্মাও উত্তরারণিস্থানীয় প্রণব দ্বারা মথন-মনন করিলে অধরারণিস্থানীয় এই দেহেই অনুভূত হইয়া থাকে‘(৯)৷ ১॥১৩ ॥
(৯) কাষ্ঠ সাধারণতঃ অগ্নির যোনি আশ্রয় ও উৎপত্তিস্থান। যাজ্ঞিকগণ দুই খণ্ড কাষ্ঠ ঘর্ষণ করিয়া অগ্নি উৎপাদন করেন। ঐ দুই খণ্ড কাষ্ঠের উপরের খণ্ডকে বলে উত্তরারণি, আর নীচের খণ্ডকে বলে অধর অরণি। ঐ দুই খণ্ড কাষ্ঠের ঘর্ষণে যেমন কাষ্ঠগত অদৃশ্য অগ্নিও দৃশ্য হয়, তেমনি প্রণবকে উত্তর অরণি করিয়া আর দেহকে অধর অরণি করিয়া ধ্যান করিলে এই দেহেই পরমাত্মাও প্রকাশ পায়।
১১
স্বদেহমরণিং কৃত্বা প্রণবঞ্চোত্তরারণিম্। ধ্যান-নিৰ্ম্মথনাভ্যাসাদ দেবং পশ্যেন্নিগূঢ়বৎ ॥ ১॥১৪॥ তিলেষু তৈলং দধিনীব সর্পি- রাপঃ স্রোতঃস্বরণীযু চাগ্নিঃ। এবমাত্মাত্মনি গৃহ্যতেহসৌ সত্যেনৈনং তপসা যোহনুপশ্যতি ॥ ১॥১৫ ॥
সরলার্থঃ।[দৃষ্টান্তার্থং প্রকৃতার্থে যোজয়িতুমাহু—স্বদেহমিতি।] স্বদেহং (স্বস্য যোগিনঃ শরীরং) অরণিং(অধরারণিং) তথা প্রণবং চ(অপি) উত্তরা- রণিং) কৃত্বা ধ্যাননিৰ্ম্মথনাভ্যাসাৎ(ধ্যানং চিন্তনমেব নিৰ্ম্মথনং, তস্য অভ্যাসাৎ পৌনঃপুন্যেন সেবনাৎ) দেবং(স্বপ্রকাশং আত্মানং) নিগূঢ়বৎ(পূর্ব্বোক্তং বহ্নিমিব প্রচ্ছন্নং) পশ্যেৎ(সাক্ষাৎ কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ) ॥ ১। ১৪ ॥ সরলার্থঃ। ইদানীং মন্ত্রদ্বয়েন দর্শনপ্রকারমাহু—‘তিলেষু’ ইত্যাদি। যঃ সত্যেন(সত্যনিষ্ঠয়া) তপসা(তপস্যয়া চ) সর্ব্বব্যাপিনং ক্ষীরে অর্পিতং(সর্ব্বাত্মনা অবস্থিতং) সর্পিঃ(ঘৃতম্) ইব[স্থিতং] আত্মবিদ্যা-তপোমূলং(আত্মবিদ্যা চ তপঃ চ মূলং দর্শনকারণং যস্য, তং) উপনিষৎপরং(উপনিষদাং তাৎপর্য্যবিষয়ং) তৎ ব্রহ্ম(ব্রহ্মাভিন্নতয়া) এনং আত্মানং অনুপশ্যতি(নিরন্তরং চিন্তয়তি, [তেন কর্ত্রা] তিলেষু[পীডনেন] তৈলং ইব, দধিনি(দগ্নি) সর্পিঃ(ঘৃতমিব) স্রোতঃসু(অন্তঃ প্রবাহেষু)[খননেন] আপঃ(জলানি ইব), অরণীযু(কাষ্ঠেষু) [ঘর্ষণেন] অগ্নিঃ[ইব] এবং(যথোক্তদৃষ্টান্তবদেব) অসৌ আত্মা আত্মনি
মূলানুবাদ। যোগী পুরুষ নিজের দেহকে নিম্ন অবণি ও প্রণবকে উত্তর অরণি(উপরের কাষ্ঠখণ্ড) কল্পনা করিয়া পুনঃপুনঃ ধ্যানরূপ মথনের সাহায্যে স্বপ্রকাশ পরমাত্মাকে[পূর্ব্বোক্ত] নিগূঢ় অগ্নির ন্যায় দশন করিবে ॥ ১ ॥ ১৪ ॥ মূলানুবাদ। আত্মবিদ্যা ও তপস্যাই ব্রহ্মলাভের মূল বা কারণ, এই জন্য ব্রহ্মকে ‘আত্মবিদ্যা-তপোমূল’ বলা হয়। ব্রহ্মই সমস্ত উপনিষদের রহস্য, এবং দুগ্ধে অবস্থিত ঘৃতের ন্যায় সর্ব্বত্রাবস্থিত ও সর্ব্বব্যাপী আত্মা। যিনি এই সর্ব্ব- ব্যাপী আত্মাকে সত্যনিষ্ঠা ও তপস্যাদ্বারা অনুধ্যান করেন, তিনি—[ নিষ্পীড়নের
শাঙ্করভাষ্যম্।—তদেব প্রপঞ্চয়তি স্বদেহেতি। স্বদেহমরণিং কৃত্বা অধরারণিং, ধ্যানমেব নিৰ্ম্মথনং, তস্য নিৰ্ম্মথনস্যাভ্যাসাদ্দেবং জ্যোতীরূপৎ প্রপশ্যেন্নিগূঢ়াগ্নিবৎ ॥ ১॥১৪ ॥
‘ভাষ্যানুবাদ। পূর্ব্বোক্ত বিষয়ই বিস্তারপূর্ব্বক বলিতেছেন—স্বদেহম ইতি। যোগী আপনার দেহকে অরণি—অধরারণি(নিম্নের কাষ্ঠখণ্ডস্থানীয়) করিয়া, এবং ধ্যানকে নিৰ্ম্মথনস্থলবর্তী করিয়া, সেই ধ্যানরূপ নিৰ্ম্মথনের পুনঃপুনঃ অনুষ্ঠান করতঃ দেবকে—জ্যোতির্ময় আত্মাকে নিগূঢ় অগ্নির ন্যায় দর্শন করিবে ॥ ১। ১৪ ॥
সর্বব্যাপিনমাত্মানং ক্ষীরে সপিরিবাপিতম্। আত্মবিদ্যা-তপোমূলং তদ্ব্রহ্মোপনিষৎপরম্! তদ্ব্রহ্মোপনিষৎ পরমিতি ॥ ১।১৬ ॥ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎসু প্রথমোহধ্যায়ঃ ॥
(স্বস্বরূপে)[ধ্যান-নিৰ্ম্মথনাভ্যাসাৎ] গৃহাতে(প্রত্যক্ষীক্রিয়তে। তদ্বহ্মোপনিষৎ পরংইতি দ্বিরুক্তিরধ্যায়সমাপ্ত্যর্থা ॥ ১ ॥ ১৫-১৬ ॥ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্যাখ্যায়াং, প্রথমোহধ্যায়ঃ ॥ ১ ॥
দ্বারা] তিলমধ্যগত তৈলের ন্যায়,[ মথনের দ্বারা] দধিগত ঘৃতের ন্যায়,[ খননের দ্বারা] নদীর ভূগর্ভস্থ স্রোতোজলের ন্যায়, এবং[ ঘর্ষণের দ্বারা] অরণিমধ্যগত অগ্নির ন্যায় এই আত্মাকে আত্মাতেই দেখিতে পান। অধ্যায়-সমাপ্তি সুচনার জন্য “তদ্ব্রহ্মোপনিষৎপরং” কথাটার দ্বিকক্তি করা হইয়াছে ॥ ১ ॥ ১৫-১৬ ॥ ইতি প্রথমাধ্যায়ের মূলানুবাদ ॥ ১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—উক্তস্যার্থস্য দ্রষ্টয়ে দৃষ্টান্তান্ বহন্ দর্শয়তি—তিলে- স্থিতি। তিলেষু যন্ত্রপীড়নেন তৈলং গৃহ্যতে, দধিনি মথনেন সপিরিব। আপঃ স্রোতঃসু নদীযু ভূখননেন। অরণিষু চাগ্নিমথনেন। এবমাত্মাত্মনি স্বাত্মনি গৃহ্যতে অসৌ—মননেনাত্মভূতদেহাদিষু অন্নময়াদ্যশেষোপাধিপ্রবিলাপনেন নির্ব্বি- শেষে পূর্ণানন্দে স্বাত্মন্যেবাবগম্যত ইত্যর্থঃ। কেন তর্হি পুরুষেণাত্মা আত্মন্যেব গৃহ্যত ইত্যতআহ—সত্যেন যথাভূতহিতার্থবচনেন ভূতহিতেন। “সত্যং ভূতহিতং প্রোক্তম্” ইতি স্মরণাৎ। তপসা ইন্দ্রিয়মনসামৈকাগ্র্যলক্ষণেন। “মনসশ্চেন্দ্রিয়াণাঞ্চ ঐকাগ্র্যং পরমন্তপঃ” ইতি স্মরণাৎ। এনমাত্মানং যোহনুপশ্যতি ॥ ১॥১৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্:-কথমেনমনুপশ্যতীত্যত আহ সর্ব্বব্যাপীতি। সর্ব্বং প্রকৃত্যা- দিবিশেষান্তং ব্যাপ্যাবস্থিতং, ন দেহেন্দ্রিয়াদ্যধ্যাত্মমাত্রাবস্থিতমাত্মানং। ক্ষীরে সপিরিব সারত্বেন, নিরন্তরতয়া আত্মত্বেন সর্ব্বেস্বপিতম্ আত্মবিদ্যাতপসোমূলং কারণম্। ক্রয়তে চ-“এস হ্যেব সাধু কৰ্ম্ম কারয়তি”। “দদামি বুদ্ধিযোগৎ তং যেন মামুপযান্তি তে” ইতি। অথবা আত্মবিদ্যা চ তপশ্চ যস্যাত্মলাভে মূলং হেতুরিতি। তথা চ শ্রুতিঃ-“বিদ্যয়ামৃতমশ্নুতে” “তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব”ইতি চ। ব্রহ্মোপনিষৎপরং উপনিষন্নমস্মিন্ পবং শ্রেয়ইতি। যঃ সত্যাদিসাধনসংযুক্ত এনং সর্ব্বব্যাপিনমাত্মানং ক্ষীরে সপিরিবার্পিতং আত্মবিদ্যাতপোমূলং তদ্ ব্রহ্মো- পনিষৎপরং অনুপশ্যতি, সর্ব্বগতং ব্রহ্মাত্মদর্শিনা আত্মন্যেব গৃহ্যতে, নাসত্যাদিযুক্তেন পরিচ্ছিন্নব্রহ্মান্নময়াদ্যাত্মনা। ক্রয়তে চ-“সত্যেন লভ্যস্তপসা হ্যেষ আত্মা, সম্যগ- জ্ঞানেন ব্রহ্মচর্য্যেণ নিত্যম্।” “ন যেষু জিহ্মমমৃতং ন মায়া চ” ইতি। দ্বির্বচন- মধ্যায়পরিসমাপ্যর্থম্ ॥ ১৷১৬ ॥ ইতি শ্রীমদ্ভাগবদ্পূজ্যপাদশিষ্য-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য-শ্রীমচ্ছঙ্করভগবৎ- প্রণীতে শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমোহধ্যায়ঃ ॥ ১ ॥
ভাষ্যানুবাদ। উল্লিখিত বিষয়ের দৃঢ়তা সম্পাদনের জন্য বহু দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিতেছেন—তিলেষু ইত্যাদি। যেমন তিলের মধ্যস্থ তৈল যন্ত্র-নিষ্পী- ড়নে গৃহীত হয়—দর্শনযোগ্য হয়, দধিগত সর্পিঃ(ঘৃত) যেমন মথন দ্বারা(গৃহীত হয়), ভূখননে যেমন অন্তঃস্রোতা নদীতে জল দৃষ্ট হয়, এবং মথন দ্বারা যেমন (ঘর্ষণ দ্বারা) অরণীতে(কাষ্ঠেতে) অগ্নি প্রকটিত হয়, তেমনই মননদ্বারা অর্থাৎ আত্মারূপে কল্পিত দেহ ও ইন্দ্রিয়াদিতে অন্নময়কোষ প্রভৃতি যে সমস্ত উপাধি আছে, সে সমস্তের বিলয় সাধন করিয়া, নির্বিশেষ পূর্ণানন্দময় স্বীয় আত্মাতে সেই পরমাত্মা গৃহীত(সাক্ষাৎকৃত) হয়। কিরকম পুরুষ কি উপায়ে আত্মাতে আত্মার সাক্ষাৎকার করে? তদুত্তরে বলিতেছেন, সত্যনিষ্ঠা অর্থাৎ প্রাণিগণের হিতকর যথার্থ- ভাষণ, স্মৃতিশাস্ত্রে ভূতহিতকে ‘সত্য’ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। সেই সত্য বচন এবং ‘মন ও ইন্দ্রিয়গণের যে, একাগ্রতা, তাহাই পরম তপস্যা’ এই স্মৃতিবাক্যোক্ত ইন্দ্রিয় ও মনের একাগ্রতারূপ তপস্যা, এতদুভয় উপায়ে যে পুরুষ এই আত্মাকে নিরন্তব দর্শন করে, অর্থাৎ তদ্বিষয়ে অনুধ্যান করে।[সেই পুরুষই ঐ ভাবে আত্মাতে আত্মদর্শন করিয়া থাকে] ॥ ১ ॥ ১৫ ॥ ভাষ্যানুবাদ। কি প্রকারে ইহাকে(আত্মাকে) নিরীক্ষণ করে, তাহা বলিতেছেন—“সর্ব্বব্যাপিনং” ইত্যাদি
সর্ব্বব্যাপী-প্রকৃতি হইতে আরম্ভ করিয়া স্কুল মহাভূত পর্যন্ত সমস্ত বস্তু ব্যাপিয়া অবস্থিত, কিন্তু কেবল দেহেন্দ্রিয়াদি অধ্যাত্ম বিষয়ে অবস্থিত নহে, এবং ক্ষীরের মধ্যে ঘৃত(নবনীত) যেমন সার বস্তুরূপে অবস্থান করে, ঠিক তেমনই সকলের সারভূত আত্মারূপে অবস্থিত, আত্মবিদ্যা(আত্মজ্ঞান) ও তপস্যার মূল অর্থাৎ ঐ উভয় পাইবার কারণ, কেননা, শ্রুতি বলিতেছেন-‘ইনিই উত্তম কৰ্ম্ম করান,’[ভগবান্ বলিয়াছেন-] ‘আমি তাহাকে সেইরূপ বুদ্ধিযোগ দান করি, যাহাতে তাহারা আমাকে প্রাপ্ত হয়’ ইতি। অথবা, আত্মবিদ্যা ও তপস্যাই যাহার স্বরূপ জানিবার মূল অর্থাৎ হেতু, তিনিই-আত্মবিদ্যা-তপোমূল। শ্রুতি বলিয়াছেন-‘বিদ্যা দ্বারা অমৃত বা মোক্ষ লাভ করে’, ‘তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মকে অবগত হও‘। আর ‘ব্রহ্মোপনিষৎপর, অর্থাৎ ইহাতেই পরমশ্রেয়(মুক্তি) নিষন্ন (বিদ্যমান আছে), এমন আত্মাকে(দর্শন করেন)।[এবাক্যের সারার্থ এই যে,] যে ব্যক্তি উক্ত সত্যাদি সাধনসমূহ অধিগত হয়, সে ব্যক্তি আত্মবিদ্যা-তপোমূল, ব্রহ্মোপনিষৎপর এই আত্মাকে ক্ষীবে অবস্থিত ঘৃতের ন্যায় সর্বব্যাপীরূপে নিরন্তর দর্শন করে। ব্রহ্মাত্মদর্শী পুরুষ আত্মাতেই সেই সর্ব্বগত ব্রহ্ম দর্শন করিতে সমর্থ হন, কিন্তু অসত্যাদিযুক্ত ও অন্নময়াদিরূপে পরিচ্ছিন্ন দেহে আত্মবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি সমর্থ হয় না। কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন-‘সত্যনিষ্ঠা, তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য ও সস্যজ্ঞান(তত্ত্বজ্ঞান) দ্বারা এই আত্মাকে সর্ব্বদা লাভ করিতে পারা যায়, কিন্তু যাহাদের হৃদয়ে কুটিলতা বা অনার্জব, অনূত অসত্য ও ছল বিদ্যমান আছে, তাহারা লাভে সমর্থ হয় ‘না ইত্যাদি। অধ্যায়সমাপ্তি জ্ঞাপনের জন্য “ব্রহ্মো- পনিষৎপরং” কথার দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥ ১ ॥ ১৬ ॥
ইতি প্রথম অধ্যায়ের ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ১ ॥
যুঞ্জানঃ প্রথমং মনস্তত্ত্বায় সবিতা ধিয়ঃ। অগ্নেজ্যোতিনিচায্য পৃথিব্যা অধ্যাভরত ॥ ২॥১॥
সরলার্থঃ।[প্রথমেহধ্যায়ে পরমার্থদর্শনোপায়ত্বেন ধ্যানমুক্তম্। ইদানীং তদপেক্ষিত-সাধনবিধানায় দ্বিতীয়োহধ্যায় আবভাতে। তত্র প্রথমং সবিতারং প্রার্থয়তে যুঞ্জান ইতি।] সবিতা(জগৎপ্রসবিতা সূর্য্যঃ)[ধ্যানযোগে প্রবৃত্তস্য মম] মনঃ(অন্তঃকরণ,) প্রথনং সঞ্জানঃ(পরমাত্মনি সংযোজয়ন্) অগ্নিঃ(চক্ষু- রাদীনামিন্দ্রিয়ানামনুগ্রাহকানাং দেবানাং) জ্যোতিঃ(বস্তু-প্রকাশনসামর্থ্যং) নিচায্য(বাহ্যবিষয়াদুপাহৃত্য) তত্ত্বায়(আত্মতত্ত্ব-প্রকাশনায়) ধিয়ঃ (বুদ্ধিবৃত্তীঃ জ্ঞানানি) পৃথিব্যাঃ অধি(অধিকে পরিণামরূপে অস্মিন্ শরীরে ইত্যর্থঃ) আভরৎ(আহরৎ—আহবতু ইত্যর্থঃ) ॥ ১ ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ।[যোগী ধ্যানারম্ভকালে সবিতার নিকট প্রার্থনা করিতে- ‘ছেন,] সবিতা(ধ্যানে প্রবৃত্ত আমার) মনকে প্রথমে পরমাত্মার সহিত সংযোজিত করুন, পশ্চাৎ ইন্দ্রিয়ের অনুগ্রাহক অগ্নিপ্রভৃতি দেবতার প্রকাশন- সামর্থ্য বিচার করিয়া অর্থাৎ তাঁহাদের প্রকাশনশক্তি বাহ্য বিষয় হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া তত্ত্বপ্রকাশনের নিমিত্ত আমার বুদ্ধিবৃত্তিকে পৃথিবীর বাহিরে এই দেহে আহরণ করুন। অভিপ্রায় এই যে, প্রথমে আমার মনকে পরমাত্মবিষয়ে নিয়োজিত করুন। অনন্তব ইন্দ্রিয়ের অধিদেবতাগণের প্রকাশশক্তি শব্দাদি বিষয় হইতে নিবৃত্ত করুন, তাহার পর যাহাতে আত্মতত্ত্ব-চিন্তাসম্পন্ন হইতে পারি, তাহার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিকেও পার্থিব চিন্তা হইতে সরাইয়া শরীরমধ্যে আত্মবিষয়ে স্থাপন করুন ॥২৷৷১৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।—ধ্যানমুক্তং ধ্যাননিৰ্ম্মথনাভ্যাসাদ দেবং পশ্যেন্নিগূঢ়- বদিতি পরমাত্মদর্শনোপায়ত্বেন। ইদানীং তদপেক্ষিতসাধনবিধানার্থ দ্বিতীয়োহ- ধ্যায় আরভ্যতে। তত্র প্রথমং তৎসিদ্ধ্যর্থং সবিতাবমাশাস্তে—যুঞ্জান ইতি। যুঞ্জানঃ প্রথমং মনঃ—প্রথমং ধ্যানারম্ভে মনঃ পরমাত্মনি সংযোজনীয়ং, ধিয় ইতরানপি প্রাণান্, “প্রাণা বৈ ধিয়ঃ” ইতি শ্রুতেঃ। অথবা ধিয়ঃ বাহ্যবিষয়াঃ জ্ঞানানি। কিমর্থম্? তত্ত্বায় তত্ত্বজ্ঞানায় সবিতা ধিয়ো বাহ্যবিষয়জ্ঞানাৎ অগ্নেঃ জ্যোতিঃ প্রকাশং নিচায্য দৃষ্ট্বা পৃথিব্য অধি অস্মিন্ শরীরে আভরত আহরৎ। এতদুক্তং ভবতি—জ্ঞানে প্রবৃত্তস্য মম মনঃ বাহ্যবিষয়জ্ঞানাদুপসংহৃত্য পরমাত্মন্যেব সংযোজয়িতুমনুগ্রাহকদেবতাত্মনামগ্ন্যাদীনাং যৎ সর্ব্ববস্তুপ্রকাশনসামর্থ্যং, তৎ সর্ব্ব- ‘মম্মদ্বাগাদিষু সম্পাদয়েৎ সবিতা, যৎপ্রসাদাদবাপ্যতে যোগ ইত্যর্থঃ। অগ্নিশব্দ ইতরাসামপ্যনুগ্রাহক দেবতানামুপলক্ষণার্থঃ ॥ ২॥১ ॥
ভাষ্যানুবাদ। ইতঃ পূর্ব্বে প্রথমাধ্যায়ে “ধ্যাননিৰ্ম্মথনাভ্যাসাৎ” ইত্যাদি বাক্যে পরমাত্ম-দর্শনের উপায়রূপে ধ্যানের কথা বলা হইয়াছে। এখন
সরলার্থি। বয়ং দেবস্য সবিতুঃ সথে সতি(অনুমত্যাং সত্যাং) যুক্তেন (সবিত্রা পরমাত্মনি সংযোজিতেন) মনসা সুবর্গেয়ায়(স্বর্গপ্রাপ্তিহেতুভূতায় ধ্যান- কর্ম্মণে) শক্ত্যা(যথাশক্তি)[প্রযত্নং কুৰ্ম্ম ইতিশেষঃ]॥২৷৷২॥
মূলানুবাদ। আমরা প্রকাশমান সবিতার অনুমতিক্রমে পরমাত্মায় সংযোজিত মনের সাহায্যে পরমাত্মধ্যানের হেতুভূত ধ্যানকার্য্যে যথাশক্তি প্রযত্ন করিতেছি ॥২॥২৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।-যুক্তেনেতি। যদা তত্ত্বায় মনো যোজয়ন্ননুগ্রাহক- শক্ত্যাধানেন দেহেন্দ্রিয়দার্য্যং করোতি, তদা যুক্তেন সবিত্রা পরমাত্মনি সংযো- জিতেন মনসা বয়ং তস্য দেবস্য সবিতুঃ সবেহনুজ্ঞায়াং সত্যাং সুবর্গেয়ায় স্বর্গ- ধ্যানের উপযোগী সাধনসমূহ নির্দেশের জন্য দ্বিতীয় অধ্যায় আরব্ধ হইতেছে। সেই ধ্যানসিদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রথমতঃ সবিতার নিকট প্রার্থনা করা হইতেছে— “যুঞ্জানঃ” ইত্যাদি। “যুঞ্জানঃ প্রথমং মনঃ” অর্থাৎ প্রথমতঃ ধ্যানের প্রারম্ভে মনকে এবং “ধিয়ঃ”— অপরাপর প্রাণকেও(ইন্দ্রিয়কেও) পরমাত্মাতে সংযোজিত করিতে হইবে। ‘প্রাণসমূহই ধী’ এই শ্রুতিতে প্রাণ অর্থেও ‘ধী’ শব্দ পঠিত হইয়াছে। অথবা ‘ধিয়ঃ’ অর্থ বাহ্য পদার্থবিষয়ক জ্ঞানসমূহ। কিসের জন্য?—পরমাত্ম- বিষয়ে সংযোজনের উদ্দেশ্য কি? তত্ত্ব-জ্ঞানের জন্য। সবিতা(সূর্য্যদেব) (ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতৃ দেবতাগণের) জ্যোতিঃপ্রকাশ অর্থাৎ বস্তুপ্রকাশনসামর্থ্য দর্শন করিয়া তত্ত্বজ্ঞানের নিমিত্ত উহা বাহ্য বিষয় বিজ্ঞান হইতে পৃথিবীর উৎকৃষ্ট বস্তু এই শরীরে আহরণ করিয়াছেন(সংস্থাপন করুন)। এই কথা বলা হইতেছে যে, আমি জ্ঞানানুশীলনে প্রবৃত্ত হইয়াছি।[এ সময়ে সবিতা] আমার মনকে বাহ্য বিষয়সম্পর্কিত জ্ঞান হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া, পরমাত্মাতে সংযোজিত করিবার নিমিত্ত ইন্দ্রিয়সমূহের অনুগ্রাহক অগ্নি- প্রভৃতি দেবতার যে, সর্ব্ববস্তু প্রকাশ করিবার শক্তি আছে, সেই সমস্ত শক্তি আমার বাক্ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ে সন্নিবেশিত করুন, যাহার প্রসাদে আমার যোগসিদ্ধি অধিগত হইবে। এখানে অগ্নি-শব্দটী অপরাপর ইন্দ্রিয়দেবতারও উপলক্ষণ (বোধক)(১) ॥ ২। ১ ॥
(১) জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্ম্মেন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ, এ সমস্তই ইন্দ্রিয়-পদবাচ্য। প্রত্যেক ইন্দ্রিয়েরই কার্য্যশক্তি নিয়মিত করিবার জন্য এক একটা দেবতা আছে। ঐ সকল দেবতাকে ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতা বলে। বাগিন্দ্রিয়ের দেবতা হইতেছেন—অগ্নি। এখানে মূলে কেবল অগ্নির মাত্র নামোল্লেখ আছে, অন্য কোনও দেবতায় নাম নাই। অন্যান্য দেবতাকেও ঐ অগ্নি-শব্দে ধরিয়া লইতে হইবে। এই জন্য উপলক্ষণ কথা বলা হইয়াছে।
যুক্তায় মনসা দেবান্ সুবৰ্য্যতো ধিয়া দিবম্। বৃহজ্জ্যোতিঃ করিষ্যতঃ সবিতা প্রসুবাতি তান্ ॥ ২॥৩৷৷
সরলার্থঃ। সবিতা যুক্তায়(যোজয়িত্বা) মনসা সুবঃ(স্বঃ-ব্রহ্মানন্দং) যতঃ(গচ্ছতঃ) তান্(পূর্ব্বোক্তান্) দেবান(মনঃপ্রভৃতীনি করণানি, তদধি- দৈবতানি চ) ধিয়া(সম্যক্ জ্ঞানেন) বৃহৎ(মহৎ) জ্যোতিঃ(প্রকাশাত্মকং ব্রহ্ম) করিষ্যতঃ(অনুভবিষ্যতঃ তৎসমর্থান্) প্রসুবাতি(অনুজানাতু করোতু ইতিযাবৎ ॥২॥৩৷৷
মূলানুবাদ। সবিতৃদেব[আমায়] মনকে পরমাত্মায় সংযোজিত করিয়া পরমাত্মাভিগামী সেই দেবগণকে অর্থাৎ মন ও ইন্দ্রিয়গণকে বিবেকবুদ্ধির সাহায্যে বৃহৎজ্যোতিঃ(প্রকাশময়) ব্রহ্মানুভবের উপযুক্ত করুন। অভিপ্রায় এই যে, সবিতার অনুগ্রহে আমার ইন্দ্রিয়গণ বিষয় হইতে নিবৃত্ত হইয়া আত্মার স্বরূপপ্রকাশে সমর্থ হউক ॥২৷৷৩৷৷
প্রাপ্তিহেতুভুতায় ধ্যানকর্ম্মণে যথাসামর্থ্যং প্রযতামহে। পরমাত্মবচনোহত্র স্বর্গশব্দঃ, তৎপ্রকরণাৎ, তস্যৈব সুখরূপত্বাৎ, তদংশত্বাচ্চেতরস্য সুখস্য। তথা চ শ্রুতিঃ—“এতস্যৈবানন্দস্যান্যানি ভূতানি মাত্রামুপজীবন্তি” ইতি ॥ ২॥১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—যুক্তায়েতি। পুনরপি সোহপ্যেবং করোহিতি প্রার্থনা। যুক্তায় যোজয়িত্বা দেবান্ মনআদীনি করণানি, তেষাং বিশেষণম সুবঃ স্বর্গং সুখং পূর্ণানন্দব্রহ্ম, যত ইতি দ্বিতীয়াবহুবচনম্, পূর্ণানন্দব্রহ্ম গচ্ছতঃ, ন শব্দাদিবিষয়ান্। পুনরপি বিশেষণান্তবং—সম্যদর্শনেন দিবং দ্যোতনস্বভাবং চৈতন্যৈকবসং বৃহৎ মহদ্ ব্রহ্ম জ্যোতিঃ প্রকাশং করিষ্যতঃ পূর্ণানন্দব্রহ্মাবিষ্করিষ্যতঃ। অত্র দ্বিতীয়াবহু- বচনম্। সবিতা প্রসুবাতি তান্—তানি করণানি। যথা করণানি বিষয়েভ্যো নিবৃত্তানি আত্মাভিমুখানি আত্মপ্রকাশমেব কুৰ্য্যঃ, তথানুজানাতু সবিতে- ত্যর্থঃ ॥ ২॥৩॥
ভাষ্যানুবাদ। “যুক্তেন” ইতি। সাধক যখন তত্ত্বজ্ঞান লাভের নিমিত্ত মনঃসংযোজনপূর্ব্বক অনুগ্রাহক(ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতা) দেবতাগণের শক্তি-সঞ্চারের ফলে দেহ ও ইন্দ্রিয়ের দৃঢ়তা সম্পদান করেন, তখন পরমাত্মবিষয়ে যুক্ত—সংযোজিত মনের সাহায্যে সেই সবিতৃদেবের অনুজ্ঞা প্রাপ্ত হইলে পর, সুবর্গেয়ের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ সুবর্গের-পদবাচ্য পরমাত্মার প্রাপ্তি বিষয়ে উপায়স্বরূপ ধ্যান-কার্য্যে আমরা যথাশক্তি যত্ন করিব। এখানে ‘সুবর্গেয়’ শব্দের অর্থ পরমাত্মা, কারণ, ইহা পরমাত্মার প্রকরণে পঠিত, এবং পরমাত্মাই প্রকৃত সুখ, অন্যান্য সুখ তাহারই অংশ মাত্র। শ্রুতি বলিতেছেন —‘অন্যান্য প্রাণিসকল এই আনন্দেরই মাত্রা বা অংশ মাত্র উপভোগ করিয়া থাকে’ ইত্যাদি ॥ ২॥ ২॥ ভাষ্যানুবাদ। নিম্নোল্লিখিত ক্রিয়া সম্পাদনের নিমিত্ত পুনরায় সবিতার নিকট প্রার্থনা করা হইতেছে। সবিতা[আত্মাকে] মনের সহিত
৯৬
যুঞ্জতে মন উত যুঞ্জতে ধিয়ো- বিপ্রা বিপ্রস্য বৃহতো বিপশ্চিতঃ। বি হোত্রা দধে বয়ুনাবিদেক ইন্মহী দেবস্য সবিতুঃ পরিষ্টুতিঃ ॥ ২॥৪ ॥
সরলার্থঃ।[ এবমনুজানতস্তস্য সবিতু স্তুতিঃ কর্ত্তব্যা ইত্যাহ[যে] বিপ্রাঃ(ব্রাহ্মণাঃ) মনঃ যুঞ্জতে, ধিয়ঃ(অপরান্যপি করণানি) যুঞ্জতে(পরমাত্মনি যোজয়ন্তি),[তৈঃ বিপ্রৈঃ] বায়ুনাবিৎ(প্রজ্ঞানবিৎ, সর্ব্বস্য সাক্ষিভূতইত্যর্থঃ।) একঃ(অদ্বিতীয়ঃ)[যঃ দেবঃ] হোত্রাঃ(হোতৃসাধ্যাঃ ক্রিয়াঃ) বিদধে (বিধত্তে),[তস্য] বিপ্রস্থ্য(ব্যাপকস্য) বৃহতঃ(মহতঃ) বিপশ্চিতঃ(সর্ব্ব- দর্শিনঃ) দেবস্য(প্রকাশস্বভাবস্য) সবিতুঃ ইং(ইত্থং) মহতী পরিষ্টুতিঃ (স্তুতিঃ)[কর্ত্তব্যা ইতি শেষঃ] ॥২॥৪॥
মূলানুবাদ। সবিতৃদেব এই প্রকারে অনুমতি প্রদান করায় বিশেষ- ভাবে তাহার স্তুতি করা আবশ্যক, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—[যে সকল] বিপ্র মন ও ইন্দ্রিয়গণকে পরমাত্মাতে সংযোজিত করেন,[তাহাদের] যিনি সর্ব্বজ্ঞ সর্ব্বসাক্ষী এবং সমস্ত যজ্ঞাদি ক্রিয়ার প্রবর্ত্তক(বিধাতা), সেই ব্যাপক মহৎ ও সর্ব্বদর্শী সবিতৃদেবের বিশেষভাবে স্তুতি করা আবশ্যক ॥২॥৪॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তস্যৈবমনুজানতো মহতী পরিষ্টুতিঃ কর্ত্তব্যেত্যাহ— যুঞ্জত ইতি। যুঞ্জতে যোজয়ন্তি যে বিপ্রা মনঃ, উত যুঞ্জতে ধিয়ঃ—ইতরাণ্যপি করণানি। ধীহেতুত্বাৎ করণেষু ধীশব্দপ্রয়োগঃ। তথা চ শ্রুত্যন্তরম্ “যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সহ” ইতি। বিপ্রস্থ্য বিশেষেণ ব্যাপ্তস্থ্য বৃহতো মহতো বিপশ্চিতঃ সর্ব্বজ্ঞস্য দেবস্য সবিতুম্মহী মহতী পরিষ্টুতিঃ কর্ত্তব্যা। কৈঃ? বিপ্রৈঃ। পুনরপি বিশিনষ্টি—বি হোত্রা দধে। হোত্রাঃ ক্রিয়া যো বিদধে, বয়ুনাবিৎ প্রজ্ঞাবিৎ সর্ব্বজ্ঞানাৎ সাক্ষিভূত এযোহদ্বিতীয়ঃ। যে বিপ্রা মন আদিকরণানি বিষয়েভ্য উপসংহ্যতাত্মন্যেব যোজয়ন্তি, তৈর্ব্বিপ্রস্থ্য বৃহতো বিপশ্চিতো মহতী পরিষ্টুতিঃ কর্ত্তব্যা। হোত্রা বিদধে বয়ুন্যাবদেকঃ সবিতা ॥ ২॥৪ ॥
সংযোজিত করিয়া দেবগণকে অর্থাৎ মনপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণকে প্রকাশময়— একমাত্র চৈতন্যস্বরূপ স্বর্গ-শব্দবাচ্য সুখরূপী পূর্ণ আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মগামী করুণ। এবং উহারা যাহাতে শব্দস্পর্শাদি বিষয়ের দিকে না যায়, এবং সম্যজ্ঞান দ্বারা(তত্ত্বজ্ঞানের সাহায্যে) যাহাতে বৃহৎ(মহৎ) প্রকাশাত্মক পূর্ণ আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মকে আবিষ্কার করিতে পারে, তাহাদিগকে সেইরূপ করুন। ইন্দ্রিয়গণ যাহাতে শব্দাদি বিষয় হইতে বিমুখ হইয়া এবং আত্মাভিমুখ হইয়া আত্মাকে প্রকাশ করে, সাবতা সেইরূপ করুন ॥ ২॥৩॥ ভাষ্যানুবাদ। সেই সবিতা এই ভাবে অনুজ্ঞা প্রদান করায় বিশেষরূপে তাহার স্তুতি করা আবশ্যক, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—যুঞ্জুতে
যুজে বাং ব্রহ্ম পূর্ব্যং নমোভি- বিশ্লোক এতু পথ্যেব সূরেঃ। শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা- আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থুঃ ॥ ২॥৫ ॥
সরলার্থঃ।[হে করণ-তদনুগ্রাহকৌ,] বাং(যুবয়োঃ সম্বন্ধি—প্রকাশ্যং) পূর্ব্বং(পূর্ব্বে ভবং শাশ্বতমিতি যাবৎ) ব্রহ্ম যুজে(অহং সমাদধে সমাধি- বিষয়ং করোমি), নমোভিঃ(নমস্কারৈঃ) সুরেঃ(পণ্ডিতস্য) পথি এব *(সম্মার্গে এব) বিশ্লোকঃ(বিশেষেণ স্তুতিঃ) এতু(ভবতু)। যে দিব্যানি (‘প্রকাশময়ানি) ধামানি(স্থানানি) আ তস্থঃ(অধিতিষ্ঠন্তি),[তে] বিশ্বে (সর্ব্বে) অমৃতস্য(হিরণ্যগর্ভাত্মনঃ ব্রহ্মণঃ) পুত্রাঃ শৃণ্বন্তু[মম শ্লোকবচনমিতি শেষঃ] ॥২॥৫৷৷
মূলানুবাদ।[হে করণবর্গ ও তদধিষ্ঠাতৃ দেবগণ,] তোমাদিগকে শাশ্বত ব্রহ্মের সহিত সংযোজিত বা সমাহিত করিতেছি। নমস্কার দ্বারা আমার শ্লোক বা স্তুতিগান বিস্তৃত হউক। যাহারা দিব্যধামসকল অধিকার করিয়া রহিয়াছেন, হিরণ্যগর্ভসম্ভূত সেই বিশ্বেদেবগণ[আমার সেই স্তুতিগান] শ্রবণ করুন ॥২॥৫॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—কিঞ্চ, যুজে বামিতি। যুজে বাং সমাদধে বাং যুবয়োঃ করণানুগ্রাহকয়োঃ সম্বন্ধি প্রকাশ্যত্বেন তৎপ্রকাশিতং ব্রহ্মেত্যর্থঃ। অথবা বামিতি বহুবচনার্থে, যুগ্মাকং কারণভূতং ব্রহ্ম, পূর্ব্বাং চিরন্তনং যুজে সমাদধে। নমোভিন্ন মস্কারৈশ্চিত্তপ্রণিধানাদিভিঃ। এষ এবং সমাদধানস্য মম শ্লোকঃ
ইত্যাদি। যে সকল বিষয়ে মনকে সংযোজিত করেন, এবং অপরাপর ইন্দ্রিয়কেও [ধিয়ঃ] সংযোজিত করেন, সেই বিপ্রের বিপ্র—বিশেষরূপে পরিব্যাপ্ত, বৃহৎ —মহৎ ও বিপশ্চিৎ অর্থাৎ সর্ব্বজ্ঞ দেবতা সবিতার মহতী স্তুতি করা আবশ্যক। পুনশ্চ সেই সবিতাকেই বিশেষ করিয়া বলা হইতেছে যে, যিনি বয়ুনাবিৎ—প্রজ্ঞা- ভিজ্ঞ অর্থাৎ সর্ব্বজ্ঞতানিবন্ধন সকলের সাক্ষিস্বরূপ ও অদ্বিতীয়; সেই সবিতাই সমস্ত হোত্র ক্রিয়া অর্থাৎ হোতৃসাধ্য যজ্ঞাদি ক্রিয়া বিধান করিয়া থাকেন (সম্পাদন করেন)। সংক্ষিপ্তার্থ এই যে, যে সকল বিপ্র মনঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয় বর্গকে বিভিন্ন বিষয় হইতে প্রত্যাহরণপূর্ব্বক আত্মাতে যোজিত করেন, তাহাদের সর্বব্যাপী বৃহৎ বিপশ্চিতের(সর্ব্বজ্ঞ সবিতার) স্তুতি করা উচিত। সর্বজ্ঞানের সাক্ষীরূপী এক—অদ্বিতীয় সবিতা দেবই হোমাদি ক্রিয়া নিষ্পাদন করিয়া থাকেন। উপবে যে, ‘ধিয়ঃ’ শব্দের ‘করণানি’(ইন্দ্রিয়গণ) অর্থ করা হইল, তদ্বিষয়ে ‘যখন পঞ্চ জ্ঞান অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রিয়পঞ্চক মনের সহিত অবস্থান করে’ এই শ্রুত্যন্তর-বাক্যই প্রমাণ।[এখানে ইন্দ্রিয়কে জ্ঞান বলা হইয়াছে। জ্ঞান ও ধী একই বস্তু; সুতরাং ‘ধিয়ঃ’ কথায় ইন্দ্রিয়রূপ অর্থ করা অন্যায় হয় নাই]॥২॥৪॥
১৩
সরলার্থঃ।[সবিতৃপ্রার্থনামন্তরেণ যোগপ্রবৃত্তস্য কর্ম্মণ্যের প্রবৃত্তি- দুর্দ্দর্বারা ভবতীত্যত আহ—অগ্নির্য্যত্রেতি। যত্র(যস্মিন্ যজ্ঞাদিরূপে কর্মণি) অগ্নিঃ অভিমথ্যতে(অরণিমথনেনোৎ- পাদ্যতে), যত্র বায়ুঃ(প্রাণবায়ুঃ) অধিরুধ্যতে(প্রাণায়ামেণ নিরুধ্যতে), যত্র চ সোমঃ অতিবিচ্যতে(আধিক্যেন প্রবর্ত্ততে), তত্র(তথাবিধে কর্মণি) মনঃ সংজায়তে(মনঃপ্রবৃত্তির্ভবতীত্যর্থঃ) ॥২॥৬৷৷
মূলানুবাদ।[যে বাক্তি সবিতার প্রার্থনা না করিয়া—তাঁহার অনুমতি না লইয়া যোগে প্রবৃত্ত হয়, তাহার যোগপ্রবৃত্তি ফলতঃ ভোগজনক কর্মানুষ্ঠানেই পরিণত হয়। এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—] যাহাতে অগ্নি মথিত হয়, যাহাতে বায়ু নিরুদ্ধ হয় অর্থাৎ প্রাণায়াম করিতে হয়, এবং যাহাতে যজ্ঞীয় সোম অধিকমাত্রায় হয়, সেইরূপ কর্ম্মেতে মন যায় অর্থাৎ তাদৃশ কর্মানুষ্ঠানেই তাহার প্রবৃত্তি ঘটে ॥২॥৬৷৷
কীর্তিতব্য এতু বিবিধমেতৃ পথ্যের সুবেঃ পথি সন্মার্গে। অথবা পথ্যা কীর্তি- রিত্যেতদ্বাক্যং প্রার্থনারূপং শৃণ্বন্ত বিশ্বে অমৃতস্য ব্রহ্মণঃ পুত্রাঃ সুরাত্মনো হিরণ্য- গর্ভস্য। কে তে? যে ধামানি দিব্যানি দিবিভবান্যাতস্থবধিতিষ্ঠন্তি ॥ ২॥৫ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্।—যুঞ্জানঃ প্রথমং মন ইত্যাদিনা সবিত্রাদিপ্রার্থনা প্রতি- পাদিতা। যস্তু পুনঃ প্রার্থনামকৃত্বা তৈরননুজ্ঞাতঃ সন্ যোগে প্রবর্ত্ততে, স ভোগ- হেতৌ কর্ম্মণ্যের প্রবর্ত্তত ইত্যাহ—অগ্নির্যত্রেতি। অগ্নির্যত্রাভিমথ্যতে আধানাদৌ। বায়ুর্যত্রাধিরুধ্যতে প্রবর্গ্যাদৌ। সবিত্রা প্রেরিতঃ শব্দমভিব্যক্তং করোতি। সোমো যত্র দশাপবিত্রাৎ পূর্য্যমাণোহতিরিচ্যতে, তত্র ক্রতৌ সঞ্জায়তে মনঃ ॥২॥৬॥ অগ্নিরত্রাভিমথ্যত ইত্যত্রাপরা ব্যাখ্যা। অগ্নিঃ পরমাত্মা, অবিদ্যাতৎ- কার্য্যস্য দাহকত্বাৎ। উক্তঞ্চ—“অহমজ্ঞানজং তমঃ। নাশসাম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞান- দীপেন ভাস্বতা” ইতি। যত্র যস্মিন্ পুরুষে মথ্যতে স্বদেহমরণিং কৃত্বেত্যাদিনা পূর্ব্বোক্তধ্যাননিৰ্ম্মথনেন, বায়ুর্যত্রাধিরুধ্যতে শব্দমব্যক্তং করোতি, রেচকাদি- করণাৎ। সোমো যত্রাতিবিচ্যতেহনেকজন্মসেবয়া, তত্র তস্মিন্ যজ্ঞদানতপঃ- প্রাণায়ামসমাধিবিশুদ্ধান্তঃকরণে সঞ্জায়তে পরিপূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মাকারং মনঃ সমুৎপদ্যতে, নান্যত্রাহশুদ্ধান্তঃকরণে। উক্তঞ্চ—
“প্রাণায়ামবিশুদ্ধাত্মা যস্মাৎ পশ্যতি তৎ পরম্। ‘তস্মান্নাতঃ পরং কিঞ্চিৎ প্রাণায়ামাদিতি শ্রুতিঃ। অনেকজন্মসংসারচিতে পাপসমুচ্চয়ে। তৎক্ষীণে জায়তে পুংসাং গোবিন্দাভিমুখী মতিঃ ॥ জন্মান্তরসহস্রেযু তপোজ্ঞানশমাদিভিঃ। নরাণাং ক্ষীণপাপানাং কৃষ্ণে ভক্তিঃ প্রজায়তে ॥”
তস্মাৎ প্রথমং যজ্ঞাদ্যনুষ্ঠানং, ততঃ প্রাণায়ামাদি, ততঃ সমাধিঃ, ততো বাক্যার্থজ্ঞাননিষ্পত্তিঃ, ততঃ কৃতকৃত্যতেতি ॥ ২॥৬ ॥
ভাষ্যানুবাদ। আরও; “যুজে বাম্” ইত্যাদি[হে করণবর্ণ ও তদনুগ্রাহক দেবতাগণ,] তোমরা যে ব্রহ্মতত্ত্ব প্রকাশ করিয়াছ, আমি নমস্কার দ্বারা অর্থাৎ চিত্তপ্রণিধানাদি দ্বারা, সেই পূর্ব্ববর্তী—চিরন্তন ব্রহ্মে সমাধি করিতেছি, অথবা তোমাদিগকে তাঁহাতে মিলিত করিতেছি। অথবা ‘বাং’ পদটী দ্বিতীয়ার বহুবচনান্ত। তোমাদের—করণবর্গ ও দেবতাগণের কারণস্বরূপ চিরন্তন ব্রহ্মে আমি সমাধি করিতেছি[অভিন্নরূপে চিন্তা করিতেছি]। সৎপথে বর্তমান বিজ্ঞব্যক্তির ন্যায় এইরূপে সমাধিকারী আমার এই শ্লোক—যাহা আমি স্তুতিরূপে কীর্ত্তন করিব, তাহা বিবিধ ভাব(বিস্তৃতি) লাভ করুক। অথবা ব্রহ্ম-স্তুতি-প্রকাশক “পথ্যা কীর্ত্তিঃ” অর্থাৎ বাক্য—অমৃতের—মরণ রহিত ব্রহ্মের দেবরূপী হিরণ্যগর্ভের পুত্র বিশ্বদেবগণ—যাহাবা দিব্যধাম সমূহ—স্বর্গীয় স্থান সকল অধিকার করিয়া রহিয়াছেন॥ ২॥৫॥ ভাষ্যানুবাদ। “যুঞ্জানঃ প্রথমং মনঃ” ইত্যাদি মন্ত্রে সবিতৃপ্রভৃতির ‘প্রার্থনা উক্ত হইয়াছে, কিন্তু যে লোক প্রার্থনা না করিয়া এবং তাঁহাদের অনুমতি প্রাপ্ত না হইয়া যোগ-সাধনায় প্রবৃত্ত হয়,[বুঝিতে হইবে,] সে লোক প্রকৃত পক্ষে ভোগসাধন—যাহা দ্বারা বিষয়-ভোগ পাওয়া যায়, সেই রকম কর্ম্মেই প্রবৃত্ত হয়,(যোগে নহে), এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—“অগ্নিরিত্র” ইত্যাদি। যাহাতে আধানাদি নিমিত্তে(অগ্নিচয়নের জন্য) অগ্নিকে মথন করিতে হয়, অর্থাৎ অগ্নি-উৎপাদনের জন্য কাষ্ঠ ঘর্ষণ করা হয়, যাহাতে প্রবর্গ্যাদি কার্য্যে(বায়ুর স্তুতি প্রভৃতি কার্য্যে) বায়ুর নিরোধ করা হয়, তেজোময় সবিতার প্রেরণায় শব্দের অভিব্যক্তি(স্পষ্ট উচ্চারণ) হয়, এবং যাহাতে— পবিত্র সোম দশাপবিত্র হইতে অতিরিক্ত হয়(অধিক হইয়া পড়ে), সেই ক্রতুতে—যজ্ঞে তাহার মন যায়। অভিপ্রায় এই যে, সবিতৃপ্রার্থনাহীন ব্যক্তি যোগ-সাধনায় প্রবৃত্ত হইলেও তাহার মন যোগে নিরত না হইয়া অগ্নি প্রভৃতি-সাধ্য কর্মানুষ্ঠানের দিকেই ধাবিত হয় ॥ অথবা “অগ্নিরত্রাভিমথ্যতে” এই মন্ত্রের অন্যপ্রকার ব্যাখ্যা এইরূপ—অগ্নি অর্থ—পরমাত্মা; কারণ, অবিদ্যা ও অবিদ্যাকার্য্য পরমাত্মজ্ঞানে দগ্ধ হয়। এ কথা অন্যত্রও উক্ত আছে ‘আমিই(পরমাত্মা—ভগবান্) জীবের অন্তঃকরণে অবস্থিত হইয়া উজ্জ্বল জ্ঞান-দীপ দ্বারা অজ্ঞানসম্ভূত তমঃ(অন্ধকার) বিনাশ করি।’ যাহাতে—যে পুরুষে মথিত হয়, অর্থাৎ “স্বদেহং অরণিং কৃত্বা” ইত্যাদি বাক্যে পূর্ব্বে উক্ত ধ্যানরূপ মন্থান দ্বারা মথিত হয়, বায়ু যাহাতে অধিরুদ্ধ হয়, অর্থাৎ রেচকাদি ক্রিয়া সম্পাদন দ্বারা অব্যক্ত শব্দ উৎপাদন করে, এবং বহুজন্মের সাধনায় সোম যেখানে অতিরিক্ত হয়, যজ্ঞ দান তপস্যা প্রাণায়াম ও সমাধি দ্বারা বিশুদ্ধভাবাপন্ন সেই অন্তঃকরণে পরিপূর্ণ আনন্দময় অদ্বিতীয় ব্রহ্মাকারে মন সমুৎপন্ন হয় অর্থাৎ সেইরূপ অন্তঃকরণেই যোগোপযোগী মনসম্পন্ন হয়, কিন্তু অন্যত্র —অশুদ্ধ অন্তঃকরণে নহে। এ কথা অন্যত্রও উক্ত আছে—
সরলার্থঃ।—[ যস্মাৎ সবিতুরনুজ্ঞামপ্রাপ্তস্য ভোগজনকে কর্ম্মণ্যেব প্রবৃত্তিঃ স্যাৎ, তস্মাৎ—] প্রসবেন(শস্যাদ্যুৎপত্তি-কারণেন) সবিত্রা (করণেন) পূর্ব্বং(পূর্ব্বতনং নিত্যং) ব্রহ্ম জুযেত(সেবেত--উপাসীতে- ত্যর্থঃ)। তত্র(তস্মিন্ ব্রহ্মণি) যোনিং(নিষ্ঠাং—সমাধিং) কৃথসে(কুরুখ)। [ তৎফলমাহ—] তে(এবং কুর্ব্বতঃ তব) পূর্ত্তং(স্মার্ত্তং কৰ্ম্ম) নহি(নৈব) অক্ষিপৎ(ক্ষেপণং সংসারবন্ধং মা কার্ষীদিত্যর্থঃ) ॥২॥৭॥
মূলানুবাদ। যেহেতু সবিতার আজ্ঞা গ্রহণ ব্যতীত যোগপ্রবৃত্ত ব্যক্তির ভোগজনক কর্ম্মেই প্রবৃত্তি হয়,[সেই হেতু—] যোগী জগৎপ্রসবকারী সবিতার স্যহায্যে নিত্য ব্রহ্মের উপাসনা করিবে, এবং সেই ব্রহ্মবিষয়ে সমাধি করিবে।[তাহা হইলে] অনুষ্ঠিত পূর্ত্ত(স্মৃতিবিহিত) কৰ্ম্ম সংসার- বন্ধনের কারণ হইবে না ॥ ২॥৭ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্।--সবিত্রেতি। যস্মাদননুজ্ঞাতস্য তস্য ভোগহেতোঃ কর্মণ্যের প্রবৃত্তিঃ, তস্মাৎ সবিত্রা প্রসবেন শস্যপ্রসবেনেতি যাবৎ। জুষেত সেবেত ব্রহ্ম পূর্ব্বং চিরন্তনম্। তস্মিন্ ব্রহ্মণি যোনিং নিষ্ঠাং সমাধিলক্ষণাং কৃণসে কুরুঘ। এবং কুর্ব্বতো মম কিং ততো ভবতীত্যাহ নহি ত ইতি। ন হি তে পূর্ত্তং স্মার্ত্তং কৰ্ম্ম, ইষ্টং শ্রৌতঞ্চ কর্মাক্ষিপন্ ন পুনর্ভোগহেতোর্ব্বধাতি। জ্ঞানাগ্নিনা সবীজস্য দগ্ধত্বাৎ। উক্তঞ্চ—“যঘেষিকাতুলমগ্নৌ প্রোতং প্রদূয়েত, এবং হাস্য সর্ব্বে পাপ্নানঃ প্রদূয়ন্তে” ইতি। “জ্ঞানাগ্নিঃ সর্ব্বকৰ্ম্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা” ইতি চ॥ ২॥৭ ॥
যেহেতু প্রাণায়াম দ্বারা বিশুদ্ধচিত্ত পুরুষ সেই ব্রহ্মপদ দর্শন করিয়া থাকেন, সেই হেতু শ্রুতি বলিতেছেন—‘এই প্রাণায়াম অপেক্ষা আর শ্রেষ্ঠ সাধন কিছু নাই। সংসারে অনেক জন্ম-পরম্পরাক্রমে সঞ্চিত পাপসমূহ ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে, তবেই পুরুষের গোবিন্দাভিমুখে মতি জন্মে। সহস্র সহস্র জন্মে তপস্যা জ্ঞান ও সমাধি সাধনা দ্বারা মানুষের পাপক্ষয় হইলে পর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি জন্মে।’ অতএব প্রথমে যজ্ঞাদি কর্ম্মের অনুষ্ঠান, অনন্তর প্রাণারামাদি সাধন, পরে সমাধিসিদ্ধি, তদনন্তর ‘তত্ত্বমসি’ প্রভৃতি মহাবাক্যার্থবোধ, তাহার পর কৃত- কৃত্যভাব বা মুক্তি হইয়া থাকে ॥ ২॥৬॥ ভাষ্যানুবাদ। যেহেতু সবিতার অনুমতি ব্যতিরেকে যোগপ্রবৃত্ত পুরুষের ভোগজনক কর্ম্মেই প্রবৃত্তি হয়, সেই হেতু যোগী, যিনি সস্যসম্পদ্ প্রসব করেন(উৎপাদন করেন) তাহার সাহায্যে সেই চিরন্তন(নিত্য) ব্রহ্মের সেবা করিবে, এবং সেই ব্রহ্ম বিষয়ে সমাধি—চিত্তের একাগ্রতারূপ যোনি অর্থাৎ নিষ্ঠা স্থাপন করিবে।[যদি মনে কর] এরূপ করিলে আমার
ত্রিরুন্নতং স্থাপ্য সমং শরীরং হৃদীন্দ্রিয়াণি মনসা সন্নিবেশ্য। ব্রহ্মোড়পেন প্রতরেত বিদ্বান্ স্রোতাংসি সর্ব্বাণি ভয়াবহানি ॥২॥৮॥
সরলার্থঃ। স[ইদানীং “যোনিং কৃথসে” ইত্যত্রোক্তস্য সমাধেঃ প্রকারং দর্শয়তি “ত্রিরুন্নতম্” ইতি।][ বিদ্বান্] শরীরং ত্রিরুন্নতং(ত্রীণি বক্ষো শ্রীবাশিরাংসি উন্নতানি যস্মিন্),(তৎ) সমং(অবক্রং চ) স্থাপ্য(স্থাপয়িত্বা), মনসা(করণেন) ইন্দ্রিয়াণি(চক্ষুঃ প্রভৃতীনি) হৃদি(হৃদয়ে) সন্নিবেশ্য(সম্যক্ নিয়ম্য) ব্রহ্মোড়পেন(ব্রহ্ম এব উড়ুপংপ্লবঃ, তেন) ভয়াবহানি(তির্য্যগাদি- যোনি-জন্মহেতুত্বাৎ ভয়ংকরাণি) স্রোতাংসি(পুনরাবৃত্তিলক্ষণানি অবিদ্যাকাম- কৰ্ম্মাদীনি) প্রতরেত(অতিক্রামেৎ সংসারসরিতঃ পারং গচ্ছেদিত্যা- শয়ঃ) ॥ ২॥৮৷৷
মূলানুবাদ। যোগতত্ত্ববিদ্ পুরুষ বক্ষঃ, গ্রীবা ও মস্তক, এই অংশত্রয় সমুন্নত করিয়া অর্থাৎ কুঞ্চিত বা বক্রভাবাপন্ন না করিয়া শরীরকে সমসূত্রন্যায়ে সরলভাবে স্থাপন করিয়া, এবং মনের সাহায্যে ইন্দ্রিয়গণকে হৃদয়মধ্যে সন্নিবেশিত(নিরুদ্ধ) কবিয়া ব্রহ্মরূপ উড়ুপ দ্বারা অর্থাৎ প্রাণরূপ ভেলার সাহায্যে ভয়জনক সমস্ত সংসারস্রোত উত্তীর্ণ হইবেন ॥২॥৮॥
শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্র যোনিং কৃণস ইত্যুক্তং, কথং যোনিকরণ- মিত্যাশঙ্ক্য তৎপ্রকারং দর্শয়তি—ত্রিরুন্নতমিতি। ত্রীণ্যুন্নতানি উরোগ্রীবশিরাংসি উন্নতানি যস্মিন্ শরীরে, তৎ ত্রিরুন্নতং, সংস্থাপ্য সমং শরীরং, হৃদীন্দ্রিয়াণি মনসা সন্নিবেশ্য সন্নিয়ম্য, ব্রহ্মৈবোড় পন্তরণ- সাধনং, তেন ব্রহ্মোড়পেন। ব্রহ্মশব্দং প্রণবং বর্ণয়ন্তি। তেনোড়ুপস্থানীয়েন প্রণবেন, কাকাক্ষিবদুভয়ত্র সম্বধ্যতে। তেনোপসংহৃত্য তেন প্রতরেত অতি- ক্রমেৎ বিদ্বান্—স্রোতাংসি সংসারসরিতঃ স্বাভাবিকবিদ্যাকামকৰ্ম্মপ্রবর্তিতানি ভয়াবহানি প্রেততির্য্যগুদ্ধ প্রাপ্তিকরাণি পুনরাবৃত্তিভাঞ্জি ॥ ২॥৮ ॥
লাভ কি? তদুত্তরে বলিতেছেন “নহি তে” ইতি।[এইরূপ করিলে] স্মৃতিবিহিত পূর্ত্ত কৰ্ম্ম এবং শ্রুতিবিহিত ইষ্ট(যাগ যজ্ঞাদি) কৰ্ম্ম আর তোমায় ক্ষেপণ করিবে না, অর্থাৎ পুনরায় ভোগের জন্য তোমাকে আর আবদ্ধ করিবে না; কারণ, তখন জ্ঞানরূপ অগ্নি দ্বারা বীজ অবিদ্যার সহিত সমস্ত কৰ্ম্ম দগ্ধ হইয়া যায়। শ্রুতিতে উক্ত আছে যে, ঈষিকার(শরতৃণের) তুলা যেমন অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হইয়া দগ্ধ হয়, এইপ্রকার এই জ্ঞানীরও সমস্ত পাপ-পুণ্য কৰ্ম্ম ভস্মীভূত করে ইতি ॥২॥৭৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।—প্রাণায়ামক্ষয়িতমনোমলস্য চিত্তং ব্রহ্মণি স্থিতং ভবতীতি প্রাণায়ামো নিদ্দিশ্যতে। প্রথমং নাড়ীশোধনং কর্তব্যম্। ততঃ প্রাণায়ামেহধিকারঃ। দক্ষিণনাসিকাপুটমঙ্গুল্যাবষ্টভ্য বামেন বায়ুং পূরয়েদ্ যথা- শক্তি। ততোহনন্তরমুৎসৃজ্যৈবং দক্ষিণেন পুটেন সমুৎসৃজেৎ। সব্যমপি ধারয়েৎ। পুনর্দক্ষিণেন পূরয়িত্বা সব্যেন সমুৎসৃজেদ যথাশক্তি। ত্রিঃপঞ্চ- কৃত্বো বৈবমভ্যস্যতঃ সবনচতুষ্টয়মপররাত্রে মধ্যাহ্নে পূর্ব্বরাত্রেহদ্ধাত্রে চ পক্ষান্ মাসাদ্বিশুদ্ধির্ভবতি। ত্রিবিধঃ প্রাণায়ামঃ—রেচকঃ পূরকঃ কুম্ভক ইতি। তদেবাহ—
আসনানি সমভ্যস্য বাঞ্ছিতানি যথাবিধি। প্রাণায়ামং ততো গার্গি, জিতাসনগতোহভ্যসেৎ। মৃদ্বাসনে কুশান্ সম্যগাস্তীর্য্যামৃতমেব চ। লম্বোদরঞ্চ সম্পূজ্য ফলমোদকভক্ষণৈঃ। তদাসনে সুখাসীনঃ সব্যে ন্যস্যেতরং করম্। সমগ্রীবশিরাঃ সম্যক্ সংবৃতাস্যঃ সুনিশ্চলঃ। প্রাত্ম খোদম্মুখো বাপি নাসাগ্রন্যস্তলোচনঃ। অতিভুক্তমভুক্তঞ্চ বর্জয়িত্বা প্রযত্নতঃ। নাড়ীসংশোধনং কুর্যাদুক্তমার্গেণ যত্নতঃ। বৃথা ক্লেশো ভবেৎ তস্য তচ্ছোধনমকুর্ব্বতঃ। নাসাগ্রে শশভূদ্বীজং চন্দ্রাতপবিতানিতম্। সপ্তমস্য তু বর্গস্য চতুর্থং বিন্দুসংযুতম্। বিশ্বমধ্যস্থমালোক্য নাসাগ্রে চক্ষুষী উভে। ঈড়য়া পূরয়েদ্বাযুং বাহ্যং দ্বাদশমাত্রকৈঃ। ততোহগ্নিং পূর্ব্ববধ্যায়েৎ স্ফুরজ্জালাবলীযুতম্। রুষষ্ঠং[রেফং চ] বিন্দুসংযুক্তং শিখিমণ্ডলসংস্থিতম্। ধ্যায়েদ্বিরেচয়েদ্বাযুং মন্দং পিঙ্গলয়া পুনঃ। পুনঃ পিঙ্গলয়াপূর্য্য ঘ্রাণং দক্ষিণতঃ সুধীঃ তদ্বদ্বিরেচয়েদ্বায়ুমিড়য়া তু শনৈঃ শনৈঃ। ত্রিচতুর্ব্বৎসরঞ্চাপি ত্রিচতুর্মাসমেব বা। গুরুণোক্তপ্রকারেণ রহস্যেবং সমভ্যসেৎ। প্রাতৰ্মধ্যন্দিনে সায়ং স্নাত্বা ষট্কৃত্ব আচরেৎ। সন্ধ্যাদি কৰ্ম্ম কৃত্বৈবং মধ্যরাত্রেহপি নিত্যশঃ। নাড়ীশুদ্ধিমবাপ্পোতি তচ্চিহ্নং দৃশ্যতে পৃথক্। শরীরলঘুতা দীপ্তির্জঠরাগ্নিবিবর্দ্ধনম্। নাদাভিব্যক্তিরিত্যেতল্লিঙ্গং তচ্ছুদ্ধিসূচনম্। শুদ্ধ্যন্তি ন জপৈস্তে চ স্পর্শশুদ্ধেরহেতবঃ। প্রাণায়ামং ততঃ কুৰ্য্যাদ্রেচপূরককুম্ভকৈঃ। প্রাণাপানসমাযোগঃ প্রাণায়ামঃ প্রকীর্তিতঃ।
প্রণবত্র্যাত্মকং গার্গি, রেচপূরককুম্ভকম্। তদেতৎ প্রণবং বিদ্ধি তৎস্বরূপং ব্রবীম্যহম্। যদ্বেদাদৌ স্বরঃ প্রোক্তো বেদান্তেষু প্রতিষ্ঠিতঃ।। তয়োরন্তং তু যদগাগি, বর্গপঞ্চকপঞ্চমম্। রেচকং প্রথমং বিদ্ধি দ্বিতীয়ং পূবকং বিদুঃ। তৃতীয়ং কুম্ভকং প্রোক্তং প্রাণায়ামন্ত্রিবাত্মকঃ। ত্রয়াণাং কারণং ব্রহ্ম ভারূপং সর্ব্বকারণম্। রেচকঃ কুম্ভকো গার্গি, সৃষ্টিস্থিত্যাত্মকাবুভৌ। পূরকস্তথ সংহারঃ কারণং যোগিনামিহ। পূরয়েৎ ষোড়শৈর্মাত্রাইরাপাদতলমস্তকম্। মাত্রৈর্দ্ধাত্রিংশকৈঃ পশ্চাদ্রেচয়েৎ সুসমাহিতঃ। সম্পূর্ণকুম্ভবদ্বায়োর্নিশ্চলং মূন্নিদেশতঃ। কুম্ভকং ধারণং গার্গি, চতুঃষষ্ট্যা তু মাত্রয়া। ঋষয়স্ত বদন্ত্যন্যে প্রাণায়ামপরায়ণাঃ। পবিত্রভূতাঃ পূতাস্ত্রাঃ প্রভঞ্জনজয়ে রতাঃ। তত্রাদৌ কুম্ভকং কৃত্বা চতুঃষষ্ট্যা তু মাত্রয়া। রেচয়েৎ ষোড়শৈর্মাত্রৈন্যাসেনৈকেন সুন্দরি। তয়োশ্চ পূরয়েদ্বায়ুং শনৈঃ ষোড়শমাত্রয়া। প্রাণস্যায়মনত্ত্বেবং বশং কুৰ্য্যাজ্জয়ী বশঃ। পঞ্চ প্রাণাঃ সমাখ্যাতা বায়বঃ প্রাণমাশ্রিতাঃ। প্রাণো মুখ্যতমস্তেষু সর্ব্বপ্রাণভূতাং সদা। ওষ্ঠনাসিকয়োর্মধ্যে হৃদয়ে নাভিমণ্ডলে। পাদাঙ্গুষ্ঠাশ্রিতং চৈব সর্ব্বাঙ্গেযু চ তিষ্ঠতি। নিত্যং ষোড়শসঙ্খ্যাভিঃ প্রাণায়ামং সমভ্যসেৎ। মনসা প্রার্থিতং যাতি সর্ব্বপ্রাণজয়ী ভবেৎ। প্রাণায়ামৈৰ্দ্দহেদ্দোষান্ ধারণাভিশ্চ কিলিষান্। প্রত্যাহারাচ্চ সংসর্গং ধ্যানেনানীশ্ববান্ গুণান। প্রাণায়ামশতং স্নাত্বা যঃ করোতি দিনে দিনে। মাতাপিতৃগুরুম্নোহপি ত্রিভির্বর্ষৈর্ব্যপোহতি ॥২॥৮৷৷
ভাষ্যানুবাদ। ব্রহ্মনিষ্ঠ হইবার কথা বলা হইয়াছে। কি প্রকারে ব্রহ্মনিষ্ঠ হইতে হইবে, সেই আকাঙ্ক্ষায় তাহার প্রণালী প্রদর্শন করিতেছেন “ত্রিরুন্নতম্” ইত্যাদি। শরীরের বক্ষঃ(উরঃ) গ্রীবা ও মস্তক, এই তিনটী অংশ যাহাতে উন্নত হয়; এমনভাবে সমসূত্রে শরীর সংস্থাপন করিয়া এবং মনের সাহায্যে মন ও চক্ষুপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়সকলকে হৃদয়ে সন্নিবেশিত করিয়া, ব্রহ্মই উড়ুপ— সংসার-সাগর-সমুত্তরণের উপায়(ভেলা), সেই ব্রহ্মোড়প দ্বারা। আচার্য্যগণ ব্রহ্ম শব্দের প্রণব-অর্থও বর্ণনা করিয়া থাকেন। কাকাক্ষিন্যায়ে এই
প্রাণান্ প্রপীড্যেহ সংযুক্তচেষ্টঃ ক্ষীণে প্রাণে নাসিকয়োচ্ছ সীত। দুষ্টাশ্বযুক্তমিব বাহমেনং বিদ্বান্ মনো ধারয়েতাপ্রমত্তঃ ॥২॥৯৷৷
সরলার্থঃ। অথেদানীং প্রাণায়ামপ্রকারো নিৰ্দ্দিশ্যতে “প্রাণান্” ইত্যাদিনা। ইহ(যোগমার্গে প্রবৃত্তঃ) সংযুক্তচেষ্টঃ(সম্যক্ যুক্তা নিয়মিতা চেষ্টা প্রযত্নো যস্য, তথাবিধঃ), অপ্রমত্তঃ(সাবধানঃ সন্)[পঞ্চ] প্রাণান্) প্রপীড্য (পূরক কুম্ভক-রেচকক্রমেণ প্রাণ-সংযমৎ কৃত্বা) প্রাণে ক্ষীণে(দুর্ব্বলতাং গতে সতি) নাসিকয়া উচ্ছ্বসীত(স্বাসং ত্যজেৎ)। তথা দুষ্টাশ্বযুক্তং(অবশীভূতা- শ্বযুক্তং) বাহং(রথ-নিয়ন্তারং) ইব এনং(মনঃ) ধারয়েত(মূর্ত্তিবিশেষে মনো ধারণাং কুৰ্য্যাৎ) ॥ ২॥৯৷৷
মূলানুবাদ। এই যোগানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত বিদ্বান্ পুরুষ সংযুক্তচেষ্ট হইয়া অর্থাৎ যোগশাস্ত্রবিহিত নিয়মে আহারবিহারাদি কার্য্যে নিয়মযুক্ত থাকিয়া, এবং মনোযোগী থাকিয়া প্রাণবায়ু প্রপীড়ন অর্থাৎ পূরক ও কুম্ভক করিয়া প্রাণ( মন) শক্তিক্ষয়ে দুর্ব্বল হইলে পর নাসিকা দ্বারা শ্বাস ত্যাগ করিবে। অনন্তর দুষ্ট অশ্বযুক্ত রথের সারথির ন্যায়[ স্বভাবচঞ্চল] এই মনকে ধারণ করিবে অর্থাৎ কোন এক ধ্যেয়বস্তুতে মনঃ স্থাপন করিবে ॥২॥৯৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।—তদেতদাহ প্রাণানিত্যাদিনা। প্রাণান্ প্রপীড্যেহ যুক্তো নাত্যশ্নত ইতি শ্লোকোক্ত প্রকারেণ সংযুক্তাশ্চেষ্টা যস্য স সংযুক্তচেষ্টঃ। ক্ষীণে শক্তিহান্যা তনুত্বং গতে মনসি নাসিকায়াঃ পুটাভ্যাং শনৈঃ শনৈরুৎসৃজেৎ, ন মুখেন। বায়ুং প্রতিষ্ঠাপ্য শনৈন্মাসিকয়োৎসৃজেদিতি। উদাত্তাশ্বযুতং রথনিয়ন্তারমিব মননে মনো ধারয়েতাহপ্রমত্তঃ প্রণিহিতাত্মা চ ॥২॥৯৷৷
একই ব্রহ্ম-শব্দের সন্নিবেশ ও প্রতরণ উভয় স্থলেই সম্বন্ধ হইয়াছে।[তদনুসারে অর্থ হইতেছে] উড়ুপস্থানীয় সেই প্রণবের সাহায্যে ইন্দ্রিয়গণকে হৃদয়েসন্নিবেশ করিয়া, তাহা দ্বারাই প্রতরণ করিবে, অর্থাৎ স্বাভাবিক অবিদ্যা ও তন্মূলক কাম- কর্মাদি-সমুৎপাদিত প্রেত, তির্য্যক্(পশু পক্ষী) প্রভৃতি + উত্তমাধম যোনিতে জন্মের নিদান এবং পুনঃপুনঃ জন্মমরণময় সংসার-নদীর ভয়াবহ স্রোতঃ- সমূহ অতিক্রম করিবে ॥২॥৮৷৷
• ভাষ্যাসুবাদ। প্রাণায়াম দ্বারা যাহার মনের মল(রাগাদি) ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তাহারই মন ব্রহ্মে স্থিরতা লাভ করে, এই কারণে এখন প্রাণায়াম নির্দেশ করা হইতেছে—প্রথমতঃ নাড়ীশোধন করিতে হয়, পরে প্রাণায়ামে অধিকার জন্মে। অঙ্গুলীর অগ্রভাগ দ্বারা নাসিকার দক্ষিণ পুট (ভাগ) চাপিয়া ধরিয়া, বাম পুট দ্বারা যথাশক্তি বায়ু পূরণ করিবে,
অর্থাৎ বায়ু অকর্ষণ করিবে। তাহার পর(কুম্ভক করিবার পর) বাম নাসাপুট চাপিয়া ধরিয়া দক্ষিণ নাসাপুট ছাড়িয়া উহা দ্বারা বায়ু পরিত্যাগ করিবে। পুনরায় দক্ষিণ নাসিকা দ্বারা যথাশক্তি বায়ু পূরণ করিয়া পূর্ব্বের ন্যায় বাম নাসিকাপুটে বায়ু রেচন করিবে। যে লোক চারি সবনে(চারি সময়ে) শেষ রাত্রে, মধ্যাহ্ণে, পূর্ব্বরাত্রে(রাবির প্রথম ভাগে) ও অর্দ্ধরাত্রে এইভাবে প্রাণায়াম অভ্যাস করে, তাহার একপক্ষ কালের মধ্যে বা এক মাসের মধ্যে বিশুদ্ধি হইয়া থাকে। প্রাণায়াম তিন প্রকার বা তিনভাগে বিভক্ত—রেচক, পূরক ও কুম্ভক। ঋষিগণ তাহাই বলিয়াছেন— হে গার্গি, যোগী প্রথমতঃ নিজের অভিমত আসন সকল যথাবিধি অভ্যাস করিয়া অনন্তর আপনার আয়ত্ত আসনে অধিষ্ঠিত হইয়া প্রাণায়াম অভ্যাস করিবে। কোমল আসনে কুশ ও মৃগচর্ম্ম উত্তমরূপে আস্তরণ করিয়া ফল ও মোদকময় নৈবেদ্য দ্বারা লম্বোদরের(গণেশের) অর্চ্চনা করিয়া, সেই আসনে সুখোপবিষ্ট হইয়া বাম করের উপর দক্ষিণ কর স্থাপনপূর্ব্বক গ্রীবা ও শির সমোন্নত করিয়া নিশ্চলভাবে বসিবে, পরে মুখ মুদিত কবিযা পূর্ব্বমুখ বা উত্তরমুখ হইয়া নাসিকার অগ্রভাগে চক্ষু স্থাপন করিবে, অর্থাৎ নাসাগ্রে স্থিরদৃষ্টি হইবে। অতি ভোজন ও একেবারে অভোজন যত্নপূর্ব্বক বর্জন করিবে। যথোক্ত নিয়মানুসারে যত্নসহকারে নাড়ীশোধন করিবে। যে লোক নাড়ীশোধন না করিয়াই যোগাভ্যাসে রত হয়, তাহার বৃথা পরিশ্রমমাত্র লাভ হয়। চন্দ্র- কিরণোজ্জ্বল চন্দ্রবীজ(ঠ) এবং বর্গের সপ্তম ও চতুর্থ বর্ণকে(র ও ব) বিন্দু সংযুক্ত করিয়া নাসাগ্রে চক্ষুদ্বয় স্থাপন করিয়া ইড়া নাড়ীদ্বারা দ্বাদশমাত্রা ক্রমে বাহ্য বায়ু পূরণ করিবে। তাহার পর উজ্জ্বল শিখাসমূহসমন্বিত অগ্নির ধ্যান করত বিন্দু সংযুক্ত রেফ(ব) জপ করিতে করিতে ধীরে ধীরে পিঙ্গলা নাড়ীপথে নিরুদ্ধ বায়ু বিরেচন করিবে(‘ত্যাগ করিবে)। পুনরায় পিঙ্গলা নাড়ীপথে দক্ষিণ নাসিকা দ্বারা বায়ু পূরণ করিয়া ইড়ানাড়ীদ্বারা অল্পে অল্লে বায়ু বিরেচন করিবে। গুরুর উপদেশক্রমে এইভাবে তিন চারি বৎসর বা তিন চার মাস এইরূপ নির্জন স্থানে প্রাণায়াম অভ্যাস করিবে। প্রাতঃকালে, মধ্যাহ্ণে ও সায়ংসময়ে স্নানের পর ছয়বার করিয়া প্রাণায়াম করিবে, কিন্তু সন্ধ্যা প্রভৃতি নিত্য কৰ্ম্ম অগ্রে করিয়া লইবে। মধ্যরাত্রেও প্রত্যহ এইরূপ করিবে, তাহা হইলে নাড়ীশুদ্ধি সম্পন্ন হইবে। নাড়ীশুদ্ধি হইলে, তাহার পৃথক্ পৃথক্ চিহ্ন প্রকাশ পাইয়া থাকে। প্রথমে শরীরের লঘুতা(জড়তা নাশ), দীপ্তি(উজ্জ্বলতা), জঠরাগ্নিবৃদ্ধি(ক্ষুধাবোধ), এবং অস্পষ্ট ধ্বনিনামক নাদের দেহমধ্যে অভিব্যক্তি হইয়া থাকে। এই সকল চিহ্নই যোগীর নাড়ীশুদ্ধির পরিচায়ক। বহু জপেও নাড়ীশুদ্ধি হয় না; কারণ, উহারা নাড়ীশুদ্ধির কারণ বা উপায় নহে। অতএব রেচক পূরক ও কুম্ভকরূপ প্রাণায়াম করিবে। প্রাণ ও অপানের যে সংযোগ, তাহাই প্রাণায়াম নামে কথিত হয়। হে গাগি, প্রণবই এ্যাত্মক অর্থাৎ রেচক পূরক ও কুম্ভক এই তিনই প্রণব স্বরূপ। আমি সেই প্রণবের স্বরূপ বর্ণনা করিতেছি, তুমি তাহা অবধারণ কর।
১৪
বেদের আদিতে যে স্বরবর্ণ(অকার) উপদিষ্ট হইয়াছে, এবং বেদের অন্তেও যে স্বরবর্ণ(উকার) অবস্থিত আছে, তদুভয়ের অন্তে যে, পঞ্চম বর্গের(প বর্গের) পঞ্চম বর্ণ(ম্)[এই অ+উ+ম্ এর সমবায়ে প্রণব অক্ষর(ওঁম্) নিষ্পন্ন হইয়াছে]। প্রথমে রেচক(বায়ু ত্যাগ), দ্বিতীয় পূরক, এবং তৃতীয় হইতেছে কুম্ভক, এই ত্রিতয়াত্মক(তিনের সমষ্টি) হইতেছে প্রাণায়াম। সর্ব্বকারণ জ্যোতির্ময় ব্রহ্ম উক্ত তিনের(রেচক পূরক ও কুম্ভকের) কারণ। হে গার্গি, রেচক ও কুম্ভক হইতেছে সৃষ্টি ও স্থিতিস্বরূপ, আয় পূরক হইতেছে সংহাররূপী; ইহাই যোগীগণের সিদ্ধির কারণ। হে গার্গি, প্রথমে ষোড়শ(১৬) মাত্রাক্রমে পূরক করিবে, মস্তক হইতে পাদতলপর্যন্ত সে বায়ুর স্পর্শানুভূতি হইবে, পরে চৌষট্টি মাত্রায় কুম্ভক করিবে, তখন পূর্ণ কুম্ভের ন্যায় বায়ু নিশ্চল, ভাবে মস্তকভাগে স্থিরতা লাভ করে, তাহার পর দ্বাদশ মাত্রাক্রমে খুব সাবধানে নিরুদ্ধ বায়ুর রেচন করিবে। হে সুন্দরি, অপর একশ্রেণীর ঋষি আছেন, যাহারা প্রাণায়ামে তৎপর, পবিত্রচিত্ত এবং অস্ত্র শুদ্ধি করিয়া বায়ুজয়ে রত, তাহারা বলিয়া থাকেন, প্রথমে এক নাসাপুটে চৌষটি মাত্রায় কুম্ভক করিয়া পশ্চাৎ যোড়শমাত্রায় অপর নাসা পুটে রেচক করিবে। পুনরায় ষোড়শ মাত্রাক্রমে অল্পে অল্পে ঐ উভয় নাসা- পুটের দ্বারা পূরক করিবে। এইরূপে প্রাণ-সংযমন বশীভূত করিয়া প্রাণজয়ী হইবে।
প্রাণ পাঁচপ্রকার বিখ্যাত, দৈহিক বায়ু এই প্রাণকেই আশ্রয় করিয়া থাকে। তন্মধ্যে প্রাণই সমস্ত প্রাণিদেহে সর্ব্বপ্রধান। সেই প্রাণ ওষ্ঠ ও নাসিকার মধ্যস্থলে, হৃদয়ে ও নাভিমণ্ডলে, এমন কি পায়ের অঙ্গুষ্ঠাঙ্গুলিতে পর্য্যন্ত বিদ্যমান থাকিয়া সর্ব্বাঙ্গে অবস্থান করে। ষোড়শসংখ্যক মাত্রায় প্রত্যহ প্রাণায়াম অভ্যাস করিবে। তাহার ফলে মনের প্রার্থনানুযায়ী সমস্ত বস্তু প্রাপ্ত হওয়া যায়; এবং সমস্ত প্রাণকে জয় করিতে সমর্থ হয়। প্রাণায়ামে রাগদ্বেষাদি দোষ দগ্ধ করিবে। ধারণা দ্বারা সঞ্চিত পাপরাশি বিনাশ করিবে, এবং প্রত্যাহারদ্বারা সংসর্গজ পাপ দগ্ধ করিবে, আব ধ্যানের(১২) দ্বারা অনীশ্বর- ভাব বিনষ্ট করিবে। যে লোক স্নান করিয়া প্রত্যহ একশত সংখ্যক প্রাণায়াম করে, সে লোক যদি পিতৃ-মাতৃ-গুরুহত্যাকারীও হয়, তথাপি তিনবৎসরে পাপমুক্ত হয় ॥” “প্রাণান্ প্রপীড্য” ইত্যাদি বাক্য এই কথাই ব্যক্ত করিতেছেন—এই যোগমার্গে প্রবৃত্ত ব্যক্তি প্রাণ পীড়ন করিয়া অর্থাৎ প্রাণসংযমন করিয়া[গীতায় উক্ত] “নাত্যশ্নতঃ”(অধিক ভোজনকারীর যোগসিদ্ধি হয় না।] ইত্যাদি
(১২) প্রত্যাহার অর্থ—বহির্মুখ ইন্দ্রিয়গণকে অন্তর্মুখ করা। ধারণা অর্থ—“দেশবন্ধশ্চিত্তস্য ধারণা”। চিত্তকে কোন এক ধ্যেয় বিষয়ে বলপূর্ব্বক আবদ্ধ করিয়া রাখা। ধ্যানঅর্থ—একই ধ্যেয় বিষয়ে মনের একাকার চিন্তা- প্রবাহ। “প্রত্যয়ৈকতানতা ধ্যানম্ ॥(পাতঞ্জল দর্শন। ২।)
সমে শুচৌ শর্করাবহ্নিবালুকা- বিবর্জ্জিতে শব্দজলাশ্রয়াদিভিঃ। মনোহনুকূলে ন তু চক্ষুপীড়নে গুহানিবাতাশ্রয়ণে প্রযোজয়েৎ ॥২॥১০॥
সরলার্থঃ।[ইদানীং যোগসিদ্ধ্যনুকূলং স্থানং নিদ্দিশতি “সমে” ইতি।] সমে(অবিষমে) শুচৌ(পূবিত্রে) শর্কবাবহ্ণিবালুকাবিবর্জ্জিতে(শর্করা— পাষাণখণ্ডানি) বহ্নিঃ—অগ্নিঃ, বালুকাঃ—মৃত্তিকাচূর্ণানি, তৈঃ বিবর্জ্জিতে উদ্রুহিতে ইত্যর্থঃ), শব্দজলাশ্রয়াদিভিঃ(শব্দঃ কোলাহলধ্বনিঃ, জলাশ্রয়ঃ জলাশয়ঃ,[. আদি পদেন দংশমশকাদিসংগ্রহঃ], তদাদিভিঃ চ)[বিবর্জ্জিতে] মনোহনুকূলে(মনঃপ্রসাদকরে), নতু(ন পুনঃ) চক্ষুপীড়নে(চক্ষুষঃ পীড়া- করে)[এবং ভূতে] গুহানিবাতাশ্রয়ণে(গুহায়াং যৎ নিবাতং বায়ুরহিতং আশ্রয়ণং আশ্রয়স্থানং, তস্মিন্)[স্থিত্বা] প্রযোজয়েৎ(যোগমভ্যসেৎ ইত্যর্থঃ) ॥২॥১০৷৷
মূলানুবাদ।[ এখন যোগসিদ্ধির অনুকূল স্থান নির্দেশ করিতেছেন] যে স্থান সম অর্থাৎ(নিম্নোন্নতভাবরহিত), পবিত্র, প্রস্তরাদির টুকরা, অগ্নি, বালুকা ও জনকোলাহলধ্বনিরহিত ও জলাশয়াদির অসন্নিহিত, এবং মনের অনুকূল বা প্রসন্নতাকারক ও চক্ষুর পীড়াদায়ক নহে, এবং তীব্র বায়ুসঞ্চালনশূন্য এরূপ গুহাপ্রভৃতি স্থানে যোগসাধনায় প্রবৃত্ত হইবে ॥২॥১০৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্।—সমইতি। সমে নিম্নোন্নতরহিতে দেশে। শুচৌ শুদ্ধে। শর্করাবহ্নিবালুকাবিবর্জ্জিতে। শর্করাঃ ক্ষুদ্রোপলাঃ, বালুকাস্তচ্চ র্ণম্। তথা শব্দজলাশ্রয়াদিভিঃ। শব্দঃ কলহাদিধ্বনিঃ, জলং সর্ব্বপ্রাণ্যপভোগ্যম্। মণ্ডুপ আশ্রয়ঃ। মনোহনুকূলে মনোরমে, চক্ষুপীড়নে প্রতিবাদ্যভিমুখে। ছান্দসো বিসর্গলোপঃ। গুহানিবাতাশ্রয়ণে গুহায়ামেকান্তে নিবাতে সমাশ্রিত্য প্রয়োজয়েৎ প্রযুজীত চিত্তং পরমাত্মনি ॥২॥১০৷৷
নিয়মানুসারে যাহার চেষ্টা(যত্ন) সংযুক্ত অর্থাৎ উপযুক্তরূপে নির্ব্বাহিত হয়, এরূপ হইয়া, প্রাণ—মন শক্তিক্ষয়ে ক্ষীণতা(দুর্ব্বলতা) প্রাপ্ত হইলে পর, অল্পে অল্পে উভয় নাসাপুট দ্বারা বায়ু ত্যা; করিবে, কিন্তু মুখ দ্বারা নহে। অভিপ্রায় এই যে, হৃদয়ে বায়ু নিবোধ করিয়া ঐ বায়ু দুই নাসারন্ধ্রের দ্বারা ত্যাগ করিবে,[কিন্তু কখনও মুখ দিয়া বায়ু ত্যাগ করিবে না]। এবং বিদ্বান পুরুষ অপ্রমত্তও প্রণিহিতচিত্ত হইয়া দুর্দ্দমনীয় অশ্বযুক্ত রথচালক সারথির ন্যায় মনকে মননের(ধ্যানের) দ্বারা ধারণ করিবে অর্থাৎ ধ্যেয় বিষয়ে স্থাপন করিবে ॥ ২॥৯৷৷ ভাষ্যানুবাদ।[কিরূপ স্থানে আসন করিবে, তাহা নির্দেশ করিতেছেন।] সম-নিম্নন্নতভাবরহিত, শুচি শুদ্ধ পবিত্র, শর্করাবহ্ণিবালুকা
নীহারধূমাকানিলানলানাং খদ্যোতবিদ্যুৎস্ফটিকশশীনাং। এতানি রূপাণি পুরঃসরাণি ব্রহ্মণ্যভিব্যক্তিকরাণি যোগে ॥২॥১১॥
সরলার্থঃ।[ইদানীং যোগাভ্যাসে রতস্য সিদ্ধিসূচকানি যানি চিহ্বানি অভিব্যজ্যন্তে, তানি নিদ্ধিশ্যন্তে—নীহার ইত্যাদিন্না।] যোগে[অনুষ্ঠীয়মানে সতি] ব্রহ্মণি(ব্রহ্মবিষয়ে) অভিব্যক্তিকরাণি(ব্রহ্মাভিব্যক্তিসূচকানি) নীহারঃ(তুষারং) ধূমঃ, অর্কঃ(সূর্য্যঃ), অনিলঃ(বায়ুঃ), অনলঃ(অগ্নিঃ) চ,[তেষাং, তথা] খদ্যোতঃ, বিদ্যুৎ, স্কটিকঃ, শশী(চন্দ্রঃ) চ[তেষাং] এতানি রূপাণি পুরঃসরাণি(অগ্রবর্ত্তিনি)[ভবন্তি]।[যোগে প্রবৃত্তো যোগী যদি নীহারধূমাদীনাং রূপাণি সমক্ষং পশ্যতি, তদাত্মনঃ যোগসিদ্ধিং ব্রহ্মসাক্ষাৎ- কাররূপামদূরবর্ত্তিনীং[জানীয়াদিতি ভাবঃ] ॥ ১ ॥ ১১ ॥
দ।[অতঃপর যোগাভ্যাসে রত ব্যক্তির ব্রহ্মসাক্ষাৎকার- সূচক চিহ্নসকল নিদ্দিষ্ট হইতেছে]। যোগাভ্যাসে রত ব্যক্তির যখন ব্রহ্মসাক্ষাৎকার হইবার সময় উপস্থিত হয়, তাহার পূর্ব্বে তুষার, ধূম, সূর্য্য, বায়ু, অগ্নি, খদ্যোত (জোনাকী পোকা) ও বিদ্যুৎ, স্ফটিক ও চন্দ্র, এই সকলের রূপ(স্পর্শ ও জ্যোতিঃপ্রভৃতি) প্রকাশ পাইতে থাকে ॥ ১। ১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং যোগমভ্যস্যতোহভিব্যক্তিচিহ্নানি বক্ষ্যন্তে— নীহার ইত্যাদিনা। নীহারস্তযাবঃ, তদ্বৎ প্রাণৈঃ সমা চিত্তবৃত্তিঃ প্রবর্ত্ততে, ততো ধূম ইবাভাতি, ততোহর্ক ইব, ততো বায়ুরিবাভাতি। ততো বহ্নিরিবাত্যুষ্ণো বায়ুঃ প্রকাশদহনঃ প্রবর্ত্ততে। বাহ্যবায়ুরিব সঙ্ক্ষুভিতো বলবান্ বিজৃম্ভতে। কদাচিৎ খদ্যোতখচিতমিবান্তরীক্ষমালক্ষ্যতে; বিদ্যুদিব রোচিষ্ণুরালক্ষ্যতে, কদাচিৎ স্ফটিকাকৃতিঃ, কদাচিৎ পূর্ণশশিবৎ। এতানি রূপাণি যোগে ক্রিয়মাণে ব্রহ্মণ্যাবিক্রিয়মাণে নিমিত্তে পুরঃসরাণ্যগ্রগামীনি। তদা পরমযোগসিদ্ধিঃ ॥ ২॥ ১১ ॥
বিবজ্জিত—শর্করা ক্ষুদ্র পাষাণখণ্ডপ্রভৃতি, বালুকা—ঐ ‘পাষাণচূর্ণ, শব্দ— কলহ(ঝগড়া) প্রভৃতির ধ্বনি, জল—সর্ব্বপ্রাণীর উপভোগের যোগ্য অর্থাৎ প্রাণীমাত্রই যে জল পান করিবার অধিকারী, এমন সাধারণ জল, আশ্রয় অর্থ—মণ্ডপ(যাহাতে সর্ব্বসাধারণে বাস করিতে পারে, এমন গৃহ), এ সকল যেখানে না থাকে, এবং যাহা মনের অনুকূল অর্থাৎ মনোরম অথচ চক্ষুর পীড়াদায়ক নহে, এবং যেখানে প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত না হয়, এমন গুহা প্রভৃতি নির্জন স্থান আশ্রয় করিয়া চিত্তকে পরমাত্মায় সংযোজিত করিবে ॥২॥১০॥ ভাষ্যানুবাদ। এখন “নীহার” ইত্যাদি বাক্যে—যোগাভ্যাসরত ভাষ্যঅনুবাদ। এখন “নীহার” ইত্যাদি বাক্যে—যোগাভ্যাসরত
পৃথ্যপতেজোহনিলখে সমুখিতে পঞ্চাত্মকে যোগগুণে প্রবৃত্তে। ন তস্য রোগো ন জরা ন মৃত্যুঃ প্রাপ্তস্য যোগাগ্নিময়ং শরীরম্ ॥২॥১২
সরলার্থঃ। পৃথ্যপতেজোহনিলখে সমুখিতে(অভিব্যক্তে সতি), [এতদেব বিবৃণোতি—“পঞ্চাত্মকে যোগগুণে প্রবৃত্তে” ইতি]। পঞ্চাত্মকে (পঞ্চানাং পৃথিব্যাদীনাং গন্ধরসাদিরূপে) যোগগুণে(যোগোক্তগুণে) প্রবৃত্তে(প্রকাশমানে সতি),[তদা] যোগাগ্নিময়ং(যোগাগ্নিনা দগ্ধদোষরাশিং বিশুদ্ধমিত্যর্থঃ) শরীরংপ্রাপ্তস্য তস্য যোগিনঃ রোগঃ(ব্যাধিঃ) ন, জরা (কায়শীর্ণতা) ন, মৃত্যুঃ(অকালমরণং চ) ন[ভবতীতি শেষঃ] ॥২॥১২॥
মূলানুবাদ। পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু ও আকাশ অভিব্যক্ত হইলে পর অর্থাৎ যোগসিদ্ধিসূচক পঞ্চভূতেয় গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ ও শব্দ, এই পাঁচপ্রকার গুণ যোগীর নিকট প্রকাশ পাইতে থাকিলে, যোগাগ্নি দ্বারা বিশোধিত বিমল দেহপ্রাপ্ত সেই যোগীর কোন ব্যাধি হয় না, এবং জরা ও মৃত্যু ভয় থাকে না, অর্থাৎ তাহার মৃত্যু নিজের ইচ্ছাধীন হয় ॥২॥১২৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। পৃথীতি। পৃথ্যপ্তেজোহনিলখে পৃথিব্যাদীনি ভূতানি দ্বন্দ্বৈকবদ্ভাবেন নিৰ্দ্দিশ্যন্তে। তেষু পঞ্চসু ভূতেয় সমুখিতেয়-পঞ্চাত্মকে যোগগুণে প্রবৃত্ত ইত্যস্য ব্যাখ্যানম্। কঃ পুনর্যোগগুণঃ প্রবর্ত্ততে। পৃথব্যা গন্ধঃ। তথাহদ্যো রসঃ। এবমন্যত্র ॥ উক্তং-“জ্যোতিষ্মতী স্পর্শবতী তথা রসবতী পরা। গন্ধবত্যপরা প্রোক্তা চতস্রস্তু প্রবৃত্তয়ঃ ॥ আসাৎ যোগ- প্রবৃত্তীনাং যদ্যেকাপি প্রবর্ত্ততে। প্রবৃত্তযোগং তং প্রাহুর্যোগিনো যোগ- চিন্তকাঃ” ॥ ২॥ ১২ ॥
ব্যক্তির যোগসিদ্ধির পূর্ব্বচিহ্নসকল বলা হইতেছে—নীহার অর্থ—তুষার, সেই তুষারের মত[মৃদুমন্দভাবে] চিত্তের বৃত্তি বা চিন্তাধারা হইতে থাকে। তাহার পর ধূমের ন্যায় চিত্তবৃত্তি প্রবৃত্ত হয়। তাহার পর সূর্য্যের ন্যায়, তদনন্তর বায়ুর ন্যায় বৃত্তি প্রকাশ পায়। তাহার পর অগ্নির ন্যায় অত্যুষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ বাহিরের বায়ুর ন্যায় বিক্ষোভিত প্রবল বায়ু প্রকাশিত হয়। কখনও বা আকাশমণ্ডল খদ্যোত-খচিতেয়(জোনাকিপোকায় শোভিতের মত) দেখা যায়, কখনও আবার দিদ্যুতের ন্যায় উজ্জ্বল দৃষ্ট হয়, কখনও বা স্ফটিকময় আকৃতি, কখনও আবার পূর্ণ চন্দ্রের মত দেখা যায়। যোগানুষ্ঠানে নিরত থাকিলে ব্রহ্মস্ফূরণের পূর্ব্ববর্তী এই সকল চিহ্ন প্রকাশ পাইয়া থাকে। বুঝিতে হইবে, তখন যথার্থই যোগসিদ্ধি হইবে ॥ ২॥ ১১ ॥
লঘুত্বমারোগ্যমলোলুপত্বং বর্ণপ্রসাদঃ স্বরসৌষ্ঠবঞ্চ। গন্ধঃ শুভো মূত্রপুরীষমল্লং যোগপ্রবৃত্তিং প্রথমাং বদন্তি ॥২॥১৩৷৷ যথৈব বিম্বং মৃদয়োপলিপ্তং তেজোময়ং ভ্রাজতে তৎ সুধান্দ্ৰং।
সরলার্থঃ।[যোগিনঃ প্রথমা সিদ্ধিরুচ্যতে লঘুত্বমিত্যাদিনা।] [শরীরস্থ্য] লঘুত্বং আরোগ্যং(নীরোগভাবঃ),[মনসঃ] অলোলুপত্বং (ভোগাদিষু লোভরাহিত্যং), বর্ণপ্রসাদং[বর্ণপ্রসাদঃ](শরীরকান্তিঃ), স্বরসৌষ্ঠবং(মধুবস্বরত্বং), শুভঃ(প্রিয়ঃ) গন্ধঃ, অল্পং মূত্র-পুরীষং(মল- মূত্রয়োঃ অল্পত্বং),[ইমাং] প্রথমাং যোগসিদ্ধিং) বদন্তি[যোগিন ইতি শেষঃ] ॥ ২॥ ১৩॥
মূলানুবাদ।[যোগসিদ্ধির প্রথম অবস্থা বলা হইতেছে] শরীরের লঘুত্ব, রোগীনতা লোভনিবৃত্তি, উজ্জ্বল কান্তি, মধুর স্বর, সদ্গন্ধ এবং মল মূত্রের অল্পতা, এ সকলকে যোগিগণ যোগের প্রথমসিদ্ধি বলিয়া থাকেন ॥২॥১৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। লঘুত্বমিতি। ন তস্য যোগিনো রোগো ন জরা দুঃখমমানসং বা ভবতি। কস্য প্রাপ্তস্য যোগাগ্নিময়ং শরীরম্। যোগাগ্নি- সংপ্লষ্টদোষকলাপং শরীরং প্রাপ্তস্য। স্পষ্টমন্যৎ ॥ ২॥ ১৩॥
ভাষ্যানুবাদ। “পৃথ্বী” ইত্যাদি। পৃথ্বী(পৃথিবী), অপ্, তেজঃ, অনিল(বায়ু), খ-আকাশ, এই পঞ্চভূত সমুত্থিত হইলে পর, অর্থাৎ ধ্যান বলে স্ব স্ব কারণে বিলীন করা হইলে পর, এবং পঞ্চাত্মক অর্থাৎ পাঁচপ্রকার যোগগুণ বা যোগ বিভূতি প্রবৃত্ত হইলে পর[যেমন] গন্ধগুণযুক্ত পৃথিবীর গুণ-গন্ধ রসযুক্ত জলের গুণ রস, রূপযুক্ত তেজের গুণ রূপ, স্পর্শগুণসম্পন্ন বায়ুর গুণ স্পর্শ, এবং আকাশের গুণ শব্দ, এই সমুদয় গুণ তখন যোগীর নিকট অভিব্যক্ত হইয়া থাকে। অন্যত্রও একথা উক্ত আছে। যোগীর প্রবৃত্তি চারি প্রকার-জ্যোতিষতী, স্পর্শবতী, রসবতী, আর একটা গন্ধবতী। এই সকল যোগ প্রবৃত্তির(যোগ- ফলের) মধ্যে একটাও যদি কাহারও উপস্থিত হয়, তাহা হইলে যোগচিন্তাপরায়ণ যোগীগণ তাহাকে প্রবৃত্তযোগ(প্রবৃত্তমাত্র যোগী) বলিয়া থাকেন। সেই যোগীর রোগ থাকে না, জরা(বার্দ্ধক্য) হয় না, অথবা মৃত্যুও হয় না। কাহার?-কোন যোগীব? না, যিনি যোগাগ্নিময় শরীর প্রাপ্ত হইয়াছেন, অর্থাৎ যোগাগ্নি দ্বারা যাহার সমস্ত দোষ দগ্ধ হইয়াছে, এমন শরীর প্রাপ্ত হইয়াছেন,[তাহার]। অন্য(ত্রয়োদশ) মন্ত্রের অর্থ স্পষ্ট ॥ ২॥ ১২॥ ১৩॥
তদ্বাত্মতত্ত্বং প্রসমীক্ষ্য দেহী একঃ কৃতার্থো ভবতে বীতশোকঃ ॥২॥১৪৷৷ যদাত্মতত্ত্বেন তু ব্রহ্মতত্ত্বং দীপোপমেনেহ যুক্তঃ প্রপশ্যেৎ। অজং ধ্রুবং সর্ব্বতত্ত্বৈর্বিশুদ্ধং জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্বপাশৈঃ ॥২॥১৫৷৷
সরলার্থঃ। বিম্বং(সৌবর্ণং রাজতং বা পিণ্ডং)[পূর্ব্বং] মৃদয়া (মৃত্তিকয়া) উপলিপ্তং মলিনীকৃতং) তৎ যথা এব(নিশ্চয়ে) সুধান্তং (অগ্ন্যাদিনা সুধৌতং বিমলীকৃতং সৎ) তেজোময়ং(তেজঃপুঞ্জমিব) ভ্রাজতে (দীপ্যতে), একঃ(কশ্চিদেব) দেহী(শরিরী) তৎ(আত্মতত্ত্বং) প্রসূমীক্ষ্য (সাক্ষাৎকৃত্য) বীতশোকঃ কৃতার্থঃ(কৃতকৃত্যঃ) ভবতে(ভবতীত্যর্থঃ) ॥২॥১৪॥ সরলার্থঃ। বীতশোকত্বমুপপাদয়িতুমাহ—যদেতি।] যুক্তঃ(যোগরতঃ পুরুষঃ) যদা(যস্মিন্ কালে) তু দীপোপমেন(দীপবৎ প্রকাশস্বভাবেন) আত্মতত্ত্বেন(আত্মস্বরূপতয়া) ব্রহ্মতত্ত্বং(ব্রহ্মস্বরূপং) প্রপশ্যেৎ(সাক্ষাৎ করোতি),[তদা] অজং(জন্মরহিতং) ধ্রুবং(নির্বিকারং) সর্ব্বতত্ত্বৈঃ
মূলানুবাদ। প্রথমে মৃত্তিকা-সংস্পর্শে মলিনীকৃত সুবর্ণপিণ্ড যেমন অগ্নিপ্রভৃতি দ্বারা বিশোধিত হইয়া তেজঃপুঞ্জরূপে দীপ্তি পায়, ঠিক তেমনই কোন কোন দেহীও সেই আত্মতত্ত্ব সাক্ষাৎকার করিয়া সর্ব্বদুঃখমুক্ত কৃতার্থ হয় ॥ ২ ॥ ১৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, যথৈবেতি। যথৈব বিম্বং সৌবর্ণং রাজতং বা মৃদয়োপলিপ্তং মৃদাদিনা মলিনীকৃতং পূর্ব্বং, পশ্চাৎ সুধান্তং-সুধৌত- মিত্যস্মিন্নর্থে সুধান্তমিতি ছান্দসম্। অগ্ন্যাদিনা বিমলীকৃতং তেজোময়ং ভ্রাজতে। তদ্বা তদেব আত্মতত্ত্বং প্রসমীক্ষ্য দৃষ্ট্বা একোহ দ্বিতীয়ঃ কৃতার্থো ভবতে বীত- শোকঃ। পরেষাং পাঠে তদ্বৎ সতত্ত্বং প্রসমীক্ষ্য দেহীতি। তত্রাপ্যয়মে- বার্থঃ ॥ ২ ॥ ১৪ ॥
ভাষ্যানুবাদ। অপি চ, “যথৈব” ইত্যাদি। সুবর্ণময় বা রজতময় কোন একটা বিশ্ব(বস্তু) যেমন প্রথমে মৃত্তিকা বিলিপ্ত, অর্থাৎ মৃত্তিকা প্রভৃতি দ্বারা মলিনীকৃত হইলেও যেমন পশ্চাৎ উত্তমরূপে ধৌত হইয়া—অগ্নিপ্রভৃতি দ্বারা শোধিত মলরহিত হইয়া তেজোময় তেজঃপুঞ্জরূপে(স্বরূপাবস্থায়) শোভা পায়। ঠিক তেমনই যোগীও আত্মতত্ত্ব প্রত্যক্ষ করিয়া শোকমুক্ত এক অদ্বিতীয় কৃতার্থ হন। “তদ্বৎ সতত্ত্বং প্রসমীক্ষ্য দেহী” এইরূপ পাঠেও উক্ত প্রকারই অর্থ হয় ॥ ২ ॥ ১৪ ॥
১১২
এষ হ দেবঃ প্রদিশোহনু সর্ব্বাঃ পূর্ব্বো হ জাতঃ স উ গর্ভে অন্তঃ। স এব জাতঃ স জনিষ্যমাণঃ প্রত্যঙ্ জনাংস্তিষ্ঠতি সর্বতোমুখঃ ॥২॥১৬৷৷
অবিদ্যা-তৎকার্য্যেঃ) বিশুদ্ধং(তৎসম্বন্ধশূন্যং) দেবং(স্বপ্রকাশং পরমেশ্বরং) জ্ঞাত্বা সর্ব্বপাশৈঃ(সর্ব্বৈববিদ্যাদিবন্ধনৈঃ) মুচ্যতে(বিমুক্তো ভবতীত্যর্থঃ) ॥২॥১৫৷৷
সরলার্থঃ।[তদ্দর্শনসম্ভাবনামাহ “এষহ” ইত্যাদিনা।] এষ (পূর্ব্বোক্তঃ) দেবঃ(পরমাত্মা) হ সর্ব্বাঃ প্রদিশঃ(প্রাচ্যাদ্যা দিশঃ) অনু (লক্ষীকৃত্য) পূর্ব্বঃ(প্রথমঃ হিরণ্যগর্ভরূপেণ) জাতঃ(সূক্ষ্মরূপেণ উৎপন্নঃ), সঃ(পরমাত্মা) উ(এব) গর্ভে অন্তঃ(পঞ্চভূতাত্মকে ব্রহ্মাণ্ডোদর-
মূলানুবাদ।[যোগী কিপ্রকারে বীতশোক হন, এখন তাহা, বলিতেছেন—] যুক্ত(যোগসাধনায় নিরত যোগী) যে অবস্থায় দীপের ন্যায় প্রকাশস্বভাব আত্মদর্শন করিয়া তদভিন্নরূপে ব্রহ্মতত্ত্ব দর্শন করেন—প্রত্যক্ষ করেন, তখন তিনি জন্ম ও বিকারশূন্য এবং সর্ব্বপ্রকার জড়সম্পর্করহিত প্রকাশময় পরমাত্মাকে সম্পূর্ণরূপে অবগত হইয়া সর্ব্বপ্রকার অবিদ্যাবন্ধন হইতে বিমুক্ত হন ৷৷ ২ ৷৷ ১৫ ৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। কথং জ্ঞাত্বা বীতশোকো ভবতীত্যাহ—যদেতি। যদা যস্যামবস্থায়ামাত্মতত্ত্বেন স্বেনাত্মনা। কিং বিশিষ্টেন? দীপোপমেন দীপস্থানীয়েন প্রকাশস্বরূপেণ ব্রহ্মতত্ত্বং প্রপশ্যেৎ। তুশব্দোহবধারণে। পরমাত্মানমাত্মনৈব জানীয়াদিত্যর্থঃ। উক্তঞ্চ—“তদাত্মানমেবাবেদহং ব্রহ্মাস্মি” ইতি। কীদৃশম্? অন্যস্মাদজায়মানম্, ধ্রুবং অপ্রচ্যুতস্বরূপং, সর্ব্বতত্ত্বৈরবিদ্যাতৎ- কার্য্যৈর্বিশুদ্ধং অসংস্পৃষ্টং জ্ঞাত্বা দেবং, মুচ্যতে সর্ব্বপাশৈরবিদ্যাদিভিঃ ॥২॥১৫৷৷
ভাষ্যানুবাদ। কি প্রকারে জ্ঞানলাভের পর বীতশোক(শোক- মুক্ত) হয়, তাহা বলিতেছেন—“যদা” ইতি। যুক্ত(যোগী) পুরুষ যে অবস্থায় ব্রহ্মতত্ত্বকে দীপোপম দীপতুল্য প্রকাশস্বভাব আত্মতত্ত্বের সহিত—স্বীয় আত্মার সহিত অভিন্নরূপেই দর্শন করে। তু-অর্থ অবধারণ—নিশ্চয় অর্থাৎ পরমাত্মাকে আত্মস্বরূপেই অবগত হয়। এ কথা শ্রুতিতেও উক্ত আছে—‘তখন আমি ব্রহ্মস্বরূপ, এই ভাবে আত্মাকে জানিয়াছিলেন’ ইতি। আত্মতত্ত্ব কি প্রকার? অন্য কোনও কারণ হইতে অনুৎপন্ন, ধ্রুব—কখনও নিজ স্বভাব হইতে চ্যুত হয় না, এমন, এবং অবিদ্যা ও অবিদ্যাজনিত সমস্ত কার্য্যবর্গ দ্বারা অস্পৃষ্ট ও দ্যোতমান, তাহা জানিয়া—সাক্ষাৎ কার করিয়া অবিদ্যা প্রভৃতি সমস্ত বন্ধনপাশ হইতে বিমুক্ত হন॥ ২॥ ১৫॥
যো দেবোঅগ্নৌ যোঅপ্সু যো বিশ্বং ভুবনমাবিবেশ। য ওষধীষু যো বনস্পতিষ তস্মৈ দেবায় নমো নমঃ ॥২॥১৭৷৷ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎসু দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ ॥২॥
মধ্যে) জাতঃ(বিরাটপুরুষরূপেণ অভিব্যক্তঃ), স এব জাতঃ(পূর্ব্বমুৎপন্নঃ), সঃ[এব] জনিষ্যমাণঃ(ভবিষ্যতি কালেহপি উৎপৎস্যতে),[স এবচ] জনান্(জায়মানানি সর্ব্বাণি বস্তুনি) প্রত্যঙ্(অভিব্যাপ্য) সর্ব্বতোমুখঃ (সর্ব্বদর্শী সন্) তিষ্ঠতি(বর্ত্তত ইত্যর্থঃ) ॥ ২॥ ১৬॥
সরলার্থঃ।[ইদানীং ব্রহ্মসাক্ষাৎকারোপায়তয়া নমস্কারোঃ” হপি নিরূপ্যতে—যো দেব “ইত্যাদিনা।] যঃ দেবঃ(প্রকাশস্বভাবঃ পরমাত্মা) অগ্নৌ, যঃ অপ্সু(জলে) যঃ ওষধিযু(তৃণলতাদিষু), যঃ বনস্পতিযু (অশ্বত্থাদিবৃক্ষেষু) আবিবেশ[আবিষ্ট ইতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে]।[কিং বহুনা,] যঃ বিশ্বং(নিখিলং) ভুবনং(জগৎ) আবিবেশ(অন্তর্য্যামিরূপেণ প্রবিষ্টোহস্তি), তস্মৈ দেবায় নমোনমঃ(পুনঃ পুনঃ নম ইত্যর্থঃ) ॥ ২॥ ১৭॥
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়ব্যাখ্যা ॥ ২ ॥
মূলানুবাদ। সমস্ত দিগ্বীপী এই প্রকাশমান পরমেশ্বরই সকলের প্রথমে সূক্ষ্ম হিরণ্যগর্ভরূপে অভিব্যক্ত হন, তিনিই আবার ব্রহ্মাণ্ডমধ্যে স্থূল বিরাটরূপে প্রকাশ পান। তিনিই জীবরূপে উৎপন্ন হইয়াছেন, পরেও উৎপন্ন হইবেন এবং তিনিই সর্ব্বতোমুখ অর্থাৎ সর্ব্বদর্শীরূপে অবস্থান করেন ॥ ২ ॥ ১৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। পরমাত্মানমাত্মত্বেন বিজানীয়াদিত্যুক্তং, তদেব ভাবয়ন্নাহ—এষ হেতি। এষ এব দেবঃ প্রদিশঃ প্রাচ্যাদ্যা দিশ উপদিশশ্চ সর্ব্বাঃ পূর্ব্বোহ জাতঃ সর্ব্বস্মাদ্ধিরণ্যগর্ভাত্মনা, স উ গর্ভে অন্তর্বর্ত্তমানঃ, স এব জাতঃ শিশুঃ, স জনিষ্যমাণোহপি, স সব সর্ব্বাংশ জনান্ প্রত্যঙ্ তিষ্ঠতি, সর্ব্বপ্রাণিগতানি মুখানি অস্যেতি সর্ব্বতোমুখঃ ॥ ১ ॥ ১৬ ॥
ভাষ্যানুবাদ। পরমাত্মাকে আত্মস্বরূপে জানিবে, এ কথা বলা হইয়াছে, এখন তাহা যেরূপে সম্ভবপর হয়, তাহা বলিতেছেন—“এষঃ” ইতি। এই দেব পরমাত্মাই পূর্ব্বাদি সমস্ত দিক্ ও বিদিকে বর্তমান, তিনিই সকলের পূর্ব্বে হিরণ্যগর্ভরূপে গর্ভমধ্যে জন্ম ধারণ করিয়াছেন, এবং তিনিই এখন শিশুরূপে জাত হইয়াছেন, ভবিষ্যতেও তিনিই জন্ম লাভ করিবেন, এবং তিনিই সর্ব্বতোমুখ—সর্ব্বপ্রাণির অভিমুখে যাহার মুখ, এমন তাবে সকল জনের অভ্যন্তরে অবস্থান করিতেছেন ॥ ১ ॥ ১৬ ॥
১৫
মূলানুবাদ। প্রকাশময় যে পরমাত্মা অগ্নিতে[প্রবিষ্ট রহিয়াছেন, এবং] যিনি জলে, তৃণ লতা প্রভৃতি ওষিধিতে, ও অশ্বত্থ প্রভৃতি বনস্পতির মধ্যে,[অধিক কি,] যিনি সমস্ত জগতে, অনুপ্রবিষ্ঠ রহিয়াছেন, তাঁহার উদ্দেশ্য পুনঃ পুনঃ নমস্কার ॥ ২ ॥ ১৭ ॥
ইতি দ্বিতীয় অধ্যায়ের মূলানুবাদ ॥ ২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং যোগবৎ সাধনান্তরাণি নমস্কারাদীনি কর্তব্যত্বেন দর্শয়িতুমাহ—যো দেব ইতি। যো বিশ্বং ভুবনং স্বেন বিরচিতং সংসারমণ্ডলমাবিবেশ। য ওষধীযু শাল্যাদিষু, বনস্পতিবু অশ্বত্থাদিষু, তস্মৈ বিশ্বাত্মনে ভূবনমূলায় পরমেশ্বরায় নমো নমঃ। দ্বির্বচনমাদরার্থম্ অধ্যায়- পরিসমাপ্ত্যর্থঞ্চ ৷৷ ২ ৷৷ ১৭ ৷৷ ইতি শ্রীমদ্ভাগবদ্পূজ্যপাদশিষ্য-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য- শ্রীমচ্ছঙ্করভগবদ্প্রণীতে শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ ॥ ২ ॥
ভাষ্যানুবাদ। যোগ যেমন পরমাত্মদর্শনের সাধন বা উপায়, নমস্কারাদিও ঠিক তেমনই সাধন, এইজন্য নমস্কারাদি সাধনেরও কর্তব্যতা প্রদর্শনের জন্য বলিতেছেন—“যো দেবঃ” ইতি। যিনি বিশ্বে—ভুবনে অর্থাৎ আপনার বিরচিত সংসারমণ্ডলে প্রবেশ করিয়াছেন, এবং যিনি শালী ধান্যাদি ওষধিতে ও অশ্বত্থপ্রভৃতি বনাস্পতির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, সেই বিশ্বাত্মা—জগতের মূলকারণ পরমেশ্বরের উদ্দেশে পুনঃ পুনঃ নমস্কার। আদরাতিশয় প্রদর্শনার্থ ও অধ্যায়সমাপ্তি সূচনার্থ ‘নমঃ’ শব্দের দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥ ২॥ ১৭ ॥
ইতি দ্বিতীয় অধ্যায়ের ভাষ্যানুবাদ ॥ ২ ॥
যএকো জালবান্ ঈশত ঈশিনীভিঃ সর্ব্বাল্লোকানীশত ঈশনীভিঃ। য এবৈক উদ্ভবে সম্ভবে চ য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ॥ ৩॥ ১
সরলার্থঃ। সম্প্রতি ব্রহ্মাত্মৈক্যাববোধায় প্রথমং তাবৎ ব্রহ্মণ শীতিশীতব্যভাব উচ্যতে য এক ইত্যাদিনা। যঃ(প্রসিদ্ধঃ) ‘জালবান্(বন্ধকারণত্বাৎ জালং মায়া, তদ্বান্-মায়াবীত্যর্থঃ) একঃ(একোহপি সন্) ঈশনীভিঃ(স্বশক্তিভিঃ) ঈশতে(ঈষ্টে-শাসনং করোতীত্যর্থঃ)।[কিমীষ্টে? ইত্যপেক্ষায়াং কৰ্ম্মপদং পরিপূর্য্যাহ] ঈশনীভিঃ সর্ব্বান্ লোকান্ ঈশতে(সর্ব্বমেব জগৎ শাস্তীত্যর্থঃ)।[উৎপত্তি-প্রলয় হেতুত্বমপি তস্যৈবেত্যাহ-] য এব একঃ(অদ্বিতীয়: পরমেশ্বরঃ) উদ্ভবে (উৎপত্তৌ), সংভবে(সম্যক্ সত্তামাত্রেণ ভবঃ স্থিতির্যত্র, তস্মিন্ প্রলয়ে) চ[ঈষ্টে]। যে(অধিকারিণঃ পুরুষাঃ এতৎ(সৃষ্টিস্থিতি-লয়হেতুত্বেন ব্রহ্ম) বিদুঃ(জানন্তি), তে অমৃতাঃ(মরণভয়হিতাঃ) ভবন্তি(মুক্তা ভবন্তীত্যর্থঃ) ॥ ৩॥ ১॥
মূলানুবাদ। যিনি প্রসিদ্ধ জালবান্(জাল অর্থ—মায়া, তদ্বান্— পরমেশ্বর) এবং যিনি এক হইয়াও ঈশনী দ্বারা অর্থাৎ স্বীয় ঐশ্বরী শক্তি দ্বারা শাসন করেন—সেই—ঈশনী শক্তি দ্বারা সমস্ত জগৎ শাসন করিয়া থাকেন; এবং যিনি জগতের উৎপত্তি ও প্রলয়ের কারণ; তাঁহাকে যাঁহারা জানেন, তাঁহারা অমৃত অর্থাৎ মুক্ত হন ॥ ৩॥১॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কথমদ্বিতীয়স্য পরমাত্মন ঈশিত্রীশিতব্যাদিভাব ইত্যাশঙ্ক্যাহ—“য একঃ” ইতি। য একঃ পরমাত্মা, স জালবান্—জালং মায়া দুরত্যয়ত্বাৎ। তথা চাহ ভগবান্—“মম মায়া দুরত্যয়া” ইতি, তদ্বান্, তদস্যাহস্তীতি জালবান্ মায়াবীত্যর্থঃ। ঈশতে ঈষ্টে, মায়োপাধিঃ সন্। কৈঃ? ঈশনীভিঃ স্বশক্তিভিঃ। তথাচোক্তম্ ‘ঈশত ঈশনীভিঃ পরমশক্তি- ভিরিতি। কান্? সর্ব্বান্ লোকানীশত ঈশিনীভিঃ। কদা? উদ্ভবে বিভূতিযোগে, সম্ভবে প্রাদুর্ভাবে চ। য এতদ্বিদুরমৃতা অমরণধৰ্ম্মাণো ভবন্তি ॥ ৩॥ ১ ॥
‘ভাষ্যানুবাদ। অদ্বিতীয় পরমাত্মার ঈশিতৃ-ঈশিতব্যভাব কিরূপে সম্ভব হয়? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন-“য একঃ” ইতি। যিনি এক অদ্বিতীয় পরমাত্মা, তিনি জালবান্—জাল অর্থ—মায়া, কারণ, মায়া অতিক্রম করা বড় কঠিন। ভগবান্ও সে কথা বলিয়াছেন—‘আমার
একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থু- র্যইমাল্লোকান্ ঈশত ঈশিনীভিঃ। প্রত্যঙ্ জনাংস্তিষ্ঠতি সঞ্চুকোপান্তকালে সংসৃজ্য বিশ্বা ভুবনানি গোপাঃ ॥ ৩॥ ২॥
সরলার্থঃ। হি(যস্মাৎ) একঃ(অদ্বিতীয়ঃ) রুদ্রঃ(রোদয়তি- সর্ব্বং সংহরতি ইতি রুদ্রঃ পরমেশ্বরঃ)[বর্ত্ততে],[তস্মাৎ হেতোঃ] দ্বিতীয়ায় (রুদ্রেতরবস্তুনে) ন তস্থুঃ(ন স্থিতিং প্রাপ্তাঃ),[কে?] যে(ব্রহ্মেন্দ্রাদয়ঃ) ঈশনীভিঃ(স্বশক্তিভিঃ) ইমান্ লোকান্(পৃথিব্যাদীন্) ঈশতে(নিয়ময়ন্তি ইত্যর্থঃ)।[সঃ রুদ্রঃ] প্রত্যক্(প্রতিপুরুষমন্তরবস্থিতঃ সন্) জনান্ [ব্যাপ্য] তিষ্ঠতি।[স রুদ্রঃ] বিশ্বা(বিশ্বানি) ভুবনানি সংসৃজ(উৎপাদ্য) গোপাঃ(গোপ্তসন্) অন্তকালে(ধ্বংসকালে) সংচুকোপ(সম্যক্ কোপংচকার সংহারং কৃতবানিত্যর্থঃ ॥ ৩॥ ২॥
মূলানুবাদ। যেহেতু একমাত্র রুদ্রই আছেন(সত্য বস্তু), ব্রহ্মা ইন্দ্র প্রভৃতি যাঁহারা নিজ শক্তি সমূহ দ্বারা সমস্ত জগৎ শাসন করিয়া থাকেন, তাঁহারা রুদ্র ভিন্ন দ্বিতীয় কোন বস্তুর অপেক্ষা করেন না। সেই রুদ্রই প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তরস্থ হইয়া রহিয়াছেন, এবং সমস্ত জগৎ সৃষ্টি করিয়া এবং সে সকলের গোপা(রক্ষক) হইয়াও, অন্তকালে বা প্রলয় সময়ে সংহার করিয়া থাকেন ॥ ৩॥ ২॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কস্মাৎ পুনর্জালবানিত্যাশঙ্ক্যাহ—একো হীতি। হিশব্দো যম্মাদর্থে। যম্মাদেক এব রুদ্রঃ স্বতো ন দ্বিতীয়ায় বস্তুন্তরায় তস্থ ব্রহ্মবিদঃ পরমার্থদর্শিনঃ। উক্তঞ্চ “একো রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ” ইতি। য ইমাঁল্লোকানীশতে নিয়ময়তি ঈশনীভিঃ। সর্ব্বাংশ জানান্ প্রতি অন্তরঃ প্রতিপুরুষমবস্থিতঃ—রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূবেত্যর্থঃ। কিঞ্চ, মায়া দুরত্যয় অর্থাৎ দুরতিক্রমণীয়‘। সেই মায়ারূপ জাল আছে বলিয়াই তিনি জালবান্—অর্থাৎ মায়াবী। তিনি মায়োপাধিবিশিষ্ট হইয়াই শাসন করিয়া থাকেন। কিসের দ্বারা? না, ঈশনী—স্বীয় শক্তি দ্বারা। অন্যত্র উক্ত আছে—পরমা শক্তিরূপ ঈশনী দ্বারা তিনি শাসন করিয়া থাকেন। কাহাদের শাসন করেন? ঈশনী শক্তির দ্বারা সমস্ত জগৎ শাসন করেন। কখন? না, উদ্ভবে অর্থাৎ ঐশ্বর্য্য লাভে ও সম্ভবে অর্থাৎ উৎপত্তিতে। যাহারা এ. তত্ত্ব জানেন, তাহারা অমৃত—মরণ ভয় রহিত হন ॥ ৩॥ ১॥ ভাষ্যানুবাদ। তিনি জালবান্ কেন? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন —“একো হি” ইতি। এখানে ‘হি’ শব্দটী ‘যস্মাৎ’(যে হেতু) অর্থে। যেহেতু রুদ্র(পরমাত্মা) একই; পরমার্থদর্শী ব্রহ্মবিদ্গণ দ্বিতীয় অপর কোনও বস্তুর জন্য অবস্থান করেন না, অর্থাৎ তাহারা অদ্বিতীয় রুদ্রকেই দর্শন
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ। সং বাহুভ্যাং ধমতি সম্পতত্রৈ- দ্দ্যাবাভূমী জনয়ন্ দেবএকঃ ॥ ৩ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ। ইদানীং তস্যৈব সৃষ্টিস্থিত্যাদিস্বাতন্ত্র্যে হেতুরুচ্যতে “বিশ্বতঃ”ইতি। বিশ্বতশ্চক্ষুঃ(বিশ্বতঃ সর্ব্বত্র চক্ষুরস্যেতি বিশ্বতশ্চক্ষুঃ)[যানি কানিচিৎ প্রাণিনাং চক্ষুর্ষি, তদস্যৈবেতি ভাবঃ]। এবং সর্ব্বত্র]। উত (অপি) বিশ্বতোমুখঃ, বিশ্বতোবাহুঃ, উত(অপি) বিশ্বতস্পাৎ(বিশ্বতঃ পাদা অন্যেত্যর্থঃ), দ্বাবাভূমী(দ্যুলোকভূলোকৌ) জনয়ন্ একঃ দেবঃ (রুদ্রঃ) বাহুভ্যাং(ধর্মাধৰ্ম্মাভ্যাং) সংপতত্রৈঃ(পরমাণুভিঃ) সংধমতি (যোজয়তি সর্ব্বমিত্যর্থঃ) ॥ ৩॥৩॥
মূলানুবাদ। বিশ্বপ্রাণীর চক্ষু, মুখ, বাহু ও চরণই যাঁহার চক্ষু, মুখ, বাহু ও চরণ, সেই এক অদ্বিতীয় দেব অর্থাৎ প্রকাশময় পুরুষ দ্যুলোক, ভূলোক ও তন্মধ্যবর্তী সমস্ত উৎপাদন করিবার নিমিত্ত প্রাক্তন ধৰ্মাধৰ্মানুসারে পরমাণু সমূহকে পরস্পর সংযোজিত করেন। অথবা ঐ দ্যাবাপৃথিবীকে বাহুযুক্ত মনুষ্যাদি ও পক্ষিগণেয় সহিত সংযোজিত করেন ॥ ৩ ॥ ৩ ॥
সঞ্চুকোপ অন্তকালে প্রলয়কালে। কিং কৃত্বা? সংসৃজ্য বিশ্বা ভুবনাদি গোপা গোপ্তা ভূত্বা। এতদুক্তং ভবতি—অদ্বিতীয়ঃ পরমাত্মা, ন চাসৌ কুম্ভ- কারবদাত্মানং কেবলং মৃৎপিণ্ডস্থানীয়মুপাদানকারণমুপাদত্তে, কিং তহি? স্বশক্তিবিক্ষেপং কুর্ব্বন্ স্রষ্টা নিয়ন্তা বাভিধীয়তে ইতি। উত্তরো মন্ত্রঃ তস্যৈব বিরাড়াত্মনাবস্থানং তৎস্রষ্ট ত্বং প্রতিপাদয়তি ॥ ৩॥ ২॥
করিয়াছেন, দ্বিতীয় কোন বস্তু দর্শন করেন নাই। ঈশনী স্বশক্তি দ্বারা এই সমস্ত লোককে শাসন অর্থাৎ নিয়মিতরূপে পরিচালিত করেন; এবং যিনি সকল জনের(সমস্ত ব্যক্তির) অন্তরস্থ, যিনি প্রত্যেক পুরুষের মধ্যে বর্তমান অর্থাৎ তিনি প্রত্যেক রূপের(বস্তুর) অনুরূপ রূপে প্রকটিত হইয়াছেন। আরও, অন্ত কালে—প্রলয় ‘সময়ে যিনি কোপ করিয়া থাকেন, সংহার করেন, কি করিয়া? বিশ্ব ভুবন সৃষ্টি করিয়া এবং তাহার গোপা গোপ্তা রক্ষক হইয়া [ পরে সংহার করেন]। এই কথা বলা হইতেছে যে, পরমাত্মা অদ্বিতীয়; তিনি যে, কুম্ভকারের ন্যায় আপনাকে মৃৎপিণ্ডের মত উপাদান কারণরূপে গ্রহণ করেন, তাহা নহে; তবে কি? না, স্বীয় শক্তির বিক্ষেপ করেন বলিয়া সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্তা বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। পরবর্তী মন্ত্রটা সেই পরমাত্মারই বিরাট্ রূপে অবস্থান ও বিশ্বস্রষ্টৃত্ব প্রতিপাদন করিতেছে॥ ৩॥ ২॥
যো দেবানাং প্রভবশ্চোদ্ভবশ বিশ্বাধিপো রুদ্রো মহর্ষিঃ। হিরণ্যগর্ভং জনয়ামাস পূর্ব্বং স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনক্তু ॥ ৩॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ। দেবানাং(ইন্দ্রাদীনাং) প্রভবঃ(উৎপত্তিকারণং) উদ্ভবঃ(নানাবিধৈশ্বর্য্যযোগহেতুঃ) চ, বিশ্বাধিপঃ(বিশ্বস্য পালকঃ), রুদ্রঃ (রোদয়তি জীবান্ ইতি রুদ্রঃ), মহর্ষিঃ(দিব্যদর্শী), যঃ(পুরুষঃ) হিরণ্যগর্ভং হিরণ্যং উজ্জ্বলজ্ঞানং গর্ভঃ অন্তঃসারো যস্য, তং সূক্ষ্মসমষ্টিভূতং সূত্রাত্মানং) পূর্ব্বং(প্রথমং) জনয়ামাস, সঃ(পরমেশ্বরঃ) নঃ(অস্মান্) শুভয়া বুদ্ধ্যা (নিৰ্ম্মলজ্ঞানেন সহ) সংযুনক্ত(সংযুক্তান্ করোত্বিত্যর্থঃ) ॥৩॥৪॥
মূলানুবাদ। দেবগণের উৎপত্তি ও ঐশ্বর্য্য লাভের হেতুভূত যিনি বিশ্বপতি রুদ্র ও মহর্ষি(সর্ব্বজ্ঞ), এবং যিনি সর্ব্বপ্রথমে হিরণ্যগর্ভের জন্ম দাতা, তিনি আমাদিগকে শুভ বুদ্ধিযুক্ত করুন ॥ ৩॥ ৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। বিশ্বতশ্চক্ষুরিতি। সর্ব্বপ্রাণিগতানি চক্ষুংযস্যেতি বিশ্বতশ্চক্ষুঃ। অতঃ স্বেচ্ছয়ৈব সর্বত্র চক্ষ রূপাদৌ সামর্থ্যং বিদ্যত ইতি বিশ্বতশ্চক্ষুঃ। এবমুত্তরত্র যোজনীয়ম্। সংবাহুভ্যাং ধমতি সংযোজয়তীত্যর্থঃ। অনেকার্থত্বাদ্ধাতুনান্। পক্ষিণশ্চ ধমতি দ্বিপদো মনুষ্যাদীংশ পতত্রৈঃ। কিং কুর্ব্বন্? দ্যাবাপৃথিবী জনয়ন্ দেব একো বিরাজং সৃষ্টবানিত্যর্থঃ ॥৩৷৷৩৷৷ শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং তস্যৈব সূত্রসৃষ্টিং প্রতিপাদয়ন্ মন্ত্রদৃগভি- প্রেতং প্রার্থয়তে।—যো দেবানামিতি। যো দেবানামিন্দ্রাদীনাং প্রভবহেতুরুদ্ভ- বহেতুশ্চ। উদ্ভবো বিভূতিযোগঃ। বিশ্বস্যাধিপো বিশ্বাধিপঃ পালয়িতা। মহর্ষিঃ। মহাংশাসাবৃষিশ্চেতি মহর্ষিঃ সর্ব্বজ্ঞ ইত্যর্থঃ। হিতং রমণীয়মৃত্যুজ্জ্বলং জ্ঞানং গর্ভোহন্তঃসারো যস্য, তং জনয়ামাস পূর্ব্বং সর্গাদৌ। স নোহস্মান্ বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুক্ত পরমপদং প্রাপ্নুয়ামিতি ৷৷ ৩ ॥ ৪ ॥
ভাষ্যানুবাদ। “বিশ্বতশ্চক্ষুঃ” ইত্যাদি। বিশ্বতশ্চক্ষুঃ। সমস্ত প্রাণির চক্ষুই তাহার চক্ষুঃ, এই কারণে তিনি বিশ্বতশ্চক্ষুঃ। সেই হেতুই ইচ্ছামত সর্ব্বত্র সমস্ত রূপাদি বিষয় দর্শনে চক্ষুর ন্যায় ইহার সামর্থ্য আছে[বুঝিতে হইবে]। পরবর্তী ‘বিশ্বতোমুখঃ’ ইত্যাদি স্থলেও এইরূপই অর্থ যোজনা করিতে হইবে; উভয় বাহু দ্বারা লোককে সংযোজিত করেন। ‘ধমতি, কথায় যদিও অগ্নি-সংযোগ অর্থ বুঝায়, তথাপি, ‘ধাতুর অর্থ অনেক রকম হয়’ এই নিয়মানুসারে এখানে সংযোজন অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে।[‘পতত্র’ অর্থ—পতন-বারণ(গমনের উপায়) অর্থাৎ যাহা অধঃ পতন হইতে রক্ষা করে]। পক্ষিগণকে পতত্রের(পক্ষের) সহিত যোজিত
সরলার্থঃ। ইদানীং বক্ষ্যমাণমন্ত্রদ্বয়েন তস্য স্বরূপমভিপ্রেত- মর্থঞ্চ নিরূপয়ন্নাহ—“যা তে রুদ্র” ইতি](হে রুদ্র, তে তব) অপাপকাশিনী (পুণ্যকরী) অঘোরা(অভয়প্রদা) শিবা(মঙ্গলময়ী) যা তনুঃ, হে গিরিশন্ত (গিরৌ স্থিত্বা শং তনোতীতি গিরিশন্ত), শন্তময়া(অতিশয়মঙ্গলপ্রদয়া) তয়া তনুবা(তন্বা) নঃ(অস্মান্) অভিচাকশীহি(নিরীক্ষস্ব) শ্রেয়সি নিয়োজয়েত্যর্থঃ) ॥ ৩॥ ৫ ॥
‘মূলানুবাদ। হে গিরিশন্ত রুদ্র, তোমার যে অপাপকাশিনী (পুণ্যজনক) অঘোরা শিবা(মঙ্গলময়ী) তনু(মূর্ত্তি), সেই মঙ্গলদায়িনী মূর্ত্তির দ্বারা আমাদিগকে নিরীক্ষণ কর, অর্থাৎ আমাদিগকে মঙ্গলপথে নিযোজিত কর ॥ ৩॥ ৫ ॥
• শাঙ্করভাষ্যম্। পুনরপি তস্য স্বরূপং দর্শয়ন্নভিপ্রেতমর্থং প্রার্থয়তে মন্ত্রদ্বয়েন—“যা তে রুদ্র” ইত্যাদি। হে রুদ্র, তব যা শিবা তনূরঘোরা। উক্তং চ “তস্যৈতে তনুবৌ ঘোরাহন্যা শিবাহন্যা” ইতি। অথবা শিবা শুদ্ধা অবিদ্যা-তৎকার্য্যবিনির্মুক্তা সচ্চিদানন্দাদ্বয়ব্রহ্মরূপা, ন তু ঘোরা শশি- বিম্বমিবাহলাদিনী। অপাপকাশিনী স্মৃতিমাত্রাঘনাশিনী পুণ্যাভিব্যক্তিকরী। তয়া আত্মনা নোহস্মান্ শন্তময়া পূর্ণানন্দরূপয়া, হে গিরিশন্ত গিরৌ স্থিত্বা শং সুখং তনোতীতি। অভিচাকশীহি অভিপশ্য নিরীক্ষস্ব শ্রেয়সা নিযোজয়স্বেত্যর্থঃ ॥ ৩৷৷ ৫ ॥
করেন, এবং দ্বিপদ মনুষ্যাদিকে পতলের(পদের) সহিত যোজিত করেন। তিনি এক অদ্বিতীয় দেবতা। উক্ত পুরুষ আর কি করেন? দ্বাবা-পৃথিবী অর্থাৎ সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করিয়াছেন(১) ॥ ৩ ॥ ৩ ॥ ভাষ্যানুবাদ। অতঃপর সেই পুরুষকৃত সূত্রাত্মসংজ্ঞক হিরণ্যগর্ভের সৃষ্টি প্রতিপাদন করত মন্ত্রদর্শী ঋষিজনের অভিপ্রায়ানুযায়ী প্রার্থনা করিতেছেন —“যো দেবানাম্” ইত্যাদি।
(১) তাৎপর্য্য—এই শ্রুতিতে সাধারণভাবে ব্রহ্মের বিশ্বরূপ প্রদর্শিত হইয়াছে। “বিশ্বতশ্চক্ষুঃ” ও “বিশ্বতোমুখঃ” প্রভৃতি কথার অভিপ্রায় এই যে, জগতে যতপ্রকার চক্ষু অর্থাৎ রূপপ্রকাশক আছে, তৎসমস্তই তাঁহার চক্ষুস্বরূপ বুঝিতে হইবে, এবং সকল জীবের মুখই তাঁহার মুখ বলিয়া ধরিতে হইবে ইত্যাদি ইত্যাদি। “বাহুভ্যাং” কথার অর্থ—কেহ বলিয়াছেন—ধৰ্ম্ম ও অধৰ্ম্ম এই দুই। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন—বিদ্যা ও কৰ্ম্ম। আশ্চর্য্য এই যে ভাষ্যকার ইহার কোন স্পষ্ট অর্থই লিখেন নাই বা সূচনাও করেন নাই, এবং “পতত্রৈঃ” কথারও কোন বিশেষ ব্যাখ্যা করেন নাই।
যামিষুং গিরিশন্ত হস্তে বিভর্য্যস্তবে। শিবাং গিরিত্র তাং কুরু মা হিণ্সীঃ পুরুষং জগৎ ॥৩৷৷৬৷৷
সরলার্থঃ। হে গিরিশন্ত, যাং ইযুং(বাণং) অস্তবে(লোকং প্রতি ক্ষেপণায়) হস্তে বিভর্ষি(ধারয়সি), হে গিরিত্র(গিরিং পর্ব্বতং ত্রায়তে রক্ষতীতি গিরিত্র), তাং(ইযুং) শিবাং(লোকহিতকরীং) কুরু, পুরুষং:(অস্মদীয়ং কমপি জনং), তথা জগৎ[অপি] মা হিংসীঃ(ন মারয়েত্যর্থঃ) ॥৩॥৬॥
মূলানুবাদ। হে গিরিশন্ত,[তুমি] লোকের প্রতি ক্ষেপন করিবার জন্য যে অস্ত্র হস্তে ধারণ করিতেছ, হে গিরিত্র, তাহা কল্যাণময় কর; আমাদের কোনও লোককে এবং সমস্ত জগৎকেও হিংসা করিও না ॥ ৩॥ ৬॥.
শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ যামিষুমিতি। যামিষুং গিরিশন্ত, হস্তে বিভর্ষি ধারয়সি অস্তবে জনে ক্ষেপ্তুং, শিবাং গিরিত্র—গিরিং ত্রায়ত ইতি, তাং কুরু, মা হিংসীঃ পুরুষমস্মদীয়ং জগদপি কৃৎস্নং। পুরুষং সাকারং ব্রহ্ম প্রদর্শয়েত্যভিপ্রেতমর্থং প্রার্থিতবান্ ॥ ৩ ॥ ৬ ॥
যিনি ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণের প্রভবহেতু অর্থাৎ উদ্ভবের কারণ। এখানে উদ্ভব অর্থ বিভূতিযোগ অর্থাৎ অলৌকিক ঐশ্বর্য্যলাভ।[ যিনি দেবগণকে অলৌকিক ঐশ্বর্য্য প্রদান করিয়াছেন।] বিশ্বের অধিপ অর্থাৎ পালনকর্তা বলিয়া বিশ্বাধিপ ও মহর্ষি—মহান্ ঋষি অর্থাৎ সর্ব্বজ্ঞ, এবং যিনি সৃষ্টির প্রথমে, হিরণ্য—হিতকর রমণীয় অতি উজ্জ্বল জ্ঞান যাহার গর্ভ অর্থাৎ অন্তঃসার, সেই হিরণ্য- গর্ভকে(আদি পুরুষকে) সৃষ্টি করিয়াছিলেন, তিনি, আমাদিগকে শুভবুদ্ধির সহিত সংযোজিত করুন, অর্থাৎ আমাদিগকে সদ্বৃদ্ধি প্রদান করুন, যাহাতে আমরা পরম পদ পাইতে সমর্থ হই ॥ ৩॥ ৪ ॥ ভাষ্যানুবাদ। পুনশ্চ দুইটী মন্ত্রে তাহার স্বরূপ প্রদর্শনপূর্ব্বক অভিপ্রেত বিষয় প্রার্থনা করিতেছেন—“যা তে রুদ্র” ইত্যাদি। হে গিরিশন্ত—যিনি পর্ব্বতে(গিরৌ) থাকিয়া লোকের সুখ বিধান করেন,[হে এবম্বিধ] রুদ্র(পরমেশ্বর), তোমার যে অঘোরা(অ-ভয়ঙ্করী) শিবা(মঙ্গলময়ী তনু, অন্যত্রও তাঁহার দ্বিবিধ তনুর উল্লেখ আছে—‘তাঁহার এই দুইটী শরীর, একটা ঘোরা(ভয়ঙ্করী), অপরটী শিবা(মঙ্গলময়ী)’ ইত্যাদি। অথবা শিবা অর্থ শুদ্ধা—অবিদ্যা ও অবিদ্যাসম্ভূত কামাদি দোষরহিত ও অদ্বিতীয় সচ্চিদানন্দঘন-ব্রহ্মস্বরূপা চন্দ্রবিম্বের ন্যায় অত্যন্ত আনন্দদায়িনী, কিন্তু কখনও ঘোরা নহে, এমন যে তোমার অপাপকাশিনী—স্মরণমাত্রে পাপ- ধ্বংসকারিনী তনু,—নিরতিশয় সুখময়ী পূর্ণানন্দস্বরূপ শরীর, সেই স্বরূপভূতা তনু দ্বারা আমাদিগকে নিরীক্ষণ কর অর্থাৎ পরম শ্রেয়োযুক্ত কর ॥ ৩ ॥ ৫ ॥ ভাষ্যানুবাদ। অপিচ “যামিষুং” ইতি। হে গিরিশন্ত, গিরিত্র, তুমি প্রাণীর উপবে ক্ষেপণ কবিবার জন্য ইষু(বাণ) হস্তে ধাবণ কবিতেছ, তাহা মঙ্গলময়
ততঃ পরং ব্রহ্মপরং বৃহন্তং যথানিকায়ং সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ম্। বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারম্ ঈশং তং জ্ঞাতাহমৃতা ভবন্তি ॥ ৩॥ ৭॥
সরলার্থঃ।[অধুনা তস্যৈব সর্ব্বকারণাত্মনা স্থিতিং তজজ্ঞানাদ- মৃতত্বপ্রাপ্তিং চ দর্শয়ন্নাহ—তত ইতি।] ততঃ(তস্মাৎ জগতঃ অথবা জগদাত্মকাৎ বিরাজঃ পুরুষাৎ) পরং(কারণত্বেন তদ্ব্যাপকং), ব্রহ্মপরং(কার্য্য- ব্রহ্মণোহপি) পরং(অতিশয়ং) বৃহন্তং(মহান্তং) যথানিকায়ং(নিকায়ো দেহঃ, তমনতিক্রম্য বিভিন্নাকারশরীরানুসারেণ) সর্ব্বভূতেষু(সর্ব্বপ্রাণিষু) গূঢ়ং(অন্তরেহবস্থিতং) বিশ্বস্য(জগতঃ) একং(অদ্বিতীয়ং) পরিবেষ্টিতারং (বেষ্টনকারিণং ব্যাপকমিত্যর্থঃ) তং(প্রসিদ্ধং) ঈশং জ্ঞাত্বা অমৃতাঃ(মরণরহিতাঃ —মুক্তাঃ) ভবন্তি[জনা ইতি শেষঃ] ॥ ৩ ॥ ৭ ॥
মূলানুবাদ। সেই পরমেশ্বরই যে, সর্ব্বকারণ রূপে অবস্থিত এবং তাঁহার জ্ঞানেই যে, অম্লত্ব লাভ হয়, তাহা প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন— “ততঃপরং” ইত্যাদি।
উক্ত জগতের অতীত, কার্যব্রহ্মেরও অতীত পরম মহৎ এবং নানাপ্রকার শরীরধারী সমস্ত প্রাণীর অন্তরে প্রচ্ছন্নভাবে বিদ্যমান ও সমস্ত জগতের ব্যাপক সেই পরমেশ্বরকে অবগত হইয়া জীবগণ অমৃত(মুক্ত) হয় ॥ ৩॥৭॥
ণাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং তস্যৈব কারণাত্মনাবস্থানং দর্শয়ন্ জ্ঞানাদমৃতত্বমাহ—“পরম” ইতি। ততঃ পুরুষযুক্তাজ্জগতঃ পরং কারণত্বাৎ কার্য্যভূতস্য প্রপঞ্চস্য ব্যাপকমিত্যর্থঃ। অথবা, ততো জগদাত্মনো বিরাজঃ পরম্। কিং তদ্? ব্রহ্মপরং বৃহন্তং, ব্রহ্মণো হিরণ্যগর্ভাৎ পরং বৃহন্তং মহদ্ব্যা- পিত্বাৎ। যথানিকায়ং যথাশরীরম্, সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ং অন্তববস্থিতম্। বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং সর্ব্বমন্তঃ কৃত্বা স্বাত্মনা সব্বং ব্যাপ্যাবস্থিতমীশং পরমেশ্বরং জ্ঞাত্বাহমৃতা ভবন্তি ॥ ৩ ॥ ৭ ॥
কর,[তাহা দ্বারা] আমাদের কোন লোককে হিংসা করিও না, এবং সমস্ত জগৎকেও[হিংসা করিও না], পরন্তু শাকার ব্রহ্ম দর্শন করাও,—এখানে এইরূপ অভিপ্রেত বিষয় প্রার্থনা করিয়াছেন ॥ ৩॥ ৬ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এখন সেই পরমাত্মারই জগৎকারণরূপে অবস্থিতি প্রদর্শনপূর্ব্বক, জ্ঞানই যে অমৃতত্ব লাভের হেতু, তাহা প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন —“ততঃ পরম্” ইত্যাদি।
‘ততঃ’ অর্থ পুরুষের(আত্মার) সহিত সম্বন্ধযুক্ত জগৎ,[যিনি] তদপেক্ষাও পর—শ্রেষ্ঠ। অভিপ্রায় এই যে, তিনি কারণ বলিয়াই তৎকার্য্য জগৎপ্রপঞ্চের ব্যাপক। অথবা ‘ততঃ’—তাহা অপেক্ষা অর্থাৎ জগদাত্মক বিরাট্ পুরুষেব
১৬
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্ত- মাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ। তমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায় ॥ ৬॥৮॥
সরলার্থঃ।[অখেদানীং মন্ত্রদর্শিনোহনুভবমুখেন ব্রহ্মাত্মজ্ঞানামুক্তিং প্রতিপাদয়ন্নাহ—“বেদাহং” ইতি।]
অহং(মন্ত্রদর্শী ঋসিং) তমসঃ(অজ্ঞানাং) পরস্তাৎ(‘পরবর্তিনং আত্মনা’- তীতং) আদিত্যবর্ণং(সূর্য্যবৎ প্রকাশস্বরূপং) মহান্তং(সর্ব্বব্যাপিনং) এতং (প্রস্তুতং) পুরুষং(পরমাত্মানং) বেদ(প্রত্যগভিন্নতয়া জানে)। তং (পরমাত্মানং) এব(নিশ্চয়ে) বিদিত্বা(জ্ঞাত্বা) মৃত্যুং(পুনর্জন্ম) অত্যেতি (অতিক্রান্তো ভবতি মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ)। অয়নায়(পরমপদপ্রাপ্তয়ে) অন্যঃ (দ্বিতীয়ঃ) পন্থাঃ(উপায়ঃ) ন বিন্যতে(নাস্তীত্যর্থঃ) ॥৩৷৷৮৷৷
মূলানুবাদ। এখন মন্ত্রদর্শী ঋষির আত্মানুভূতি প্রদর্শনপূর্ব্বক পরমাত্ম- জ্ঞানে মুক্তি প্রদর্শন করিতেছেন—“বেদাহং” ইত্যাদি।][মন্ত্রদর্শী ঋষি বলিতেছেন] আমি অজ্ঞানের অতীত সূর্য্যবৎ স্বপ্রকাশ মহান্ পুরুষকে আমি জানি।[জীব] তাঁহকে জানিয়াই মৃত্যু অতিক্রম করে(মুক্ত) হয় মুক্তি পাইবার আর দ্বিতীয় পথ নাই, অর্থাৎ পরমাত্মজ্ঞানই মুক্তি লাভের একমাত্র উপায় ॥৩॥৮॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীমুক্তমর্থং দ্রঢ়য়িতুং মন্ত্রদৃগনুভবং দর্শয়িত্বা পূর্ণানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মাত্মপরিজ্ঞানাদেব পরমপুরুষার্থপ্রাপ্তিন্নান্যেনেতি দর্শয়তি। বেদাহমেতমিতি। বেদ জানে, তমেতং পরমাত্মানম্। অথৈতং প্রত্যগাত্মানং সাক্ষিণম্। কিং। পুরুষং পূর্ণং মহান্তং সর্ব্বাত্মত্বাৎ। আদিত্যবর্ণং প্রকাশ- রূপং তমসোহজ্ঞানাৎ পরস্তাৎ, তমেব বিদিত্বাহতিমৃত্যুমেরি মৃত্যুমত্যেতি। কস্মাদম্মান্নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায় পরমপ্রাপ্তয়ে ॥ ৩॥৮॥’
অতীত। তাঁহা কি? না, ব্রহ্মপর অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভরূপী ব্রহ্ম অপেক্ষাও উত্তম, এবং ব্যাপক বলিয়াই বৃহৎ—মহৎ। যথানিকায় অর্থাৎ বিভিন্নপ্রকার শরীর অনুসারে, সর্ব্বভূতে গূঢ় অর্থাৎ সর্ব্বভূতের অন্তরে প্রচ্ছন্নভাবে বিদ্যমান, আর সমস্ত জগতের একমাত্র পরিবেষ্টিতা(ব্যাপক), অর্থাৎ সমস্ত জগৎকে অন্তর্ভুক্ত বা কবলিত করিয়া স্বস্বরূপে সমস্ত জগৎ ব্যাপিয়া অবস্থিত সেই পরমেশ্বরকে অবগত হইয়া[জীবগণ] অমৃত(মুক্ত) হয় ॥ ৩ ॥ ৭ ॥
যস্মাৎ পরং নাপরমস্তি কিঞ্চিৎ, যস্মান্নাণীয়ো ন জ্যায়োহস্তি কিঞ্চিৎ বৃক্ষ ইব স্তক্কো দিবি তিষ্ঠত্যেক- স্তেনেদং পূর্ণং পুরুষেণ সর্ব্বম্ ॥ ৩ ॥ ৯ ॥ ততো যদুত্তরতরং তদ্রূপমনাময়ম্।
সরলার্থঃ।[কস্মাৎ তমেব বিদিত্বা মৃত্যুমত্যেতি? ইত্যত আহ “যস্মাৎ” ইতি।] যস্মাৎ(পরমাত্মনঃ) পরং(উৎকৃষ্টং) অপরং(অন্যৎ) কিঞ্চিৎ ন অস্তি; যস্মাৎ ন অণীয়ঃ(অণুতবং). জ্যায়ঃ(মহত্তরং বা) কিঞ্চিৎ ন অস্তি। বৃক্ষ ইব স্তব্ধঃ(নিশ্চলঃ) একঃ(অদ্বিতীয়ঃ যঃ পরমাত্মাইতি যাবৎ), দিবি(প্রকাশময়ে স্বমহিম্নি) তিষ্ঠতি(স্বে মহিম্নি অস্তীতি ভাবঃ)। তেন পুরুষেণ ইদং সর্ব্বং(জগৎ) পূর্ণং(ব্যাপ্তমিত্যর্থঃ) ॥৩॥৯৷৷
. সরলার্থঃ।[ইদানীং ব্রহ্মণঃ সর্ব্বকারণতাং তজ জ্ঞানাদমৃতত্বং তদ্বৈপরী- ত্যাচ্চ সংসারিত্বং দর্শয়ন্নাহ—“ততো যৎ” ইত্যাদি।]
মূলানুবাদ।[তাঁহাকে জানিলেই মৃত্যু অতিক্রম হয় কেন? তদুত্তরে বলিতেছেন] যাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্ট অন্য কিছু নাই, এবং যদপেক্ষা অতিশয় সূক্ষ্ম বা মহান্ কিছু নাই, এক অদ্বিতীয়, এবং যিনি বৃক্ষের ন্যায় নিশ্চলভাবে স্বপ্রকাশ নিজ মহিমায়(দিবি) অবস্থিত, সেই পুরুষ দ্বারা এই সমস্ত জগৎ পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে ॥৩৷৯৷৷
মূলানুবাদ।[ এখন ব্রহ্মের সর্ব্বকারণতা ও ব্রহ্মজ্ঞানে অমৃতত্বলাভ ও তদভাবে দুঃখভোগ প্রদর্শন করত বলিতেছেন—“ততো যৎ” ইত্যাদি।]
শাঙ্করভাষ্যম্। কস্মাৎ পুনস্তমেব বিদিত্বাহতিমৃত্যুমেতীত্যুচ্যতে- যম্মাদিতি। যস্মাৎ পরং পুরুষাৎ পরমুৎকৃষ্টমপরমন্যন্নাস্তি, যস্মান্নাণীয়োহণুতরং ন জ্যায়ো মহত্তরং বাস্তি। বৃক্ষ ইব স্তব্ধো নিশ্চলো দিবি দ্যোতনাত্মনি স্বে মহিম্নি তিষ্ঠত্যেকোহদ্বিতীয়ঃ পরমাত্মা, তেনাহদ্বিতীয়েন পরমাত্মনা ইদং সর্ব্বং পূর্ণং নৈর- ন্তর্য্যেণ ব্যাপ্তং পুরুষেণ পূর্ণেন সর্ব্বমিদংসর্ব্বম্।। ৩৷৷ ৯৷৷
শঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং ব্রহ্মণঃ পূর্ব্বোক্তকার্য্যকারণতাং দর্শয়ন্।
ভাষ্যানুবাদ। ভাল, লোক একমাত্র তাঁহাকে জানিলেই মৃত্যু অতিক্রম করে(মুক্ত হয়) কেন? তদুত্তরে বলিতেছেন—“যস্মাৎ” ইতি। যাহা অপেক্ষা পর অর্থাৎ যে পুরুষ অপেক্ষা--উৎকৃষ্ট অপর কিছু নাই, যাহা অপেক্ষা অনীয়ঃ—অতিশয় অণু(সূক্ষ্ম) বা জ্যায়ঃ—অতিশয় মহৎ ও নাই। সেই এক অদ্বিতীয় পরমাত্মা বৃক্ষের ন্যায় স্তব্ধ—নিশ্চলরূপে প্রকাশময় স্বীয় মহিমায়(দিবি) অবস্থান করেন। সেই অদ্বিতীয় পুরুষ অর্থাৎ পূর্ণ পরমাত্মা দ্বারা এই সমস্ত জগৎ পূর্ণ—নিরন্তর ভাবে(সর্ব্বোতোভাবে) ব্যাপ্ত ॥৩৷৷৯৷৷
য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্ত্য- থেতরে দুঃখমেবাপিযন্তি ॥ ৩॥ ১০ ॥ সর্ব্বাননশিরোগ্রীবঃ সর্বভূতগুহাশয়ঃ। সর্বব্যাপী স ভগবান্ তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ ॥৩৷৷১১৷৷
ততঃ(তস্মাৎ—জগতঃ) যৎ উত্তরতরং(উত্তরং কারণং, ততোহপ্সুত্তরং সর্ব্বকারণকারণমিতি ভাবঃ), তৎ অরূপং(রূপাদিধর্মরহিতং) অনাময়ং (আধ্যাত্মিকাদি-তাপত্রয়শূন্যং)[চ], এতৎ(যথোক্তং ব্রহ্মস্বরূপং) যে বিদুঃ (জানন্তি), তে(জ্ঞানিনঃ) অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) ভবন্তি। অথ(পক্ষান্তরে) ইতরে (পূর্ব্বোক্তজ্ঞানরহিতাঃ) দুঃখং(আধ্যাত্মিকাদিরূপং) এর অপিযন্তি(প্রাপ্ন- বন্তীত্যর্থঃ) ॥ ৩॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।[অথেদানীং তস্যৈব সর্ব্বাত্মকত্বং দর্শয়ন্নাহ—“সর্ব্বানন” ইত্যাদি।][যস্মাৎ সঃ সর্ব্বানন-শিরোগ্রীবঃ(সর্ব্বেষাং আননানি শিরাংসি গ্রীবা এব আননানি শিরাংসি গ্রীবাশ্চ যস্য, সঃ), সর্ব্বভূত-গুহাশয়ঃ(সর্ব্বেষাং ভূতানাং গুহায়াং বুদ্ধৌ শেতে ইতি তথোক্তঃ), তথা সর্ব্বব্যাপী(সর্ব্বং জগৎ ব্যাপ্নোতি ইতি সর্ব্বব্যাপী) ভগবান্(ষড়ৈশ্বর্য্যযুক্তঃ চ), তস্মাৎ(হেতোঃ) সর্ব্বগতঃ (সর্ব্বত্রাবস্থিতঃ) শিবঃ(আনন্দঘনত্বেন মঙ্গলরূপশ্চ) ॥ ৩॥ ১১ ॥
সমস্ত জগতের যিনি কারণ, তাহারও যিনি কারণ, তিনি অরূপ অর্থাৎ নিরাকার নির্বিশেষ, এবং আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক দুঃখের অতীত, যাহারা তাঁহাকে জানেন, তাহারা অমৃত(মুক্ত) হন, আর যাহারা তাঁহাকে জানে না, তাহারা আধ্যাত্মিকাদি দুঃখই প্রাপ্ত হয়। ॥৩॥ ১০॥
জ্ঞানিনামমৃতত্বমিতরেষাঞ্চ সংসারিত্বং দশয়তি—তত ইতি। তত ইদং- শব্দবাচ্যাজ্জগত উত্তরতরং কারণং, ততোহপ্যুত্তরং কার্য্যকারণবিনির্ম্মুক্তং ব্রহ্মৈবেত্যর্থঃ। তদরূপং রূপাদিরহিতং, অনাময়ং আধ্যাত্মিকাদিতাপত্রয়- রহিতত্বাৎ। য এতদ্বিদুরমৃতত্বেনাহহমস্মীতি, অমৃতা অমরণধৰ্ম্মাস্তে ভবন্তি, অথেতরে যে ন বিদুদুঃখমেবাপিযন্তি ॥ ৩৷৷ ১০৷৷
ভাষ্যানুবাদ। এখন ব্রহ্মই যে, পূর্ব্বোক্ত কার্য্যবর্গের একমাত্র কারণ, ইহা প্রদর্শনপূর্ব্বক জ্ঞানিগণের অমৃতত্ব প্রাপ্তি, আর তদ্ভিন্ন লোকদিগের সংসারগতি প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন—“ততঃ” ইত্যাদি। তাহা হইতে অর্থাৎ ইদংপদবাচ্য(প্রত্যক্ষদৃশ্য) জগৎ অপেক্ষা যাহা উত্তর অর্থাৎ জগতের যাহা কারণ, তদপেক্ষাও যাহা উত্তর(পরবর্তী) কার্য্য-কারণ ভাবরহিত ব্রহ্ম, তিনি অরূপ অর্থাৎ রূপরসাদি গুণহীন, এবং অনাময় রোগ- যাতনাশূন্য) কেননা, তাঁহাতে আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক তাপের সম্বন্ধ নাই। যাহারা ইহা জানেন—আমি অমৃত—মরণ-ধর্ম্মরহিত[এইরূপে আত্মানুভব করেন, তাহারা অমৃত হন, পক্ষান্তরে তদ্ভিন্ন সকলে—যাহারা এতত্ত্ব জানে না, তাহারা কেবল দুঃখ, প্রাপ্ত হয় ॥ ৩ ॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।[অপিচ, সঃ] মহান্(সর্ব্বব্যাপী) প্রভুঃ(নিগ্রহানুগ্রহসমর্থঃ) বৈ(নিশ্চয়ে) পুরুষঃ(পুরি শেতে, পূর্ণো বা) তথা সুনির্ম্মলাং(অবিদ্যাদি- মলসম্পর্করহিতাং) ইমাং(বিদ্বদনুভবযোগ্যাং) প্রাপ্তিং(মুক্তিং)[যতঃ প্রাপ্নোতি, তস্য] সত্ত্বস্য(বুদ্ধিসত্ত্বস্য) প্রবর্ত্তকঃ(প্রেরকঃ) এষঃ(পরমেশ্বরঃ) ঈশানঃ (সর্ব্বস্য শাসকঃ) জ্যোতিঃ(স্বপ্রকাশরূপঃ) অব্যয়ঃ(নির্বিকারশ্চ ইত্যর্থঃ) ॥ ৩ ॥ ১২ ॥
মূলানুবাদ। এখন পরমেশ্বরের সর্ব্বাত্মকত্ব প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন— [যেহেতু] তিনি সর্ব্বানন-শিরোগ্রীব অর্থাৎ সর্ব্ব প্রাণীর আনন, শির ও গ্রীবাই ইঁহার আনন, মস্তক ও গ্রীবা, এবং সকল প্রাণীর বুদ্ধিরূপ গুহাতে বিদ্যমান, অথচ সর্ব্বব্যাপী, ভগবান্ অর্থাৎ ষড়ৈশ্বৰ্য্যাদিপূর্ণ; সেই হেতু তিনি সর্ব্বগত অর্থাৎ সর্ব্বত্র বিদ্যমান এবং শিব(পরম মঙ্গলরূপী)॥ ৩॥ ১১॥ মূলানুবাদ। এই পরমেশ্বর[স্বভাবতই] মহান, নিগ্রহানুগ্রহসমর্থ, পুরুষ(দেহ-পুরে অবস্থিত অথবা পরিপূর্ণ, এবং অত্যন্ত নির্ম্মল মুক্তি যাহা হইতে লাভ করা যায়, সেই বুদ্ধি-সত্ত্বের প্রেরক এবং সকলের শাসনকর্ত্তা, স্বপ্রকাশ ও নির্ব্বিকার ॥ ৩॥ ১২॥
শাঙ্করভাষ্যম। ইদানীং তস্যৈব সর্ব্বাত্মত্বং দর্শয়তি—সর্ব্বাননেতি। সর্ব্বাণ্যাননানি শিরাংসি গ্রীবাশ্চাস্যেতি সর্ব্বাননশিরোগ্রীবঃ। সর্ব্বেষাং ভূতানাং গুহায়াং বুদ্ধৌ শেত ইতি সর্ব্বভূতগুহাশয়ঃ। সর্ব্বব্যাপী স ভগবান্ ঐশ্বর্য্যাদি- সমষ্টিঃ। উক্তঞ্চ “ঐশ্বর্য্যস্য সমগ্রস্য বীর্য্যস্য যশসঃ শ্রিয়ঃ। জ্ঞানবৈরাগ্যয়োশ্চৈব যন্নাং ভগ ইতীরণা।” ভগবতি যম্মাদেবং, তস্মাৎ সর্ব্বগতঃ শিবঃ ॥ ৩॥ ১১ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ। মহানিতি। মহান্ প্রভুঃ সমর্থো বৈ নিশ্চয়েন জগদুদয়স্থিতিসংহারে সত্ত্বস্যান্তঃকরণস্যৈষ প্রবর্ত্তকঃ প্রেরয়িতা। কিমর্থমুদ্দিশ্য? সুনির্মলামিমাং স্বরূপাবস্থালক্ষণাং প্রাপ্তিং পরমপদপ্রাপ্তিং। ঈশান ঈশিতা। জ্যোতিঃ পরিশুদ্ধো বিজ্ঞানপ্রকাশঃ। অব্যয়োহবিনাশী ॥ ৩৷৷ ১২॥
ভাষ্যানুবাদ। এখন তাঁহারই সর্ব্বাত্মভাব প্রদর্শন করিতেছেন— “সর্ব্বানন” ইত্যাদি। জগতের সমস্ত আনন(মুখ) শির ও গ্রীবা(গলদেশ) ইঁহার[আনন, শির ও গ্রীবা], তিনি সর্ব্বানন শিবো গ্রীব, সকল ভূতের(প্রাণীর) গুহানামক বুদ্ধিতে বিদ্যমান, সর্ব্বব্যাপী ও ভগবান্ অর্থাৎ সমগ্র ঐশ্বর্য্যশালী, [তিনি যে ঐশ্বর্য্যশালী, তাহা অন্যত্র ও] উক্ত আছে—“সমগ্র ঐশ্বর্য্য, বীর্য্য (প্রভাব), যশঃ, শ্রী, এবং পূর্ণ জ্ঞান ও বৈরাগ্য এই ছয়টা গুণ ভগনামে কথিত, যে হেতু ভগবানে এ সমস্ত আছে, সেই হেতু তিনি সর্ব্বগত(সর্ব্বব্যাপী) ও শিবস্বরূপ॥ ৩॥ ১১॥
অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষোহন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ। হৃদা মন্বীশো মনসাভিক্লপ্তো য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ॥ ৩ ॥ ১৩ ॥
সরলার্থঃ।[কিংচ] অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ(অঙ্গুষ্ঠপবিমিতে হৃদয়েহভিব্যজ্যমানত্বাৎ অঙ্গুষ্ঠপরিমাণঃ) পুরুষঃ(পূর্ণত্বাৎ পুরিশয়নাদ্বা) অন্তরাত্মা(আত্মনঃ বুদ্ধেরন্তরবস্থিতঃ) সদা জনানাং(জনিমতাৎ প্রাণিনাং) হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ(সম্যক্ প্রবিষ্টঃ) মন্বীশঃ (জ্ঞানদাতা) তথা হৃদা(হৃদয়স্থেন) মনসা(সংকল্পবিকল্পাত্মকেন) অভিকপ্তঃ (সম্যক্ রক্ষিতঃ)[অস্তীতি শেষঃ]। যে জনাঃ এতৎ(যথোক্তমাত্মতত্ত্বং) বিদুঃ(জানন্তি), তে অমৃতাঃ(মুক্তাঃ ভবন্তীত্যর্থঃ) ॥৩॥ ১৩॥
মূলানুবাদ। আরও, তিনি অঙ্গুষ্ঠপরিমিত হৃদয়ে অভিব্যক্ত, পুরুষ, অন্তঃকরণের অধিষ্ঠাতা, সর্ব্বদা প্রাণীগণের হৃদয়ে অবস্থিত, প্রজ্ঞানাধিপতি এবং হৃদয়স্থ মনের দ্বারা সংরক্ষিত(প্রকাশিত)। যাহারা ইহাকে জানেন, তাঁহারা অমৃত হন(মুক্ত হন) ॥ ৩॥ ১৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্। অঙ্গুষ্ঠমাত্রেতি। অঙ্গুষ্ঠমাত্রোহভিব্যক্তিস্থানহৃদয়সুষির- পরিমাণাপেক্ষয়া। পুরুষঃ পূর্ণত্বাৎ পূরিশয়নাদ্বা। অন্তরাত্মা সর্ব্বস্যান্তরাত্মভূতঃ স্থিতঃ। সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ হৃদয়স্থেন মনসাভিকুপ্তঃ। মন্বশো জ্ঞানেশঃ। য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ॥ ৩॥ ১৩ ॥
ভাষ্যানুবাদ। অপিচ, “মহান্” ইতি। তিনি মহান্ প্রভু অর্থাৎ জগতের উৎপত্তি স্থিতি ও সংহারে একমাত্র সমর্থ। তিনি অন্তঃকরণরূপী সত্ত্বগুণের প্রবর্তক—প্রেরক অর্থাৎ অন্তঃকরণকে ভাল মন্দ সর্ব্ব কার্য্যে নিযোজিত করেন, কোন প্রয়োজন সাধনের নিমিত্ত[ প্রেরণ করেন]? না, এই যে স্বরূপে অবস্থিতি- রূপ সুনির্ম্মল(নির্দোষ) পরম পদপ্রাপ্তি,[ তাহার ‘জন্য’]। তিনি ঈশান— সকলের শাসনকর্তা, জ্যোতিঃ অর্থাৎ বিশুদ্ধ জ্ঞানপ্রকাশস্বরূপ এবং অব্যয় বিনাশ- রহিত(নিত্য নির্বিকার) ॥ ৩॥ ১২ ॥
ভাষ্যানুবাদ। “অঙ্গুষ্ঠমাত্র” ইত্যাদি। তিনি অঙ্গুষ্ঠপরিমিত, হৃদয়-ছিদ্রই তাহার অভিব্যক্তস্থান, সেখানেই আত্মার প্রকাশ হয়। হৃদয়ছিদ্রটী সাধারণতঃ অঙ্গুষ্ঠপরিমিত, এই কারণে তদভিব্যক্ত আত্মাকেও অঙ্গুষ্ঠমাত্র—অঙ্গুষ্ঠপরিমিত বলা হইয়াছে(১)। তিনি স্বভাবতই পূর্ণ, এই জন্য, অথবা হৃদয়-পুরে শয়ন করেন বলিয়া পুরুষ, অন্তরাত্মা—সকলের অন্তরে আত্মরূপে অবস্থিত, সর্ব্বদা প্রাণিগণের হৃদয়ে অনুপ্রবিষ্ট, এবং হৃদস্থ মনের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে গুপ্ত অর্থাৎ মানস চিন্তার
(১) সকল মানুষেরই হৃদয়ের পরিমাণ অঙ্গুষ্ঠমাত্র। অন্যান্য প্রাণির সম্বন্ধেও এইরূপ কল্পনা করিয়া লইতে হইবে। পরমাত্মা অঙ্গুষ্ঠপরিমিত সেই হৃদয়ে প্রকাশ পান, এইজন্য তাহাকেও অঙ্গুষ্ঠমাত্র বলা হইয়া থাকে।
সরলার্থঃ।[পুনরপি তস্য সর্ব্বাত্মভাবং দর্শয়তি—সহস্রেত্যাদি]। সহস্রশীর্ষা(সহস্রাণি—অসংখ্যেয়ানি শীর্ষাণি যস্য, সঃ তথোক্তঃ,[আকার- শ্ছান্দয়:], পুরুষঃ(পূর্ণঃ), সহস্রাক্ষঃ(সহস্রাণি অক্ষীণি যস্য, স তথোক্তঃ), সহস্রপাৎ(সহস্রচরণযুক্তঃ)।[সহস্রশব্দঃ সর্ব্বত্রাসংখ্যেয়ত্বপবঃ।] সঃ (পরমেশ্বর:) ভূমিং(ভুবনং) সর্ব্বতঃ(সর্ব্বপ্রকারেণ বহিরন্তশ্চ) বৃত্বা(ব্যাপ্য সমাক্রম্য) অতি(অতিক্রম্য সর্ব্বং জগৎ) দশাঙ্গুলং(দশাঙ্গুলীপরিমিতং স্বানং) অতিষ্ঠৎ।[দশাঙ্গুলমিতি আধিক্যপরং, ন তাবন্মাত্রপরমিতিভাবঃ]। [অথবা নাভেরুপবি] দশাঙ্গুলং অতিক্রম্য—[হৃদয়ং] অতিষ্ঠং(অন্তর্য্যামিতয়া স্থিত ইত্যর্থঃ) ॥৩৷১৪॥
মূলানুবাদ। তিনি সহস্র সহস্র শির, অক্ষি(চক্ষু) ও পদযুক্ত এবং পুরুষ অর্থাৎ নিত্যপূর্ণ। তিনি সমস্ত জগতে ব্যাপ্ত থাকিয়াও সকলের উপবে দশাঙ্গুলিপরিমিত স্থানে আছেন, অথবা নাভিব উপরে দশাঙ্গুলির পরবর্তী যে স্থান, সেই হৃদয়স্থানে আছেন ॥৩৷১৪৷
শাঙ্করভাষ্যম্। পুরুষোহন্তরাত্মেত্যুক্তম্, পুনরপি সর্ব্বাত্মানং দর্শয়তি —সহস্রশীর্ষেতি। সর্ব্বস্য তাবন্মাত্রত্বপ্রদশনার্থম্। উক্তঞ্চ—“অধ্যারোপাপবাদাভ্যাং নিষ্প্রপঞ্চং প্রপঞ্চ্যতে” ইতি। সহস্রাণ্যনন্তানি শীর্ষাণ্যস্যেতি সহস্রশীর্ষা। পুরুষঃ পূর্ণঃ। এবমুত্তরত্র যোজনীয়ং। স ভূমিং ভুবনং সর্ব্বতোহন্তর্ব্বহিশ্চ বৃত্বা ব্যাপ্যাত্যতিষ্ঠদ্ অতীত্য ভুবনং সমধিতিষ্ঠতি। দশাঙ্গুলং অনন্তমপাবমিত্যর্থঃ। অথবা নাভেরুপরি দশাঙ্গুলং হৃদয়ং, তত্রাধিতিষ্ঠতি ॥ ৩ ॥ ১৪ ॥
বিষয়ীভূত এবং মন্বীশ—জ্ঞানের প্রভু। যাহারা এই তত্ত্ব জানেন, তাহারা অমৃত হন অর্থাৎ মরণভয়রহিত মুক্ত হন ॥ ৩॥ ১৩॥
ভাষ্যানুবাদ। পুরুষ যে, অন্তবাত্মা, একথা বলাই হইয়াছে, এখন পুনরায় তাহার সর্ব্বাত্মভাব প্রদর্শন করিতেছেন। উদ্দেশ্য, সকল বস্তুর তন্মাত্র- ভাব বা তাহা হইতে অপৃথগ্ভাব প্রদর্শন। একথা অন্যত্রও উক্ত আছে ‘অধ্যারোপ’ ও ‘অপবাদ’ ক্রমে নিষ্প্রপঞ্চকে প্রপঞ্চিত করা হইতেছে(২)। অর্থাৎ নির্বিশেষ ব্রহ্মকে সবিশেষভাবে বর্ণনা করা হইতেছে। তাঁহার শির
(২) ‘অধ্যারোপ’ ও ‘অপবাদ’ ইহা বেদান্তের পরিভাষা। অসত্যে সত্যত্বা- রোপের নাম অধ্যারোপ। যেমন অসর্প রজ্জুতে সর্পত্বের আরোপ। উক্ত অধ্যারোপ নিরাকরণপূর্ব্বক প্রকৃত সত্য প্রদর্শনের নাম অপবাদ। যেমন রজ্জু-সর্প স্থলে সর্পভাব নিষেধ দ্বারা প্রকৃত সত্য রজ্জুত্ব জ্ঞাপন করা।
১২৮
সরলার্থঃ।[বিবিধপ্রত্যয়থম্যং নিখিলমপীদং ন ততো ভিন্নমিত্যাহ —“পুরুষঃ” ইত্যাদি।] যৎ ভূতং(অতীতং), যৎ চ ভব্যং(ভবিষ্যৎ), যৎ[চ] অম্লেন(অদনীয়েন ভক্ষবস্তুনা) অতিরোহতি(অধিকাং বৃদ্ধিং প্রাপ্নোতি অর্থাৎ বর্তমানং), ইদং সর্ব্বং পুরুষ এব।[অথবা, পুরুষঃ এব ইদং সর্ব্বং ইতি সম্বন্ধঃ!] অমৃতত্বস্য(কৈবল্যস্য) উত(অপি) ঈশানঃ(প্রভুঃ)।[অপি-শব্দাৎ অন্যেষামপি ঈশান ইতি গম্যতে ইতি ভাবঃ] ॥৩৷৷১৫৷৷
মূলানুবাদ।[বিভিন্ন প্রতীতিগম্য সমস্ত জগৎই তাঁহা হইতে ভিন্ন নহে; ইহা বুঝাইবার নিমিত্ত বলিতেছেন—‘পুরুষঃ’ ইত্যাদি।
যাহা ভূত(অতীত), যাহা ভবিষ্যৎ এবং যাহা অন্নের দ্বারা বৃদ্ধি পাইতেছে অর্থাৎ বর্তমান, এ সমস্ত পুরুষই—পরমাত্মস্বরূপই।(তাঁহা হইতে পৃথক্ নহে); অথবা পুরুষই ভূত ভবিষৎ ও বর্তমান সমস্ত বস্তুস্বরূপ। সেই পুরুষ অমৃতত্বের(মুক্তিরও) প্রভু ॥৩॥১৫৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। ননু সর্ব্বাত্মত্বে সপ্রপঞ্চং ব্রহ্ম স্যাৎ, তদ্ব্যতিরেকেণা- ভাবাদিত্যাহ—পুরুষ এবেদমিতি। পুরুষ এবেদং সর্ব্বম্। যদ্ভূতং যচ্চ ভব্যং। যদন্নেনাতিরোহতি, যদিদং দৃশ্যতে বর্তমানং যদ্ভূতং যচ্চ ভব্যং ভবিষ্যৎ। কিঞ্চ। উতামৃতত্বস্যেশানোহমরণধর্ম্মত্বস্য কৈবল্যস্য ঈশানঃ। যচ্চান্নেনাতিরোহতি যদ্বর্ত্ততে, তস্য ঈশানঃ ॥ ৩॥ ১৫ ॥
হাজার হাজার, এই জন্য তিনি সহস্রশীষা, পূর্ণ বলিয়া পুরুষপদবাচ্য। পরবর্তী শব্দগুলিরও এইভাবেই অর্থযোজনা করিতে হইবে। তিনি সর্ব্বতোভাবে সমস্ত জগতে ব্যাপ্ত থাকিয়াও ভুবন অতিক্রম করিয়া দশাঙ্গুলি অর্থাৎ অনন্ত— অসীম স্থানে অবস্থিত। অথবা নাভিদেশের উপরিভাগে যে, দশাঙ্গুলি পরিমিত হৃদয়, তাহাতে অবস্থি—বিশেষভাবে অভিব্যক্ত ॥৩৷১৪॥
ভাষ্যানুবাদ। ভাল কথা, ব্রহ্ম যদি সর্ব্বাত্মকই হন, তাহা হইলে তদ্ভিন্ন যখন কিছুই নাই, তখন ব্রহ্মত সপ্রপঞ্চ অর্থাৎ সবিশেষ বা অনেকাত্মক হইতেছেন? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন—“পুরুষ এবেদং” ইত্যাদি।
এই ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান যাহা কিছু, সে সমস্ত পুরুষই অর্থাৎ কোন বস্তুই পুরুষ হইতে অতিরিক্ত নহে। আর তিনি অমৃতত্বের অর্থাৎ কৈবল্যের. ঈশ্বর প্রভু এবং যাহা অন্ন দ্বারা জীবিত থাকে, তাহারও প্রভু ॥৩৷১৫৷
সর্ব্বতঃ পাণিপাদন্তৎ সর্বতোহক্ষিশিরোমুখম্। সর্ব্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি ॥ ৩॥ ১৬॥ সর্ব্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্ব্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্। সর্বস্য প্রভুমীশানং সর্বস্য শরণং বৃহৎ ॥ ৩॥ ১৭॥
সরলার্থঃ।[পুনরপি তস্য সর্বব্যাপিতাং সর্বজ্ঞতাং চ দর্শন্নাহ -সর্ব্বত ইতি]। তৎ(ব্রহ্ম) সর্ব্বতঃ পাণিপাদং(সর্ব্বতঃ সর্ব্বাসু দিক্ষু পাণয়ঃ পাদাশ্চ যস্য, তৎ তথা), সর্বতোহক্ষিশিরোমুখং(সর্ব্বতঃ অক্ষি, শিরঃ, মুখং চ যস্য, তৎ তথা) সর্ব্বতঃ শ্রুতিমৎ(সর্ব্বতঃ সকর্ণং), লোকে(প্রাণি- সমূহে, জগতি বা) সর্ব্বং আবৃত্য(ব্যাপ্য) তিষ্ঠতি(বর্ত্তত ইত্যর্থঃ) ॥৩৷৷১৬৷৷ সরলার্থঃ।[ব্রহ্মণো হস্তপদাদিসদ্ভাবশ্রবণাদম্মদাদিতুল্যতাশঙ্কা মা ভূদিত্যত আহ-সর্ব্বেন্দ্রিয়েতি]। সর্ব্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বাণি ইন্দ্রিয়াণি, গুণা ইন্দ্রিয়বৃত্তয়শ্চ, তৈঃ আভাসত- ইতি তথা) সর্ব্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতং(বস্তুতস্তু সর্ব্বৈঃ ইন্দ্রিয়ৈঃ বিবর্জিতং রহিতং), সর্ব্বস্য(ব্রহ্মাদিস্থাবরান্তস্থ্য) প্রভুং(নিগ্রহানুগ্রহসমর্থং) ঈশানং(শাসকং), সর্ব্বস্য বৃহৎ(মহৎ) শরণং(আশ্রয়শ্চ) ॥৩৷৷১৭৷৷ মূলানুবাদ।[পুনরায় তাঁহার সর্বব্যাপিত্ব ও সর্বজ্ঞত্ব প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন-“সর্ব্বতঃ ইত্যাদি]। তাঁহার হস্তপদ সর্বত্র, চক্ষু, শির ও মুখ সর্ব্বত্র, কর্ণও সর্ব্বত্র, এবং তিনি জগতে সমস্ত বস্তু ব্যাপিযা আছেন ॥৩৷৷১৬৷৷ মূলানুবাদ।[কাহারো আশঙ্কা হইতে পাবে যে, পরমেশ্বর যখন হস্তপদাদিযুক্ত, তখন তিনিও আমাদেরই মত, এই আশঙ্কা নিবৃত্তির জন্য বলিতেছেন-“সর্ব্বেন্দ্রিয়” ইত্যাদি]।
শাঙ্করভাষ্যম্। পুনরপি নির্বিশেষং প্রতিপাদয়িতুং দর্শয়তি-সর্ব্বত ইতি। সর্ব্বতঃ পাণয়ঃ পাদাশ্চেতি সর্ব্বতঃ পাণিপাদং তৎ। সর্ব্বতোহক্ষীণি শিরাংসি চ মুখানি চ যস্য তৎ সর্ব্বতোহক্ষিশিরোমুখম্। সর্ব্বতঃ শ্রুতিঃ শ্রবণমস্যেতি শ্রুতিমৎ। লোকে প্রাণিনিকায়ে সর্ব্বমাবৃত্য সংব্যাপ্য তিষ্ঠতি ॥৩৷৷১৬৷৷
ভাষ্যানুবাদ। পুনশ্চ নির্ব্বিশেষভাব প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন— “সর্ব্বতঃ” ইত্যাদি। সকলের হস্তপদই তাঁহার হস্ত ও পদ, এই জন্য তিনি ‘সর্ব্বতঃপাণিপাঁদ’, সমস্ত চক্ষু, শির ও মুখই তাঁহার চক্ষু শির ও মুখ, এইজন্য তিনি ‘সর্ব্বতোহক্ষি- শিরোমুখ’; সর্ব্বপ্রকার শ্রুতিই(শ্রবণেন্দ্রিয়ই) তাঁহার শ্রুতি, এই জন্য তিনি ‘সর্ব্বতঃ শ্রুতিমৎ’; এবং তিনি লোকে অর্থাৎ প্রাণিদেহে সমস্ত অংশ আবরণ ‘করিয়া ব্যাপিয়া অবস্থান করেন ॥৩৷১৬৷৷
১৭
সরলার্থঃ। অপিচ, স্থাবরস্য(স্থিতিশীলস্য বৃক্ষাদেঃ) চরস্য জঙ্গমস্য মনুষ্যাদেঃ) সর্ব্বস্য লোকস্য বশী(প্রভুঃ), হংসঃ(হন্তি অবিদ্যা-তৎকার্য্যাণি ইতি হংসঃ পরমাত্মা)। নবদ্বারে(নবসংখ্যকানি দ্বারাণি ছিদ্রাণি—চক্ষুদ্বয়, শ্রোত্রদ্বয়, নাসিকাদ্বয়, মুখ, পায়ুপস্থরূপাণি যত্র, তস্মিন্) পুবে(দেহে) দেহী(দেহাভিমানী জীবঃ সন্) বহিঃ(বাহ্যবিষয়ভোগার্থং) লেলায়তে(স্পন্দতে ব্যাপারবান্ ভবতীত্যর্থঃ) ॥৩৷৷১৮,
সমস্ত ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়বৃত্তি(জ্ঞানাদি) তাঁহাতে প্রকাশমান থাকিলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় ও তৎক্রিয়াবর্জিত, সকলের প্রভু ও শাসক এবং সকলের পরম আশ্রয় ॥৩৷১৭৷৷
মূলানুবাদ। অপিচ, স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত লোকের প্রভু হংস(অবিদ্যা ও তৎকার্য্যসমূহ বিনাশ করেন বলিয়া পরমাত্মা হংসপদব্যচ্য) দুই চক্ষু, দুই কর্ণ, দুই নাসারন্ধ্র, এক মুখ, এবং মলদ্বার ও মূত্রদ্বার এই নয়টা দ্বারযুক্ত এই দেহরূপ পুরে দেহাভিমানী জীবভাব প্রাপ্ত হইয়া বহির্জগতে কার্য্য করিয়া থাকেন,(কিন্তু স্বরূপতঃ তাহার কোন ক্রিয়া নাই) ॥৩৷৷১৮৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। উপাধিভূতপাণিপাদাদীন্দ্রিয়াধ্যারোপণাজ জ্ঞেয়স্য তদ্বত্তাশঙ্কা মাভূদিত্যেবমর্থমুত্তরতো মন্ত্রঃ-সর্ব্বেন্দ্রিয়েতি। সর্ব্বাণি চ তানীন্দ্রিয়াণি শ্রোত্রাদীনি-ইন্দ্রিয়াণি অন্তঃকরণপর্য্যন্তানি সর্ব্বেন্দ্রিয়গ্রহণেন গৃহ্যন্তে। অন্তঃকরণ- বহিঃকরণোপাধিভূতঃ সর্ব্বেন্দ্রিয়গুণৈরব্যবসায়-সঙ্কল্পশ্রবণাদিভিগুণবদাভাসত ইতি সর্ব্বেন্দ্রিয়গুণাভাসম্। সর্ব্বেন্দ্রিয়ৈব্যাপৃতমিব তজজ্ঞেয়মিত্যর্থঃ, “ধ্যায়তীব লেলায়তীব”ইতি শ্রুতেঃ। কস্মাৎ পুনঃ কারণাত্তদ্ব্যাপৃতমিবেতি গৃহ্যতে? ইত্যাহ-সর্ব্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতং সর্ব্বকরণবহিতমিত্যর্থঃ। অতো ন চ করণ- ব্যাপারৈর্ব্যাপৃতং তজজ্ঞেয়ং। সর্ব্বস্য জগতঃ প্রভুমীশানম্। সর্ব্বস্য শরণং পরায়ণং বৃহৎ কারণঞ্চ ॥ ৩॥ ১৭ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, নবদ্বারেতি। নবদ্বারে শিরসি সপ্তদ্বারাণি দ্বে অবাচী,পুরে দেহী বিজ্ঞানাত্মা ভূত্বা কার্যকরণোপাধিঃ সন্ হংসঃ পরমাত্মা হন্ত্যবিদ্যাত্মকং কার্য্যমিতি, লেলায়তে চলতি বহির্বিষয়গ্রহণায়। বশী সর্ব্বস্য লোকস্য স্থাবরস্য চরস্য চ ॥ ৩॥ ১৮॥
ভাষ্যানুবাদ। আশঙ্কা হইতে পারে যে, হস্ত, পদ ও ইন্দ্রিয়াদি উপাধি তাঁহাতে আরোপিত থাকায়, বিজ্ঞেয় ব্রহ্ম বোধ হয় ঐ সকল উপাধিদ্বারা বিশেষত(সবিশেষ)। সেরূপ আশঙ্কা না হউক, এইজন্য পরবর্তী “সর্ব্বেন্দ্রিয়” ইত্যাদি মন্ত্র প্রকটিত হইতেছে। এখানে ‘সর্ব্বেন্দ্রিয়’ শব্দে অন্তঃকরণ ও শ্রোত্রাদি সমস্ত ইন্দ্রিয় গ্রহণ করিতে হইবে। বুদ্ধিপ্রভৃতি অন্তঃকরণ এবং শ্রোত্রাদি বহিরিন্দ্রিয়, এ সমস্ত তাহার
সরলার্থঃ।[ইদানীং নিরাকারস্য ব্রহ্মণো নিত্যজ্ঞানস্বরূপতাং দর্শয়িতুমাহ— অপাণিপাদ ইত্যাদি।]
সঃ(পরমাত্মা) অপাণিপাদঃ জবনঃ গ্রহীতা(হস্তরহিতোহপি গ্রহীতা সর্ব্বং ধৃত্বা রক্ষতি, পাদরহিতোহপি জবনঃ গতিশীলঃ সর্ব্বগতইত্যর্থঃ)। অচক্ষুঃ চক্ষুরহিতোহপি) পশ্যতি(দর্শনকার্য্যং করোতি), অকর্ণঃ(কর্ণরহিতোহপি) শৃণোতি(সর্ব্বং শব্দং গৃহ্লাতি, ইন্দ্রিয়নিরপেক্ষ-জ্ঞানস্বভাব ইতি ভাবঃ)। সঃ
মূলানুবাদ।[ এখন পরমেশ্বরের নিত্যজ্ঞানস্বরূপতা প্রদর্শনের জন্য বলিতেছেন—“অপাদিপাদঃ” ইত্যাদি।] তিনি হস্তরহিত, অথচ গ্রহীতা—সব ধরিয়া আছেন; পাদরহিত, অথচ গমন- কারী—সর্ব্বত্রবিদ্যমান আছেন, চক্ষুবর্জ্জিত, অথচ সমস্ত দর্শন করিতেছেন, কর্ণরহিত,
, শাঙ্করভাষ্যম্। এবং তাবৎ সর্ব্বাত্মকং ব্রহ্ম প্রতিপাদিতম্, অথেদানীং নির্বিকারানন্দস্বরূপেণানুদিতানস্তমিতং জ্ঞানাত্মনাবস্থিতং পরমাত্মানং দর্শয়িতুমাহ —অপাণিপাদ ইতি। নাস্য পাণিপাদাবিত্যপাণিপাদঃ। জবনো দূরগামী। গ্রহীতা পাণ্যভাবেহপি সর্ব্বগ্রাহী। পশ্যতি সর্ব্বমচক্ষুরপি সন্, শূণোত্য-
উপাধিমাত্র; ঐ সকল ইন্দ্রিয়ের অধ্যবসায়, সংঙ্কল্প ও শ্রবণ প্রভৃতি গুণের দ্বারা তিনি গুণযুক্তের ন্যায় প্রতিভাত হন মাত্র, এই জন্য তিনি সর্ব্বেন্দ্রিয়গুণাভাস, বুঝিতে হইবে যে,[তিনি কোনপ্রকার ইন্দ্রিয়ব্যাপারে সংস্পৃষ্ট না হইলেও] মনে হয়, যেন সমস্ত ইন্দ্রিয়ব্যাপারসংযুক্ত। শ্রুতিও বলিয়াছেন-“যেন ধ্যানই করেন, যেন চেষ্টাই করেন” ইত্যাদি। কি কারণে তাঁহাকে ব্যাপৃতের ন্যায় বুঝিতে হইবে? তদুত্তরে বলিতেছেন-“সর্ব্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতং” সেই হেতুই বুঝিতে হইবে যে, তিনি শ্রোত্রাদি করণব্যাপারে ব্যাপৃত নহেন, আর তিনি সমস্ত জগতের প্রভু-ঈশ্বর এবং সকলের একমাত্র শরণ ও পরম কারণ ॥৩॥ ১৭ ॥
ভাষ্যানুবাদ। অপিচ, নবদ্বারে ইত্যাদি। স্থাবর-জঙ্গমাত্মক সমস্ত জগতের প্রভু হংস—অবিদ্যাত্মক কার্য্যরাশি হিংসা(ধ্বংস) করেন, এই জন্য হংসপদবাচ্য পরমাত্মা। নবদ্বারে—মস্তকে সপ্তদ্বার, আর নিম্নে দুইটী দ্বার, এই নবদ্বারযুক্ত পুরে(দেহে) দেহী অর্থাৎ দেহেন্দ্রিয়াদি উপাধিযুক্ত বিজ্ঞানাত্মা (জীবাত্মা) হইয়া বাহ্য বিষয়সমূহ গ্রহণ করিবার নিমিত্ত যত্ন করে॥ ৩॥ ১৮॥ ভাষ্যানুবাদ। এ পর্য্যন্ত এইরূপে ব্রহ্মের সর্ব্বাত্মভাব প্রতিপাদিত হইল। উদয়াস্তময়রহিত নির্বিকার জ্ঞানানন্দস্বরূপে অবস্থিত পরমাত্মার স্বরূপ- প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন—অপাণিপাদ ইত্যাদি। ইহার হস্ত ও পদ নাই, এইজন্য ইনি অপাণিপাদ, জবন অর্থ—দূরগামী, গ্রহীতা অর্থ—হস্তের অভাবেও সকলকে ধরিয়া আছেন, চক্ষুহীন হইয়াও সমস্ত দর্শন করিয়া থাকেন, এবং কর্ণরহিত হইয়াও শ্রবণ করেন। তিনি মনোরহিত
১৩২
স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাহস্তি বেত্তা তমাহুরগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্ ॥ ৩॥ ১৯ ॥ অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়া- নাত্মা গুহায়াং নিহিতোহস্য জন্তোঃ। তমক্রতুং পশ্যতি বীতশোকো ধাতুঃ প্রসাদান্মহিমানমীশম্ ॥৩॥ ২০ ॥
সরলার্থঃ।[ উক্তার্থদার্ট্যায় বিদ্বদনুভবং দর্শয়তি “যেদাহম্” ইতি]। অহং(মন্ত্রদর্শী ঋষিঃ) অজরং(জরারহিতং) পুরাণং(শাশ্বতং) সর্ব্বাত্মানং (সর্ব্বেযামাত্মস্বরূপং) বিভুত্বাৎ(ব্যাপকত্বাৎ) সর্ব্বগতং চ এতং(আত্মানং) অনুগ্রহে অথবা ইন্দ্রিয়সকল প্রসন্ন হইলে[আত্মাকে] সর্ব্বসংকল্পবর্জিত মহান্ ঈশরূপে(পরমাত্মার সহিত ভিন্নরূপে) দর্শন করেন, এবং দ্রষ্টা বীতশোক অর্থাৎ সর্ব্ব দুঃখের অতীত হন ॥৩৷৷২০॥
মূলানুবাদ। পূর্ব্বোক্ত কথার দৃঢ়তা সম্পাদনের নিমিত্ত এখন মন্ত্রদর্শী ঋষির অনুভব প্রদর্শন করিতেছেন “বেদাহং” ইত্যাদি]। জরাবর্জিত পূবাণ(চিরকাল একরূপে স্থিত) এবং ব্যাপকত্বনিবন্ধন সর্ব্বত্রা- বস্থিত এই আত্মাকে আমি জানি। ব্রহ্মবাদিগণ(ব্রহ্মজ্ঞ ঋষিগণ) সর্ব্বদা যাহার অণুতরঃ। মহতো মহত্ত্বপরিমাণাৎ মহীয়ান্ মহত্তরঃ। স চাত্মাস্য জন্তোর্ব্ব হ্রাদি- স্তম্বপর্য্যন্তস্য প্রাণিজাতস্য, গুহায়াং হৃদয়ে নিহিত আত্মভূতঃ স্থিত ইত্যর্থঃ। তমাত্মানং অক্রতুং বিষয়ভোগসঙ্কল্পরহিতমাত্মনো মহিমানং কর্মনিমিত্তবৃদ্ধিক্ষয়- রহিতমীশং পশ্যতি—অয়মহমস্মীতি সাক্ষাজ্জানাতি যঃ, স বীতশোকো ভবতি। কেন তর্হ্যসৌ পশ্যতি। ধাতুরীশ্বরস্য প্রসাদাৎ। প্রসন্নে হি পরমেশ্বরে তদ্যথাত্ম্য- জ্ঞানমুৎপদ্যতে, অথবেন্দ্রিয়াণি ধাতবঃ শরীরস্য শরীরস্য ধারণাৎ, তেষাং প্রসাদাদ্বিষয়দোষদর্শনমলাদ্যপনয়নাৎ। অন্যথা দুর্ব্বিজ্ঞেয় আত্মা কামিভিঃ প্রাকৃতপুরুষৈঃ ॥ ৩॥ ২০ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। উক্তমর্থং দ্রঢ়য়িতুং মন্ত্রদুগনুভবং দর্শয়তি-বেদাহ- মেতমিতি। বেদ জানে, অহন্ এতমজরং, বিপরিণামধৰ্ম্মবর্জিতং, পুরাণং পুরাতনম্।
ভাষ্যানুবাদ। আরো আছে, “অণোরণীয়ান্” ইত্যাদি। তিনি অণু —সূক্ষ্ম হইতেও অণীয়ান্—অতিশয় সূক্ষ্ম, মহৎ—মহৎপরিমাণযুক্ত আকাশাদি অপেক্ষাও মহীয়ান্—অতিশয় মহৎ। তিনি এই জন্তুর(প্রাণীর) আত্মা; তিনিই ব্রহ্মাদি স্তম্বপর্য্যন্ত(তৃণপর্য্যন্ত) সমস্ত প্রাণীর হৃদয়-গুহায় নিহিত আত্মারূপে বিদ্যমান আছেন। সেই আত্মাকে যিনি অক্রতু—বিষয়ভোগসঙ্কল্পশূন্য কৰ্ম্মজনিত হ্রাসবৃদ্ধিরহিত মহিমাময় ঈশ্বররূপে দর্শন করেন, অর্থাৎ আমি এতৎস্বরূপ এইরূপে আত্ম-সাক্ষাৎকার করেন, তিনি বীতশোক(শোকমুক্ত) হন। তিনি কাহার সাহায্যে দর্শন করেন?[তদুত্তরে বলিতেছেন,] বিধাতার ঈশ্বরের প্রসাদে (অনুগ্রহে)। কারণ, ঈশ্বর প্রসন্ন হইলে তদ্বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান সমুৎপন্ন হয়। অথবা, ধাতু অর্থ—ইন্দ্রিয়সমূহ, কারণ, ইন্দ্রিয়গণই শরীরের বিধারক, সেই ইন্দ্রিয়সমূহের যে, বিষয়দোষ-দর্শনের ফলে প্রসাদ—নিৰ্ম্মলতা, তাহার সাহায্যে। নচেৎ কামনাপরায়ণ সাধারণ পুরুষের পক্ষে আত্মা দুবিজ্ঞেয়,(সহজে বোধগম্য হয় না)॥ ৩॥ ২০॥
জন্মনিরোধং প্রবদন্তি যস্য ব্রহ্মবাদিনোহভিবদন্তি নিত্যম্ ॥ ৩॥ ২১ ॥ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎসু তৃতীয়োহধ্যায়ঃ ॥ ৩ ॥
বেদ(বিশেষেণ জানামি), ব্রহ্মবাদিনঃ(ব্রহ্মবিদঃ) যস্য(আত্মনঃ) জন্মনিরোধং (জন্মনঃ অভাবং) প্রবদন্তি(কথয়ন্তি), নিত্যং[মহিমানং চ] প্রবদন্তি। অথবা যস্য জন্ম উৎপত্তিং, নিবোধং(ধ্বংসং মরণং চ’) প্রবদন্তি(কথয়ন্তি)[মূঢ় ইতি শেষঃ], ব্রহ্মবাদিনঃ[পুনঃ] নিত্যং(ধৰ্ম্মধর্ম্যভেদাৎ, নিত্যত্বং) প্রবদন্তি (প্রকর্ষেণ কথয়ন্তীত্যর্থঃ) ॥৩৷৷২১৷৷
ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়ব্যাখ্যা ॥১॥
জন্মাভাব বলিয়া থাকেন। অথবা, মূঢ়জনেরা যাহার জন্ম ও বিনাশ বর্ণনা করে, [ কিন্তু ব্রহ্মবাদিগণ] যাহার নিত্যতা ঘোষণা করেন,[ আমি সেই আত্মাকে অনুভব করিতেছি] ॥৩৷৷২১৷৷
ইতি তৃতীয়াধ্যায়ের মূলানুবাদ ॥৩॥
সর্ব্বাত্মানং সর্ব্বেষামাত্মভূতম্, সর্ব্বগতং বিভুত্বাদ আকাশবদ্ব্যাপকত্বাৎ। যস্য চ জন্মনিরোধং উৎপত্ত্যভাবং প্রবদন্তি ব্রহ্মবাদিনো হি নিত্যম্। স্পষ্টোহর্থঃ ॥ ৩৷৷২১ ॥ ইতি শ্রীমদ্গাবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য- শ্রীমচ্ছঙ্করভগবৎপ্রণীতে শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ভাষ্যে তৃতীয়োহধ্যায়ঃ ॥ ৩॥
ভাষ্যানুবাদ। পূর্ব্বে যে বিষয় উক্ত হইয়াছে, তাহারই সমর্থনের জন্য, এ বিষয়ে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষির অনুভব প্রদর্শন করিতেছেন “বেদাহং” ইত্যাদি।
এই যে, অজর—সর্ব্বপ্রকার পরিণামরহিত, পুরাণ অর্থাৎ পুরাতন বা চিরন্তন, সর্ব্বাত্মা—সকলের আত্মস্বরূপ, এবং আকাশের ন্যায় ব্যাপকত্বনিবন্ধন সর্ব্বগত(সর্ব্বত্র বিদ্যমান) পুরুষ, তাহাকে আমি জানি অর্থাৎ তাহাকে আমি ‘আত্মস্বরূপে অনুভব করিতেছি। যে পুরুষের জন্মনিরোধ অর্থাৎ উৎপত্তির অভাব ব্রহ্মবাদীরা সর্ব্বদা বলিয়া থাকেন,[আমি সেই পুরুষকে জানি] ॥ ৩॥ ২১॥
• ইতি তৃতীয় অধ্যায়ের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৩ ॥
য একোহবর্ণো বহুধা শক্তিযোগাদ্ বর্ণাননেকান্ নিহিতার্থো দধাতি। বি চৈতি চান্তে বিশ্বমাদৌ স দেবঃ, স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনক্তু ॥ ৪ ॥ ১ ॥
১৩৬
তদেবাগ্নিস্তদাদিত্যস্তদ্বায়ুস্তদু চন্দ্রমাঃ। তদেব শুক্রং তদ্বহ্ম তদাপস্তৎ প্রজাপতিঃ ॥৪॥২॥ ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি ত্বং কুমার উত বা কুমারী। ত্বং জীর্ণো দণ্ডেন বঞ্চসি ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ,॥ ৪ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ। অথ তস্য সর্ব্বাত্মকত্বং মন্ত্রত্রয়েণ প্রদর্শ্যতে “তদেবাগ্নিঃ” ইত্যাদি। তৎ(ব্রহ্ম) এব অগ্নিঃ, তৎ[এব] আদিত্যঃ(সূর্য্যঃ), তৎ[এব] বায়ুঃ, তৎ চন্দ্রমাঃ উ(অপি, চন্দ্রোহপীত্যর্থঃ), তৎ এব শুক্রং(শুভ্রং জ্যোতিষ্মদিত্যর্থঃ), তৎ ব্রহ্ম(হিরণ্যগর্ভঃ), তৎ আপঃ(জলানি), তৎ প্রজাপতিঃ(বিরাট্ পুরুষঃ) ॥ ৪ ॥ ২ ॥ সরলার্থঃ।[হে ব্রহ্ম] ত্বং স্ত্রী[অসি], ত্বং পুমান্(পুরুষঃ) অসি, ত্বং কুমারঃ(বালকঃ), ত্বং কুমারী উত(অপি, কুমারী অপি ভবসীত্যর্থঃ)। ত্বং জীর্ণঃ(বৃদ্ধঃ সন্) দণ্ডেন বঞ্চসি(গচ্ছসি), ত্বং বিশ্বতোমুখঃ(সর্ব্বরূপঃ) জাতঃ (উৎপন্নঃ) ভবসি(সর্ব্বপ্রাণিরূপেণ জায়সে ইত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ৩ ॥
মূলানুবাদ। অতঃপর তিনটী মন্ত্রে পূর্ব্বোক্ত ব্রহ্মের সর্ব্বাত্মভাব প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন—“তদেব” ইত্যাদি। পূর্ব্বোক্ত ব্রহ্মই অগ্নি, তিনিই আদিত্য, তিনিই বায়ু এবং তিনিই চন্দ্র, তিনিই শুক্র অর্থাৎ জ্যোতির্ময় নক্ষত্রাদি, তিনিই হিরণ্যগর্ভ নামক ব্রহ্ম, এবং তিনিই বিরাট্নামক প্রজাপতি ॥ ৪ ॥ ২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। যস্মাৎ স এব স্রষ্টা, তস্মিন্নেব লয়ঃ, তস্মাৎ সএব সর্ব্বং, ন ততো বিভক্তমস্তীত্যাহ মন্ত্রত্রয়েণ—তদেবেতি। তদেবাত্মতত্ত্বমগ্নিঃ, তদাদিত্যঃ। এবশব্দঃ সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে, তদেব শুক্রমিতি দর্শনাৎ। শেষমৃজু। তদেব শুক্রং শুদ্ধং অন্যদপি দীপ্তিমন্নক্ষত্রাদি, তদ্বহ্ম হিরণ্যগর্ভাত্মা, তদাপঃ, স প্রজাপতিঃ বিরাড়াত্মা ॥ ৪ ॥ ২ ॥
ভাষ্যানুবাদ। যেহেতু তিনিই সৃষ্টিকর্তা, এবং তাঁহাতেই জগতের লয় হয়, সেইহেতু তিনিই সর্ব্বাত্মক, তাঁহা হইতে বিভক্ত বা পৃথক্ কিছু নাই, ইহাই এখন তিনটা মন্ত্রে বলিতেছেন—“তদেব” ইত্যাদি। সেই আত্মতত্ত্বই(আত্মাই) আমি, তাঁহাই আদিত্য(সূর্য্য)। পরবর্তী “তদ্এব শুক্রম্” বাক্যে ‘এব’ শব্দ দৃষ্ট হওয়ায় সর্ব্বত্রই ‘এব’ শব্দের সম্বন্ধ আছে, বুঝিতে হইবে। অবশিষ্ট অংশ সহজ(ব্যাখ্যা অনাবশ্যক)। তাহাই শুক্র—শুদ্ধ, অর্থাৎ নক্ষত্র প্রভৃতি আরও যাহা কিছু দীপ্তিমান্,[তাহাও তিনি]। তিনিই ব্রহ্ম
নীলঃ পতঙ্গো হরিতো লোহিতাক্ষ- স্তড়িগর্ভ ঋতবঃ সমুদ্রাঃ। অনাদিমত্ত্বং বিভূত্বেন বর্ত্তসে যতো জাতানি ভুবনানি বিশ্বা ॥ ৪ ॥ ৪ ॥
সরলার্থঃ।[অপিচ, ত্বমেব] নীলঃ পতঙ্গঃ(ভ্রমর ইত্যর্থঃ), হরিতঃ হরিদ্বর্ণঃ) লোহিতাক্ষঃ(লোহিতচক্ষুঃ শুকাদিপক্ষিরূপ ইত্যর্থঃ), তড়িদগর্ভঃ বিদ্যুদযুক্তঃ মেঘ ইত্যর্থঃ), ঋতবঃ(গ্রীষ্মাদিরূপ):), সমুদ্রাঃ[চ],[যম্মাদেবং, তস্মাৎ] অনাদিমৎ(আদিরহিতং সর্ব্বকারণমিত্যর্থঃ) ত্বং[এব] বিভুত্বেন (ব্যাপকরূপেণ) বর্তসে(তিষ্ঠসি), যতঃ(যস্মাৎ ত্বত্তঃ) বিশ্বা(বিশ্বানি) ভুবনানি জাতানি(উৎপন্নানীত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ৪ ॥ মূলানুবাদ।[হে ব্রহ্ম], তুমি স্ত্রী, তুমি পুরুষ, তুমি কুমার এবং কুমারী, তুমি বৃদ্ধ হইয়া দণ্ডের সাহায্যে গমন কর, এবং তুমিই নানারূপে জন্ম লাভ করিয়া থাক ॥৪॥৩॥ মূলানুবাদ। অপিচ, তুমিই নীলবর্ণ পতঙ্গ অর্থাৎ ভ্রমর, হরিদ্বর্ণ ও লোহিতচক্ষু শুকাদি পক্ষী, বিদ্যদগর্ভ মেঘ, গ্রীষ্মাদি ঋতু, এবং সপ্ত সমুদ্র।[যেহেতু তুমিই সর্ব্বময়, সেই হেতু] অনাদিমৎ(আদিরহিত সর্ব্বকারণ) তুমিই সর্ব্ব- ব্যাপীরূপে বর্তমান আছ, তোমা হইতেই সমস্ত ভুবন উৎপন্ন হইয়াছে ॥৪॥৪॥ শাঙ্করভাষ্যম্। স্পষ্টো মন্ত্রার্থঃ ॥৪॥৩॥ শাঙ্করভাষ্যম্। নীলইতি। ত্বমেবেতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে। ত্বমেব নীলঃ পতঙ্গো ভ্রমরঃ, পতনাদগচ্ছতীতি পতঙ্গঃ। হরিতো লোহিতাক্ষঃ, শুকাদি- নিকৃষ্টাঃ প্রাণিনস্থমেবেত্যর্থঃ। তড়িদগর্ভো মেঘঃ। ঋতবঃ সমুদ্রাঃ। যস্মাৎ ত্বমেব সর্ব্বস্যাত্মভূতঃ,তস্মাদনাদিস্থমেব-ত্বমেবাদ্যন্তশূন্যঃ। বিভুত্বেন ব্যাপকত্বেন, যতো জাতানি ভুবনানি বিশ্বানি ॥৪॥৪॥ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ, তাঁহাই জন, এবং প্রসিদ্ধ প্রজাপতিও তিনিই।[অভিপ্রায় এই যে, জগতে তদতিবিক্ত আর কিছুই নাই] ॥৪॥২॥ ভাষ্যানুবাদ। শ্রুতির অর্থ স্পষ্ট,[সুতরাং ভাষ্যব্যাখ্যা অনাবশ্যক] ॥৪॥৩॥ ভাষ্যানুবাদ। “নীলঃ” ইত্যাদি। শ্রুতির “ত্বম্ এব”(তুমিই) কথাটীর সর্ব্বত্র সম্বন্ধ। যেই বিভু(ব্যাপক) তোমা হইতে নিখিল জগৎ উৎপন্ন হইয়াছে, সেই তুমিই পতঙ্গ অর্থাৎ ভ্রমর, ভ্রমর প’ড়েপ’ড়ে চলে’ বলিয়া পতঙ্গ- পদবাচ্য। তুমিই হরিদ্বর্ণ লোহিতলোচন শুষ্ক প্রভৃতি নিকৃষ্ট প্রাণী। তুমিই তড়িদ্গর্ভ-মেঘ, এবং তুমিই ছয় ঋতু ও সপ্ত সমুদ্র। যেহেতু তুমিই সকলের আত্মস্বরূপ, সেই হেতু তুমিই অনাদি অর্থাৎ আদি অন্ত বা উৎপত্তি বিনাশ শূন্য ॥৪॥৪॥ ১৮
১৮
১৩৮
অজামেকাং লোহিতশুক্লকৃষ্ণাং বহ্বীঃ প্রজাঃ সৃজমানাং সরূপাঃ। অজো হ্যেকো জুষমাণোহনুশেতে জহাত্যেনাং ভুক্তভোগামজোহন্যঃ ॥ ৪ ॥ ৫ ॥
সরলার্থঃ।[ইদানীং জগদুপাদানভূতাং তেজোহবন্নলক্ষণাং প্রকৃতিং, অজারূপ-কল্পনয়া দর্শয়তি—“অজাম্” ইত্যাদি।] সরূপাঃ(স্বসমানরূপঃ) বহ্বীঃ(অনেকাঃ) প্রজাঃ(জায়মনানি ভূতানি) সৃজমানা(জনয়ন্তীং) লোহিতশুক্লকৃষ্ণাং(লোহিতং তেজঃ, শুক্লা আপঃ, কৃষ্ণা পৃথিবী, তদাত্মিকা তোজোহবন্নলক্ষণামিত্যর্থঃ) একাং(একজাতীয়াং) অজাং (ছাগাকাবেণ কল্পিতা, প্রকৃতিমিত্যর্থঃ) একঃ অজঃ(বদ্ধো জীবঃ) জুষমাণঃ (সেবমানঃ প্রকৃতিপরবশঃ সন্) অনুশেতে(অনুগচ্ছতি)। অন্যঃ অজঃ(মুক্তো জীবঃ) ভুক্তভোগাৎ(কৃতভোগাৎ) এনাং(প্রকৃতিং) জহাতি(পরিত্যজতি, প্রাকৃতভোগাদ বিবজ্যত ইত্যর্থঃ) ॥[ যথা কশ্চিদজঃ যথোক্তরূপাং অজামনুসবতি, অন্যশ্চ তামপভুজ্য ততো নিব- র্ত্ততে, তথা কশ্চিৎ জীবঃ এনাং প্রকৃতিং সেবতে, কশ্চিচ্চ জাতবৈরাগ্যঃ সন্ এনাং পরিত্যজতীত্যাশয়ঃ।] ॥ ৪ ॥ ৫ ॥
মূলানুবাদ। জগৎপ্রকৃতিকে রূপকভাবে অজা কল্পনা করিয়া বলিতেছেন—“অজাম্” ইত্যাদি।
আপনার অনুরূপ বহু প্রজাব(সন্তানের) প্রসবকারিণী এবং লোহিত শুক্ল ও কৃষ্ণ বর্ণযুক্ত অর্থাৎ তেজ, জল ও পৃথিবীরূপা এক অজাকে অর্থাৎ অজাতুল্য প্রকৃতিকে একটা অজ(বদ্ধ জীব) প্রকৃতির সহিত অনুসরণ করে অর্থাৎ ভোগকরে, আবার অন্য অজ অর্থাৎ মুক্ত জীব ভুক্তভোগা(যাহাকে সম্পূর্ণরূপে ভোগ করা হইয়াছে, এমন প্রকৃতিকে পরিত্যাগ করে, অর্থাৎ পূর্ণ বৈরাগ্য লাভে মুক্ত হয় ॥ ॥ ৪ ॥ ৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানাং তেজোহবন্নলক্ষণাং প্রকৃতিং ছান্দগ্যো- পনিষৎপ্রসিদ্ধামজারূপকল্পনয়া দর্শয়তি—অজামেকামিতি। অজাং প্রকৃতিং লোহিতশুক্লকৃষ্ণাং তেজোহবন্নলক্ষণাং, বহ্বীঃ প্রজাঃ সৃজমানামুৎপাদয়ন্তীং, ধ্যানযোগানুগতদষ্টাং দেবাত্মশক্তিং বা, সরূপাঃ সমানাকারাঃ। অজো বিজ্ঞানাত্মা অনাদিকামকৰ্ম্মবিনাশিতঃ স্বয়মাত্মানং মন্যমানো জুষমাণঃ সেবমানোহনু- শেতে ভজতে। অন্য আচার্য্যোপদেশপ্রকাশাবসাদিতাবিদ্যান্ধকারো জহাতি ত্যজতি ॥ ৪ ॥ ৫ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এখন ছান্দোগ্যোপোনিষদে বর্ণিত তেজ, জল ও পৃথিবীরূপা প্রকৃতিকে অজারূপে(ছাগীরূপে) কল্পনা করিয়া প্রদর্শন করিতেছেন- —“অজামেকাম্” ইত্যাদি।
দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে। তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদত্ত্য- নশ্নন্নন্যোহভিচাকশীতি ॥ ৪ ॥ ৬ ॥
সরলার্থঃ। সযুজা(সযুজৌ সদা সংযুক্তৌ) সখায়া(সখায়ৌ—সমান- ভাবৌ) দ্বা(দ্বৌ) সুপর্ণা(সুপর্ণো পক্ষিণৌ—পক্ষিরূপেণ কল্পিতৌ জীবাত্ম- পমাত্মানৌ) সমানং(একং) বৃক্ষং(বৃক্ষরূপেণ কল্পিতং দেহং) পরিষস্বজাতে (আলিঙ্গিতবন্তৌ)। তয়োঃ জীব-পরমাত্মনোঃ) অন্যঃ(অন্যতরঃ—জীবঃ) স্বাদু(পক্কং ভোগযোগ্যমিত্যর্থঃ) পিপ্পলং(কম্মফলং সুখদুঃখরূপং) অত্তি (উপভুঙেক্ত), অন্যঃ(অন্তর্যামী) তু(পুনঃ) অনশ্নন্(অভুঞ্জানঃ) অভি- চাকশীতি(সাক্ষিরূপেণ পশ্যতীত্যর্থঃ ॥ ৩॥ ৬॥
মূলানুবাদ। সর্ব্বদা সংযুক্ত সখা(সমানস্বভাব) দুইটা পক্ষী একই বৃক্ষকে(দেহকে) আলিঙ্গন করিয়া আছে। তাহাদের মধ্যে একটা স্বাদু অর্থাৎ ভোগযোগ্য প্রাক্তন কর্ম্মফল ভোগ করে, আর অপর পক্ষীটা(পরমাত্মা— অন্তর্যামী) ভোগ না করিয়া সাক্ষিরূপে কেবল দর্শনমাত্র করে ॥ ৪ ॥ ৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম। ইদানীং সূত্রভূতৌ পরমার্থবস্তুবধারণার্থমুপন্যস্যেতে— “দ্বা” ইতি। দ্বা দ্বৌ বিজ্ঞানাত্মপরমাত্ম-নৌ। সুপর্ণা সুপণৌ শোভনপতনৌ সোভনগমনৌ সুপর্ণো, পক্ষিসামান্যাদ্বা সুপর্ণো, সযূজা সযুজৌ সর্ব্বদা সংযুক্তৌ। সখায়া সখায়ৌ সমানাখ্যানৌ সমানানভিব্যক্তিকারণৌ। এবস্তৃতৌ সন্তৌ সমানমেকং বৃক্ষং বৃক্ষমিবোচ্ছেদসামান্যাদ্ব ক্ষং শরীরং পরিষস্বজাতে পরিষক্তবন্তৌ সমাশ্রিতবন্তৌ এতৌ। তয়োরন্যোহবিদ্যাকামবাসনাশ্রয়লিঙ্গো- পাধির্বিজ্ঞানাত্মা পিপ্পলং কর্মফলং সুখদুঃখলক্ষণং স্বাদু অনেকবিচিত্র- বেদনাস্বাদরূপমত্তি উপভূক্তেইবিবেকতঃ, অনশ্নন্নন্যো নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্ত- স্বভাবঃ পরমেশ্বরোহভিচাকশীতি সর্ব্বমপি পশ্যন্নাস্তে ॥ ৪ ॥ ৬ ॥
লোহিত-শুক্ল-কৃষ্ণা অর্থাৎ তেজ, জল ও পৃথিবীরূপা[তেজ লোহিতবর্ণ, জল শুক্লবর্ণ এবং পৃথিবী কৃষ্ণবর্ণ বলিয়া প্রসিদ্ধ।] যে অজা—জগৎকারণভূতা প্রকৃতি আপনার অনুরূপ বহু প্রজা(জড় বস্তু) উৎপাদন করে, সেই অজা প্রকৃতিকে অথবা ধ্যানযোগপ্রভাবে পরিদৃষ্ট পূর্ব্বোক্ত দেবাত্মশক্তিকে এক অজ (জন্মরহিত) বিজ্ঞানাত্মা(জীব) অনাদিসঞ্চিত কামনা ও তন্মূলক কর্ম্ম দ্বারা প্রতিহত বিজ্ঞান হইয়া ঐ প্রকৃতিকেই স্বীয় আত্মস্বরূপ মনে করিয়া সেবা করত ভজনা করিয়া থাকে। আর অপর অজ জ্ঞান-প্রকাশে অবিদ্যান্ধকার বিধ্বস্তকরত [ঐ প্রকৃতিকে] পরিত্যাগ করে ॥ ৪ ॥ ৫ ॥, ভাষ্যানুবাদ। অতঃপর পরমার্থ সত্যবস্তু নির্ণয়ার্থ সূত্ররূপে(সংক্ষিপ্ত- বাক্যে) দুইটা মন্ত্র উপদিষ্ট হইতেছে “দ্বা” ইত্যাদি। ‘দ্বা’ অর্থ দুইটী—বিজ্ঞানাত্মা
সমানে বৃক্ষে পুরুষো নিমগ্নোহ নীশয়া শোচতি মুহ্যমানঃ। ‘জুষ্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশ- মস্য মহিমানমিতি বীতশোকঃ ॥ ৪ ॥ ৭ ॥
সরলার্থঃ। কিংচ, পুরুষঃ(জীবঃ) সমানে(জীবান্তর্যামিসাধারণে) বৃক্ষে(বৃক্ষবৎ নশ্বরে দেহে) নিমগ্নঃ(অবিদ্যয়া তাদাত্ম্যমিবাপন্নঃ) অনীশয়া (অবিদ্যাজনিতদৈন্যেন) মুহ্যমানঃ(মোহং প্রাপ্তঃ সন্) শোচতি(দুঃখমাপ্নোতি)। [স এব] যদা(যস্মিন্ কালে) জুষ্টং(সেবয়া পরিতুষ্টং) অন্যং দেহাদ্যপাদি- সম্বন্ধরহিতং) ঈশং(পরমেশ্ববং) পশ্যতি(সাক্ষাৎ করোতি),[তদা] বীতশোকঃ (সর্ব্বদুঃখরহিতঃ সন্) অস্য(ঈশস্য) মহিমানং(স্বয়ংপ্রকাশানন্দাত্মরূপং) ইতি(এতি—প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ৭ ॥
মূলানুবাদ। আরও এক কথা। পুরুষ(জীব) জীব ও অন্তর্যামীর তুল্যস্থান(সমান) দেহরূপবৃক্ষে নিমগ্ন অর্থাৎ অবিদ্যা ও কামকর্মাদি দ্বারা দেহাত্ম- বুদ্ধি সম্পন্ন হইয়া দীনভাবে মোহগ্রস্তরূপে দুঃখ ভোগ করে।[সেই পুরুষই] যখন উপাসনাদি সেবা দ্বারা পরিতুষ্ট ঈশ্বরকে দেহোপাধিযুক্ত হইতে ভিন্নরূপে দর্শন করে, তখন সে এই পরমেশ্বরের মহিমা(স্বপ্রকাশ আনন্দ স্বভাব) প্রাপ্ত হইয়া বীতশোক অর্থাৎ শোকরহিত—মুক্ত হয় ॥ ৪ ॥ ৭ ॥
শাঙ্করভাষ্যম। তত্রৈবং সতি সমানে বৃক্ষে শরীরে পুরুষো ভোক্তা অবিদ্যাকামকৰ্ম্মফল-রাগাদিগুরুভাবাক্রান্তোহলাবুরিব সমুদ্রজলে নিমগ্নো নিশ্চয়েন দেহাত্মভাবমাপন্নঃ অয়মেবাহং ‘অমুষ্য পুত্রোহস্য নপ্তা কৃশঃ স্থলো গুণবান্ নির্গুণঃ সুখী দুঃখীত্যেবংপ্রত্যয়ো নান্যোহস্ত্যস্মাদিতি জায়তে ম্রিয়তে সংযুজ্যতে চ সম্বন্ধিবান্ধবৈঃ। অতোহনীশয়া ন কস্যচিৎ সমর্থোহহম্, পুত্রো মম নষ্টঃ, মৃতা মে ভার্য্যা, কিং যে জীবিতেন-ইত্যেবং দীনভাবোহনীশা, তয়া শোচতি সন্তপ্যতে মুহ্যমানোহনেকৈবনর্থপ্রকারৈরবিবেকতয়া বিচিত্রতা- মাপদ্যমানঃ। স এব প্রেততির্য্যত্মনুষ্যাদিযোনিষাপতন দুঃখমাপন্নঃ কদাচি- দনেকজন্মশুদ্ধধৰ্ম্মসঞ্চয়ননিমিত্তং কেনচিৎ পরমকারুণিকেন, দর্শিতযোগ- মার্গোহহিংসাসত্যব্রহ্মচর্য্যসর্ব্বত্যাগসমাহিতাত্মা সন্ শমাদিসম্পান্নো জুষ্টং সেবিতমনেকযোগমার্গৈর্ষদা যস্মিন্ কালে পশ্যতি ধ্যায়মানোহন্যং বৃক্ষো- পাধিলক্ষণাদ্বলক্ষণমংসারিণং অশনায়াদ্যসংস্পৃষ্টং সর্ব্বান্তরং পরমাত্মান- মীশৎ-অয়মহমস্মি আত্মা সর্ব্বস্য সমঃ সর্বভূতান্তরস্থঃ, নেতরোহবিদ্যা- জনিতোপাধিপরিচ্ছিন্নো মায়াত্মেতি, বিভূতিং মহিমানমিতি জগদ্রূপ- মস্যৈব মহিমা পরমেশ্বরস্যেতি যদৈবং পশ্যতি, তদা বীতশোকো ভবতি সর্ব্বমাচ্ছোকসাগরাদ্বিমুচ্যতে কৃতকৃত্যো ভবতীত্যর্থঃ। অথবা জুষ্টৎ যদা পশ্যত্যন্তমীশং অস্যৈব প্রত্যগাত্মনো মহিমানমিতি, তদা বীতশোকো, ভবতি ॥ ৪ ॥ ৭ ॥
(জীব) ও পরমাত্মা। ‘সুপর্ণা’ অর্থ উত্তম গমনশীল, অথবা পক্ষীর সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় সুপর্ণ পদবাচ্য। সযুজা—সর্ব্বদা সংযুক্ত(কখনও যাহাদের ছাড়াছাড়ি নাই), ‘সখায়া’ অর্থ যাহাদের নাম ও অভিব্যক্তির কারণ, তুল্য, এমন। উহারা উভয়ে এবস্তৃত হইয়া একই বৃক্ষে একই শরীরে সমাশ্রিত আছে। বৃক্ষের ন্যায় শরীরও উচ্ছেদশীল(ধ্বংসশীল), এই জন্য এখানে শরীরকে বৃক্ষ বলা হইয়াছে। সেই দুইএর মধ্যে একটা—অবিদ্যা ও কামবাসনাবিশিষ্ট লিঙ্গশরীরো- পাধিযুক্ত বিজ্ঞানাত্মা(জীব) স্বাদু অবিবেকবশতঃ নানাবিধ বৈচিত্র্যানুভূতিরূপ স্বাদযুক্ত পিপ্পল অর্থাৎ কর্ম্মফল—সুখদুঃখ উপভোগ করে, আর অন্যটী অর্থাৎ নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্তস্বভাব পরমেশ্বর ভোগ না করিয়া কেবল দর্শনকরত অবস্থান করে॥ ৪ ॥ ৬ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এইরূপ সিদ্ধান্ত অবধাবিত হইলে পর,[বুঝিতে হইবে,] অবিদ্যা, কামনা, কৰ্ম্ম, এবং কৰ্ম্মফল ও তদ্বিষয়ে অনুরাগরূপ গুরুভারে আক্রান্ত ভোক্তা(জীব) সমুদ্রে, নিমগ্ন অলাবুর(লাউএর) মত বৃক্ষরূপে কল্পিত একই শরীরে নিমগ্ন হইয়া অর্থাৎ নিশ্চয়রূপে দেহতাদত্ম্য বা দেহাত্মভাব প্রাপ্ত হইয়া—এই দেহই আমি, আমি অমুকের পুত্র, অমুকের নপ্তা(নাতি), আমি কৃশ, আমি স্থূল, গুণবান্, নির্গুণ, সুখী দুঃখী এবং এতদতিরিক্ত আর আত্মা নাই, ইহাই জন্মে মরে এবং বন্ধুবান্ধবগণের সহিত মিলিত হয়—এবংবিধ প্রতীতিসম্পন্ন হয়। এই কারণে অনীশাবশতঃ—আমি কোন বিষয়েই সমর্থ নহে, আমার পুত্র নষ্ট ও ভার্য্যা মৃত্যুগ্রস্ত এবংবিধরূপে যে, দীনভাব, তাহার নাম অনীশা(প্রভুত্বের অভাব), তদ্দ্বারা শোকান্বিত বা সন্তপ্ত হয়। বিবেক জ্ঞানের অভাবে অনেক প্রকার অনর্থ দ্বারা বিমোহিত ও বৈচিত্র্য প্রাপ্ত হইয়া শোক সন্তাপ অনুভব করিয়া থাকে।
সেই জীবই প্রেত-পশুপক্ষী ও মনুষ্যাদিযোনিতে পরিভ্রমণ করত দুঃখ প্রাপ্ত হয়, অনেক-জন্মসঞ্চিত শুদ্ধ ধর্মবলে কখনও কোনও দয়ালু পুরুষের নিকট যোগমার্গোপদেশ লাভ করিয়া অহিংসা, সত্যপরায়ণতা, ব্রহ্মচর্য্য ও সর্বত্যাগ বা অপরিগ্রহ, এই সমস্ত উপায়ে সমাহিতচিত্ত(একাগ্রচিত্ত ও শমদমাদি সাধন- সম্পন্ন হইয়া তদগতচিত্ত হয়, তখন ভিন্ন অর্থাৎ বৃক্ষরূপে কল্পিত দেহ-উপাধি হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ, অসংসারী ক্ষুধা-পিপাসাদি সংসাবধর্মে অসংস্পৃষ্ট পঞ্চ- কোষেরও পরবর্তী পরমেশ পরমাত্মাকে ‘আমি এই পরমাত্মস্বরূপ’ এই ভাবে দর্শন করে, এবং এই আত্মা সর্ব্বভূতের অন্তরে অবস্থিত সর্বত্র সমাস, এবং এতদতিরিক্ত অবিদ্বাকৃত উপাধিসংযুক্ত মায়িক অন্য আত্মা নাই, আর তখন অনুভব করে যে, এই জগৎ ‘এই পরমেশ্বরেরই মহিমা অর্থাৎ বিভূতি বা ঐশ্বর্য্য। যখন এইরূপ দর্শন করে—অন্তরে অনুভব করে, তখন বীতশোক হয়, অর্থাৎ সর্বপ্রকার শোক-সাগর হইতে বিমুক্ত হয়, সর্ব্বতোভাবে কৃতার্থতা লাভ করে। অথবা, যখন কৰ্ম্মফলভোক্তা দেহাতিরিক্ত এই জীবকে এই পরমাত্মারই মহিমারূপে দর্শন করে, তখন বীতশোক হয়,—শোকোত্তীর্ণ হয় ॥ ৪ ॥ ৭ ॥
১৪২
ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্ যস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে নিযেদুঃ। যস্তং ন বেদ কিমুচা করিষ্যতি য ইত্তদ্বিদুস্ত ইমে সমাসতে ॥ ৪ ॥৮॥ ছন্দাংসি যজ্ঞাঃ দ্রুতবো ব্রতানি ভূতং ভব্যং যচ্চ বেদা বদন্তি।
সরলার্থঃ।[পুনরপি তন্মহিমানমাহ—‘ঋচঃ” ইত্যাদিনা]। ঋচঃ (নিয়তপাদা মন্ত্রাঃ, বেদা ইত্যাশয়ঃ) অক্ষবে(অবিকারে) পরমে(নিরতিশয়ে) বোমন্(ব্যোম্নি) আকাশকল্পে ব্রহ্মণীত্যর্থঃ)[তৎপ্রতিপাদকতয়া বর্ত্তন্তে ইতি শেষঃ।] যস্মিন্(ঋগধিষ্ঠানে ব্রহ্মণি) অধিবিশ্বে(বিশ্বাধিকাঃ সর্ব্বে) দেবাঃ অগ্ন্যাদয়ঃ(ভূতানি বা) নিষেদুঃ(নিষন্নাঃ অবস্থিতাঃ)। যঃ এতং(বিশ্বাধিষ্ঠানং পরমাত্মানং) ন বেদ(ন বিজানাতি),[সঃ] ঋচা(বেদোক্তেন কর্ম্মণা) কিং করিষ্যতি (ন কিমপীতিভাবঃ)। যে(অধিকারিণঃ) ইৎ(ইত্থং) তৎ(তং পরমেশ্বরং) বিদুঃ (জানন্তি), তে ইমে(বেত্তারঃ) সমাসতে(সম্যক্ ব্যাপকত্বেন তিষ্ঠন্তি ব্রহ্মাত্মনা তিষ্ঠন্তীতিভাবঃ) ॥৪॥৮॥
সরলার্থঃ। ইদানীং তস্যৈবাক্ষবস্থ্য ব্রহ্মণঃ সর্ব্বস্রষ্ট, ত্বমাহ—“ছন্দাংসি” ইতি। ছন্দাংসি(বেদাঃ) যজ্ঞাঃ(জ্যোতিষ্টোমাদয়ঃ), দ্রুতবঃ(সংকল্পাঃ—
মূলানুবাদ। ঋক্ অর্থ ছন্দোবদ্ধ বেদবাক্য, কিন্তু এখানে “ঋচঃ” অর্থ বেদত্রয়। সেই বেদত্রয় এই অক্ষরে(অবিকারী) পরম ব্যোমে আকাশতুল্য ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ বেদত্রয়ই এই অক্ষর ব্রহ্মের প্রতিপাদক। বিশ্বের উৎকৃষ্ট দেবগণ এই অক্ষর ব্রহ্মেই প্রতিষ্ঠিত আছেন। যে লোক তাঁহাকে না জানে, ঋকের দ্বারা(বেদোক্ত কর্ম্ম দ্বারা) সে কি করিবে? পরন্তু যাহারা তাঁহাকে উক্ত প্রকারে জানে, তাহারা ব্যাপক ব্রহ্মভাবে অবস্থান করে ॥৪॥৮॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং তদ্বিদঃ কৃতার্থতাং দর্শয়তি—ঋচ ইতি। বেদত্রয়বেদ্যে অক্ষরে পরমে ব্যোমন্ ব্যোম্নাকাশকল্পে যস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে নিষেদুঃ আশ্রিতাস্তিষ্ঠন্তি। যস্তং পরমাত্মানং ন বেদ কিমৃচা করিষ্যতি। য ইৎ তদ্বিদুস্ত ইমে সমাসতে কৃতার্থাস্তিষ্ঠন্তি ॥ ৪॥৮॥
ভাষ্যানুবাদ। এখন আত্মদর্শীদিগের কৃতার্থতা প্রদর্শন করিতেছেন, —ঋচ ইত্যাদি। দেবগণ বেদত্রয়বেদ্য ও আকাশের ন্যায় নির্লেপ বিশ্বাধার বা বিশ্বের অতীত যে অক্ষরে(পরমাত্মায়) আশ্রিত আছেন, যে লোক সেই পরমাত্মাকে জানে না, সে বেদবিদ্যা দ্বারা(কেবল কর্ম্মজ্ঞান দ্বারা) কি করিবে? পরন্তু যাহারা তাহাকে(পরমাত্মাকে) জানে, তাহারাই কৃতার্থ হইয়া থাকে ॥৪॥৮॥
উপাসনানি), ব্রতানি(চান্দ্রায়ণাদীনি), ভূতং(অতীতং), ভব্যং(ভবিষ্যৎ) [ চকারাৎ বর্তমানং চ], যচ্চ(যদপি অন্যৎ কিঞ্চিৎ পশুপ্রভৃতি) বেদাঃ বদন্তি (প্রতিপাদয়ন্তি), এতৎ(যথোক্তরূপম্) বিশ্বং(জগৎ এব) মায়ী(মায়াধীশ্বরঃ পরমেশ্বরঃ) অস্মাৎ(অক্ষরাৎ ব্রহ্মণঃ) সৃজতে(উৎপাদয়তি)। অন্যঃ (অবিবেকী জীবঃ) মায়য়া(মায়াধীনতয়া) তস্মিন্(বিশ্বস্মিন্) সন্নিরুদ্ধঃ অবিদ্যা বিশগো ভূত্বা ভ্রাম্যতীত্যর্থঃ) ॥৪॥৯৷৷
মূলানুবাদ। ঋক্ প্রভৃতি চারিবেদ, জ্যোতিষ্টোম প্রভৃতি যজ্ঞ, ক্রতু- সকল অর্থাৎ নানাপ্রকার উপাসনা, চান্দ্রায়ণাদি ব্রত, ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান, এবং এতদতিরিক্ত আরও যাহা বেদশাস্ত্র প্রতিপাদন করে, এই বিশ্বপ্রপঞ্চকে সেই মায়াবী ঈশ্বর সেই সর্ব্বাধিষ্ঠানভূত অক্ষর ব্রহ্ম হইতে সৃষ্টি করিয়া থাকেন। অন্য অর্থাৎ মায়াপরবশ জীব সেই বিশ্বেতেই মায়া দ্বারা আবদ্ধ হয়, অর্থাৎ মায়াব বশবর্তী হইয়া সংসার-সাগয়ে পরিভ্রমণ করে ॥৪॥৯৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং তস্যৈবাক্ষরস্থ্য মায়োপাধিকজগৎসৃষ্ট, ত্বং তন্নিমিত্তত্বং ভেদেন দশয়তি—ছন্দাংসীতি। ছন্দাংসি ঋগযজুঃসামার্থর্বাঙ্গিরসাখ্যা বেদাঃ, দেবযজ্ঞাদয়ো সুপসম্বন্ধরহিতবিহিতক্রিয়াশ্চ যজ্ঞাঃ, জ্যোতিষ্টোমাদয়ঃ দ্রুতবঃ। ব্রতানি চান্দ্রায়ণাদীনি। ভূতং অতীতং। ভব্যং ভবিষ্যৎ। যদিাত তয়োর্মধ্যবর্তি বর্তমানৎ সূচয়তি। চশব্দঃ সমুচ্চয়ার্থঃ। যজ্ঞাদিসাধ্যে কম্মণি প্রপঞ্চে ভূতাদৌ চ বেদা এব মানমিত্যেতদ্বদন্তি। যচ্ছব্দঃ সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে। অস্মাৎ প্রকৃতাদক্ষরাদ্ ব্রহ্মণঃ পূর্ব্বোক্তং সর্ব্বমুৎপদ্যত ইতি সম্বন্ধঃ। অবিকারিব্রহ্মণঃ কথং প্রপঞ্চোপাদানত্বামত্যত আহ—মায়ীতি। কূটস্থস্যাপি স্বশক্তিবশাৎ স্বর্ব্বস্রষ্টত্বমুপপন্নমিত্যেতৎ। বিশ্বং পূর্ব্বোক্তপ্রপঞ্চং সৃজতে উৎপাদয়তি। স্বমায়য়া কল্পিতে তস্মিন্ ভূতাদিপ্রপঞ্চে মায়য়ৈবান্য ইব সন্নিরুদ্ধঃ সম্বদ্ধঃ অবিদ্যাবশগো ভূত্বা সংসারসমুদ্রে ভ্রমতীত্যর্থঃ ॥
ভাষ্যানুবাদ। অতঃপর, সেই অক্ষর-পদবাচ্য পরমাত্মাই যে, মায়ারূপ উপাধির সাহায্যে উপাদান ও নিমিত্তকারণরূপে জগৎসৃষ্টি করেন, তাহাই এখন প্রদর্শন করিতেছেন—“ছন্দাংসি” ইতি। মূলের ‘চ’ শব্দটা সমুচ্চয়ার্থক অর্থাৎ ‘এবং’ অর্থে প্রযুক্ত। ‘যৎ’ পদটী অতীত ও ভব্যের মধ্যবর্তী বর্তমানের সূচক, এবং ছন্দঃ প্রভৃতি সকলের সহিত উহার সম্বন্ধ। ‘ছন্দাংসি’ অর্থ— ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্ব্ববেদ, যজ্ঞ—অর্থাৎ প্রসিদ্ধ দেবযজ্ঞাদি এবং বেদ- বিহিত যে সকল ক্রিয়াতে যুপের ব্যবহার নাই, সেই সকল ক্রিয়া, ক্রতু— জ্যোতিষ্টোম প্রভৃতি যাগ, ব্রত—চান্দ্রায়ণাদি ব্রত, যাহা অতীত, যাহা ভব্য . অর্থাৎ ভবিষ্যৎ(হইবে), যাহা বর্তমান, এবং[বেদসমূহ আরও যাহা কিছু বলে,] এ সমুদয় এই অক্ষর ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন হয়।[‘বেদা বদন্তি’ কথার
সরলার্থঃ। অতঃপরং জগৎপ্রকৃতেমায়াত্বং, তদধিষ্ঠাতুশ্চ ব্রহ্মণো মায়িত্বং প্রদর্শয়তি—“মায়াং তু” ইতি ॥ প্রকৃতিং(প্রাগুক্তাং জগদুপাদানভূতাং) তু মায়াং(মায়াসংজ্ঞিতাং) বিদ্যাৎ (জানীয়াৎ), মহেশ্বরং(পরমেশ্বরং) তু(পুনঃ) মায়িনং(মায়ায়াঃ অধিপতিং) [বিদ্যাৎ]। যদ্বা, মায়াং তু প্রকৃতিং(জগদুপাদানভূতাং বিদ্যাৎ, মায়িনং (মায়াবিনং) তু মহেশ্বরং(সর্ব্বনিয়ামকং)[বিদ্যাদিতি সম্বন্ধঃ]। অত্র (মায়িনঃ) অবয়বভূতৈঃ(অবয়বত্বেন কল্পিতৈঃ বস্তুভিঃ) তু(এব) ইদং সর্ব্বং জগৎ ব্যাপ্তম্(পূর্ণমিতার্থঃ) ॥৪॥১০॥
মূলানুবাদ। পূর্ব্বে যাহাকে জগতের প্রকৃতি বা উপাদান বলা হইয়াছে, সেই প্রকৃতিকেই মায়া বলিয়া জানিবে, এবং মহেশ্বরকে অর্থাৎ জগৎ স্রষ্টাকে মায়াবী বলিয়া জানিবে। ইহারই অবয়বভূত অর্থাৎ অবয়বরূপে কল্পিত বস্তু সমূহের দ্বারা এই সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত অর্থাৎ পরিপূর্ণ রহিয়াছে ॥৪॥১০॥
শাঙ্করভাষ্যম্। পূর্ব্বোক্তায়াঃ প্রকৃতৈৰ্ম্মায়াত্বং তদধিষ্ঠাতৃসচ্চিদানন্দ- রূপব্রহ্মণস্তদুপাধিবশান্মায়িত্বঞ্চ। চিদ্রূপস্য মায়াবশাৎ কল্পিতাবয়বভূতৈঃ কার্য্য- করণসঙ্ঘাতৈঃ সর্ব্বং ভূরাদীদং পরিদৃশ্যমানং জগদ্ব্যাপ্তঞ্চেত্যাহ-মায়ান্তিতি। জগৎপ্রকৃতিত্বেনাধস্তাৎ সর্বত্র প্রতিপাদিতা প্রকৃতির্মায়ৈবেতি বিদ্যাদ্বিজানীয়াৎ। তু শব্দোহবধারণার্থঃ। মহাংশাসাবীশ্বরশ্চেতি মহেশ্বরস্তং মায়িনং মায়ায়াঃ সত্তাস্ফূর্ত্যাদিপ্রদতয়া অধিষ্ঠানত্বেন প্রেরয়িতারমেব বিদ্যাদিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। তস্য প্রকৃতস্য পরমেশ্বরস্য রজ্জ্বাদ্যপ্রতিষ্ঠানেষু কল্পিতসর্পাদিস্থানীয়ৈর্মায়িকৈঃ স্বাবয়- বৈরধ্যাসদ্বাবা ইদং ভূরাদি সর্ব্বং ব্যাপ্তমেব পূর্ণমিত্যেৎ। তুশব্দস্ববধারণার্থঃ ॥৪৷৷১০৷৷ অভিপ্রার এই যে,] পুরুষসাধ্য যজ্ঞাদি ক্রিয়া, জগৎপ্রপঞ্চ ও ভূতাদির অস্তিত্ব বিষয়ে বেদই একমাত্র প্রমাণ।
ভাল, নির্বিকার ব্রহ্মে জগতের উপাদান-কারণতা কিরূপে সম্ভবে? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন—‘মায়ী’ ইতি। ব্রহ্ম কূটস্থ(নির্বিকার) হইলেও, স্বীয় মায়াশক্তিযোগে তাহার সর্ব্বস্রষ্টৃত্ব অর্থাৎ জগদুপাদানত্ব সম্ভবপর হয়(১)। মায়ী (পরমেশ্বর) উক্ত(ছন্দঃ প্রভৃতি) প্রপঞ্চ সৃষ্টি করিয়া থাকেন। স্বমায়াকল্পিত
(১) অভিপ্রায় এই যে, যাহা রূপান্তর বা অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়, তাহাকে বিকারী বলে। বিকারশীল বস্তুই উপাদান কারণ হইয়া থাকে। যেমন মৃত্তিকা বিকারশীল বস্তু, তাহা ঘট শরা প্রভৃতির উপাদান কারণ হয়। ব্রহ্ম যখন নির্ব্বিকার, তখন তাহার উপাদান কারণত্ব অসম্ভব হইতে পারে। এইজন্য বলিতেছেন, ব্রহ্ম স্বয়ং অবিকারী হইলেও তাহার শক্তি—মায়া নির্ব্বিকার নহে। মায়াই তাহার শরীরস্থানীয়। সেই মায়াশক্তি জগৎ-প্রপঞ্চাকাবে পরিণত হয়, আর চৈতন্যরূপে তিনি সৃষ্টির নিমিত্তকারণ হন মাত্র।
সরলার্থঃ।[অথেদানীং তস্যৈব সর্বাধিষ্ঠানত্বং দর্শয়তি—“যো যোনিং” ইত্যাদি।] যঃ একঃ(অদ্বিতীয়ঃ পরমেশ্বরঃ) যোনিং যোনিং(প্রতিযোনি সর্ব্বমুৎপত্তিস্থানং) অধিতিষ্ঠতি(সত্তাপ্রদত্বেন অধিষ্ঠায় তিষ্ঠতীত্যর্থঃ), যস্মিন্ (অধিষ্ঠাতরি পরমেশ্বরে) ইদং(সর্ব্বং জগৎ) সমেতি(সম্যক্ গচ্ছতি স্থিতি-
মূলানুবাদ। এক অদ্বিতীয় যে পরমেশ্বর প্রত্যেক যোনিতে—উৎপত্তি- স্থানে অধিষ্ঠান করেন।[অধিষ্ঠান অর্থ—সত্তাপ্রদান ও কার্য্যোন্মুখ করা।] এবং এই সমস্ত জগৎ[উৎপত্তিকালে] যাঁহার আশ্রয়ে স্থিতি লাভ করে,
শাঙ্করভাষ্যম্। মায়া-তৎকার্যাদিযোনেঃ কূটস্থস্য স্বশক্তিতোহধিষ্ঠাতৃত্বং বিয়দাদিকার্য্যাণামুৎপত্তিহেতুত্বৎ, তেনৈব সর্ব্বাধিষ্ঠাতৃত্বোপলক্ষিতসচ্চিদানন্দবপুষা ব্রহ্মাস্মীত্যেকত্বজ্ঞানান্মুক্তিঞ্চ দর্শয়তি—যো যোনিমিতি। যো মায়াবিনি- র্মুক্তানন্দৈকঘনঃ পরমেশ্বরঃ, যোনিং যোনিমিতি বীপ্সয়া মূলপ্রকৃতি- র্মায়া অবান্তরপ্রকৃতযশ্চ সূচিতাঃ। তাঃ প্রকৃতীঃ সত্তাস্ফূর্ত্তিপ্রদত্বেনাধি- ষ্ঠায় তিষ্ঠতি অন্তর্য্যামিরূপেণ “য আকাশে তিষ্ঠন্” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। একো- সেই ভূতভৌতিক প্রপঞ্চাত্মক জগতে নিজেই অন্যের মত অর্থাৎ অবিদ্যার বশবর্তী হইয়া জীবরূপে সন্নিরুদ্ধ হন অর্থাৎ অবিদ্যাবশে সংসার-সমুদ্রে ভ্রমণ করিয়া থাকেন ॥৪৷৷৯৷৷ ভাষ্যানুবাদ। পূর্ব্বে যে প্রকৃতির কথা বলা হইয়াছে, সেই প্রকৃতিই যে মায়া, আর সেই প্রকৃতির অধিষ্ঠাতা বা প্রবর্ত্তক সৎ চিৎ আনন্দরূপী ব্রহ্মই যে, সেই প্রকৃতিসম্বন্ধ বশতঃ ‘মায়ী’-পদবাচ্য এবং সেই চৈতন্যরূপী ব্রহ্মেরই যে, মায়াকল্পিত অবয়বরূপ দেহেন্দ্রিয়সমষ্টি দ্বারা পৃথিবী অন্তরীক্ষ প্রভৃতি সমস্ত জগৎ পরিব্যাপ্ত, ইহা প্রতিপাদনের জন্য বলিতেছেন—“মায়াং তু” ইতি। ইতঃপূর্ব্বে সর্ব্বত্র জগৎপ্রকৃতিরূপে অর্থাৎ জগতের উপাদান কারণরূপে বর্ণিত যে প্রকৃতি, তাহাকে মায়া বলিয়া জানিবে। “মায়াংতু” এই ‘তু’ শব্দের অর্থ অবধারণ,[তাহাকে মায়া বলিয়াই জানিবে।] যিনি মহান্ অথচ ঈশ্বর(শাসন- শক্তিসম্পন্ন), তিনি মহেশ্বর, তাহাকে মায়ী বলিয়া অর্থাৎ মায়ার সত্তা ও প্রকাশ সম্পাদক এবং আশ্রয়প্রদরূপে প্রেরক বলিয়াও জানিবে। রজ্জু প্রভৃতি আশ্রয়ে যেরূপ সর্পাদি কল্পিত হয়, ঠিক সেইরূপ পূর্ব্বোক্ত পরমেশ্বরের মায়াকল্পিত অবয়ব দ্বারা অধ্যাসরূপে এই পৃথিব্যাদি সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত অর্থাৎ তাঁহার কল্পিত অবয়বের অধ্যাসে সমস্ত জগৎ পরিপূর্ণ। শ্রুতির ‘তু’ অর্থ ‘অবধারণ(নিশ্চয়),[অবয়ব দ্বারা ব্যাপ্তই বুঝিতে হইবে।] ॥৪॥১০॥ ভাষ্যানুবাদ। কূটস্থ ব্রহ্মই মায়া ও মায়াকার্য্য যত কিছু আছে, সে সমস্তের যোনি(উৎপত্তিস্থান)। তিনি স্ববশে থাকিয়া(মায়ার অধীন না হইয়া)
১৯
তমীশানং বরদং দেবমীড্যং নিচায্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি ॥ ৪ ॥ ১১ ॥
কালে স্থিতিং লভতে), বি+ এতি = ব্যেতি(প্রলয়কালে বিলয়ং চ গচ্ছতি)। তৎ বরদং(বরং সাধকাভীষ্টং দদাতীতি বরদং), ঈড্যং(স্তবনীয়ং) দেবং (প্রকাশরূপং) ঈশানং(সর্ব্বনিয়ন্তারং পরমেশ্বরং) নিচায্য(সাক্ষাৎকৃত্য) অত্যন্তং যথাস্যাৎ তথা, শান্তিং এতি(গচ্ছতি) ॥ ৪ ॥ ১১ ॥
এবং[প্রলয় কালে] বিকার বা বিলয়প্রাপ্ত হয়, সাধক বরপ্রদ স্তবনীয় সেই, ঈশ্বরকে নিশ্চয়রূপে প্রত্যক্ষ করিয়া আত্যন্তিক শান্তি লাভ করেন ॥ ৪ ॥ ১১ ॥
হদ্বিতীয়ঃ। যস্মিন্মায়াদ্যধিষ্ঠাতরীশ্বরে ইদং সর্ব্বং জগদুপসংহারকালে সমেতি সঙ্গচ্ছতে লয়ং প্রাপ্নোতি। পুনঃ সৃষ্টিকালে বিবিধমেতি আকা- শাদিরূপেণ নানা ভবতি। তং প্রকৃতমধিষ্ঠাতারমীশানং নিয়ন্তারম্, বরদং মোক্ষপ্রদম্, দেবং দ্যোতনাত্মকম্, ঈড্যং বেদাদিস্তুত্যং, নিচায্য নিশ্চয়েন ব্রহ্মাহমম্মীত্যপরোক্ষীকৃত্য—সুষুপ্ত্যাদৌ প্রত্যক্ষীকৃতা যা সর্ব্বো- পরমলক্ষণা সার্ব্বজনী শান্তিঃ, সেদমা দর্শিতা, তাং প্রসিদ্ধামিমাং শান্তিং সর্ব্ব- দুঃখবিনির্মুক্ত-সুখৈকতানস্বরূপাং মুক্তিমিতি যাবৎ। গুরূপদিষ্টতত্ত্বমাদি- বাক্যজন্য-সুত্তত্ত্বজ্ঞানেনাবিদ্যা-তৎকার্য্যাদিবিশ্বমায়ানিবৃত্ত্যাত্যন্তং পুনরাবৃত্তিরহিতং যথা ভবতি, তথা এতি একরসো ভবতীত্যেতৎ ॥ ৪ ॥ ১১ ॥
অধিষ্ঠাতা অর্থাৎ আকাশাদি সমস্ত কাৰ্য্য বস্তুর উৎপত্তির হেতু, আমি সেই সর্ব্বা- ধিষ্ঠাতৃভাবে উপলক্ষিত(যুক্ত)(১) সচ্চিদানন্দাত্মক ব্রহ্মস্বরূপ, এই ভাবে ব্রহ্মা- ত্মৈকত্বজ্ঞানেই যে মুক্তি লাভ হয়, ইহা প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন—“যো যোনিং” ইত্যাদি। মায়াতীত আনন্দঘন এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বর যে, যোনিতে যোনিতে অর্থাৎ প্রত্যেক উৎপত্তিকারণে, এখানে “যোনিং যোনিং” এই বীপ্সা বা দ্বিরুক্তি থাকায়, মূল কারণ মায়া ও অবান্তর(মধ্যবর্তী) কারণ আকাশাদিও সূচিত হইয়াছে। সেই সকল প্রকৃতিতে(উপাদান কারণে) সত্তাপ্রদরূপে অধিষ্ঠাতা হইয়া অন্তর্য্যামিরূপে অবস্থান করেন, যেহেতু শ্রুতিতে আছে যে, ‘যিনি আকাশে অবস্থান করত আকাশকে নিয়মিত করেন’ ইত্যাদি। প্রলয় কালে এই সমস্ত জগৎ যেই মায়াধিষ্ঠাতা পরমেশ্বরে সমতা প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ লয় প্রাপ্ত হয়, এবং সৃষ্টিকালে আবার বিবিধ রূপ প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ আকাশাদি নানা আকারে প্রকটিত হয়। ঈশান—সর্ব্বজগতের নিয়ন্তা, বরদ-মোক্ষপ্রদ, প্রকাশস্বভাব এবং বেদাদি শাস্ত্র যাহার স্তুতি করিয়াছেন, সেই পূর্ব্বোক্ত অধিষ্ঠাতা ঈশ্বরকে নিশ্চিত- রূপে জানিয়া অর্থাৎ ‘আমিই সেই ব্রহ্ম, এইরূপে সাক্ষাৎ উপলব্ধি করিয়া—সুষুপ্তি
(১) উপলক্ষিত অর্থ—কাদাচিৎক সম্বন্ধযুক্ত। বুঝিতে হইবে, ব্রহ্মের যে, অধিষ্ঠাতৃভাব, তাহা সকল সময় থাকে:না, অর্থাৎ কেবল সৃষ্টিকালে থাকে, প্রলয় কালে থাকে না।
যো দেবানাং প্রভবশ্চোদ্ভবশ্চ বিশ্বাধিপো রুদ্রো মহর্ষিঃ। হিরণ্যগর্ভং পশ্যত জায়মানং স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনক্তু॥ ৪ ॥ ১২ ॥ যো দেবানামধিপো যস্মিল্লোকা অধিশ্রিতাঃ।
মূলানুবাদ। এই মন্ত্রটী ইতঃ পূর্ব্বে তৃতীয় অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকরূপে উক্ত হইয়াছে এবং সেখানেই ইহার ব্যাখ্যা প্রদত্ত হইয়াছে ॥ ৪ ॥ ১২ ॥ মূলানুবাদ। যিনি ব্রহ্মাদি দেবগণের অধিপতি, পৃথিব্যাদি সমস্ত লোক
শাঙ্করভাষ্যম্। সূত্রাত্মানং প্রত্যবিরতমভিমুখতয়া বীক্ষন্তং পরমেশ্বরং প্রতি অখণ্ডিততত্ত্বজ্ঞানসিদ্ধয়ে প্রার্থনামাহ—যো দেবানামিতি। পূর্ব্বমেবাস্য প্রতিপাদিতোহর্থঃ ॥ ৪ ॥ ১২ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। ব্রহ্মপ্রমুখানাং দেবানাং স্বামিতামাকাশাদিলোকা- শ্রয়ত্বং প্রমাত্রাদীনাং নিয়ন্ত ত্বং বুদ্ধিশুদ্ধিদ্বারা সম্যগজ্ঞানসিদ্ধ্যর্থং মুমুক্ষুভিঃ প্রার্থমানত্বঞ্চ পরমেশ্বরস্যাহ—যো দেবানামধিপ ইতি। প্রকৃতঃ পরমেশ্বরো সময়ে সর্ব্ববিষয়-নিবৃত্তিরূপ লোকপ্রত্যক্ষীভূত যে শান্তি প্রসিদ্ধ আছে, সেই প্রসিদ্ধ শান্তি অর্থাৎ সর্ব্বপ্রকার দুঃখসম্পর্কশূন্য একমাত্র আনন্দ-প্রবাহাত্মক মুক্তি প্রাপ্ত হয়। তখন গুরুর উপদেশলব্ধ “তৎ ত্বম্ অসি” ইত্যাদি বাক্যজন্য উত্তম তত্ত্বজ্ঞানের ফলে অবিদ্যা ও তৎকার্য্য মায়াময় বিশ্বপ্রবঞ্চ বিলীন হইয়া যায়; এবং পুনরায় সংসারে যাহাতে আসিতে না হয়, সেইরূপে একরস(ব্রহ্মস্বভাব) হইয়া যায় ॥ ৪ ॥ ১১ ॥ ভাষ্যানুবাদ। যিনি সূত্রাত্মার প্রতি সর্ব্বদা দৃষ্টিরাখেন, অর্থাৎ যিনি সমস্ত সূক্ষ্মসৃষ্টি-উপহিত হিরণ্যগর্ভের কার্য্যে সহায়তা করেন, সেই পরমেশ্বরবিষয়ে অখণ্ডাকার তত্ত্বজ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করিতেছেন—“যোদেবানাং” ইতি।
এই শ্রুতির অর্থ পূর্ব্বেই ব্যাখ্যাত হইয়াছে ॥ ৪ ॥ ১২ ॥ ভাষ্যানুবাদ। পরমেশ্বরই যে, চতুর্মুখ ব্রহ্মাপ্রভৃতি দেবগণের আশ্রয়, এবং জ্ঞাতাদিগের বুদ্ধিবৃত্তির নিয়ন্তা, আর মুমুক্ষুগণকর্তৃক চিত্তশুদ্ধিপূর্ব্বক তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য প্রার্থিত হন, ইহা বলিতেছেন—“যো দেবানাং” ইত্যাদি।
য ঈশেহস্য দ্বিপদশচতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥ ৪ ॥ ১৩ ॥ সূক্ষ্মাতিসূক্ষমং কলিলস্য মধ্যে বিশ্বস্য স্রষ্টারমনেকরূপম্।
পাতা), লোকাঃ(ভূরাদয়ঃ) যস্মিন্(পরমকারণে) অধিশ্রিতাঃ(আশ্রিতাঃ), যঃ অস্য দ্বিপদঃ(মনুষ্যাদেঃ) চতৃষ্পদঃ(পশ্বাদেঃ) ঈশে(ঈষ্টে-শাস্তি), [তস্মৈ] কস্মৈ(কায়-অখণ্ডানন্দরূপায় ব্রহ্মণে) হবিষা(চরুপুরোডাশাদিনা) বিধেম(পরিচরেম ইত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ১৩ ॥ সরলার্থঃ। পুনরপি স্তৌতি—“সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মম্” ইতি। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মং (অণোরপ্যণীয়াংসং) কলিলস্য(জগদারম্ভকানামপাং বুদ্বুদস্য পূর্ব্বাবস্থা কলিলং, তস্য) মধ্যে(অভ্যন্তরে) বিশ্বস্য(জগতঃ) স্রষ্টারং অনেকরূপং(কার্যকারণাদি- ভেদেনাবভাসমানং), তথা বিশ্বস্য একং(অদ্বিতীয়ং) পরিবেষ্টিতারং যাঁহাতে আশ্রিত, এবং যিনি দ্বিপদ ও চতুষ্পদগণের শাসনকর্তা, সেই আনন্দঘন ব্রহ্মকে হবি দ্বারা আরাধনা করি ॥ ৪ ॥ ১৩ ॥
মূলানুবাদ। সূক্ষ্ম হইতেও অতি সূক্ষ্ম(দুর্বিজ্ঞেয়), সৃষ্টিকালীন জলের যে, বুদ্ধ দাবস্থা, তাহারও পূর্ব্ববর্তী কলিলাবস্থার মধ্যে থাকিয়া বিশ্বের দেবানাং ব্রহ্মাদীনামধিপঃ স্বামী। যস্মিন্ পরমেশ্বরে সর্ব্বকারণে ভূরাদয়ো লোকা অধিশ্রিতাঃ অধি উপরি শ্রিতা অধ্যস্তা ইতি যাবৎ। প্রকৃতঃ পরমেশ্বরঃ অস্য দ্বিপদো মনুষ্যাদেশ্চতুষ্পদঃ পশ্বাদেশ্চেশে ঈষ্টে। তকারলোপশ্চান্দসঃ। কম্মৈ কায়ানন্দরূপায়। স্মৈভাবোহপি ছান্দসঃ। দেবায় দ্যোতনাত্মনে তস্মৈ হবিষা চরুপুরোড়াশাদিদ্রব্যেন বিধেম পরিচরেম। বিধেঃ পরিচরণ- কৰ্ম্মণ এতদ্রূপম্ ॥ ৪॥ ১৩॥ শাঙ্করভাষ্যম্। পরস্যাতিসূক্ষ্মত্বং জগচ্চক্রে সাক্ষিত্বেনাবস্থিতত্বং নিখিলজগৎসৃষ্টত্বং সর্ব্বাত্মকত্বং তত্তাদাত্ম্যজনানাং মুক্তিশ্চেত্যেতদ্বহুশোহধস্তাৎ প্রতিপাদিতং যদ্যপি, তথাপি বুদ্ধিসৌকর্য্যার্থং পুনবপ্যাহ-সূক্ষ্মেতি।
প্রস্তাবিত যে পরমেশ্বর ব্রহ্মাদি দেবগণের অধিপতি—প্রভু, সর্ব্বকারণরূপী যে পরমেশ্বরে পৃথিব্যাদি সমস্ত লোক(ভোগস্থান) সম্পূর্ণরূপে আশ্রিত অর্থাৎ আরোপিত রহিয়াছে, এবং যে পরমেশ্বর এই দ্বিপদ মনুষ্যাদি ও চতুষ্পদ পশু প্রভৃতি প্রাণীর শাসনকর্তা, “ঈশে” এখানে ‘ত’ অক্ষরটা লুপ্ত হইয়াছে, ‘ঈষ্টে’ এইরূপ বুঝিতে হইবে। ‘ক’ অর্থ আনন্দ, দেব অর্থ প্রকাশস্বভাব, সেই পরমানন্দ- রূপ প্রকাশাত্মক পরমেশ্বরের উদ্দেশ্যে—চরু পুরোডাশপ্রভৃতি হবিদ্রব্য দ্বারা পরিচর্য্যা(সেবা) করিব। এখানে বি+ধা ধাতুর অর্থ পরিচরণ—পরিচর্য্যা ॥৪॥১৩৷৷ ভাষ্যানুবাদ। যদিও ইতঃ পূর্ব্বে পরমেশ্বরের অতিসূক্ষ্মত্ব, জগৎ- সাক্ষিরূপে অবস্থান, সর্ব্বজগৎস্রষ্টৃত্ব ও সর্ব্বাত্মভাব, এবং যাঁহারা তাহাকে অভিন্ন-
(ব্যবস্থাপকং) শিবং(মঙ্গলরূপং পরমেশ্বরং) জ্ঞাত্বা(সাক্ষাৎকৃত্য) অত্যন্তং যথাস্যাৎ, তথা শান্তিং এতি(মুচ্যতে ইত্যর্থঃ)।[অয়মপি মন্ত্রঃ তৃতীয়াধ্যায়ে ব্যাখ্যাতঃ] ॥ ৪ ॥ ১৪ ॥ সরলার্থঃ।[তদেকনিষ্ঠানাং মুক্তিফলং দুঃখনিবৃত্তিং চ দর্শয়তি—“স এব” ইতি]।
বিশ্বাধিপঃ(বিশ্বপতিঃ) সঃ(প্রকৃতঃ) পরমেশ্বরঃ এব(নিশ্চয়ে) কালে (স্থিতিকালে) সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ঃ(অন্তর্য্যামিতয়া অন্তববস্থিতঃ সন্) ভুবনস্য গোপ্তা (রক্ষিতা), যদ্বা, কালে(কল্পারম্ভসময়ে)[প্রাক্তন-কর্মানুসারেণ] ভুবনস্য সৃষ্টিকর্তা অনন্তরূপে প্রকাশমান, এবং জগতের অদ্বিতীয় ভোগবিধাতা শিবকে অর্থাৎ আনন্দময় পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ করিয়া আত্যন্তিক শান্তি লাভ করে ॥৪॥১৪॥ মূলানুবাদ। বিশ্বের অধিপতি সেই পরমেশ্বরই উপযুক্ত সময়ে (স্থিতিকালে) সর্ব্বভূতের অন্তবে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া জগৎ রক্ষা করেন এবং দেবগণ ও
পৃথিব্যাদ্যব্যাকৃতান্তমুত্তরোত্তরং সূক্ষ্মসূক্ষ্মতরত্বমপেক্ষ্যেশ্বরস্য তদপেক্ষয়া সূক্ষ্মতমত্বমাহ—সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মমিতি। কলিলস্যাবিদ্যা-তৎকার্য্যাত্মকদুর্গস্য গহনস্য মধ্যে। শেষং ব্যাখ্যাতম্ ॥ ৪ ॥ ১৪ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। পরস্য সাক্ষিরূপেণাবস্থিতত্বং সনকাদিভিরহ্মাদি- দেবৈশ্চাধিকারিপুরুষৈরপ্যাত্মতয়া প্রাপ্যত্বং সাধনচতুষ্টয়াদিযুতাস্মদাদীনাং মোক্ষ- সিদ্ধিঞ্চাহ—স এবেতি। স এব প্রকৃতঃ কালে অতীতকল্পেযু জীবসঞ্চিতকর্ম্ম- পরিপাকসময়ে ভুবনস্য গোপ্তা তত্তৎকর্মানুগুণতয়া রক্ষিতা। বিশ্বাধিপঃ বিশ্বস্বামী। সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ো ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তেষু সাক্ষিমাত্রতয়াহবস্থিতঃ।
রূপে উপলব্ধি করেন, তাহাদের মুক্তি বা সংসার-বন্ধ-ক্ষয় হয়, এ সকল বিষয় বহুবার বর্ণিত হইয়াছে, তথাপি ঐ সকল বিষয়কে সহজে বুদ্ধিগম্য করিবার নিমিত্ত আবারও বলিতেছেন—“সূক্ষ্ম” ইত্যাদি।
স্থূল পৃথিবী হইতে আরম্ভ করিয়া অব্যাকৃত বা সূক্ষ্ম ভূত-জড়বর্গপর্যন্ত যে সকল ক্রমশঃ সূক্ষ্ম ও সূক্ষ্মতররূপে অবস্থিত, তদপেক্ষাও সূক্ষ্মতমভাব বলিতেছেন- সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ইত্যাদি। অবিদ্যা ও অবিদ্যাপ্রসূত সমস্তই দুর্গম বা গহন অর্থাৎ সহজ বুদ্ধির অগম্য, এই জন্য ঐ সকলকে কলিল বলা হইয়াছে। সেই কলিলের মধ্যে [স্থিত]। অপর অংশ পূর্ব্বেই ব্যাখাত,[এই জন্য ব্যাখ্যা অনাবশ্যক] ॥ ৪॥ ১৪ ॥ ভাষ্যানুবাদ। পরমেশ্বরই যে, সর্ব্বসাক্ষিরূপে বর্তমান, সনকাদি ঋষি- বন্দ ও বিভিন্ন কর্মাধিকারপ্রাপ্ত ব্রহ্মাদি দেবগণ ও যে, তাঁহাকে অভিন্নরূপে প্রাপ্ত
গোপ্তা(রক্ষকঃ—ব্যবস্থাপক ইত্যর্থঃ)। দেবাঃ ব্রহ্মর্ষয়ঃ চ যস্মিন্(পরমেশ্বরে) যুক্তাঃ(সমাহিতাঃ ভবন্তি)।[অন্নোহপি] তং এবং(যথোক্তরূপং) জ্ঞাত্বা মৃত্যুপাশান্ ছিনত্তি(মৃত্যুপাশাৎ মুচ্যতে ইত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ১৫ ॥
ব্রহ্মর্ষিগণ যাঁহাতে সমাহিত থাকেন। যে লোক তাঁহাকে এই ভাবে জানে, সে লোক মৃত্যুপাশ ছেদন করে ॥ ৪ ॥ ১৫ ॥
যস্মিন্ চিদ্ঘনানন্দবপুষি পরে যুক্তা ঐক্যং প্রাপ্তাঃ। তে কে? ব্রহ্মর্ষয়ঃ সনকাদয়ঃ, দেবতাঃ ব্রহ্মাদয়ঃ। তমেবেশ্বরং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মাহমস্মীত্যপরোক্ষীকৃত্য মৃত্যুপাশান্, মৃত্যুরবিদ্যা তমঃ রূপাদয়শ্চ পাশাঃ—পাশ্যন্ত ইতি পাশাস্তান্। মৃত্যুর্বৈতমঃ ইতি শ্রুতেঃ। তৎকার্য্যকামকর্ম্ম ছিনত্তি নাশয়তি ঐক্যরূপ- স্বপ্রকাশাগ্নিনা দহতীত্যর্থঃ ॥৪ ॥ ১৫ ॥
হন, এবং আমরাও যে, চতুর্বিধ সাধন সম্পন্ন(১) হইলে মোক্ষলাভ করিতে পারি, তাহা প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন—“স এব” ইত্যাদি।
পূর্ব্বকথিত পরমেশ্বরই কালে—অতীত কল্পসমূহে জীবগণের পূর্ব্বসঞ্চিত কর্ম্মসমূহের যখন ফলপ্রদান সময়-উপস্থিত হয়, তখন, পূর্ব্বকথিত পরমেশ্বরই ভুবনের(জগতের) গোপ্তা অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন কর্ম্মের অনুকূলভাবে রক্ষক(হন)। [তিনিই] বিশ্বের অধিপতি—স্বামী(প্রভু), এবং সর্ব্বভূতের মধ্যে গূঢ় অর্থাৎ ব্রহ্মা হইতে আরম্ভ করিয়া তৃণপর্যন্ত সর্বত্র সাক্ষিরূপে বিদ্যমান। যাঁহারা সেই চিদানন্দমূর্ত্তি পরমেশ্বরে যুক্ত—অর্থাৎ একত্ব বা অভেদ প্রাপ্ত হন, তাঁহারা কাহারা? না, সনকপ্রভৃতি ব্রহ্মর্ষিগণ ও ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতাগণ। সেই ঈশ্বরকেই অবগত হইয়া অর্থাৎ আমিই ব্রহ্ম, এইরূপে প্রত্যক্ষ করিয়া সমস্ত মৃত্যুপাশ ছেদন করেন—বিনাশ করেন, ঐক্যবোধরূপ স্বপ্রকাশ অগ্নি দ্বারা দগ্ধ করিয়া থাকেন। এখানে ‘মৃত্যু’ অর্থ—অবিদ্যা বা অজ্ঞানান্ধকার, এবং রূপরসাদি বিষয়, উহারা বন্ধন ঘটায় বলিয়া ‘পাশ’ পদ-বাচ্য। শ্রুতি বলিয়াছেন—“তমই মৃত্যু” ইতি। এখানে অবিদ্যাজনিত কাম কৰ্ম্মও মৃত্যুপদে বুঝিতে হইবে ॥ ৪ ॥ ১৫ ॥
(১) চতুব্বিধ সাধন এইরূপ—১। নিত্যানিত্য বস্তুবিবেক, অর্থাৎ কোনটা নিত্য, আর কোনটা অনিত্য, ইহা পৃথক্ করিয়া জানা। ২। ঐহিক ও পার- লৌকিক ভোগে বৈরাগ্য। ৩। শম দমাদি ছয়টা গুণ থাকা। ৪। মুমুক্ষুত্ব— মুক্তিলাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এই চারিটী ধৰ্ম্ম মুক্তিলাভের প্রধান সহায় বলিয়া, ‘সাধন’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে।
ঘৃতাৎ পরং মণ্ডমিবাতিসূক্ষ্মং জ্ঞাত্বা শিবং সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ং। বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্ব্বপাশৈঃ ॥ ৪ ॥ ১৬ ॥
সরলার্থঃ।[পুনরপি সদ্বিজ্ঞানফলমাহ—“ঘৃতাৎ পরম্”ইতি]। ঘৃতাৎপরং(ঘৃতোপরি বিদ্যমানং) মণ্ডং(সারভাগং) ইব অতিসূক্ষ্মং(দুর্লক্ষ্যং) বিশ্বস্য একং(অদ্বিতীয়ং) পরিবেষ্টিতারং(কর্মফলপ্রদাতারং) সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ং দেবং শিবং জ্ঞাত্বা সর্ব্বপাশৈঃ(অবিদ্যাবাসনাদিভিঃ) মুচ্যতে(মুক্তো- ভবতীত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ১৬ ॥
মূলানুবাদ। ঘৃতের উপরিভাগে যে শরের মত সারভাগ থাকে, তাহার ন্যায় অতিসূক্ষ্ম, বিশ্বের কর্মফলব্যবস্থাপক ও সর্ব্বভূতের অন্তরে গূঢ়ভাবে প্রকাশমান দেবকে(পরমেশ্বরকে) জানিয়া জীব সর্ব্বপ্রকার বন্ধনপাশ হইতে মুক্ত হয় ॥ ৪ ॥ ১৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম। পরস্যাত্যন্তাতিসূক্ষ্মতমত্বমানন্দাতিশয়বত্ত্বং নির্দোষ- বত্ত্বং জীবেষতি সূক্ষ্মতয়া স্বরূপেণাবস্থিতত্বং সর্ব্বস্যাপি সত্তাদিপ্রদতয়া ব্যাপিত্বং তদেকত্বজ্ঞানাৎ পাশহানিঞ্চ দর্শয়তি—ঘৃতাদিতি। ঘৃতোপরি বিদ্যমানং মণ্ডং সারস্তদ্বতামতিপ্রীতিবিষয়ো যথা, তথা মুমুক্ষুণামতিসাররূপানন্দপ্রদত্বেন নিরতিশয়প্রীতিবিষয়ঃ পরমাত্মা, তদ্বৎ ঘৃতসারবদানন্দরূপেণাত্যন্তসূক্ষ্মং জ্ঞাত্বা শিবমিত্যেতদ্ব্যাখ্যাতম্। সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ং ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তেষু জন্তুষু কৰ্ম্ম- ফলভোগসাক্ষিত্বেন প্রত্যক্ষতয়া বর্তমানমপি তৈস্তিরস্কৃতেশ্বরভাবম্। উত্তরার্দ্ধং ব্যাখ্যাতম্ ॥ ৪ ॥ ১৬ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এখন দেখান হইতেছে যে, পরমেশ্বরই অত্যন্ত সূক্ষ্মতম, নিরতিশয় আনন্দময়, সর্ব্বদোষ বর্জিত, এবং সর্ব্বজীবে অতি সূক্ষ্মভাবে স্বরূপতঃ বর্তমান, তাঁহার সত্তায়ই সকল বস্তু সত্তাবান্ হয়, এই জন্য তিনি সর্ব্বব্যাপী, এবং তাঁহাতে ও জীবেতে একত্ব জ্ঞান হইলেই সমস্ত কৰ্ম্ম-পাশ বিনষ্ট হয়, এই সমস্ত বিষয় প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন—“ঘৃতাৎ” ইতি। ঘৃতের উপরিভাগে মণ্ড(মাড়ের মত সারভাগ) থাকে, তাহা যেমন ভোক্তাদের পক্ষে অত্যন্ত প্রীতিকর, তেমনি মুমুক্ষুগণের সম্বন্ধেও অতিশয় আনন্দপ্রদ বলিয়া পরমাত্মাও সর্বাধিক প্রীতির বিষয় বা প্রিয় বস্তু। পরমাত্মাকে উক্ত ঘৃতসারের ন্যায়, আনন্দপ্রদ বলিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম শিবরূপ জানিয়া—। “শিবৎ” ইত্যাদি কথার অর্থ তৃতীয় অধ্যায়ে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। সর্ব্বভূতে গূঢ়(প্রচ্ছন্ন) কথার অভি- প্রায় এই যে, ব্রহ্মাদি স্তম্বপর্য্যন্ত(তৃণ পর্য্যন্ত) সমস্ত প্রাণীতে জীবকৃত কৰ্ম্মফল- ভোগের সাক্ষীরূপে প্রত্যক্ষযোগ্যরূপে বর্তমান থাকিলেও অবিদ্যা ও কাম কর্ম্মাদি দ্বারা তাঁহার পরমেশ্বরভাব আচ্ছাদিত থাকে,[এইজন্য গূঢ় বলা হইয়াছে] ॥৪৷৷১৬৷৷
এষ দেবো বিশ্বকর্মা মহাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ। হৃদা মনীষা মনসাহভিকৃতো য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ॥ ৪ ॥ ১৭ ॥
সরলার্থঃ। বিশ্বকৰ্ম্মা(বিশ্বং কৰ্ম্ম—কার্য্যং যস্য, সঃ তথোক্তঃ), মহাত্মা (মহান্ আত্মা) সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ। এষঃ দেবঃ(পরমাত্মা) হৃদা (দ্বৈতভ্রান্তিহারকেন নেতি নেতীত্যুপদেশেন), মনীষা(আত্মানাত্মবিবেকবুদ্ধ্যা), মনসা(বিচারজাতাত্মৈক্যজ্ঞানেন) অভিকুপ্তঃ(প্রকাশিতো ভবতি)। যে এতৎ(যথোক্তং তত্ত্বং) বিদুঃ(জানন্তি)। তে অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) ভবন্তি (মুচ্যন্ত ইত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ১৭ ॥
মূলানুবাদ। বিশ্বস্রষ্টা, মহান্ আত্মস্বরূপ, এবং সর্ব্বদা প্রাণিহৃদয়ে গূঢ়ভাবে অবস্থিত এই দেবকে(পরমাত্মাকে) যাহারা জানে, তাহারা অমৃত হয়, অর্থাৎ মরণভয় হইতে মুক্ত হয় ॥ ৪ ॥ ১৭ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। নির্ভেদসুখৈকতানাত্মনো বিশ্বকৃত্বং তদ্ব্যাপিত্বং সন্যাসিভিরাপ্তব্যমোক্ষরূপত্বঞ্চাহ-এষ ইতি। এষঃ প্রকৃতো দেবো দ্যোতনাত্মকঃ। বিশ্বকর্মা মহদাদিবিশ্বং কৰ্ম্ম-ক্রিয়ত ইতি কৰ্ম্ম, মায়াবেশাদ বিশ্বরূপ কার্য্যমস্যেতি বিশ্বকর্মা। মহাংশাসাবাত্মেতি মহাত্মা সর্বব্যাপীত্যথঃ। সদা সর্ব্বদা জনানাং হৃদয়ে পরমে ব্যোম্নি হৃদাকাশে জলাদ্যপাধিযু সূর্য্যপ্রতিবিম্বব- ন্নিবিষ্টঃ সম্যস্থিত ইত্যেতৎ। স এব সাক্ষিরূপেণ হৃদা-হৃঞহরণ ইতি স্মরণাৎ ইরতীতি হৃৎ, তেন হৃদা নেতি নেতীতিনিষেধোপদেশেন। মনীষা অয়ং পুরুষার্থোহয়মপুরুষার্থোহয়মাত্মায়মনাত্মেত্যেতয়া বিবেকবুদ্ধ্যা। মনসা বিচারসাধ্যৈকত্বজ্ঞানেন চ। অভিক্লপ্তঃ প্রকাশিতোহখণ্ডৈকরস- ত্বেনাভিব্যক্ত ইত্যেতৎ। যে জনা সাধনচতুষ্টয়সম্পন্নাঃ সন্ন্যাসিন এতৎ তত্ত্বমস্যাদিবাক্যপ্রতিপাদ্যৈকত্বরূপমখণ্ডৈকরসমিতি যাবৎ, বিদুঃ ব্রহ্মাহ- মম্মীত্যপরোক্ষীকুয্যুঃ,তে যথোক্তজ্ঞানিনোহমৃতা ভবন্তি অমরণধৰ্মাণঃ পুন- রাবৃত্তিরহিতা ভবন্তীত্যর্থঃ ॥ ৪ ॥ ১৭ ॥
ভাষ্যানুবাদ। সর্ব্বপ্রকার ভেদবর্জিত সুখমাত্র স্বরূপ হইয়াও তিনি যে, বিশ্বের কর্তা, বিশ্বব্যাপী, এবং সন্ন্যাসিগণের প্রাপ্তব্য মোক্ষস্বরূপ, ইহা প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন—“এযঃ” ইতি। বর্ণনীয় এই প্রকাশময়(দেব) পরমেশ্বরই বিশ্বকর্মা অর্থাৎ মহত্তত্বাদিক্রমে সৃষ্ট বিশ্ব তাহারই কর্ম্ম বা কার্য্য, মায়ার সাহায্যে এই বিশ্বরূপ কার্য্য তাঁহার দ্বারাই নিষ্পন্ন হইয়াছে, এইজন্য তিনি বিশ্বকর্মা। মহান্ অথচ আত্মা—এই কারণে তিনি মহাত্মা অর্থাৎ সর্ব্বব্যাপী। জলাদি স্বচ্ছ পদার্থে যেমন সূর্য্যের, প্রতিবিম্ব পতিত হয়, তেমনই প্রাণীগণের হৃদয়ে—পরম ব্যোমরূপ হৃদয়াকাশে
সরলার্থঃ।[ কালত্রয়েহপি পরমাত্মনঃ কূটস্থত্বং ভেদাভাসশূন্যত্বং চ দর্শয়িতুমাহ—“যদা”ইতি। যদা(যস্যামবস্থায়াং) অতমঃ(তমসঃ অবিদ্যাবরণস্যাভাবঃ)[নাসীৎ], তৎ(তদা) দিবা(দিবসং) ন, রাত্রিঃ(শর্ব্বরী) ন, সৎ(কারণং) ন, অসৎ (কার্য্যং) চ ন,(যদ্বা সত্তাসত্তয়োরাবোপঃ চ ন)।[ননু তর্হি শূন্যবাদ
মূলানুবাদ। পরমেশ্বর যে, তিন কালেই কূটস্থ ও সর্ব্বপ্রকার বিভাগ- শূন্য, এখন তাহা প্রদর্শন করিতেছেন—“যদা”ইত্যাদি। যে সময় তমঃ অর্থাৎ অবিদ্যা ও তৎকার্য্য ছিল না, সে সময় দিবা ছিল না,
শাঙ্করভাষ্যম্। কালত্রয়েহপি মুক্তৌ প্রলয়াদৌ চ পরমাত্মা কুটস্থ ইতি নিশ্চয়াজ্জাগ্রং স্বপ্নয়োরপি ভ্রান্ত্যা সদ্বিতীয়ত্বাবভাসঃ। বস্তুতস্তু সদা নির্ভেদ এবেত্যাহ—যদেতি। যদা যস্যামবস্তায়ামতমো ন তমোহস্যেত্যতমঃ তত্ত্বমাদিবাক্যজন্যজ্ঞানেন দীপস্থানীয়েন দগ্ধাবিদ্যাতৎকার্য্যরূপতমস্কত্বাৎ, তদা তৎকালে ন দিবা দিবাবোপোহপি নাস্তি, ন রাত্রিস্তত্তারোপোহপি নাস্তীতি সর্ব্বত্রানুসঙ্গঃ। ন সন্ সত্তারোপোহপি। নাসন্ অভাবারোপোহপি। তর্হি
তিনি সর্ব্বদা সন্নিবিষ্ট অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে বিদ্যমান। ‘হৃদা’—হরণার্থক ‘হৃ’ ধাতু হইতে নিষ্পন্ন ‘হৃৎ’ অর্থ হরণকারী, অবিদ্যাদি দোষের হরণকারী বলিয়া হৃদা অর্থ—“নেতি নেতি”(তিনি ইহা নহে ইহা) ইত্যাদি নিষেধক উপদেশবাক্য, তাহা দ্বারা, ‘মনীষা’ অর্থ—ইহা প্রকৃত পুরুষার্থ, ইহা প্রকৃত পুরুষার্থ নহে, ইহা আত্মা, উহা আত্মা নহে, এবংবিধ বিবেকবুদ্ধি, তাহা দ্বারা, এবং ‘মনসা’ অর্থাৎ বিচারলভ্য একত্ব- জ্ঞানের দ্বারা সেই পরমেশ্বরই জীবের সাক্ষিরূপে অভিকুপ্ত হন, অর্থাৎ অখণ্ড আনন্দৈকরসরূপে প্রকাশিত হন। চতুর্বিধ সাধনসম্পন্ন যে সকল সন্ন্যাসী “তত্ত্বমসি” ইত্যাদি বাক্যপ্রতিপাদ্য অখণ্ড একরস ও একরূপ(যাহার রূপভেদ নাই) এই তত্ত্ব জানেন—‘আমি ব্রহ্ম- স্বরূপ’ এইরূপে উহা প্রত্যক্ষ করেন, তাঁহারা অর্থাৎ উক্তপ্রকার জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা অমৃত হন, অর্থাৎ মরণভয়রহিত হন, সংসারে আর ফিরিয়া আইসেন না॥ ৪ ॥ ১৭ ॥ ভাষ্যানুবাদ। যখন নিশ্চয় জানা যাইতেছে যে, পরমাত্মা কালত্রয়েই মুক্তিতে এবং প্রলয়কালেও কূটস্থ অর্থাৎ নির্ব্বিকার, তখন জাগ্রৎ অবস্থায় ও স্বপ্নাবস্থায় যে, দ্বৈতাবভাস বা ভেদপ্রতীতি, তাহা নিশ্চয়ই ভ্রান্তিমূলক, প্রকৃত পক্ষে আত্মা চির কালই ভেদশূন্য, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—“যদা” ইত্যাদি। যখন—যে অবস্থায় ‘অতমঃ’ অর্থাৎ “তত্ত্বমসি” প্রভৃতি বাক্যজনিত প্রদীপতুল্য তত্ত্বজ্ঞান-বহ্নি দ্বারা অবিদ্যা ও অবিদ্যাকার্য্য দগ্ধহ ইয়া যায়, তমের অভাব হয়,
১৫৪
তদক্ষরং তৎসবিতুর্ব্বরেণ্যং প্রজ্ঞা চ তস্মাৎ প্রসূতা পুরাণী ॥ ৪ ॥ ১৮ ॥
আপতিতঃ? ইত্যাহ—] কেবলঃ(বিশুদ্ধঃ) শিবঃ(আনন্দঃ) এব। তৎ (শিবরূপং) অক্ষরং(অবিকারি), তং(চ) সবিতুঃ(আদিত্যমণ্ডলাভিমানিনঃ পুরুষস্য) বরেণ্যঃ(বরণীয়ং)। তস্মাৎ(অক্ষরাৎ শিবাৎ) পুবাণী(ব্রহ্মাদি- পবম্পরয়া প্রাপ্তা শাশ্বতী) প্রজ্ঞা(তত্ত্বমস্যাদিবাক্যজা বুদ্ধিঃ) প্রসূতা(বিবেকিষু) প্রাপ্তা অনাদিসিদ্ধা বুদ্ধিরিত্যর্থঃ, ॥ ৪ ॥ ১৮ ॥
রাত্রি ছিল না, সৎ বা অসৎ ছিল না। সে সময় আদিত্যমণ্ডলাভিমানিনী দেবতার বরণীয় নির্বিশেষ আনন্দরূপ সেই অক্ষর অর্থাৎ কূটস্থ ব্রহ্মমাত্র ছিলেন। তাঁহা হইতেই পুবাণী প্রজ্ঞা অর্থাৎ গুরুপৰম্পবাক্রমে আগত জ্ঞান বিবেকীপুরুষে প্রকটিত হইয়াছে ॥ ৪ ॥ ১৮ ॥
তত্ত্বং সর্ব্বত্র শূন্যমেব জাতমিতি বৌদ্ধমতাবিশেষমাশঙ্ক্যাহ—শিব এবেতি। শিব এব শুদ্ধস্বভাবো নিব্বিকল্পঃ, ন শন্যমেবেতি নিপাতার্থঃ। কেবলোহবিদ্যাদি- বিকল্পশূন্যঃ। তদক্ষরং তদুক্তস্বরূপং ন ক্ষবতীত্যক্ষরং নিত্যং তৎ তৎপদ- লক্ষ্যম্। সবিতৃবাদিত্যাদিমণ্ডলাভিমানিনো বরেণ্যং সন্তজনীয়ং প্রজ্ঞা— গুরুপদেশাৎ তত্ত্বনস্যাদিবাক্যজা বুদ্ধিঃ। চকার এবকারার্থঃ। তস্মাচ্ছুদ্ধত্ব- হেতোঃ প্রসূতা নিত্যা বিবেকাদিমৎসু সন্ন্যাসিষ ব্যাপ্তা পূর্ণত্বাকাবেণ। পুরাণী ব্রহ্মাণমাবভ্য পবস্পবযা প্রাপ্তা অনাদিসিদ্ধা ॥ ৪ ॥ ১৮ ॥
তখন দিবা নাই ও রাত্রি নাই অর্থাৎ তৎকালে দিবাবাত্রি ভেদকল্পনা নাই। সৎ ও অসৎ নাই, অর্থাৎ তৎকালে সত্তা বা অসত্তার কল্পনা নাই।
ভাল, তাহা হইলে ত বৌদ্ধসম্মত শূন্যই তত্ত্ব হইয়া পড়িল? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন—না, “শিব এব” একমাত্র শিবই(আনন্দ মাত্র ছিল)। ‘এব’ শব্দেব অভিপ্রায় এই যে, স্বভাবশুদ্ধ শিবই ছিলেন, শূন্য বা অভাব নহে। ‘কেবল’ অর্থ— অবিদ্যাকল্পিত ভেদশূন্য। তাহা অক্ষর—তাহার যেরূপ স্বরূপ বলা হইয়াছে, তাহার ক্ষরণ—অন্যথাভাব হয় না’, উহা নিত্য। তাহা ‘তৎ’ পদের লক্ষ্য, অর্থাৎ “তত্ত্ব- মসি” বাক্যস্থ ‘তৎ’ পদটী লক্ষণা দ্বারা তাঁহাকে বুঝায়, এবং তাহা সবিতার অর্থাৎ আদিত্যমণ্ডলাভিমানী পুরুষের বরণীয় বা আরাধ্য। প্রজ্ঞা অর্থ “তত্ত্বমসি” বাক্যজন্য বুদ্ধি(জ্ঞান)। সেই বিশুদ্ধ কারণ হইতে পুরাণী—যাহা ব্রহ্মা হইতে আরম্ভ করিয়া গুরুপরম্পয়াক্রমে প্রাপ্তা, সেই অনাদিসিদ্ধ(প্রজ্ঞা) সর্ব্বদা বিবেকজ্ঞান- সম্পন্ন সন্ন্যাসিগণে পরিপূর্ণরূপে প্রকাশিত হইয়াছে ॥ ৪ ॥ ১৮ ॥
সরলার্থঃ।[পুনশ্চ মহিমান্তরমাহ—“নৈনম্” ইতি]। এনং(পূর্ব্বোক্তং পরমাত্মানং) ঊর্দ্ধং(ঊর্দ্ধস্থং) অ পরিজগ্রভৎ(পবিতঃ অগ্রহীৎ—ন প্রাপ্তবান্) [কোহপীতে শেষঃ]। তথা তির্য্যঞ্চং(পার্শ্ববর্তিনং) ন, মধ্যে(মধ্যবর্তিনং) ন পরিজগ্রভৎ। তস্য-তুলনাপি নাস্তীত্যাহ—তস্য(পরমাত্মনঃ) প্রতিমা(তুলা) ন অস্তি, যস্য মহং(দিগাদিপরিচ্ছেদশূন্যং) যশঃ(কীর্ত্তিঃ—মহিমেত্যর্থঃ) নাম (অভিধানং বাচকমিত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ১৯ ॥
সরলার্থঃ।[ অস্যেন্দ্রিয়াদ্যবিষয়তাং স্বাত্মস্বরূপতাং চ দশয়তি—“ন সংদৃশে” ইত্যাদি]।
মূলানুবাদ। ইঁহাকে(পরমেশ্বরকে) কেহ উর্দ্ধে, পার্শ্বে বা মধ্যে দর্শন করে নাই, এবং মহৎ(লোকাতিশায়া) যশঃ অর্থাৎ মহিমাই যাঁহার নাম বা স্বরূপপ্রকাশক। জগতে তাঁহার প্রতিমা বা তুলনা নাই,[সুতরাং দৃষ্টান্ত বা উপমা দ্বারা তাঁহাকে বুঝান যায় না] ॥ ৪ ॥ ১৯ ॥
মূলানুবাদ। এই পরমেশ্বরের স্বরূপটা দর্শনপথে নাই, কেহই
শাঙ্করভাষ্যম্। কূটস্থস্য ব্রহ্মণ ঊর্দ্ধাদিষু দিক্ষু কেনাপ্যপরি- গ্রাহ্যত্বমদ্বিতীয়ত্বাৎ কেনাপ্যতুলিতত্বং কালদিগাদ্যনবচ্ছিন্নযশোরূপত্বঞ্চাহ— নৈনমিতি। এনং প্রকৃতং অপবিচ্ছিন্নরূপত্বান্নিবংশত্বান্নিরবয়বত্বাচ্চ ঊর্দ্ধাদিষু দিক্ষু কশ্চিদপি ন পরিজগ্রভৎ পরিগ্রহীতুং ন শত্রুয়াৎ। তস্য তস্যৈবেশ্বরস্যাখণ্ড- সুখানুভবত্বাদেতাদৃশদ্বিতীয়াভাবাৎ প্রতিমা উপমা নাস্তি। যস্য নাম মহদ্যশঃ যস্যেশ্বরস্য নাম অভিধানং মহদ্দিগাদ্যনবচ্ছিন্নং সর্ব্বত্র পরিপূর্ণং যশঃ কীর্ত্তিঃ ॥৪॥১৯৷৷
ভাষ্যানুবাদ। কূটস্থ ব্রহ্ম উর্দ্ধাদি কোন দিকে কাহারো গ্রহণযোগ্য নহে, অদ্বিতীয়ত্ব নিষ্কন্ধন কাহাবো সঙ্গে তুলনার যোগ্য ও নহে, এবং তাঁহার যশঃ কাল ও দিগাদি দ্বারা সীমাবদ্ধ নহে; এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—“নৈন” ইত্যাদি। যেহেতু এই আত্মা সর্ব্বপ্রকার পরিচ্ছেদরহিত(অসীম) নিরংশ ও নিরবয়ব, সেই’হেতু কেহই তাঁহাকে উদ্ধ-অধঃ প্রভৃতি দিকে গ্রহণ করিতে সমর্থ হয় না‘। সেই পরমেশ্বর অখণ্ড আনন্দানুভবস্বরূপ এবং দ্বিতীয়রহিত, এইজন্য তাঁহার প্রতিমা অর্থাৎ উপমা নাই। দিক্ প্রভৃতি দ্বারা অপরিচ্ছিন্ন মহৎযশ কীর্তিই যাহার নাম অর্থাৎ কেবল কীর্ত্তি দ্বারা যাহার উল্লেখ মাত্র হয়,[তাহার প্রতিমা নাই] ॥ ৪ ॥ ১৯ ॥
হৃদা হৃদিস্থং মনসা য এন- মেবং বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি॥ ৪ ॥ ২০ ॥
অস্য(পরমেশ্বরস্থ্য) রূপং(স্বরূপং) সাদৃশে(চক্ষুরাদিদর্শনপথে) ন তিষ্ঠতি (ইন্দ্রিয়াগোচর ইতি ভাবঃ।)[অতএব] কশ্চন(কশ্চিদপি জনঃ) এনং চক্ষুষা ন পশ্যতি। যে হৃদিস্থং(হৃদয়ে স্থিতং) এনং এবং(যথোক্ত-প্রকারং) হৃদা(অবিদ্যাহারিণা) মনসা(বুদ্ধ্যা) বিদুঃ(জানন্তি), তে অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) ভবন্তি ॥ ৪ ॥ ২০ ॥
ইহাকে চক্ষু দ্বারা দর্শন করে না।[পরশ্ব] যাহারা হৃদয়স্থ ইহাকে অবিদ্যারহিত শুদ্ধমনে দর্শন করেন, তাঁহারা অমৃত—মুক্ত হন ॥ ৪ ॥ ২০ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ঈশস্যেন্দ্রিয়াদ্যবিষয়তা, প্রত্যগুপতাং তদৈক্যজ্ঞানাৎ মোক্ষতাঞ্চাহ-ন সন্দশ ইতি। অন্য প্রকৃতেশ্ববস্থ্য রূপং স্বরূপং রূপাদিরহিতং নির্বিশেষং স্বপ্রকাশাখণ্ডসুখানুভবং সন্দশে চক্ষুরাদিগ্রহণযোগ্যপ্রদেশে ন তিষ্ঠতি তদ্বিষয়ো ন ভবতীত্যেতৎ। ইন্দ্রিযাগোচরত্বাদেবৈনং প্রকৃতং-চক্ষুরিত্যুপ- লক্ষণম্, সর্ব্বেন্দ্রিয়ৈবপি কশ্চন কোহপি ন পশ্যতি তদ্বিষয়তয়া গৃহীতুং ন শত্রুয়াৎ। “যচ্চক্ষুষান পশ্যতি, যেন চক্ষংষি পশ্যতি” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। হৃদা শুদ্ধবুদ্ধ্যা, এতদ্ব্যাখ্যাতং মনসেতি। হৃদিস্থং হৃদাকাশগুহাস্তং প্রত্যক্তয়া তত্রাবস্থিতম্। যে সাধনচতুষ্টযাদিযুক্তাঃ সন্ন্যাসিনো যোগ্যাধিকারিণ এনং প্রকৃতং ব্রহ্মাত্মানমেবমিথং ব্রহ্মাহমস্মীত্যপবোক্ষেণ বিদুর্জ্জানন্তি, তেনা- পরোক্ষীকরণমহিম্নামৃতা ভবন্তি অমবণধম্মাণো ভবন্তি। মরণহেত্ববিদ্যা- দেস্তত্ত্বজ্ঞানাগ্নিনা দগ্ধত্বাৎ পুনর্দেহান্তবং ন ভজন্তীত্যর্থঃ ॥ ৪ ॥ ২০ ॥
ভাষ্যানুবাদ। পরমেশ্বর যে, চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের অগোচর ও জীবাত্ম- স্বরূপ এবং তদ্বিষয়ক একত্বজ্ঞানে যে, মোক্ষ হয়, তাহা বলিতেছেন—“ন সংদৃশে” ইত্যাদি। এই পরমেশ্বরের যে, রূপাদিরহিত স্বপ্রকাশ অখণ্ড চৈতন্যস্বরূপ নির্বিশেষ রূপ, তাহা চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের গ্রহণযোগ্য স্থানে বর্তমান নহে, অর্থাৎ তাহার স্বরূপ কোন ইন্দ্রিয়ের বিষয় হয় না। ইন্দ্রিয়ের অগোচর বলিয়াই এই ঈশ্বরকে কেহ কখনও কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখিতে পায় না, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্যরূপে ধরিতে সমর্থ হয় না, যেহেতু “যাহাকে চক্ষু দ্বারা দেখা যায় না, পরন্তু যাহার সাহায্যে চক্ষু সকলকে দেখে” এইরূপ শ্রুতিবাক্য আছে। শ্রুতির চক্ষুংষি(চক্ষু) পদটী অপর সমস্ত ইন্দ্রিয়েরও উপলক্ষক(বোধক)। ‘হৃদা’ অর্থ বিশুদ্ধ বুদ্ধি দ্বারা, ইহার ব্যাখা পূর্ব্বেই করা হইয়াছে। মনের দ্বাবা, হৃদিস্থ হৃদয়াকাশরূপ গুহায় আত্মরূপে অবস্থিত উক্ত ঈশ্বরকে যাহারা—উপযুক্ত অধিকারযুক্ত সাধনচতুষ্টয় সম্পন্ন যে সন্ন্যাসিগণ ‘আমি ব্রহ্ম’ ইত্যাকারে অপারোক্ষভাবে জানে প্রত্যক্ষ করে, তাঁহারা সেই প্রত্যক্ষীকরণের ফলে অমৃত হন, অর্থাৎ মরণধর্মরহিত হন।, জ্ঞানাগ্নি দ্বারা মৃত্যুর কারণীভূত অবিদ্যাদি দোষ দগ্ধ হওয়ায় তাহারা পুনরায় আর দেহ লাভ করে না(মুক্ত হয়) ॥ ৪ ॥ ২০ ॥
অজাত ইত্যেবং কশ্চিদ্ভীরুঃ প্রপদ্যতে। রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম্॥ ৪ ॥ ২১ ॥ ‘মা নস্তোকে তনয়ে মা ন আয়ুষি মা নো গোষু মা নো অশ্বেষু রীরিষঃ।
সরলার্থঃ। হে রুদ্র,[ত্বং] ভামিতঃ(ক্রুদ্ধঃ সন্) নঃ(অস্মাকং) তোকে(পুলে), তথা তনয়ে(পৌত্রে), অথবা তোকে(কন্যাপুত্রসাধারণে অপত্যে)[বিশেষেণ] তনয়ে(পুলে) মা রীরিষঃ(হিংসাং মা কার্ষীঃ), তথা নঃ (অস্মাকং) আয়ুষি(পূর্ণশতবর্ষরূপে) মা[রীষঃ], নঃ গোমু গবাদি- পশুমা নঃ অশ্বেষু মা,[রীষঃ]। তথা নঃ বীবান্(অস্মদীয়বীরপুরুষান্) মা বধীঃ(ন হিংসি)।[যতঃ] হবিষ্মন্তঃ(হবিসা হবণীয়দ্রব্য-সম্ভারেণ যুক্তাঃ) [বয়ং] সদং(সদা) ইৎ(ইখং) ত্বা(ত্বাং) হবামহে(রক্ষণার্থমামন্ত্রয়ামহে ইত্যর্থঃ) ॥ ৪ ॥ ২২ ॥
ইতি চতুর্থ্যাধ্যায়ব্যাখ্যা ॥ ৪ ॥
মূলানুবাদ। হে রুদ্র, তুমি কুপিত হইয়া আমাদের পুত্র ও পৌত্রে হিংসা করিও না, এবং আমাদের গো-পশুতে বা আমাদের অশ্বেতে হিংসা করিওনা। বীর ভৃত্যগণকে বধ করিওনা। কারণ, আমারা হবনযোগ্য দ্রব্যসম্ভার দ্বারা সর্ব্বদা তোমাকে এই প্রকারে হোম বা আরাধনা করিয়া থাকি ॥ ৪ ॥ ২২ ॥
ইতি চতুর্থ অধ্যায়ের অনুবাদ ॥ ৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ—মা ন ইতি। মা বীবিষ ইতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে। মা রীরিষঃ। রীষণং মরণং বিনাশং মা কার্ষীঃ। নোহস্মাকং তোকে পুত্রে তনয়ে পৌত্রে নঃ আয়ুষি। মা নো গোষু মা নোহশ্বেষু শরীরিষু। যো চাস্মাকং বীরা বিক্রনমন্তো ভৃত্যাস্তান্ হে রুদ্র! ভামিতঃ ক্রোধিতঃ সমাবধীঃ। কস্মাৎ? যস্মাদ্ধবিঘ্নন্তো হবিষা যুক্তাঃ সদমিং ত্বা হবামহে সদৈব রক্ষণার্থমাহুয়াম ইত্যর্থঃ ॥ ৪ ॥ ২২ ॥ ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যশ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ভাষ্যে চতুর্থোহধ্যায়ঃ ॥ ৪ ॥
ভাষ্যানুবাদ। আরও এক কথা—“মা নঃ” ইতি। “মা রীরিষঃ” (হিংসা করিও না) এ কথাটীর পরবর্তী সর্ব্বত্র সম্বন্ধ আছে। ‘মৃ. রীরিষঃ’ অর্থ রেষণ—মরণ ‘অর্থাৎ বিনাশ করিওনা। আমাদের তোকে—পুত্রে, তনয়ে— পৌত্রে, আমাদের আয়ুতে(জীবনে), এবং আমাদের গো—পশুতে ও আমাদের অশ্বেতে হিংসা করিও না। আর যাহারা আমাদের বীর পুরুষ অর্থাৎ বিক্রমশালী ভৃত্য, ‘হে রুদ্র, তুমি ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদিগকেও বধ করিওনা। কি কারণে? যেহেতু আমরা হবিস্মৎ হইয়া অর্থাৎ হবনীয় দ্রব্যযুক্ত হইয়া সর্ব্বদাই এইরূপে হবন করিয়া থাকি অর্থাৎ রক্ষার জন্য তোমাকে আহ্বান করিয়া থাকি,[অতএব হিংসা করিওনা]॥ ৪ ॥ ২২ ॥
ইতি চতুর্থ অধ্যায়ের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৪ ॥
দ্বে অক্ষরে ব্রহ্মপরে ত্বনন্তে বিদ্যাবিদ্যে নিহিতে যত্র গূঢ়ে। ক্ষরত্ত্ববিদ্যা হ্যমৃতং তু বিদ্যা বিদ্যাবিদ্যে ঈশতে যস্ত সোহন্যঃ ॥ ৫ ॥ ১ ॥
সরলার্থঃ।[চতুর্থাধ্যায়োক্তমেবার্থং বিশেষেণ দর্শয়িতুমাহ—“দ্বে অক্ষরে” ইত্যাদি].
দ্বে বিদ্যাবিদ্যে(বিদ্যা চ অবিদ্যা চ) যন(যস্মিন্) ব্রহ্মপরে(ব্রহ্মণঃ-হিবণ্য- গর্ভাদপি শ্রেষ্ঠে) অনন্তে(দেশকালাদিকৃত-পরিচ্ছেদবহিতে) অক্ষবে(ব্রহ্মণি) গূঢে(নিহিতে অনভিব্যক্ততয়া স্থিতে)[ভবতঃ]।[তত্র কা বিদ্যা, কা বাবিদ্যেত্যপেক্ষায়ামাহ] ক্ষরং তু(ক্ষরণহেতুঃ সংসারকারণং যৎ, তদেব) অবিদ্যা(অত্র অবিদ্যাপদবাচ্যা), অমৃতং তু(অমরণহেতুঃ-মুক্তিকারণং পুনঃ) বিদ্যা(বিদ্যাপদবাচ্য)। যঃ তু(পুনঃ) বিদ্যাবিদ্যে ঈশতে(ঈষ্টে-শান্তি), স(শাসকঃ) অন্যঃ(বিদ্যাবিদ্যাভ্যাং পৃথক্-পরমেশ্বর ইত্যর্থঃ) ॥ ৫ ॥ ১ ॥
মূলানুবাদ।[চতুর্থ অধ্যায়ের শেষভাগে যে পরমেশ্বরের কথা উক্ত হইয়াছে, তাহারই বিরতির জন্য এই পঞ্চম অধ্যায় আবদ্ধ হইতেছে।]। তিবণ্যগর্ভনামক ব্রহ্মারও অতীত এবং দেশকালাদিসীমাবহিতে যে-অগব ব্রহ্মে বিদ্যা ও অবিদ্যা প্রচ্ছন্নভাবে নিহিত আছে, এব’ যিনি উক্ত বিদ্যা ও অবিদ্যার শাসনকর্তা, তিনি উক্ত বিদ্যা ও অবিদ্যা হইতেও অন্য, অর্থাৎ বিদ্যা ও অবিদ্যাব অতিরিক্ত পরমেশ্বর। এখানে অবিদ্যা অর্থ—যাহা কিছু সংসাবকারক, তৎসমুদয়, আর বিদ্যা অর্থ—যাহা কিছু অমৃতের(মুক্তির) কারণ, তৎসমস্ত ॥ ৫ ॥ ১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। চতুর্থাধ্যায়শেষমপূর্ব্বার্থং প্রতিপাদয়িতুং পঞ্চমোহধ্যায় আবভ্যতে-দ্বে অক্ষর ইত্যাদিনা। দ্বে বিদ্যাবিদ্যে যস্মিন্নক্ষবে ব্রহ্মণো হিরণ্যগর্ভাৎ পরে ব্রহ্মপরে পরস্মিন্ বা ব্রহ্মণি অনন্তে দেশতঃ কালতো বস্ত্বতো বা অপরিচ্ছিন্নে। যত্র যস্মিন্ দ্বে বিদ্যাবিদ্যে নিহিতে স্থাপিতে গূঢ়েইনভিব্যক্তে। বিদ্যাবিদ্যে বিবিচ্য দর্শয়তি—ক্ষরং ত্ববিদ্যা ক্ষবণহেতুঃ সংস্কৃতিকারণম্। অমৃতন্তু বিদ্যা মোক্ষহেতুঃ। যস্ত পুনর্বিবিদ্যাবিদ্যে ঈশতে নিয়ময়তি, স তাভ্যামন্যস্তৎসাক্ষিত্বাৎ ॥ ৫ ৷৷ ১ ৷৷
ভাষ্যানুবাদ। চতুর্থ অধ্যায়ের শেষভাগে যে, অভিনব বিষয় বর্ণিত হইয়াছে, তাহাই প্রতিপাদন করিবার জন্য এই পঞ্চম অধ্যায় আরব্ধ হইতেছে— “দ্বে অক্ষরে” ইত্যাদি।
দেশ, কাল ও বস্তু দ্বারা পরিছিন্ন বা সীমাবদ্ধ নয়, এমন অনন্ত ব্রহ্মপদ—ব্রহ্মা।
সরলার্থঃ।[ তমেব বিশিষ্য দর্শয়তি “যো যোনিং” ইত্যাদিনা।] যঃ একঃ(পরমেশ্বরঃ) যোনিং যোনিং(প্রতিবস্তু), তথা বিশ্বানি (নিখিলানি) রূপাণি(লোহিতাদীনি) সর্ব্বাঃ যোনীঃ(উৎপত্তিস্থানানি) চ অধিতিষ্ঠতি(অন্তর্যামিতয়া নিয়ময়তি), তথা যঃ অগ্রে(সৃষ্টেরাদৌ) প্রসূতং মূলানুবাদ। যিনি এক হইয়াও প্রত্যেক স্থানে, সমস্ত রূপে ও সমস্ত উপাদানে(উৎপত্তিকারণে) অধিষ্ঠান করেন, এবং যিনি কল্পের আদিতে উৎপন্ন ঋষি কপিলকে ধম্ম জ্ঞান বৈরাগ্য ও ঐশ্বর্য্যে পূর্ণ করিয়াছিলেন, এবং
শাঙ্করভাষ্যম্। কোহসাবিত্যাহ—যো যোনিমিতি। যো যোনিং যোনিং স্থানং স্থানং “যঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠন্” ইত্যাদিনোক্তানি পৃথিব্যাদীনি অধিতিষ্ঠতি নিয়ময়তি। একোহদ্বিতীয়ঃ পরমাত্মা। বিশ্বানি রোহিতাদীনি রূপাণি যোনীশ্চ প্রভবস্থানানি অধিতিষ্ঠতি। ঋষিং সর্ব্বজ্ঞমিত্যর্থঃ। কপিলং কনককপিলবর্ণং, প্রসূতং স্বেনৈবোৎপাদিতম্। হিরণ্যগর্ভং জনয়ামাস পূর্ব্বমিত্যস্যৈব জন্ম- শ্রবণাৎ, অন্যস্য চাশ্রবণাৎ, উত্তবত্র “যো ব্রহ্মাণং বিদধাতি পূর্ব্বম্। যো বৈ বেদাংশ প্রহিণোতি তস্মৈ” ইতি বক্ষ্যমাণত্বাৎ। “কপিলোহগ্রজঃ” ইতি পুরাণবচনাৎ কপিলো হিরণ্যগর্ভো বা নিদ্দিশ্যতে।
“কবিলর্ভগবতঃ সর্ব্বভূতস্য বৈ কিল। বিষ্ণোবাশো জগন্মোহনাশায় সমুপাগতঃ ॥ কৃতে যুগে পরং জ্ঞানং কপিলাদিস্বরূপধুক্। দদাতি সর্ব্বভূতাত্মা সব্বস্থ্য জগতো হিতম্ ॥ হং শত্রুঃ সর্ব্বদেবানাং ব্রহ্মা ব্রহ্মবিদামসি। বামর্ব্বলবতাং দেবো যোগিনাং ত্বং কুমারকঃ ॥ ঋষীণাঞ্চ বশিষ্ঠত্বং ব্যাসো বেদবিদামসি। সাজ্যানাং কপিলো দেবো রুদ্রাণামসি শঙ্করঃ ॥”
অর্থ হিরণ্যগর্ভ, তদপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, অথবা পরব্রহ্মরূপী যে অক্ষর(নির্বিকার ব্রহ্ম, তাহাতে) বিদ্যা ও অবিদ্যা। উভয়ই গূঢ় অর্থাৎ অব্যক্তভাবে নিহিত—স্থাপিত রহিয়াছে। এখন বিদ্যা ও অবিদ্যাকে পৃথক্ করিয়া প্রদর্শন করিতেছেন—যাহা ক্ষর—ক্ষরণের অর্থাৎ সংসার লাভের কারণ, তাহাই অবিদ্যা, আর অমৃত হইতেছে—বিদ্যা; কারণ, উহা মোক্ষের হেতু। যিনি উক্ত বিদ্যা ও অবিদ্যাকে নিয়মিত করেন, অর্থাৎ পরিচালিত বলেন, তিনি ঐ বিদ্যা ও অবিদ্যা হইতে স্বতন্ত্র। কারণ, তিনি ঐ উভয়ের সাক্ষী বা সাক্ষাৎদ্রষ্টা ॥ ৫ ॥ ১ ॥ ভাষ্যানুবাদ। ইনি কে? তদুত্তরে বলিতেছেন—“যো যোনিম্” ইতি। এক অদ্বিতীয় যে পরমাত্মা প্রত্যেক যোনিকে সমস্ত স্থানকে অর্থাৎ ‘যিনি পৃথিবীতে থাকিয়া’ ইত্যাদি শ্রুতিকথিত পৃথিবী প্রভৃতিকে নিয়মিতভাবে পরি-
ঋষিং প্রসূতং কপিলং যস্তমগ্রে জ্ঞানৈর্বিভর্তি জায়মানঞ্চ পশ্যেৎ ॥ ৫ ॥ ২ ॥
ঋষিং কপিলং জ্ঞানৈঃ(ধর্মজ্ঞানবৈবাগ্যৈশ্বর্য্যৈঃ) বিভত্তি(পুষ্ণাতি), জায়মানং (উৎপন্নং) চ পশ্যেৎ(অপশ্যদিত্যর্থঃ)।[সঃ অন্যঃ ইতি পূর্ব্বেণ সম্বদ্ধঃ] ॥৫৷৷২॥ জন্মের পরও দর্শন করিয়াছিলেন,[তিনি জীব হইতে পৃথক্, এই পূর্ব্ব শ্রুতির সহিত সম্বন্ধ] ॥ ৫ ॥ ২ ॥.
ইতি পমর্ষিঃ প্রসিদ্ধঃ। “ততস্তদানীন্তু ভবনমস্মিন্ প্রবর্ত্ততে কপিলং কবীনাম্। স ষোড়শাস্ত্রে। পুরুষশ্চ বিষ্ণোর্বিবাজমানং তমসঃ পরস্তাৎ” ইতি ক্রয়তে মুণ্ডকোপনিষদি। স এব বা কপিলঃ প্রসিদ্ধঃ, অগ্রে সৃষ্টিকালে যো জ্ঞানৈ- ধৰ্ম্মজ্ঞানবৈরাগ্যশ্বয্যৈর্বিভত্তি বভাব, জায়মানঞ্চ পশ্যেদপশ্যদিত্যর্থঃ ॥৫॥২॥
চালিত করেন, এবং লোহিতাদি সমস্ত রূপ(বর্ণ) ও সমস্ত যোনিকে—উৎপত্তি স্থানকে পরিচালিত করেন। যিনি পূর্ব্বে প্রস্তুত অর্থাৎ আপনারই উৎপাদিত কপিলকে সুবর্ণসদৃশ কপিলবর্ণ হিরণ্যগর্ভকে সর্ব্বজ্ঞ ঋষি করিয়াছিলেন। এখানে কপিল অর্থ হিরণ্যগর্ভই, কারণ, শ্রুতিতে তাঁহারই উৎপত্তি শ্রবণ আছে, অন্যের (সাংখ্যবক্তা কপিলেব) উৎপত্তি শ্রুতি নাই। বিশেষতঃ পরে ‘যিনি প্রথমে ব্রহ্মাকে উৎপাদন করেন, এবং যিনি তাঁহার উদ্দেশে বেদবিদ্যা প্রেরণ করেন, বন্ধ’র হৃদয়ে বেদবিদ্যা উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন, তাঁহার উদ্দেশ্যে[ নমস্কার], ইত্যাদি বাক্যে ব্রহ্মারই প্রথমোৎপত্তি শ্রুত হওয়ায় এব, পুরাণশাস্ত্রে ‘কপিল অগ্রজ অর্থাৎ সকলের অগ্রে জাত’ এইরূপ উক্তি থাকায় এখানে কপিল কথায় হিরণ্যগর্ভই নির্দিষ্ট হইয়াছে[ বুঝা যাইতেছে]।
‘জগজ্জনের মোহ বা অজ্ঞান-ভ্রান্তি বিনষ্ট করিবার নিমিত্ত কপিল মুনি সর্ব্ব- ভূতময় ভগবান্ বিষ্ণুর অংশে আবির্ভূত হইয়াছেন। সত্যযুগে সর্ব্বভূতের আত্মস্বরূপ বিষ্ণু কপিলাদিরূপ ধারণ করত সর্ব্ব জগতের হিতকর পরমজ্ঞান (আত্মজ্ঞান) প্রদান করেন।[হে দেব,] তুমিই সমস্ত দেবতার মধ্যে ইন্দ্র, ব্রহ্মবিদ্গণের মধ্যে ব্রহ্মা’, বলবান্ধির মধ্যে বায়ু যোগীদিগের মধ্যে তুমি সনৎকুমার, ঋষিদিগের মধ্যে তুমি বসিষ্ঠ, বেদবিদ্গণের মধ্যে বেদব্যাস, সাংখ্য- দিগের(আত্মজ্ঞদিগের) মধ্যে শঙ্কর(শিব)।’ এই সকল পুরাণবচনে পরমর্ষি কপিল প্রসিদ্ধ আছেন।(১) সেই কপিলও হইতে পারেন, যিনি অগ্রে— সৃষ্টিকালে জ্ঞানের দ্বারা ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ঐশ্বর্য্য দ্বারা ধারণ বা পোষণ করিয়া- ছিলেন, এবং উৎপত্তি সময়েও তাঁহাকে দর্শন করিয়াছিলেন ॥ ৫ ॥
(১) উপরে চিহ্নিত স্থলে ভাষ্যমধে কতকটা বাক্য মুণ্ডকোপনিষদের বাক্য বলিয়া সন্নিবেশিত আছে। বস্তুতঃ মুণ্ডকোপিনষদে ঐরূপ কোনও বাক্য দেখা যায় না, অধিকন্তু উদ্ধৃত বাক্যটীর অর্থও পরিস্ফুট হয় না, এই কারণে অনুবাদে ঐ অংশ পরিত্যক্ত হইল। পাঠকগণ অর্থসঙ্গতি করিয়া, লইতে চেষ্টা করিবেন।
২১
১৬২
একৈকং জালং বহুধা বিকুর্ব্ব- ন্নস্মিন্ ক্ষেত্রে সংহরত্যেষ দেবঃ। ভূয়ঃ সৃষ্ট্বা পতয়স্তথেশঃ সর্বাধিপত্যং কুরুতে মহাত্মা ॥ ৫ ॥ ৩ ॥ সর্ব্বা দিশ উর্দ্ধমধশ্চ তির্য্যক্ প্রকাশয়ন্ ভ্রাজতে যদ্বনডান্। সরলার্থ। অপিচ, এষঃ(উক্তঃ) দেবঃ(প্রকাশস্বভাবঃ) মহাত্মা (পবমাত্মা) অস্মিন্ ক্ষেত্রে(মাযাময়ে জগতি) একৈকং(প্রত্যেকং) জালং (কর্মফলং) বহুদা(সুরনরাদিভেদেন অনেকধা) বিকুর্ব্বন্(সৃষ্টিকালে সৃজন) [অন্তকালে] সংহবতি(সংহারং করোতি)। ঈশঃ মহাত্মা(পরমাত্মা) ভূয়ঃ (পুনরপি) পতয়ঃ(লোকপালাঃ)[তান্] তথা(যথা পূর্ব্বকালে, তদ্বৎ) সৃষ্ট। (উৎপাদ্য) সর্বাধিপত্যং(সর্ব্বস্বামিতাং) কুরুতে(করোতীত্যর্থঃ) ॥৫॥৩৷৷ সরলার্থঃ। কিঞ্চ, যদু(যথা) অনড়ান্(সূর্য্যঃ) উর্দ্ধং অধঃ তির্য্যক্ চ সর্ব্বা দিশঃ প্রকাশয়ন্ ভ্রাজতে(শোভতে), এবং(তথা) সঃ একঃ দেবঃ মূলানুবাদ। এই দেব মহাত্মা(পরমাত্মা) এই মায়াময় জগতে এক একটী জালকে অর্থাৎ কর্মফলকে দেবমনুষ্যাদি নানাপ্রকারে সৃষ্টি করেন, আবার [সংহাবকালে] সংহার করেন। এই ঈশ্বরই পুনবায় পূর্ব্বকল্পানুসারে লোকপাল প্রভৃতি সৃষ্টি করিয়া সকলের উপর আধিপত্য বা প্রভুত্ব করিয়া থাকেন ॥৫৷৷৩৷৷ মূলানুবাদ। অনডাম্(সূর্য্য) যেরূপ উর্দ্ধ, অধঃ ও পার্শ্ব সমস্ত দিক্ প্রকাশ করিয়া শোভা পান, এইরূপ সেই এক অদ্বিতীয় বরণীয় দেব ভগবানও শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, একৈকমিতি। সুরনরতির্য্যগাদীনাং সৃজতি জালমেকৈকং প্রত্যেকং বহুধা নানাপ্রকারং বিকুর্ব্বন্ সৃষ্টিকালেহস্মিন্ মায়াত্মকে ক্ষেত্রে সংহরত্যেষ দেবঃ। ভূয়ঃ পুনর্যে লোকানাং পতয়ো মরীচ্যাডয়স্তান্ সৃষ্ট্বা তথা, যথা পূর্ব্বস্মিন্ কল্পে সৃষ্টবান, ঈশঃ সর্ব্বাধিপত্যং কুরুতে মহাত্মা ॥ ৫ ॥ ৩ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, সর্ব্বা দিশ ইতি। সর্ব্বা দিশঃ প্রাচ্যাদ্যা ঊর্দ্ধমুপরিষ্টাদধশ্চাধস্তাৎ তির্য্যক্ পার্শ্বাদশশ্চ প্রকাশয়ন্ স্বাত্মচৈতন্যজ্যোতিষা ভাষ্যানুবাদ। অপিচ, “একৈকং” ইত্যাদি। স্বপ্রকাশ মহান্ আত্মা পরমেশ্বর এই সংসার-ক্ষেত্রে সৃষ্টিকালে সুরনর ‘ও পশুপক্ষী প্রভৃতির এক একটা কর্মফলরূপ জালকে—উহার প্রত্যেকটাকে আবার বহুপ্রকারে বিস্তৃত করিয়া অর্থাৎ নানা আকারে প্রকটিত করিয়া সংহার করেন। পুনরায়, মরীচি প্রভৃতি ঋষি, যাহারা লোকাধিপতি, তাহাদিগকে সেইরূপে অর্থাৎ পূর্ব্ব কল্পে যেরূপে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, ঠিক সেইরূপে সৃষ্টি করিয়া সকলের উপর আধিপত্য করিতে- ছেন ॥ ৫ ॥ ৩ ॥
এবং স দেবো ভগবান্ বরেণ্যো- যোনিস্বভাবানধিতিষ্ঠত্যেকঃ ॥ ৫ ॥ ৪ ॥ যচ্চ স্বভাবং পচতি বিশ্বযোনিঃ পাচ্যাংশ্চ সর্ব্বান্ পরিণাময়েদ্ যঃ। সর্বমেতদ্বিশ্বমধিতিষ্ঠত্যেকো- গুণাংশ্চ সর্ব্বান্ বিনিযোজয়েদ্ যঃ ॥ ৫ ॥ ৫ ॥
ভাষ্যানুবাদ। আরও এক কথা, “সর্ব্বা দিশঃ” ইতি। অনড়াম্ (আদিত্য) যেরূপ স্বীয় জ্যোতি দ্বারা উর্দ্ধ, অধঃ ও তির্যক্-পার্শ্বগত পূর্ব্বাদি সমস্ত দিক্ প্রকাশকরত আত্মজ্যোতিতে দীপ্তি পান, অর্থাৎ অনড়াম্-পদবাচ্য
তদ্বেদগুহ্যোপনিষৎসু গূঢ়ং তদ্ব্রহ্মা বেদতে ব্রহ্মযোনিম্। ‘যে পূর্ব্বদেবা ঋষয়শ্চ তদ্বিদু- স্তে তন্ময়া অমৃতা বৈ বভূবুঃ ॥ ৫ ॥ ৬ ॥
সরলার্থঃ। তৎ(পবমাত্মতত্ত্বং) বেদগুহ্যোপনিযুৎসু(বেদানাং গুহ্যাঃ রহস্যাত্মকত্বাৎ গোপনীয়াঃ উপনিষদঃ, তাসু) গূঢ়ং(প্রচ্ছন্নতয়া বর্ণিতং)[অস্তি]; ব্রহ্মা(হিরণ্যগর্ভঃ) ব্রহ্মযোনিং(ব্রহ্মণঃ কারণ, বেদপ্রমাণকংবা) তৎ(তং) বেদতে(জানাতি)। যে পূর্ব্বদেবাঃ(প্রাচীনা দেবতাঃ রুদ্রাদয়ঃ) ঋষয়ঃ(বাম- দেবাদয়ঃ) চ তৎ(পরমাত্মতত্ত্বং) বিদুঃ(জানন্তি), তে তন্ময়াঃ(ব্রহ্মাত্মভাবাঃ সন্তঃ) অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) বভূবুঃ ॥৫॥৬৷৷
মূলানুবাদ। তিনি(পরমেশ্বর) বেদসার উপনিবদে গূঢ়(অতি অস্ফুটভাবে বর্ণিত) আছেন; ব্রহ্মা অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ সেই ব্রহ্মযোনিকে নিজেরও কারণকে) জানেন। যে সকল পূর্ব্বদেব—রুদ্র প্রভৃতি প্রাচীন দেবতা’ এবং ঋষি বামদেব প্রভৃতি তাঁহাকে জানিয়াছেন, তাঁহারা তন্ময়(ব্রহ্মময়) ও অমৃত(মুক্ত) হইয়াছেন ॥৫॥৬৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, তাদতি। তৎ প্রকৃতমাত্মস্বরূপং বেদানাং গুহোপনিষদো বেদগুহোপনিষদঃ, তাসু বেদগুহোপনিষৎ গূঢ়ং সংবৃতং ব্রহ্মা হিরণ্যগর্ভো বেদতে জানাতি ব্রহ্মযোনিং বেদপ্রমাণকামত্যর্থঃ। অথবা ব্রহ্মণো হিরণ্যগর্ভস্য যোনিং বেদস্য বা, যে পূর্ব্বদেবা রুদ্রাদয় ঋযযশ্চ বামদেবাদযঃ তদ্বি- দুস্তে তন্ময়াস্তদাত্মভূতাঃ সন্তঃ অমৃতা অমরণধৰ্ম্মাণো বভূবুঃ। তথেদানীন্তনোহপি তমেব বিদিত্বামৃতো ভবতীতি বাক্যশেষঃ ॥ ৫ ॥ ৬ ॥
আদিত্য যেমন জগৎ-মণ্ডলের প্রকাশনে নিরত, তেমনি দেব—প্রকাশস্বভাব ভগবান্ জ্ঞানাদি-ঐশ্বর্য্যসমন্বিত বরেণ্য—বরণীয় অর্থাৎ পরমারাধ্য সেই এক— অদ্বিতীয় পরমাত্মা জগতের সমস্ত যোনিস্বভাবকে অর্থাৎ নিজেরই স্বরূপভূত পৃথিব্যাদি পদার্থ সমূহকে, অথবা কারণস্বভাব অর্থাৎ স্বভাবতঃ কারণশক্তিযুক্ত পৃথিবীপ্রভৃতি ভূতবর্গকে অধিষ্ঠান করেন, অর্থাৎ যথানিয়মে পরিচালিত করেন ॥ ৫ ॥ ৪ ॥ ভাষ্যানুবাদ। “যচ্চ স্বভাবং” ইতি। যৎ শব্দটী ক্লীবলিঙ্গে আছে, উহাকে পুংলিঙ্গে পরিবর্তিত করিতে হইবে। যিনি বিশ্বের—জগতের যোনি অর্থাৎ কারণস্বরূপ হইয়া স্বভাবকে—যেমন অগ্নির উষ্ণতা, সে সকলকে পরিনিষ্পন্ন- করেন, এবং যিনি পাচ্য—পাকযোগ্য(উত্তাপে যাহাদের পরিবর্তন ঘটে, এইরূপ) পৃথিবী প্রভৃতি পদার্থকে বিপরিণত করেন অর্থাৎ পাক দ্বারা রূপান্তরিত করেন, আর যিনি সমস্ত জগৎকে অধিষ্ঠিত থাকিয়া নিয়মপূর্ব্বক পরিচালনা করেন, তিনি এবংবিধ ॥ ৫ ॥ ৫ ॥
গুণান্বয়ো যঃ ফলকৰ্ম্মকর্তা কৃতস্য তস্যৈব স চোপভোক্তা। ‘স বিশ্বরূপস্ত্রিগুণস্ত্রিবত্বা। প্রাণাধিপঃ সঞ্চরতি স্বকর্ম্মভিঃ ॥ ৫ ॥ ৭ ॥
অঙ্গুষ্ঠমাত্রো রবিতুল্যরূপঃ সঙ্কল্লাহঙ্কারসমন্বিতো যঃ।, বুদ্ধেগুণেনাত্মগুণেন চৈব আরাগ্রমাত্রোহহ্যপরোহপি দৃষ্টঃ ॥ ৫ ॥ ৮ ॥
সরলার্থঃ। কিংচ, যঃ(পরমাত্মা) অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ(অঙ্গুষ্ঠপরিমিতহৃদয়- স্বত্বাৎ অঙ্গুষ্ঠপবিমিতঃ) রবিতুল্যরূপঃ(স্বয়ং প্রকাশঃ), সংকল্পাহঙ্কারসমন্বিতঃ (ইদং মে, স্যাদিদং মে স্যাদিত্যাদিরূপা ভাবনা সংকল্পঃ, গর্ব্বাপরপর্যায়ঃ অহঙ্কারঃ, তাভ্যাং সমন্বিতঃ) আরাগ্রামাত্রঃ(আরা চর্ম্মবেধিকা, তত্তুল্যঃ অতিসূক্ষ্মঃ, জীবঃ ইত্যাশয়ঃ) বুদ্ধেঃ(অন্তঃকরণস্য) গুণেন ইচ্ছাদিনা, আত্মগুণেন দেহধর্ম্মেণ জরাদিনা, যদা আত্মনঃ স্বস্য গুণেন জ্ঞানপ্রকাশাদিনা) অপরঃ অপি(পরমাত্মনঃ ভিন্ন ইব) দৃষ্টঃ,[অবিবেকিতিঃ খলু পরমাত্মনো ভিন্ন ইব জীবো লক্ষ্যত ইতি ভাবঃ] ॥৫॥৮৷৷
মূলানুবাদ। যে পরমাত্মা অঙ্গুষ্ঠপরিমিত হৃদয়ে অভিব্যক্ত থাকায় অঙ্গুষ্ঠ-, পরিমিত এবং রবির ন্যায় উজ্জ্বল, নানাবিধ কামনা ও অহঙ্কারযুক্ত এবং চর্মবেধন যন্ত্রের অগ্রভাগের ন্যায় অতি সূক্ষ্ম জীবভাবে বুদ্ধি ও দেহধর্মযোগে অথবা বুদ্ধি ও নিজ চৈতন্যযোগে যেন অপর বস্তু বলিয়া দৃষ্ট হন; অর্থাৎ জীবকে পরমাত্মা হইতে পৃথক্ বলিয়া মনে হয় ॥৫॥৮৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। অঙ্গুষ্ঠমাত্রোহঙ্গুষ্ঠপরিমিতহৃদয়শুষিরাপেক্ষয়া। রবি- তুল্যরূপো জ্যোতিঃস্বরূপ ইত্যর্থঃ। সঙ্কল্লাহঙ্কারাদিনা সমন্বিতঃ। বুদ্ধেগুণে- নাত্মগুণেন চ জবাদিনা। উক্তং জবামৃত্যু শরীরস্যেতি। আবাগ্রমাত্রঃ প্রতোদা- গ্রপ্রোত-লোহকণ্টকাগ্রমাত্রোহপবোহপি জ্ঞানাত্মনাত্মা দৃষ্টোহবগতঃ। অপিশব্দঃ সম্ভাবনায়াং, অপরোহপ্যোপাধিকো জল সূর্য্য ইব জীবাত্মা সম্ভাবিত ইত্যর্থঃ ॥৫৷৷৮৷৷ হইল, অতঃপর এখন ‘ত্বং’ পদের অর্থ—জীবের বিষয় বর্ণনা করিবার জন্য পরবর্তী মন্ত্রসকল আরব্ধ হইতেছে—“গুণান্বয়ঃ”ইত্যাদি। জ্ঞান ও কৰ্ম্মজনিত বাসনাত্মক গুণসমূহের সহিত যাহার অন্বয় বা সম্বন্ধ, তিনি ‘গুণান্বয়’-পদবাচ্য। তিনিই ফলোদ্দেশ্যে বিহিত কর্ম্মের কর্তা বা অনুষ্ঠাতা এবং তিনিই স্বকৃত কৰ্ম্মফলের উপভোক্তা, কার্য্যকারণভাবে দেহ ধারণ করে বলিয়া বিশ্বরূপ অর্থাৎ বিভিন্ন কর্ম্মের বিভিন্ন প্রকার ফলভোগের অনুবোধে নানাবিধ রূপ(দেহ) ধাবণ কবে বলিয়া নানারূপ। পুনশ্চ তিনি(জীব) ত্রিগুণ-সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের সম্বন্ধ ইহার আছে বলিয়া ত্রিগুণ। আর দেৰযান, পিতৃযান ও দংশমশকাদিজন্মভেদে ত্রিবিধ গন্তব্য পথ থাকায় ত্রিবত্মর্ণ, অথবা ধৰ্ম্ম, অধৰ্ম্ম ও জ্ঞানরূপ তিনটা সাধনপথ থাকায় ত্রিবত্মা। প্রাণাপানাদি পাঁচ প্রকার বৃত্তিসম্পন্ন প্রাণের অধিপতি(জীব) হইয়া সংবরণ(সংসারে পরি- ভ্রমণ) করে। কিসের দ্বারা? না-নিজকৃত কৰ্ম্মসমূহ দ্বারা, অর্থাৎ স্বীয় কর্মানুসারে সংসারে পরিভ্রমণ করে ॥ ৫॥ ৭ ॥
বালাগ্রশতভাগস্য শতধা কল্পিতস্য চ। ভাগো জীবঃ স বিজ্ঞেয়ঃ স চানন্ত্যায় কল্পতে ॥ ৫ ॥ ৯ ॥ নৈব স্ত্রী ন পুমানেষ ন চৈবায়ং নপুংসকঃ। যদ্যচ্ছরীরমাদত্তে তেন তেন স রক্ষ্যতে ॥ ৫ ॥ ১০ ॥
সরলার্থঃ।[দৃষ্টান্তেন পুনরপি জীবস্বরূপং নিৰ্দ্দিশতি—“বালাগ্র” ইতি।] সঃ(পূর্ব্বোক্তো, জীবঃ শতধা কল্পিতস্য(শতকৃত্বঃখণ্ডিতস্য) বালাগ্র- শতভাগস্য(কেশাগ্রশতভাগস্য) ভাগঃ(একোভাগঃ, তৎপরিমিতঃ অতিসূক্ষ্ম ইত্যাশয়ঃ) বিজ্ঞেয়ঃ(বিশেষেণ জ্ঞাতব্যঃ)। সচ(অতিসূক্ষ্মোহপি জীবঃ) আনন্ত্যায়(স্বরূপতঃ অপরিচ্ছিন্নত্বায়) কল্পতে(যুজ্যতে)।[জীবঃ উপাধি- সম্পর্কাৎ সূক্ষ্মত্বেন প্রতীয়মানোহপি স্বরূপতঃ অনন্ত এবেতি ভাবঃ ॥ ৫ ॥ ৯ ॥
সরলার্থঃ। কিংচ, এষঃ(জীবঃ) স্ত্রী(স্ত্রীত্বযুক্তঃ) নৈব, নচ পুমান্ (পুংলিঙ্গঃ), অয়ং নপুংসকঃ(ক্লীবঃ) চ ন[ভবতি]।[কিন্তু] যৎ যৎ (স্ত্রীপুরুষত্বাদিবিশিষ্টং) শরীরং আদন্তে(গৃহ্নাতি), সঃ(জীবঃ) তেন তেন (শরীরভেদেন) রক্ষ্যতে(লক্ষ্যতইত্যর্থঃ) ॥ ৫ ॥ ১০ ॥
মূলানুবাদ। একটা কেশের অগ্রভাগকে শতখণ্ডে বিভক্ত করিয়া, তাহার এক খণ্ডকেও আবার শতখণ্ডে বিভক্ত করিলে, তাহার একভাগের যাহা পরিমাণ, উক্ত জীবও ঠিক তত্তুল্য। অথচ সে তখনও স্বরূপতঃ অনন্তই থাকে ॥ ৫ ॥ ৯ ॥
মূলানুবাদ। এই জীব নিশ্চয়ই স্ত্রী নয়, পুরুষ নয়, এবং নপুংসক ও নয়।[কর্মানুসারে] যে যে শরীর গ্রহণ করে, সেইসকল শরীরানুসারে স্ত্রীপুরুষাদিভেদে প্রতীত হয় মাত্র ॥ ৫ ॥ ১০ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। পুনরপি দৃষ্টান্তান্তরেণ দশয়তি, বালাগ্রেতি। বালাগ্রস্য শতকৃত্বো ভেদমাপাদিতস্য যো ভাগস্তস্যাপি শতধা কল্পিতস্য ভাগো জীবঃ স বিজ্ঞেয়ঃ। লিঙ্গস্যাতিসূক্ষ্মত্বাৎ তৎপরিমাণেনায়ং ব্যপদিশ্যতে। স চ জীবস্বরূপে- ণানন্ত্যায় কল্পতে স্বতঃ ॥ ৫ ॥ ৯ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, নৈব স্ত্রীতি। স্বতোহদ্বিতীয়াপরোক্ষব্রহ্মাত্ম- স্বভাবত্বাৎ নৈব স্ত্রী, ন পুমানেষঃ, নৈব চায়ং নপুংসকঃ। যদ্যৎ স্ত্রীশরীরং, পুরুষ- শরীরং বা আদত্তে, তেন তেন স চ বিজ্ঞানাত্মা রক্ষ্যতে সংরক্ষাতে। তত্তদ্ধৰ্মা নাত্মন্যধ্যস্যাভিমন্যতে। স্থুলোহহং কৃশোহহং পুমানহং স্ত্রী অহং নপুংসকোহহং ইতি ॥ ৫॥ ১০ ॥
ভাষ্যানুবাদ। “অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ”ইতি। অঙ্গুষ্ঠপরিমিত হৃদয়-গুহায় থাকে বলিয়া[জীব] অঙ্গুষ্ঠমাত্র, রবিতুল্যরূপ অর্থ সূর্য্যের ন্যায় জ্যোতির্ময়, আর সংকল্প(নানাবিধ ভাবনা) ও অহংকারাদিধর্মযুক্ত এবং বুদ্ধিধর্ম ও জরাপ্রভৃতি দেহধর্মযুক্ত। অন্যত্র উক্ত আছে—‘জরা ও মৃত্যু শরীরের ধর্ম্ম। আরাগ্রামাত্র
১৬৮
সংকল্পনস্পর্শনদৃষ্টিমোহৈ- গ্রাসাম্বুরষ্ট্যা চাত্মবিবৃদ্ধজন্ম। কৰ্ম্মানুগান্যনুক্রমেণ দেহী। স্থানেষু রূপাণ্যভিসম্প্রপদ্যতে ॥ ৫ ॥ ১১ ॥
সরলার্থঃ।[শরীরগ্রহণকারণমিদানীং দর্শয়তি “সংঙ্কল্পন” ইত্যাদিভিঃ।] দেহী(জীবঃ) গ্রাসাম্ব বৃষ্ট্যা(গ্রাসাম্ব নোঃ অন্নপানয়োঃ বর্ষণেন)[যথা] আত্ম- বিবুদ্ধিজন্ম(দেহস্য বুদ্ধিজন্মনা আত্মনোহপি বুদ্ধিং)[অভিমন্যতে]।[তথা] সংকল্পন-স্পর্শন-দৃষ্টিমোহৈঃ(প্রথমং ইদংমেহস্তু ইত্যাদিরূপং সংকল্পনং, ততঃ) স্পর্শনং—ইন্দ্রিয়ৈগ্রহণং, পশ্চাৎ দৃষ্টিঃ(ভোগঃ, তজ্জৈঃ মোহৈঃ) স্থানেষু ভোগ- স্থানেষু) অনুক্রমেণ(যথাক্রমং) কর্ম্মানুগানি(স্বকৃতকৰ্ম্মানুরূপাণি) রূপাণি (স্ত্রী-পুরুষ ক্লীবাদিলক্ষণানি) অভিমংপ্রপদ্যতে(সম্যক্প্রাপ্তোতীত্যর্থঃ) ॥ ৫ ॥ ১১ ॥
মূলানুবাদ। দেহাভিমানী জীব[যেমন] অন্নপান ভোজনে[দেহের, বৃদ্ধিতে] আপনার বৃদ্ধি মনে করে,[ঠিক তেমনই] মানসিক সংকল্প, বিষয়েন্দ্রিয় সংযোগ ও ভোগজনিত মোহের ফলে শাস্ত্র নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে স্বীয় কর্ম্মানুরূপ বিবিধ রূপ অর্থাৎ স্ত্রীপুরুষাদি ভেদে নানা দেহ প্রাপ্ত হয় ॥ ৫ ॥ ১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কেন তহ্যসৌ শবীরাণ্যাদত্ত ইত্যাহ সঙ্কল্পনেতি। প্রথমং সঙ্কল্পনম্, ততঃ, স্পর্শনং ত্বগিন্দ্রিয়ব্যাপারঃ, ততো দৃষ্টিবিধানম্, ততো মোহঃ, তৈঃ সঙ্কল্পনস্পর্শনদুষ্টমেহৈঃ শুভাশুভানি বম্মাণি নিষ্পদ্যন্তে। ৩৩৪ কর্মানুগানি কর্মানুসায়ীণি স্বাপুংনপুংসকলক্ষনাণি অনুক্রমেণ পরিপাকাপেক্ষয়া, দেহী মর্ত্যঃ, স্থানেয় দেবতিষ্যজ্ঞানুষ্যাদিধভিসম্প্রপদ্যতে। তত্র দৃষ্টান্তমাহ গ্রাসাম্বুনোরন্নপানয়োরনিয়তয়োর ষ্টিবাসেচনং নিদানমাত্মনঃ শরীরস্য বৃদ্ধির্জায়তে যথা, তদ্ব’দত্যর্থঃ ॥ ৫ ॥ ১১ ॥
—আরা অর্থ গো-তাড়ন যষ্টিয় তাহার, অগ্রে বিদ্ধ লৌহকণ্টক(লোহার কাঁটা), তাহার ন্যায় সূক্ষ্ম, জীব জ্ঞানময়রূপে যেন ভিন্নবৎ দৃষ্ট হয়। এখানে ‘অপি’ অর্থ সম্ভাবনা। অর্থ হইতেছে যে, জলে পতিত সূর্য্য-প্রতিবিম্বের ন্যায় জীবাত্মাও অপর(ব্রহ্মভিন্নবৎ) সম্ভাবিত বা কল্পিত হইয়াছে ॥ ৫॥৮॥ ভাষ্যানুবাদ। পুনর্ব্বারও অন্য দৃষ্টান্ত দ্বারা দেখাইতেছেন “বালাগ্র” ইতি। একটা কেশকে একশত ভাগে খণ্ডিত করিয়া তাহারও একটা ভাগকে আবার শতভাগে বিভক্ত করিলে তাহার যে একভাগ, জীবকে তণ্ডুল্যপরিমাণ অর্থাৎ অতিসূক্ষ্ম বলিয়া জানিবে। কারণ, জীবের উপাধিকৃত লিঙ্গশরীরটা অতি সূক্ষ্ম বলিয়া তাহার পরিমাণেই জীবপরিমাণ ব্যবহৃত হইয়া থাকে। জীব জীবরূপে সূক্ষ্ম হইলেও স্বরূপতঃ আনন্ত্য বা অসীমভাবে সম্পন্ন হইয়া থাকে ॥ ৫ ॥ ৯ ॥ ভাষ্যানুবাদ। আরও, “নৈব স্ত্রী”ইতি। প্রকৃতপক্ষে জীব যখন অদ্বিতীয় অপরোক্ষ ব্রহ্মস্বভাব, তখন সে স্ত্রী নয়, পুরুষ নয়, এবং, নপুংসকও।
স্থূলানি সূক্ষ্মাণি বহুনি চৈব রূপাণি দেহী স্বগুণৈর্ব্বণোতি। ক্রিয়াগুণৈরাত্মগুণৈশ্চ তেষাং সংযোগহেতুরপরোহপি দৃষ্টঃ ॥ ৫ ॥ ১২ ॥
পরলার্থঃ।[উক্তমেবার্থ, প্রপঞ্চয়তি “স্থূলানি” ইত্যাদি]। দেহী দেহাভিমানী জীবঃ) ‘স্বগুণৈঃ(স্বকৃতধৰ্ম্মাধৰ্ম্মজ্ঞানবাসনাভিঃ) স্থূলানি (পাষাণাদীনি) সূক্ষ্মাণি(দেবাদিময়ানি) বহুনি রূপাণি(শরীরাণি) বৃণোতি(গৃহ্নাতি)। ক্রিয়াগুণৈঃ(অদৃষ্টৈঃ) আত্মগুণৈঃ(অন্তঃকরণধর্ম্মৈঃ জ্ঞানেচ্ছাদিভিঃ) চ তেষাং(বিষয়াণাং) সংযোগহেতুঃ(সংযোগার্থং) অপরঃ (অন্যঃ দেহান্তরং প্রাপ্তঃ) অপি(সম্ভাবনায়াং) দৃষ্টঃ[ভবতীতি শেষঃ] ॥৫॥১২৷৷
মূলানুবাদ। সেই দেহী.স্বকৃত পাপপুণ্যের ফলে স্থলসূক্ষ্ম বহুবিধ রূপ গ্রহণ করিয়া থাকে এবং স্বকৃত কৰ্ম্ম ও জ্ঞানজনিত শুভাশুভ বাসনাবশে শব্দাদি বিষয় ভোগের হেতুভূত অপরও হয়, অর্থাৎ ভোগেব জন্য ভিন্ন দেহ প্রাপ্ত হইয়া জীব অপর বলিয়া প্রতীত হয় ॥৫৷৷১২৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স্থূলানীতি। স্থলান্যশ্মাদীনি। তানি চ সূক্ষ্মাণি তৈজসধাতুপ্রভৃতীনি। বহুনি দেবাদিশরীরাণি। দেহী বিজ্ঞানাত্মা স্বগুণৈর্ব্বিহিত- প্রতিষিদ্ধবিষয়ানুভবসংস্কারৈরূণোতি আবৃণোতি। ততস্তত্তৎক্রিয়াগুণৈরাত্ম- গুণৈশ্চ স দেহী অপরোহপি দেহান্তরসংযুক্তো ভবতীত্যর্থঃ ॥ ৫ ॥০১২ ॥
নয়, পরন্তু যে যে স্ত্রীশরীর, পুরুষ শরীর বা ক্লীবশরীর গ্রহণ করে, বিজ্ঞানাত্মা (বুদ্ধিপ্রধান জীবাত্মা) সেই সেই শরীর অনুসারে লক্ষিত হয়, অর্থাৎ সেই সকল শরীরের ধর্ম্ম আপনাতে আরোপ করিয়া—‘আমি স্কুল, আমি কৃশ, আমি পুরুষ, আমি স্ত্রী, আমি নপুংসক’ ইত্যাকার অভিমান করিয়া থাকে মাত্র ॥ ৫ ॥ ১০ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এই জীব তবে কি কারণে ভিন্ন ভিন্ন শরীর গ্রহণ করে? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিতেছেন—“সংকল্পনা” ইতি।
প্রথমে সংকল্প—মনে মনে ভালমন্দ কর্ম্মের চিন্তা হয়, তাহার পর স্পর্শন অর্থাৎ ত্বগিন্দ্রিমের ব্যাপার হয়, অনন্তর দৃষ্টিপাত, তাহার পর মোহ জন্মে। উক্ত সংকল্পন, স্পর্শন, দৃষ্টি ও মোহ দ্বারা শুভাশুভ সমস্ত কর্ম্ম সম্পন্ন হয়। অনন্তর দেহী (প্রাণী) কর্ম্মানুগ অর্থাৎ কর্ম্মানুযায়ী স্ত্রীপুরুষাদিভাবে কর্ম্মফলের পরিপাক অনুসারে দেবতা পশুপক্ষী প্রভৃতি স্থান প্রাপ্ত হয়। এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিতেছেন— গ্রাস ও অম্বুর অর্থাৎ অন্ন ও জলের বৃষ্টি—সম্যক্ সেচনে(ভোজনও পানের দ্বারা) যেমন শরীরের বৃদ্ধি হয়, ইহাও ঠিক তেমনই হয় ॥ ৫ ॥ ১১ ॥ ভাষ্যানুবাদ। “স্থূলানি” ইতি। দেহী—বিজ্ঞানাত্মা(জীব) বিহিত ও নিষিদ্ধ ক্রিয়ানুষ্ঠানজনিত অদৃষ্টরূপ স্বীয় গুণানুসারে বহুতর স্থূল পাষাণাদি ও সূক্ষ্ম তৈজস ধাতুময় দেবাদিশরীর বরণ করিয়া থাকে। সেই দেহীই আবার
২২
অনাদ্যনন্তং কলিলস্য মধ্যে বিশ্বস্য স্রষ্টারমনেকরূপম্। ‘বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্বপাশৈঃ ॥ ৫ ॥ ১৩ ॥
সরলার্থঃ।[ইদানীং মোক্ষোপায়ং তৎপদার্থমাহ—“অনাদ্যনন্তং” ইত্যাদি।] কলিলস্য মধ্যে(সংসারে) অনাদ্যনন্তং(আদ্যন্তরহিতং) বিশ্বস্য স্রষ্টারং অনেকরূপং(দেবাসুরনরাদিভাবেন স্থিতং) বিশ্বস্য একং(অদ্বিতীয়ং) পরি- বেষ্টিতারং দেবং(পরমাত্মানং) জ্ঞাত্বা(স্বস্বরূপেণ বিদিত্বা)[জীবঃ] সর্ব্বপাশৈঃ (কর্মবন্ধনৈঃ) মুচ্যতে(মুক্তো ভবতীত্যর্থঃ) ॥৫॥১৩৷৷
মূলানুবাদ। এই সংসারে[জীব] অনাদি অনন্ত বিশ্বস্রষ্টা ও কৰ্ম্ম- ফলপ্রদাতা অনেকরূপে অভিব্যক্ত অদ্বিতীয় দেবকে—পরমাত্মাকে জানিয়া অর্থাৎ আত্মস্বরূপে অবগত হইয়া সমস্ত কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হয় ॥৫৷৷১৩৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। স এবমবিদ্যাকামকম্মফলরাগাদিগুরুভারাক্রান্তো- হলাবুরিব সান্দ্রজলনিমগ্নো নিশ্চয়েন দেহাহংভাবমাপন্নঃ প্রেততির্য্যত্মনুষ্যাদি- যোনিষ্বাজীবং জীবভাবমাপন্নঃ কথঞ্চিৎ পুণ্যবশাদীশ্বরার্থকৰ্ম্মানুষ্ঠানেনাপগতরাগাদি- মলোহনিত্যাদিদর্শনেনোৎপন্নেহামুত্রার্থফলভোগবিরাগঃ শমদমাদিসাধনসম্পন্নস্ত- মাত্মানং জ্ঞাত্বা মুচ্যুত ইত্যাহ—অনাদ্যনন্তমিতি। অনাদ্যনন্তং আদ্যন্ত- রহিতং, কলিলস্য মধ্যে গহনগভীরসংসারস্য মধ্যে, বিশ্বস্য স্রষ্টারমুৎপাদয়ি- তারং অনেকরূপম্, বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং স্বাত্মনা সংব্যাপ্যাবস্থি- তং, জ্ঞাত্বা দেবং জ্যোতীরূপ পরমাত্মানং মুচ্যতে সর্ব্বপাশৈরবিদ্যা- কামকর্মভিঃ ॥ ৫ ॥ ১৩ ॥
স্বানুষ্ঠিত ক্রিয়া ও আত্মগুণে অর্থাৎ মানসিক জ্ঞানবাসনাদি দ্বারা অপবও—দেহান্তর সম্বদ্ধও হইয়া থাকে, অর্থাৎ জন্মান্তর প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ৫ ॥ ১২ ॥ ভাষ্যানুবাদ। সেই আত্মা এই প্রকারে অবিদ্যা(ভ্রান্তিজ্ঞান), কাম, কৰ্ম্ম ও তৎফলে অনুরাগাদিরূপ গুরুভারে আক্রান্ত—আবিল জলমগ্ন অলাবুব ন্যায়[সংসারে] দেহে অহংভাব অর্থাৎ দেহাত্মভাব প্রাপ্ত হইয়া এবং প্রেত পশু- পক্ষী মনুষ্যাদিযোনিতে জীবভাব লাভ করিয়া, কোন প্রকারে জন্মান্তরীণ পুণ্য প্রভাবে ঈশ্বরপ্রীত্যর্থ কৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা চিত্তগত রাগাদি মলদোষ অপনয়ন করত বিষয়ের অনিত্যতাদি দোষ দর্শনের ফলে ঐহিক ও পারলৌকিক ফলভোগে বৈরাগ্যসম্পন্ন হইয়া এবং শমদমাদি সাধনসমন্বিত হইয়া আত্মার স্বরূপ অবগত হইয়া বিমুক্ত হয়, এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—“অনাদ্যনন্তম্” ইতি। অনাদ্যনন্ত—আদি অন্তরহিত এবং কলিলের মধ্যে অর্থাৎ দুষ্প্রবেশ গভীর সংসারমধ্যে, বিশ্বের স্রষ্টা উৎপাদক, অনেকরূপ, অথচ জগতের এক অদ্বিতীয় পরিবেষ্টিতা অর্থাৎ আপনা দ্বারা সকলকে ব্যাপিয়া অবস্থিত দেবকে—জ্যোতিঃ।
কলাসর্গকরং দেবং যে বিদুস্তে জহুস্তনুম্ ॥ ৪ ॥ ১৪ ॥ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎসু পঞ্চমোহধ্যায়ঃ ॥ ৫‘॥
সরলার্থঃ।[কেন রূপেণাসৌ বিজ্ঞেয় ইত্যাহ—“ভাবগ্রাহ্যম্” ইতি।] ভাবগ্রাহ্যং(শুদ্ধান্তঃকরণগম্যং) অনীড়াখ্যং(নাস্তি নীড়ং শরীরং, আখ্যা নাম চ যস্য তং), ভাবাভাবকরং(ভাবস্থ্য অভাবস্থ্য চ কারণং) শিবং(আনন্দৈকরসং) কলাসর্গকরং(কলানাং প্রাণাদি-নামান্তানাং সৃষ্টিকারকং) দেবং(পরমাত্মানং) যে বিদুঃ(অভিন্নত্বেন জানন্তি), তে(জ্ঞানিনঃ) তনুং(শরীরং) জহুঃ(ন পুনর্জায়ন্ত ইত্যর্থঃ) ॥৫॥১৪॥
মূলানুবাদ।[তাহাকে কিরূপে জানিতে হইবে, তাহা বলিতেছেন— “ভাবগ্রাহ্যং ইতি।] বিশুদ্ধ অন্তঃকরণগম্য, নাম ও শরীর বহিত, সৃষ্টিপ্রলয়কারণ এবং প্রাণাদি নামপর্যন্ত ষোড়শ কলার স্রষ্টা দেবকে অর্থাৎ প্রকাশময় পরমাত্মাকে যাহারা জানেন, তাঁহারা দেহত্যাগ করেন, অর্থাৎ তাহাদের আর পুনরায় দেহসম্বন্ধ হয় না ॥৫॥১৪॥
ইতি পঞ্চমাধ্যায়ব্যাখ্যা ॥৫॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কেন পুনবসৌ গৃহ্যত ইত্যাহ-ভাবগ্রাহ্যমিতি। ভাবেন বিশুদ্ধান্তঃকরণেন গৃহ্যত ইতি ভাবগ্রাহ্যম্, অনীড়াখ্যং-নীড়ং শরীরং অশরীরাখ্যম্। ভাবাভাবকরং শিবং শুদ্ধং অবিদ্যা-তৎকার্য্যবিনিম্মুক্তমিত্যর্থঃ। কলানাং যোড়শানাং প্রাণাদিনামান্তানাং “স প্রাণমসৃজুত” ইত্যাদিনা আথর্ব্বণোক্তানাং সর্গকরং দেবং যে বিদুরহমস্মাতি, তে জহুঃ পরিত্যজেযুস্তনুং শরীরম্ ॥ ৫ ॥ ১৪ ॥ ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ভাষ্যে পঞ্চমোহধ্যায়ঃ ॥ ৫ ॥
স্বরূপ পরমাত্মাকে অবগত হইয়া[ জীব] অবিদ্যা কামকর্ম্মাদি সমস্ত পাশ(বন্ধন) হইতে বিমুক্ত হয় ॥ ৫ ॥ ১৩ ॥
ভাষ্যানুবাদ। কোন উপায়ে ইহাকে গ্রহণ করা যায়? তদুত্তরে বলিতেছেন—“ভাবগ্রাহ্যম্” ইতি। ভাব অর্থ নিৰ্ম্মল অন্তঃকরণ, তাহাদ্বারা জ্ঞাত হয় বলিয়া ভাব গ্রাহ্য, অনীড়াখ্য—নীড় অর্থ শরীর, অনীড়াখ্য অর্থ শরীররহিত, আর ভাবাভাবকর(সর্ব্বকারণ) শিব অর্থ শুদ্ধ—অবিদ্যা ও তৎকার্য্যশূন্য, এবং কলাসর্গকর, কলা অর্থ ‘তিনি প্রাণ সৃষ্টি করিলেন’ ইত্যাদি আথর্ব্বণ শ্রুতিকথিত প্রাণ হইতে আরম্ভ করিয়া নাম পর্য্যন্ত ষোড়শ কলা, তাহার সৃষ্টিকর্তা দেবকে যাহারা জানে—অভিন্নরূপে অবগত হয়, তাহারা শরীর পরিত্যাগ করেন(মুক্ত হন)॥ ৫ ॥ ১৪ ॥
স্বভাবমেকে কবয়ো বদন্তি কালং তথান্যে পরিমুহ্যমানাঃ। দেবস্যৈষ মহিমা তু লোকে যেনেদং ভ্রাম্যতে ব্রহ্মচক্রম্ ॥ ৬
সরলার্থঃ।[ননু সন্তি বহবঃ কালস্বভাবাদিকারণবাদিনঃ, তৎ কথং পরমেশ্বরস্য কলাদিসৃষ্টিকারকত্বং নির্বিচিকিৎসমিত্যত আহ—“স্বভাবম্” ইতি।] একে(কেচিৎ) কবয়ঃ(প্রজ্ঞাবন্তঃ) স্বভাবং[কারণং] বদন্তি, তথা অন্যে পরিমুহ্যমানাঃ সন্তঃ কালং[কারণং বদন্তি], এষঃ(জগৎসর্গঃ) তু(পুনঃ) দেবস্য(পরমেশ্বরস্য) মহিমা(মাহাত্ম্যং প্রভাব ইতি যাবৎ), যেন(মহিয়া) ইদং ব্রহ্মচক্রং(ব্রহ্মাণ্ডং) লোকে(জগতি) কাম্যতে(বিপরিবর্ত্ততে ইত্যর্থঃ) [দ্বিতিয়েহধ্যায়ে বাখ্যাতোহয়ং মন্ত্রঃ] ॥৬৷১৷৷
মূলানুবাদ।[ ভাল কথা, স্বভাব প্রভৃতিকেও কারণ বলে, এরূপ বহু- লোক দেখা যায়, অতএব পরমেশ্ববই যে, নিব্যূঢ় জগৎকারণ, তাহা কি করিয়া বলা যায়? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিতেছেন—“স্বভাবং” ইতি।]
কোন কোন বিদ্বান্ বস্তুস্বভাবকে[কারণ] বলিয়া থাকেন, সেইরূপ অপর লোকে আবার বিমোহে পতিত হইয়া কালকে(সময়কে) কারণ বলেন, বাস্তবিক পক্ষে ইহা স্বপ্রকাশ পরমেশ্বরেরই মহিমা, যাহা দ্বারা এই ব্রহ্মাণ্ড আবর্ত্তিত হইতেছে ॥৬৷১॥
শাঙ্করভাষ্যম্। নম্বতে কালাদয়ঃ কারণমিতি মন্যন্তে, তৎ কথং পুনরীশ্বরস্য কলাসর্গকরত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ—স্বভাবমিতি। স্বভাবমেকে কবয়ো মেধাবিনো বদন্তি। কালং তথান্যে। কালস্বভাবয়োগ্রহণং প্রথমাধ্যায়ে নিৰ্দ্দিষ্টা- নামন্যেষামপ্যুপলক্ষণার্থং। পরিমুহ্যমানা অবিবেকিনো বিষয়াত্মানঃ ন সম্যগ জানন্তি। তু শব্দোহবধারণে। দেবস্যৈষ মহিমা মাহাত্ম্যম্। যেনেদং ভ্রাম্যতে পরিবর্ত্ততে ব্রহ্মচক্রম্ ॥ ৬ ॥ ১ ॥
ভাষ্যানুবাদ। ভাল কথা, অপরেত কাল ও স্বভাব প্রভৃতিকে কারণ বলিয়া মনে করে, তবে কি করিয়া ব্রহ্মের কারণতা সিদ্ধ হয়? এইরূপ আশঙ্কা করিয়া বলিতেছেন—“স্বভাবম্” ইতি। একশ্রেণীর কবিগণ—মেধাবিগণ স্বভাবকে[কারণ] মনে করেন, সেইরূপ অপর শ্রেণীর পণ্ডিতেরা কালকে[কারণ মনে করেন]। এখানে কাল ও স্বভাবের উল্লেখ দ্বারা প্রথমাধ্যায়ে কারণরূপে সম্ভাবিত নিয়তি প্রভৃতিও বুঝিতে হইবে। পরিমুহ্যমান—বিবেকজ্ঞানবর্জ্জিত বিষয়াকৃষ্টচিত্ত লোকেরা যথাযথভাবে জানে না। শ্রুতির ‘তু’ শব্দটী অবধারণার্থে। ইহা দেবেরই(জ্যোতিঃ স্বরূপ ব্রহ্মেরই) মহিমা মাহাত্ম্য(প্রভাব), যাহা দ্বারা এই ব্রহ্ম-চক্র(জগৎ) আবর্ত্তিত হইতেছে ॥ ৬॥ ১॥
যেনাবৃতং নিত্যমিদং হি সর্ব্বম্ জ্ঞঃ কালকারো গুণী সর্ব্ববিদ্ যঃ। , তেনেশিতং কৰ্ম্ম বিবর্ত্ততে হ পৃথ্যপ্তেজোহ নিলখানি চিন্ত্যম্ ॥ ৬ ॥ ২ ॥
সরলার্থঃ।[ ইদানীং পরমেশ্বরস্য মহিমানমেব কীর্ত্তয়তি—“যেন” ইত্যাদিনা।] ইদং পরিদৃশ্যমানং) সর্ব্বং(বস্তু) যেন নিত্যং আবৃতং(ব্যাপ্তং), সঃ (পরমেশ্বরঃ) জ্ঞঃ(জ্ঞাতা), কালকারঃ(কালস্যাপি প্রবর্তকঃ), গুণী(অপ- হতপাপত্বাদিগুণসম্পন্নঃ) সর্ব্ববিৎ(সর্ব্বং বেত্তীতি), তেন(পরমেশ্ববেণ) ঈশিতং (শাসিতং প্রেরিতমিতি যাবৎ)[সং] কৰ্ম্ম—পৃথ্যপতেজোহনিলখানি(পৃথিবী- জল-তেজোবাযাকাশানি, এতদাত্মকং কার্য্যজাতং) বিবর্ত্ততে(প্রাদুর্ভবতি),[তৎ ঈশ্বরতত্ত্বং] চিন্ত্যং(চিন্তনীয়ম্ উপাসনীয়মিত্যর্থঃ) ॥৬৷৷২॥
মূলানুবাদ। যাঁহা দ্বারা, সর্ব্বদা এই সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত এবং যিনি , জ্ঞানী গুণী সর্ব্ববিদ্ ও কালের প্রবর্ত্তক, তাঁহারই শাসনাধীন হইয়া পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু ও আকাশরূপ কৰ্ম্ম(উৎপন্ন বস্তু) বিবর্ত্তমান হইতেছে, অর্থাৎ অসত্য হইয়াও সত্যবৎ প্রকাশ পাইতেছে; তাঁহাকে চিন্তা করিবে, অর্থাৎ তাঁহার উপাসনা করিবে ॥৬৷৷২৷৷
শাঙ্করভাষ্যম্। মহিমানং প্রপঞ্চয়তি—যেনেতি॥ যেনেশ্বরেণাবৃতং ব্যাপ্তমিদং জগন্নিত্যং নিয়মেন। জ্ঞঃ কালকাকারঃ কালস্যাপি কর্তা। গুণী অপহতপাপ্যাদিমান্, সর্ব্বং বেত্তীতি সর্ব্ববিদ্ যঃ। তেনেশ্বরেণেশিতং প্রেরিতং কর্ম্ম—ক্রিয়ত ইতি স্রজীব ফণী। হশব্দঃ প্রসিদ্ধিদ্যোতকঃ। প্রসিদ্ধং যদেতদীশ্বর- প্রেরিতং কৰ্ম্ম জগদাত্মনা বিবর্ত্তত ইতি। যৎ পুনস্তৎ কৰ্ম্ম পৃথ্যপতেজোহনিলখানি পৃথিব্যাদিভূতপঞ্চকং।। ৬।। ২॥
ভাষ্যানুবাদ। পরমেশ্বরের মহিমা বিস্তৃত ভাবে বর্ণনা করিতেছেন— “যেন” ইতি। যে ঈশ্বর দ্বারা এই জগৎ নিত্য নিয়মিত ভাবে ব্যাপ্ত, তিনি ‘জ্ঞ’ (জ্ঞাতা), কালকার অর্থাৎ কালেরও কর্তা বা প্রবর্ত্তক, গুণী—নিষ্পাপত্বাদি গুণ সম্পন্ন এবং সমস্ত জানেন বলিয়া সর্ব্ববিদ্। সেই ঈশ্বরকর্তৃক ঈশিত—প্রেরিত (তাহারই শাসন নিষ্পন্ন) কৰ্ম্ম[চলিতেছে]। এখানে কৰ্ম্ম অর্থ—যাহা কৃত হয়, যেমন মালাতে সর্প[‘বিবর্ত্ত’ কার্য্য(১)]। শ্রুতির ‘হ’ শব্দটা প্রসিদ্ধির দ্যোতক।[তাৎপর্য্যার্থ এই যে,] ঈশ্বরের ইচ্ছা প্রেরিত এই যে, কর্ম্ম(কার্য্য)
(১) কার্য্য দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। এক পরিণাম, অপর বিবর্ত্ত। তন্মধ্যে যেখানে কারণ বস্তুটাই কার্য্যাকার ধারণ করে, সেখানে হয়—পরিণাম। যেমন— দুগ্ধের পরিণাম দধি, বৃত্তিকার পরিণাম ঘট শরা প্রভৃতি। যেখানে কারণটা অবিকৃতই থাকে, কেবল ভ্রান্তিবশে অন্যপ্রকার দেখা যায়, সেখানে হয় বিবর্ত্ত কার্য্য, যেমন রজ্জুর বিবর্ত্ত কার্য্য সর্প।
তৎ কৰ্ম্ম কৃত্বা বিনিবর্ত্য ভূয়- স্তত্ত্বস্য তত্ত্বেন সমেত্য যোগম্। একেন দ্বাভ্যাং ত্রিভিরষ্টভির্ব্বা কালেন চৈবাত্মগুণৈশ সূক্ষ্মঃ ॥ ৬ ॥ ৩ ॥
সরলার্থঃ।[চিন্তাপ্রকারমাহ-“তৎ কৰ্ম্ম” ইতি।] তৎ(পৃথিব্যাদি- রূপং) কৰ্ম্ম(কাৰ্য্যং) কৃত্বা(উৎপাদ্য) বিনিবর্ত্য(স্থিত্যানুকূলমীক্ষণং কৃত্বা) ভূয়ঃ(পুনশ্চ) তত্ত্বস্য(পরমার্থরূপস্য স্বস্য) তত্ত্বেন-[তত্র বিশেষমাহ] একেন, দ্বাভ্যাং, ত্রিভিঃ, অষ্টভিঃ বা[তত্ত্বৈ:],(তত্র একেন পৃথিব্যাত্মকেন, দ্বাভ্যাং-পৃথ্বীজলাভ্যাং, ত্রিভিঃ-তেজোহবন্নলক্ষণৈঃ, অষ্টভিঃ ভূমি-জল-তেজো- বায়াকাশ-মনোবুদ্ধ্যহঙ্কারলক্ষণৈঃ তত্ত্বৈঃ,[ন কেবলং এভিরেব,] কালেন চ, সুক্ষ্মৈ: আত্মগুণৈঃ(অন্তঃকরণধর্মৈঃ কামাদিভিঃ) যোগং সমেত্য(আত্মনঃ সত্তালক্ষণং তত্ত্বং জড়তত্ত্বেষু সংযোগ্য)[স্থিতম্ ইতি শেষঃ]।[অথবা তত্ত্বস্য চিদানন্দস্বরূপস্য একেন অবিদ্যারূপেণ, দ্বাভ্যাং ধৰ্মাধৰ্মাভ্যাং, ত্রিভিঃ-সত্ত্ব- রজস্তমোগুণৈ:, অষ্টভিঃ-পঞ্চমহাভূত-মনোবুদ্ধ্যহঙ্কারলক্ষণৈঃ। তত্ত্বেন, তত্ত্বাভ্যাং তত্ত্বৈরিভি যথাযথমূহনীয়ম্। এবমাদিরূপং ব্যাখ্যান্তরমপি সম্ভবতীতি জ্ঞেয়ম্।] ॥৬৷৷৩৷৷
মূলানুবাদ। যিনি সেই পৃথিবীপ্রভৃতি কৰ্ম্ম(উৎপাদ্য বস্তু) উৎ- পাদন করিয়া এবং সেই সমুদয়কে ঈক্ষণ করিয়া অর্থাৎ সেই সকল জড়পদার্থের অবস্থা বিষয়ে দৃষ্টি করিয়া পুনরায় শাস্ত্রনিদ্দিষ্ট এক দুই তিন বা আট প্রকার মূলতত্ত্বের সহিত এবং কালও সূক্ষ্ম অন্তঃকরণগত কামাদিগুণের সহিত আপনার তত্ত্ব(সত্তা) সংযোজিত করিয়া অবস্থান করেন,[তিনি চিন্তনীয়] ॥ ৬॥৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্। যং প্রথমাধ্যায়ে চিন্ত্যমিত্যুক্তম্, এতদেব প্রপঞ্চয়তি- তদিতি ॥ তৎ কৰ্ম্ম পৃথিব্যাদি সৃষ্ট্বা, বিনিবর্ত্য প্রত্যবেক্ষণং কৃত্বা, ভূয়ঃ পুনস্তস্যাত্মন- স্তত্বেন ভূম্যাদিনা যোগং সমেত্য সঙ্গময্য। নিলোপো দ্রষ্টব্যঃ। কতিবিধৈঃ প্রকারৈঃ। একেন দ্বাভ্যাং ত্রিভিরষ্টভির্ব্বা প্রকৃতিভূতৈস্তত্ত্বৈঃ। তদুক্তম্—
“ভূমিরাপোহনলো বায়ুঃ খং মনো বুদ্ধিরেব চ। অহঙ্কার ইত্যর্থং যে ভিন্ন। প্রকৃতিরষ্টধা॥” ইতি।
কালেন চৈবাত্মগুণৈশ্চান্তঃকরণগুণৈঃ কামাদিভিঃ সূক্ষ্মৈঃ ॥ ৬ ॥ ৩ ॥
ভাবাংশ সর্ব্বান্ বিনিযোজয়েদ্ যঃ।
সরলার্থঃ।[ ইদানীং কর্ম্মারম্ভস্য প্রয়োজনং নির্দ্দিশতি—“আরভ্য” ইতি।]
যঃ গুণান্বিতানি(ত্রিগুণময়ানি) কর্মাণি(পৃথিব্যাদীনি) আরভ্য (উৎপাদ্য)[তেষু] সর্ব্বান্ ভাবান্(তত্তদ্বিশেষধৰ্ম্মান) বিনিযোজয়েৎ(সন্নি- বেশয়েৎ), তেষাং(কর্মণাং) অভাবে(নিষ্কামতয়া আত্মনি সম্বন্ধাভাবে সতি) কৃতকর্মনাশঃ(কৃতানাং স্বানুষ্ঠিতানামপি কৰ্ম্মণাং) নাশঃ(নৈক্ষলং[ভবতীতি শেষঃ]
মূলানুবাদ। এখন কর্ম্মারম্ভের উপযোগিতা প্রদর্শন করিতেছেন— “আরভ্য” ইত্যাদি।
যিনি ত্রিগুণাত্মক পৃথিবীপ্রভৃতি কার্য্যবস্তু উৎপাদন করিয়া সে সকলের বিশেষ স্বভাব বা ধৰ্ম্ম যোজনা করিয়াছিলেন, সেই সকল কৰ্ম্ম পরমেশ্বরে সমর্পণ করিলে, কর্ম্মের সহিত আত্মার কোন সম্বন্ধ থাকে না, অর্থাৎ নিষ্কামভাবে অনু- ষ্ঠিত কৰ্ম্ম দ্বারা আত্মা লিপ্ত হয় না, সুতরাং সে সকল কৃত কর্ম্মের বিনাশ বা ক্ষয়
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং কর্ম্মণা মুখ্যবিনিয়োগং দর্শয়তি—আর- ভ্যেতি। আরভ্য কৃত্বা কৰ্ম্মাণি গুণৈঃ সত্ত্বাদিভিবন্বিতানি ভাবাংশ্বাত্যন্তবিশেষান্ বিনিযোজয়েদীশ্বরে সমর্পয়েৎ যঃ। তেষামীশ্বরে সমর্পিতত্বাদাত্মসম্বন্ধাভাবস্তদভাবে পূর্ব্বকৃতকর্ম্মণাং নাশঃ। উক্তঞ্চ—
“যৎ করোসি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ। যত্তপস্যসি কৌন্তেয়, তৎ কুরুস্ব মদর্পণম্ ॥ শুভাশুভফলৈবেবং মোক্ষ্যসে কৰ্ম্মবন্ধনৈঃ। ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ। লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবান্তসা ॥ কায়েন মনসা বুদ্ধ্যা কেবলৈরিন্দ্রিয়ৈবপি।
করিয়া। কত প্রকারে? এক পৃথিবী তত্ত্ব, এইরূপ দুই তিন বা আট প্রকার প্রকৃতিরর তত্ত্বের এবং কাল ও সূক্ষ্ম আত্মগুণ—অর্থাৎ অন্তঃকরণ ধর্ম্মের কামাদির সহিত[ সংযোগ সম্পাদন করিয়া]। আট প্রকার প্রকৃতির যথা অন্যত্র উক্ত আছে—‘ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার, এই আট প্রকার প্রকৃতি আমার প্রথমোক্ত প্রকৃতি হইতে ভিন্ন বা স্বতন্ত্র ॥ ৬ ॥ ৩ ॥ ভাষ্যানুবাদ। এখন কৰ্ম্ম সমূহের মুখ্য বিনিয়োগ বা প্রধান লক্ষ্য প্রদর্শন করিতেছেন—“আরভ্য” ইতি। যে ব্যক্তি সত্ত্বাদিগুণ, সম্পর্কিত কৰ্ম্ম সমূহ আরম্ভ করিয়া অর্থাৎ সমান্ত করিয়া সেই সকল কর্ম ও ভাব সমূহ যাহা অত্যন্ত ভিন্নরূপ বিনিয়োগ করে অর্থাৎ পরমেশ্বরে সমর্পণ করে। ঈশ্বরে সমর্পিত হওয়ায় সেই সকল কর্মের সহিত আত্মার সম্বন্ধ ঘটে না, সম্বন্ধের অভাবে পূর্ব্বকৃত সমস্ত কৰ্ম্ম তখন বিনষ্ট হয়। একথা উক্তও আছে—‘হে কৌন্তেয়(কুন্তিপুত্র—
তেষামভাবে কৃতকর্মনাশঃ কর্মক্ষয়ে যাতি স তত্ত্বতোহন্যঃ ॥ ৬ ॥ ৪ ॥ আদিঃ স সংযোগনিমিত্তহেতুঃ পরস্ত্রিকালাদকলোহপি দৃষ্টঃ।
কর্ম্মক্ষয়ে সতি সঃ(শুদ্ধসত্ত্বঃ পুরুষঃ) অন্যঃ(অবিদ্যাতৎকার্য্যেভ্যঃ পৃথক্) যাতি (ভবতীত্যর্থঃ) ॥ ৬॥ ৪ ॥ সরলার্থঃ।[ বিষয়াকৃষ্টচিত্তোহপি কথং নু তৎ বিজানীযুরিত্যত আহ —“আদিঃ(সর্ব্বকরণং) অকলঃ(প্রাণাদিনামপর্য্যন্তাঃ যাঃ ষোড়শ কলাঃ প্রসিদ্ধাঃ, তদ্রহিতঃ) অপি(নিশ্চয়ে) সংযোগনিমিত্তহেতুঃ(শরীরসংযোগ- নিমিত্তং অবিদ্যা, তস্য হেতুঃ প্রেরয়িতা), ত্রিকালাৎ(অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যদ্র- হয়। কর্মক্ষয় হইলে চিত্ত বিশুদ্ধ হয়, তখন সে নিজে উক্ত পৃথিব্যাদি তত্ত্ব হইতে অন্য অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন হইয়া পড়ে ॥ ৬॥ ৪ ॥
মূলানুবাদ। যাহাদের চিত্ত বিষয়ভোগে রত, তাহারা কি উপায়ে ব্রহ্মকে জানিতে পারে, তাহা বলিতেছেন—“আদি” ইত্যাদি।
যে পরমেশ্বর সকলের আদি কারণ, প্রাণাদি নামান্ত ষোড়শ কলারহিত যোগিনঃ কৰ্ম্ম কুর্ব্বন্তি সঙ্গং ত্যক্তাত্মশুদ্ধষে।” ইতি।
কর্ম্মক্ষয়ে বিশুদ্ধসত্ত্বো যাতি তত্ত্বতোহন্যস্তত্ত্বেভ্যঃ প্রকৃতিভূতেভ্যোহন্যোহবিদ্যা- তৎকার্য্যবিনিৰ্ম্ম কশ্চিংসদানন্দাদ্বিতীয়ব্রহ্মাত্মত্বেনাবগচ্ছন্নিত্যর্থঃ। অন্যদিতি পাঠে তত্ত্বেভ্যোযদন্যৎ ব্রহ্ম, তদ্ যাতীতি ॥ ৬ ॥ ৪ ॥ শাঙ্করভাষ্যম। উক্তস্যার্থস্য দ্রঢ়য় উত্তরে মন্ত্রাঃ প্রস্তয়ন্তে-কথং নাম বিষয়বিষান্ধাঃ কথং নাম ব্রহ্ম জানীয়ুরিত্যত আহ-আদিরিতি ॥ আদিঃ কারণং অর্জুন). তুমি যাহা কিছু কার্য্য কর, যাহা ভোজম কর, যাহা হোম কর, যাহা দানকর এবং যাহা কিছু তপস্যা কর, সে সমস্ত আমাতে সমর্পণ কর। এরূপ করিলে তুমি শুভাশুভ কর্মময় বন্ধন হইতে বিমুক্ত হইবে। যে লোক ফলাকাঙ্ক্ষা পরি- ত্যাগ করিয়া ব্রহ্মে সমর্পণপূর্ব্বক সমস্ত কৰ্ম্ম করে, পদ্মপত্র যেমন জলে লিপ্ত হয় না, ঠিক তেমন সেও কৰ্ম্ম দ্বারা লিপ্ত হয় না, অর্থাৎ কৰ্ম্মফলভোগী হয় না। যোগিগণ আত্মশুদ্ধির নিমিত্ত ফলাসক্তি পরিত্যাগপূর্ব্বক দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির সাহায্যে কৰ্ম্ম করিয়া থাকেন ॥ ইতি। কৰ্ম্মক্ষয় হইলে পর শুদ্ধসত্ত্ব যোগী অবিদ্যা ও তৎকাৰ্য্য হইতে বিমুক্ত হইয়া এবং আপনাকে সচ্চিদানন্দরূপ অদ্বিতীয় ব্রহ্মরূপে অনুভব করত প্রকৃতি ও প্রকৃতিজাত সমস্ত তত্ত্ব হইতে অন্য হন, অর্থাৎ আপনার ব্রহ্মভাব অনুভব করেন। মূলে যদি ‘অন্যৎ’ পাঠ থাকে, তাহা হইলে অর্থ এই যে, তত্ত্ব হইতে অন্য যে ব্রহ্ম, তাহাকে প্রাপ্ত হন ॥ ৬॥ ৪ ॥
ভাষ্যঅনুবাদ। উক্ত বিষয়েরই দৃঢ়তা সম্পাদনের নিমিত্ত পরবর্তী
১৭৭
পাৎ) পরঃ(কালাতীত ইতি ভাবঃ) দৃষ্টঃ(অনুভূতঃ) পূর্ব্বং(তত্ত্বমস্যাদিবাক্য- জনিতজ্ঞানোদয়াৎ পূর্ব্বং) বিশ্বরূপং(সর্ব্বাত্মকং) ভবভূতং,(জগৎপ্রসবিতাবং) ঈড্যং(স্তোত্রযোগ্যং) স্বচিত্তস্থং(অন্তর্য্যামিরূপেণ হৃদয়ে বসন্তম্) তং দেবং(পরমে- শ্বরং)[জানীয়াং ইতি পূরণীয়ম্] ॥৬॥ ৫॥
বলিয়া অকল, দেহ লাভের কারণীভূত অবিদ্যারও হেতুস্বরূপ, এবং ত্রিকালের অতীত, বিশ্বরূপ জগৎকারণ, স্তবনীয় ও স্বীয় চিত্তস্থ সেই পরমেশ্বরকে আত্মজ্ঞান লাভের পূর্ব্বে[উপাসনা করিবে] ॥ ৬ ॥ ৫ ॥
সর্ব্বস্য শরীরসংযোগনিমিত্তানামবিদ্যানাং হেতুঃ। উক্তঞ্চ—“এষ এব সাধু কৰ্ম্ম কারয়তি, এষ এবাসাধু কৰ্ম্ম কারয়তি” ইতি। পরস্ত্রিকালাদতীতানাগত- বর্তমানাৎ। উক্তঞ্চ—“যম্মাদর্ব্বাক্ সম্বৎসবোহহোভিঃ পরিবর্ত্ততে। তদ্দেবাঃ জ্যোতিষাং জ্যোতিরায়ুর্বোপাসতে, মৃতং” ইতি। কস্মাৎ? যম্মাদকলোহসৌ ন বিদ্যন্তে কলাঃ প্রাণাদিনামান্তা অস্যেত্যকলঃ। কলাবদ্ধি কালত্রয়পরিচ্ছিন্ন- মুৎপদ্যতে বিনশ্যতি চ, অয়ং পুনরকলো নিষ্প্রপঞ্চঃ। তস্মান্ন কালত্রয়পরিচ্ছিন্ন- মুৎপদ্যতে বিনশ্যতি চ। তং বিশ্বানি রূপাণ্যস্যেতি বিশ্বরূপং। ভবত্যম্মাদিতি ভবঃ। ভূতমবিতথস্বরূপং। ঈড্যং দেবং স্বচিত্তস্তং উপাস্য অয়মহমস্মীতি সমাধানং কৃত্বা পূর্ব্ববাক্যার্থজ্ঞানোদয়াৎ ॥ ৬॥ ৫॥
লোকসকল বিষযান্ধ হয়, আর কি উপায়েই বা ব্রহ্মকে জানিতে সমর্থ হয়, ইহা জ্ঞাপনের জন্য বলিতেছেন—“আদি” ইতি। তিনিই আদি অর্থাৎ জীবগণের শরীর গ্রহণের হেতুভূত অবিদ্যাব(ভ্রান্তি জ্ঞানের) কারণ। অন্যত্রও উক্ত আছে—‘ইনিই শুভ কৰ্ম্ম করান, এবং ইনিই মন্দ কৰ্ম্মও করান’ ইতি। তিনি ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্তমান এই কালত্রয়ের পর— অতীত অর্থাৎ তিনি নিত্যসিদ্ধ। অন্যত্রও উক্ত আছে—‘যাহার নিম্নে সংবৎসর দিন সমূহ দ্বারা আবর্তন করে। দেবগণ তাহাকে জ্যোতিব জ্যোতি এবং আয়ু ও অমৃত রূপে উপাসনা করেন’ ইতি। কেন[তিনি কালাতীত]? যেহেতু তিনি অকল ‘প্রাণাদি নাথপর্যন্ত যে ষোড়শ কলা, তাহা তাহার নাই, নাই বলিয়াই অকল। কারণ, কলাবিশিষ্ট বস্তুই কালের দ্বাবা পরিচ্ছিন্ন হয়, এবং জন্মে ও মরে, ইনি ত অকল—নিষ্প্রপঞ্চ(সর্ব্বপ্রকার অংশাশিভাবশূন্য)। সেই কারণেই কালত্রয়-পরিচ্ছিন্ন হইয়া উৎপন্ন বা বিনষ্ট হন না। সকল রূপই তাহার রূপ,(মূর্তি), এই কারণে তিনি বিশ্বরূপ। তাহা হইতেই প্রাদুর্ভূত হয় বলিয়া তিনি ভব। অচ্যুতস্বভাব বলিয়া ভূত, ঈড্য—স্তুতিযোগ্য, পূর্ব্বে-বাক্যানুযায়ী জ্ঞান লাভের অগ্রে নিজ হৃদয়স্থ এই দেবকে উপাসনা করিয়া ‘আমি এতৎস্বরূপ’ এইরূপে একাগ্রতা সম্পাদন করিয়া— ॥ ৬॥ ৫ ॥
১৩
স বৃক্ষকালাকৃতিভিঃ পরোহন্যো- যস্মাৎ প্রপঞ্চঃ পরিবর্ত্ততে হয়ম্। ধর্মাবহং পাপনুদং ভগেশং জ্ঞাত্বাত্মস্থমমৃতং বিশ্বধাম ॥ ৬ ॥ ৬ ॥
তমীশ্বরাণাং পরমং মহেশ্বরং তং দেবতানাং পরমঞ্চ দৈবতম্। ‘পতিং পতীনাং পরমং পরস্তাদ বিদাম দেবং ভুবনেশমীড্যম্ ॥ ৬॥ ৭॥
সরলার্থঃ।[ অতঃপরং তদ্বিষয়ে বিবাদনুভব, প্রাগণতি “তগৌরাণাম্” ইত্যাদি।] ঈশ্বরাণাং(চতুর্মু খাদীনাং) পরমং(নিরতিশয়) মহেশ্ববং(নিয়ামক), দেবতানাং(ইন্দ্রাদীনাং) চ(অপি) পবমং দৈবত,(দেবত্বাপাদকং), পতীনাং (প্রজাপতীনাং) পরমং পতিং, পরস্তাৎ(অক্ষরাদপি পবং) ঈড্যং ভুবনেশং (জগন্নিয়ামকং) তং দেবং(পরমেশ্বরং) বিদাম(অপরোক্ষতয়া জানীম ইত্যর্থঃ।)৷ ৬॥ ৭॥
• মূলানুবাদ। এখন ব্রহ্মবিদ পুরুষের অনুভূতি প্রদর্শন করিতেছেন “পতিং” ইত্যাদি]
ব্রহ্মা প্রভৃতি লোকেশ্বরদিগেরও নিবঙ্কুশ মহেশ্বর অর্থাৎ শাসনকর্তা, ইন্দ্রাদি দেবগণেরও পরম দৈবত(দেবত্বপ্রদ) এবং প্রজাপতিগণেরও পতি বা শাসনকর্তা, অক্ষর ব্রহ্মেরও পরবর্তী এবং ভুবনাধিপতি ও স্তুতিপাত্র সেই দেবকে(পরমেশ্বরকে) আমরা(জ্ঞানিগণ) প্রত্যক্ষরূপে জানি ॥ ৬॥ ৭ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং বিদ্বদনুভবং দর্শয়ন্নু ক্তমর্ষৎ দৃঢ়াকরোতি— তমীশ্বরাণামিতি। তমীশ্বরাণাং বৈবস্বতযমাদীনাং পরমং মহেশ্ববং ত’ দেবতানা- মিন্দ্রাদীনাং পবমঞ্চ দৈবতং, পতিং পতানাং প্রজাপতীনাং, পরমং পরস্তাৎ পরতোহক্ষরাৎ। বিদাম দেবং দ্যোতনস্বভাবং। ভুবনানামীশং ভুবনেশং। ঈড্যং স্তুত্যম্ ॥৬৷৭৷৷
থাকে,[অতএব অস্পৃষ্ট], ধর্ম্মাবহ(ধর্ম্মের আশ্রয়), ও পাপমুদ(পাপনাশক), ভগ অর্থ ঐশ্বর্য্য, তাহার প্রভু, আত্মাতে—বুদ্ধিতে অবস্থিত, মরণধর্ম্মরহিত, বিশ্বধাম ও সমস্ত জগতের আশ্রয়স্বরূপ দেবকে জানিয়া প্রকৃত্যাদি ভূতপর্য্যন্ত তত্ত্ব হইতে অন্য হয়, অর্থাৎ অন্যত্ব উপলব্ধি করে, এই অংশের সম্বন্ধ সর্ব্বত্র— জানিতে হইবে ॥ ৬ ॥ ৬ ॥ ভাষ্যানুবাদ। এখন জ্ঞানীর অনুভবপ্রদর্শন করিয়া পূর্ব্বকথিত বিষয়টী দৃঢ়তর করিতেছেন—“তম্ ঈশ্বরাণাম্” ইতি। সূর্য্যপুত্র যমপ্রভৃতি ঈশ্বরগণের(লোকপালগণের) মহান্ ঈশ্বর(প্রভু), ইন্দ্রাদি দেবগণেরও পরম দেবতা, এবং প্রজাপতিদিগেরও পতি অর্থাৎ প্রভু, অক্ষর ব্রহ্ম হইতেও পরম স্তবনীয় ও প্রকাশস্বভাব সেই জগৎপতিকে আমরা জানি ॥ ৬॥ ৭ ॥
ন তস্য কার্য্যং করণঞ্চ বিদ্যতে, ন তৎসমশ্চাভ্যধিকশ্চ দৃশ্যতে। পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রূয়তে স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ ॥ ৬ ॥ ৮ ॥ ন তস্য কশ্চিৎ পতিরস্তি লোকে, ন চেশিতা নৈব চ তস্য লিঙ্গম্।
সরলার্থঃ।[অথ তস্য মহেশ্বরত্বমেব সমর্থয়ন্নাহ “ন তস্য” ইতি।] তস্য(পরমেশ্বরস্য) কার্য্যং(শরীরং) করণং(চক্ষুসাদিকং) চ ন বিদ্যতে। তৎ(তস্য) সমঃ(সমধৰ্ম্মা) অভ্যধিকঃ(ততো জ্যায়ান্) চ ন দৃশ্যতে (ন ক্রয়তে ইত্যর্থঃ)। অস্য বিবিধা(অনেকপ্রকারা) এব স্বাভাবিকী(স্বতঃ- সিদ্ধা) শক্তিঃ, জ্ঞান-বলক্রিয়াচ(জ্ঞানক্রিয়া—সর্ব্ববিষয়েষু জ্ঞানলাভঃ, বলক্রিয়া— সন্নিধিমাত্রেণ সর্ব্বনিয়মনং চ) ক্রয়তে[বেদেষু] ॥ ৬॥৮॥ সরলার্থঃ। কিংচ, “ন তস্য” ইতি।[যস্মাদেবং, তস্মাৎ] লোকে (জগতি) তস্য কশ্চিৎ(কশ্চিদপি) পতিঃ(প্রভুঃ) ন অস্তি(নৈবাস্তীত্যর্থঃ), ঈশিতা চ(নিয়ামকোহপি) ন[অস্তি], তস্য লিঙ্গং চ(অনুমাপকং গুণক্রিয়াদি)
মূলানুবাদ। তাহার দেহ ও ইন্দ্রিয় নাই, তাহার সমান বা অধিকও (তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠও) দৃষ্ট হয় না। ইহার স্বভাবসিদ্ধ নানাপ্রকার নিরতিশয় শক্তি এবং জ্ঞানক্রিয়া(সর্ব্বজ্ঞতা) ও বলক্রিয়া(সান্নিধ্যমাত্রে কার্য্য সম্পাদন ক্ষমতা) বেদেতে শুনিতে পাওয়া যায় ॥ ৬॥৮॥
মূলানুবাদ।[যেহেতু তিনি এমন, সেইহেতু] জগতে তাহার অধিপতি কেহ নাই, শাসনকর্ত্তাও নাই; এবং যাহাতে অনুমান দ্বারা তাহাকে
শাঙ্করভাষ্যম্। কথং মহেশ্ববমিত্যাহ—ন তস্যোতি। ন তস্য কার্য্যং শরীরং করণং চক্ষুরাদি বিদ্যতে। ন তৎসমশ্চাভ্যধিকশ্চ দৃশ্যতে ক্রয়তে বা। পরাশ্য শক্তির্বিবিধৈব ক্রয়তে, সা চ স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ। জ্ঞানক্রিয়া চ বলক্রিয়া চ। জ্ঞানক্রিয়া সর্ব্ববিষয়জ্ঞানপ্রবৃত্তিঃ, বলক্রিয়া স্বসন্নিধিমাত্রেণ সর্ব্বং বশীকৃত্য নিয়মনং ॥ ৬॥৮॥ শঙ্করভাষ্যম্। ন তস্যেতি॥ যস্মাদেবং, তস্মাৎ ন তস্য কশ্চিৎ পতি ভাষ্যানুবাদ। তিনি মহেশ্বব কিসে? তাহা বলিতেছেন—“ন তস্য” ইতি। তাঁহার কার্য্য—শরীর ও করণ—চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয় নাই; তাঁহার সমান বা তদপেক্ষা অধিক দৃষ্ট বা শ্রুত হয় না। ইহার নানাপ্রকার শক্তি শ্রুত হয়। সেই শক্তি ইঁহার স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞান-বলক্রিয়া অর্থাৎ জ্ঞানক্রিয়া সর্ব্ববিষয়ে অপ্রতিহত জ্ঞান, এবং বলক্রিয়া—তাহার কেবল সান্নিধ্যমাত্রে সকলকে বশীকৃত করিয়া রাখিবার ক্ষমতা,[ ইহা শ্রুত হয়] ॥ ৬॥৮॥ ভাষ্যানুবাদ। যেহেতু তিনি এইপ্রকার, সেই হেতু জগতে তাঁহার,
স কারণং করণাধিপাধিপো- ন চাস্য কশ্চিজ্জনিতা ন চাধিপঃ ॥ ৬ ॥ ৯ ॥ যস্তন্তনাভ ইব তন্তুভিঃ প্রধানজৈঃ স্বভাবতো দেব একঃ স্বমাবৃণোৎ।
. স নো দধাদ্বহ্মাপ্যয়ম্ ॥ ৬ ॥ ১০ ॥
ন এব[ অস্তি]। সঃ(পবমেশ্বরঃ) কারণং(সর্ব্বকারণং) করণাধিপাধিপঃ (করণানাং ইন্দ্রিয়াণাম্ অধিপঃ—জীবঃ, তস্যাপি অধিপতিবিত্যর্থঃ)।[অতএব] কশ্চিৎ(কশ্চিদপি) অস্য জনিতা(উৎপাদকঃ) চ ন, অধিপঃ চ ন[অস্তি] ॥ ৬ ॥ ৯ ॥
সরলার্থঃ। ইদানীং ব্রহ্মদশিনোহনুভবং দর্শয়ন্নাহ—“যস্তন্তনাভঃ” ইতি। যঃ একঃ দেবঃ(পরমেশ্বরঃ) তন্তুনাভঃ(লূতাকীটঃ) তন্তুভিঃ(স্বপ্রসূতৈঃ সূত্রৈঃ) ইব, স্বভাবতঃ(স্বপ্রয়োজন-নৈরপেক্ষ্যেণ) প্রধানজৈঃ(প্রকৃতিজাতৈঃ • নাম-রূপ-কর্ম্মভিঃ) স্বং(আত্মানং) আবৃণোৎ(আবৃণোতি), সঃ(পরমেশ্বরঃ) নঃ(অস্মাক’) ব্রহ্মাপ্যয়ং(ব্রহ্মণা একীভাবং) দধাৎ(দধাতু ইত্যর্থঃ) ॥ ৬॥ ১০ ॥ জানিতে পারা যায়, এমন কোন লিঙ্গ বা চিহ্নও তাহার নাই। অতএব তিনি সকলের কারণ, করণাধিপ জীবেরও অধিপতি। ইহার কেহ জন্মদাতা নাই, এবং অধিপতিও নাই ॥ ৬ ॥ ৯ ॥
মূলানুবাদ। তন্তুনাভ(মাকড়) যেমন তন্তু দ্বারা আপনাকে আবৃত করে, তেমনি যে এবদেব স্বভাবতঃ কোনও প্রয়োজনের অপেক্ষা না রাখিয়া, প্রধান হইতে উৎপন্ন নাম রূপ ও কৰ্ম্ম দ্বারা আপনাকে আচ্ছাদন করেন, সেই পবমেশ্বর আমাদিগকে ব্রহ্মাপ্যয় অর্থাৎ ব্রহ্মেতে বিলয় বা একীভাব প্রদান করুন ॥ ৬ ॥ ১০ ॥
রস্তি লোকে। অতএব ন তস্যেশিতা নিয়ন্তা। নৈব চ তস্য লিঙ্গং চিহ্নং ধূমস্থানীয়ং, যেনানুমীয়েত। স কারণং সর্ব্বস্য কারণম্। করণাধিপাধিপঃ পরমেশ্বরঃ। যম্মাদেবং, তস্মাৎ ন তস্য কশ্চিজ্জনিতা জনয়িতা ন চাধিপঃ ॥ ৬ ॥ ৯ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্। ইদানীং মন্ত্রদৃগভিপ্রেতমর্থং প্রার্থয়তে—যস্তন্তনাভ ইতি। যথোর্ণনাভিরাত্মপ্রভবৈস্তন্তুভিরাত্মানমের সমাবৃণোৎ, তথা প্রধানজৈ- রব্যক্তপ্রভবৈন্নামরূপকৰ্ম্মভিঃ তন্তুস্থানীয়ৈ, স্বমাত্মানমারুণোতি সংছাদিতবান্, সঃ নো মহ্যং ব্রহ্মণ্যপ্যয়ং একীভাবং দদাত্বিত্যর্থঃ ॥ ৬ ॥ ১০ ॥
কেহ পতি বা প্রভু নাই; এই কারণেই তাহার কেহ ঈশিতা অর্থাৎ নিয়ামক নাই এবং তাহার কোনও লিঙ্গ অর্থাৎ অনুমাপক চিহ্ন নাই; যেমন বহ্ণির অনুমাপক ধূম, তেমনি তাহাকে অনুমান করিবার কোনও চিহ্ন নাই। তিনি সকলের কারণ, এবং করণাধিপ জীবেরও অধিপতি। যেহেতু এইরূপ অবস্থা, সেই হেতু তাহার উৎপাদক(জন্মদাতা) বা অধিপতি কেহ নাই ॥ ৬॥ ৯॥
একো দেবঃ সর্বভূতেষু গূঢ়ঃ সর্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা। কর্মাধ্যক্ষঃ সর্বভূতাধিবাসঃ সাক্ষী চেতা কেবলো নির্গুণশ্চ ॥ ৬ ॥ ১১ ॥
সরলার্থঃ।[পুনরপি তমেব বিশদীকৃত্য দর্শয়ন্নাহ—“একঃ” ইতি।] সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ঃ(অদৃশ্যতয়া প্রচ্ছন্নঃ), সর্ব্বব্যাপী, সর্বভূতান্তরাত্মা, কর্মাধ্যক্ষঃ (কর্মফলপ্রদাতা), সর্ব্বভূতাধিবাসঃ(সর্ব্বপ্রাণিনামন্তর্যামী। সর্ব্বাণি ভূতানি অধিবাসয়তি স্থাপয়তীতি বা), সাক্ষী(সাক্ষাদ দ্রষ্টা), চেতা(চেতনঃ) কেবলঃ (উপাধিবর্জিতঃ), তথা নির্গুণঃ(সত্ত্বাদিগুণসম্বন্ধবহিতঃ) চ একঃ দেবঃ (পরমেশ্বরঃ)[অন্তীতি শেষঃ] ॥ ৬ ॥ ১১ ॥
মূলানুবাদ। সমস্ত ভূতে প্রচ্ছন্ন ভাবে বিদ্যমান, সর্ব্বব্যাপী সর্ব্বভূতের অন্তরবস্থিত কৰ্ম্মফলপ্রদাতা সর্ব্বসাক্ষী, চেতন, উপাধিবর্জিত ও নির্গুণ একদেব ( পরমেশ্বর)[ আছেন] ॥ ৫ ॥ ১১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। পুনরপি তমেব করতলন্যস্তামলকবৎ সাক্ষাদ্দর্শয়ন্ তদ্বিজ্ঞানাদেব পবমপুরুষার্থপ্রাপ্তিন্নান্যেনেতি দর্শয়তি মন্ত্রদ্বয়েন—“একো দেব” ইতি ॥
একোহদ্বিতীয়ো দেবঃ দ্যোতনস্বভাবঃ। সর্ব্বভূতেষু গূঢ়ঃ সর্ব্বপ্রাণিষু সংবৃতঃ। সর্ব্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা স্বরূপভূত ইত্যর্থঃ। কৰ্মাধ্যক্ষঃ সর্ব্বপ্রাণিকৃতবিচিত্রকৰ্ম্মা- ধিষ্ঠাতা। সর্বভূতাধিবাসঃ সর্ব্বপ্রাণিষু বসতীত্যর্থঃ। সর্বেষাং ভূতানাং সাক্ষী সর্ব্বদ্রষ্টা। সাক্ষাদ্রষ্টরি সংজ্ঞায়ামিতি স্মরণাৎ। চেতা চেতয়িতা। কেবলো নিরুপাধিকঃ। নির্গুণঃ সত্ত্বাদিগুণরহিতঃ ॥ ৬॥ ১১ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এখন মন্ত্রদর্শী ঋষি অভিপ্রেত বিষয় প্রার্থনা করিতেছেন—“যঃ তন্তুনাভ” ইতি। তন্তনাভ যেরূপ আপনার তন্তুসমূহ দ্বারা আপনাকে আবৃত করে, সেইরূপ যিনি তন্তুস্থলবর্তী প্রধানজাত অর্থাৎ অব্যক্ত প্রকৃতিপ্রসূত নাম-রূপ ও কর্ম্মদ্বারা নিজে নিজকে আবৃত—আচ্ছাদিত করিয়াছেন, তিনি আমার নিমিত্ত ব্রহ্মভাব অর্থাৎ ব্রহ্মেতে বিলয়—ব্রহ্মের সঙ্গে একীভাব ( তন্ময়তা) বিধান করুন ॥ ৬ ॥ ১০ ॥
ভাষ্যানুবাদ। করামলকন্যায়ে পুনরায় তাহারই স্বরূপ প্রদর্শনপূর্ব্বক, তাঁহাকে জানিলেই যে, পরমপুরুষার্থ মুক্তিলাভ হয়, অন্য প্রকারে হয় না, এখন তাহা দুইটীমন্ত্রে প্রদর্শন করিতেছেন—“একো দেবঃ” ইতি। এক অর্থ অদ্বিতীয় যাহার দ্বিতীয় আর কিছু নাই। দেব অর্থ প্রকাশময়, সমস্ত ভূতের মধ্যে গূঢ়, সর্ব্বপ্রাণীর অভ্যন্তরে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিত, সর্ব্বব্যাপী ও সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা, অর্থাৎ সর্ব্বভূতের স্বরূপভূত। কর্মাধ্যক্ষ অর্থ—সমস্ত প্রাণীর অনুষ্ঠিত বিবিধ কর্ম্মের ফল-নিয়ামক। সমস্ত প্রাণীতে বাস করেন বলিয়া তিনি সর্ব্বভূতাধিবাস। সর্ব্বভূতের
একো বশী নিষ্ক্রিয়াণাং বহুনা- মেকং বীজং বহুধা যঃ করোতি। তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরা- স্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষাম্ ॥ ৬॥ ১২ ॥
সরলার্থঃ। কিঞ্চ, বশী(স্বাধীনঃ) যঃ একঃ(পরমেশ্বরঃ) নিষ্ক্রিয়াণাৎ বহুনাং(জীবানাং)[নিমিত্তং] একং বীজং(ভূতসূক্ষ্মং) বহুধা(অনেকরূপং) করোতি, আত্মস্থং(বুদ্ধৌ প্রতিস্থিতং) তং দেবং যে ধীরা অনুপশ্যন্তি(নিত্যমনু- ভবন্তি), তেষাং[এব] শ্বাশ্বতং(সার্বিকালিক) সুখং(তৃপ্তিঃ)[ভবতি], ইতরেষাং(অনাত্মদর্শিনা, তু) ন,(শাশ্বতং সুখ’ নৈব ভবতীতি ভাবঃ) ॥ ৬॥১২৷৷
মূলানুবাদ। অপিচ, বশী(স্বাধীন) যে এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বর ক্রিয়াহীন বহুর(জীবের) নিমিত্ত এক বীজকে অর্থাৎ বীজরূপে স্থিত প্রকৃতি বা ভূতসূক্ষ্মকে বহুভাগে বিভক্ত করেন, যে সকল ধীর ব্যক্তি আত্মস্থ সেই দেবকে (পরমেশ্বরকে) দশন করে, তাহাদেরই শাশ্বত সুখ লাভ হয়, অপর সকলের হয় না ॥ ৬ ॥ ১২ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। একো বশীতি। একো বশী স্বতন্ত্রঃ নিষ্ক্রিয়াণাং বহুনাং জীবানাং, সর্ব্বা হি ক্রিয়া নাত্মনি সমবেতাঃ, কিন্তু দেহেন্দ্রিয়েরু। আত্মা তু নিষ্ক্রিয়ো নির্গুণঃ সত্ত্বাদিগুণরহিতঃ কুটস্তঃ ‘সন্ননাত্মধর্মানাত্মন্যধ্যাস্যাভিমন্যতে— কর্তা ভোক্তা সুখী দুঃখী কৃশঃ স্থূলো মনুষ্যোহমুয্য পুলোহস্য নপ্তেতি। উক্তঞ্চ—
প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্ব্বশঃ। অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্ত্তাহমিতি মন্যতে ॥ তত্ত্ববিত্ত মহাবাহো গুণকৰ্ম্মবিভাগয়োঃ। গুণাগুণেষু বর্ত্তন্ত ইতি মত্বা ন সজ্জতে। প্রকৃতেগুণসংমূঢ়াঃ সজ্জন্তে গুণকৰ্ম্মসু ॥” ইতি ॥ একং বীজং বীজস্থানীয়ং সূক্ষ্মভূতং বহুধা যঃ করোতি, তমাত্মস্থং বুদ্ধৌ স্থিতং যেহনুপশ্যন্তি সাক্ষাজ্জানন্তি, তে ধীরাঃ বুদ্ধিমন্তস্তেষামাত্মবিদাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষামনাত্মবিদাম্ ॥ ৬ ॥ ১২ ॥
সাক্ষী—সাক্ষাৎ দ্রষ্টা, কারণ,[ব্যাকরণ শাস্ত্রে] সাক্ষাৎ দ্রষ্টাকেই ‘সাক্ষী’ সংজ্ঞা দেওয়া হইয়াছে। চেতা অর্থ চেতয়িতা—চেতন বা চৈতন্যসম্পন্ন, কেবল অর্থ কোনপ্রকার উপাধিবিশেষ বা ধৰ্ম্ম তাহার নাই। নির্গুণ অর্থ, সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণরহিত ॥ ৬ ॥ ১১ ॥ ভাষ্যানুবাদ। “একঃ বশী”ইত্যাদি। বশী অর্থ স্বতন্ত্র বা স্বাধীন, স্বভাবতঃ ক্রিয়াহীন বহুজীবের তিনি নিয়ন্তা। ক্রিয়ামাত্রই আত্মসমবেত (আত্মাশ্রিত) নহে, পবন্ধ দেহ ও ইন্দিয়াদিগত; আত্মা স্বভাবতই নিষ্ক্রিয় ‘ও
নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানা- মেকো বহুনাং যো বিদধাতি কামান্। তৎ কারণং সাখ্যযোগাধিগম্যং জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্ব্বপাশৈঃ ॥ ৬ ॥ ১৩ ॥
সরলার্থঃ। যঃ নিতানাং নিত্যঃ(অর্থাৎ জীবানাং নিত্যত্ব কারণং), চেতনানাং, চেতনঃ অর্থাৎ চৈতন্যপ্রদঃ), একঃ(একোহপি সন্) বহুনাং(জীবানাং) কামং ভোগং বিদধাতি। সাংখ্যযোগাধিগম্যং(সাংখ্যযোগবলেন দ্রষ্টব্যম্) তৎ কারণং দেবং(ব্রহ্ম) জ্ঞাত্বা(সাক্ষাৎকৃত্য) সর্ব্বপাশৈঃ(অবিদ্যা-তৎকার্য্য- রূপৈঃ) মুচ্যতে(পরিত্যজ্যতে মুক্তোভবতীত্যর্থঃ) ॥ ৬॥ ১৩ ॥
মূলানুবাদ। যিনি নিত্যের নিত্য ‘অর্থাৎ নিত্যতা সম্পাদক, চেতনের চেতন(চৈতন্যপ্রদ), এবং এক হইয়াও বহুব কামভোগ বিধান করেন। সাংখ্য- যোগলভ্য সেই সর্ব্বকারণ দেবকে(পরমেশ্বরকে) অবগত হইয়া অবিদ্যা ও তৎ- কার্য্যরূপ সমস্ত পাশ হইতে বিমুক্ত হয় ॥ ৬॥ ১৩॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, নিত্য ইতি। নিত্যো নিত্যানাং জীবানাং মধ্যে, তন্নিত্যত্বেন তেষামপি নিত্যত্বমিত্যভিপ্রায়ঃ। অথবা পৃথিব্যাদীনাং মধ্যে। তথা চেতনশ্চেতনানাং প্রমাতৃণাং মধ্যে। একো বহুনাং জীবানাং যো বিদধাতি প্রয়চ্ছতি কামান্ কামনিমিত্তান্ ভোগান্। সর্ব্বস্য সাংখ্যযোগাধিগম্যং জ্ঞাত্বা দেবং জ্যোতিৰ্ম্ময়ং মুচ্যতে সর্ব্বপাশৈরবিদ্যাদিভিঃ ॥ ৬ ॥ ১৩ ॥
নির্গুণ সত্ত্বাদিগুণরহিত, এবং কূটস্থ(নিব্বিকার) হইয়াও অনাত্মা—দেহেন্দ্রিয়াদির ধৰ্ম্ম(গুণক্রিয়াদি) আপনাতে আরোপ করিয়া—আমি কর্তা, ভোক্তা, সুখী, দুঃখী, কৃশ, স্থূল, মনুষ্য—অমুকের পুত্র ও পৌত্র ইত্যাদি অভিমান করিয়া থাকে। একথা অন্যত্রও উক্ত আছে— ‘প্রকৃতির গুণপরিণাম দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা সর্ব্বতোভাবে অনুষ্ঠিত কৰ্ম্ম- রাশিকে অহঙ্কারে বিমূঢ়াত্মা(যাহার অন্তঃকরণ অহঙ্কারে মোহপ্রাপ্ত, সেই লোক) আমি(আত্মা) করিতেছি বলিয়া অভিমান করে। কিন্তু হে মহাবাহো অর্জুন, যথাযথভাবে গুণকর্মের বিভাগজ্ঞ পুরুষ কিন্তু মনে করেন যে, ত্রিগুণের পরিণাম- ভূত দেহ ও ইন্দ্রিয়াদিই গুণপরিণাম শব্দস্পর্শাদি বিষয়ের উপর কার্য্য করিতেছে, এইরূপ মনে করিয়াই তিনি এই সকল কার্য্যেতে ‘আমি কর্তা বা আমার কৰ্ম্ম’ বলিয়া আসক্তি করেন না। যাহারা প্রকৃতির ত্রিগুণে বিমূঢ়(বিবেক করণে অসমর্থ), কেবল তাহারাই উহাতে আসক্ত হয়’ ইতি। যিনি একজাতীয় বীজকে—বীজেরই মত সূক্ষ্ম পঞ্চভূতকে বহুপ্রকারে পরিণত করেন, যে সকল ধীর—সদ্বুদ্ধিসম্পন্ন লোক আত্মস্থ বুদ্ধিতে প্রকাশমান সেই পরমাত্মাকে দর্শন করেন—সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করেন, সেই আত্মবিদ্গণেরই শাশ্বত সুখ লাভ হয়, অপর সকলের—অনাত্মজ্ঞদিগের তাহা হয় না ॥ ৬ ॥ ১২ ॥
১৮৫
ন তত্র সূর্য্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকম্; নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ। তমেব ভান্তমনুভাতি সর্ব্বম্, তস্য ভাসা সর্ব্বমিদং বিভাতি ॥ ৬ ॥ ১৪ ॥
সরলার্থঃ।[পুনবপি তদ্বিশেষং বর্ণযতি—“ন তত্র” ইতি।] তত্র (পরমেশ্বরে) সূর্য্যঃ ন ভাতি(সূর্য্যঃ তং ন প্রকাশয়তীত্যর্থঃ), চন্দ্রতারকং (চন্দ্রশ্চ তারকাশ্চ) ন ভান্তি], ইমাঃ বিদ্যতঃ ন ভান্তি, অয়ং অগ্নিঃ কুতঃ (ভাতীতি ভাবঃ)।[যতঃ] তম্ এব ভান্তং(প্রকাশমানং সন্তং) অনু(অনুসৃত্য) সর্ব্বং(জগৎ) ভাতি(প্রকাশতে)।[কিং বহুনা,] সর্ব্বং ইদং(জগৎ) তস্য ভাসা(দীপ্ত্যা) বিভাতি(দীপ্যতে)।[নহি প্রকাশ্যঃ প্রকাশকং প্রকাশযিতুমর্হতীতি ভাবঃ] ॥ ৬ ॥ ১৪ ॥
মূলানুবাদ। পুনরায় তাহাকে বিশেষ করিয়া বলিতেছেন—“ন তত্র” ইত্যাদি।
তাহাতে(পবমেশ্বরে) সূর্য্য প্রকাশ পায় না, চন্দ্র ও তারকা প্রকাশ পায় না, [এ সকলই যখন তাহাকে প্রকাশ করিতে পারে না, তখন] এই অগ্নির আর কথা কি?[অধিকশকি,] তিনি প্রকাশমান আছেন বলিয়াই অপর সকলে প্রকাশ পাইতেছে, তাহার প্রকাশেই এই সকল বস্তু দীপ্তি পাইয়া থাকে ॥ ৬ ॥ ১৪ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কথং চেতনশ্চেতনানামিত্যুচ্যতে—ন তত্রেতি। তত্র তস্মিন্ পরমাত্মনি সব্দাবভাসকোহপি সূর্য্যো ন ভাতি ব্রহ্ম ন প্রকাশয়তীত্যর্থঃ। স হি তস্যৈব ভাসা সর্বাত্মনো রূপজাতং প্রকাশয়তি, ন তু তস্য স্বতঃ প্রকা- শনসামর্থ্যম্। তথা ন চন্দ্রতারক। নেমা বিদ্যুতো ভান্তি। কুতোহ- য়মগ্নিরস্মদোগোচরঃ। কি, বহুনা, যদিদং জগদ্ঘাতি, তমেব স্বতো ভারূপত্বাদ ভান্তং দীপ্যমানমনুভাত্যনুদীপ্যতে। যথা লোহাদি বহ্ণিং দহন্তমনুদহতি ন স্বতঃ। তস্যৈব ভাসা দীপ্ত্যা সর্ব্বমিদং সূর্য্যাদি ভাতি। উক্তঞ্চ “যেন সূর্য্যস্তপতি তেজসেদ্ধঃ”। “ন তদাসয়তে সূর্য্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ” ইতি ॥ ৬॥ ১৪ ॥
ভাষ্যানুবাদ। আরও,—“নিত্যঃ”ইতি। নিত্য জীবগণের মধ্যে তিনি নিত্য, কারণ, তাহার নিত্যতায়ই জীবগণের নিত্যতা; অথবা অনিত্য পৃথিবী প্রভৃতির মধ্যে[তিনি নিত্য], সে‘রূপ যাহারা চেতন প্রমাতা, তাহাদিগের মধ্যে তিনি চেতন, অর্থাৎ তাহার চৈতন্যেই অপরের চৈতন্য হয়, এবং যিনি এক হইয়াও বহু জীবের কাম—কামনাধীন ভোগ বিধান করেন—প্রদান করেন। সাংখ্যযোগের সাহায্যে অবিগম্য বা প্রাপ্য(১) সেই জ্যোতির্ময়কে জানিয়া অবিদ্যা ও তন্মলক কর্ম্মাদিরূপ পাশ হইতে বিমুক্ত হয় ॥ ৬ ১৩ ॥
(১) সাংখ্যযোগ অর্থ—যে জ্ঞানের সাহায্যে আত্মা ও অনাত্মার পার্থক্য প্রত্যক্ষ হয়, অর্থাৎ চেতন আত্মা ও অচেতন দেহ ইন্দিয় ও বুদ্ধিপ্রভৃতি যে
সরলার্থঃ। অস্য ভুবনস্য মধ্যে(অখিলে জগতি) একঃ(এক এব) হংসঃ(হন্তি অবিদ্যা-তৎকার্য্যানীতি হ’সঃ পরমাত্মা)[অস্তি],[নান্যৎ কিঞ্চন ইতি ভাবঃ।] স এব অগ্নিঃ(অগ্নিরিব) সলিলে(পঞ্চমাহুতিপরিণতে
মূলানুবাদ। এই ভুবনের মধ্যে একই হংস(পরমাত্মা)[ বিরাজমান আছেন, অপর কিছু নাই]। তিনিই জলময় পঞ্চমী আহুতির পরিণামময় এই দেহে অগ্নি, অর্থাৎ অগ্নির ন্যায় অবিদ্যাদাহক[ অথবা, জল ও অগ্নি যেমন
শাঙ্করভাষ্যম্। জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যত ইত্যুক্তম্। কস্মাৎ পুনস্তমেব বিদিত্বা মুচ্যতে, নান্যেনেত্যত্রাহ—এক ইতি। একঃ পরমাত্মা, হন্ত্যবিদ্যাদিবন্ধ- কারণমিতি হংসঃ। ভুবনস্যাস্য ত্রৈলোক্যস্য মধ্যে নান্যঃ কশ্চিৎ। কস্মাৎ। যস্মাৎ স এবাগ্নিঃ। অগ্নিরিবাগ্নিববিদ্যাতৎকার্য্যস্য দাহকত্বাৎ। উক্তঞ্চ
ভাষ্যানুবাদ। কিরূপে তিনি চেতনেরও চেতন, এই অভিপ্রাযে বলিতেছেন “ন তত্র”ইতি। সর্ববস্তুপ্রকাশক সূর্য্যও সেই পরমাত্মাতে প্রকাশ পায় না, অর্থাৎ ব্রহ্মকে প্রকাশ করিতে পারে না। কারণ, সূর্য্য তাঁহারই দীপ্তিতে দীপ্তিমান্ হইয়া সমস্ত বস্তু প্রকাশ করিয়া থাকেন, কিন্তু তাহার (সূর্য্যের) স্বরূপতঃ প্রকাশ করিবার ক্ষমতা নাই। সেইরূপ চন্দ্র ও তাবকাগণ এবং এইসকল বিদ্যুৎও প্রকাশ পায় না।[যখন চন্দ্র সূর্য্য প্রভৃতিরই এই অবস্থা, তখন] আমাদের প্রত্যক্ষগোচর অগ্নিব আর কথা কি? অধিক কি, এই যে, জগৎ প্রকাশ পাইতেছে, তাহাও, স্বতঃপ্রকাশ বলিয়া আপনা হইতেই দীপ্তিমান সেই ব্রহ্মকে লক্ষ্য করিয়াই প্রকাশ পাইতেছে। লৌহ প্রভৃতি যেমন দাহকব অগ্নির অনুগত হইয়া অর্থাৎ অগ্নিব সংসর্গে থাকিয়া দহন করে, স্বরূপতঃ নহে, [তেমনি তাঁহার দীপ্তিতেই এই সূর্য্য প্রভৃতি সমস্ত জগৎ দীপ্তি পাইতেছে। অন্যত্রও উক্ত আছে—‘সূর্য্য যে তেজের দ্বারা প্রদীপ্ত হইয়া তাপ দিতেছেন’, এবং ‘সূর্য্য তাঁহাকে প্রকাশ করে না, চন্দ্র বা অগ্নিও[প্রকাশ করে] না’ ইতি ॥৬৷১৪৷
ভাষ্যানুবাদ। প্রকাশমান ব্রহ্মকে জানিলেই মুক্ত হয়, একথা বলা হইয়াছে। কেন একমাত্র তাহাকে জানিলেই লোক মুক্ত হয়, অপর কোন উপায়ে নহে? এই আশঙ্কার উত্তরে বলিতেছেন—“একঃ” ইতি।
জীবের বন্ধ-কারণ অবিদ্যা প্রভৃতি ধ্বংস করে বলিয়া পরমাত্মা হংস-পদবাচ্য। এই ত্রিলোক মধ্যে সেই হংসই একমাত্র সত্য, তদ্ভিন্ন আর কিছু[সত্য নহে], কেন? যেহেতু তিনিই অগ্নি, অর্থাৎ অবিদ্যা ও অবিদ্যামূলক সমস্ত কার্য্য বিধ্বস্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাহা নিঃসংশয়ে বুঝিতে পারা যায়, তাহাই সাংখ্যযোগ, সাংখ্যযোগের অনুশীলনের ফলে পরমাত্মাকেও জানিতে পারা যায়, এই জন্য পরমাত্মাকে সাংখ্যযোগাধিগম্য বলা হয়।
Y
তমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায় ॥ ৬ ॥ ১৫ ॥ স বিশ্বকৃদ্বিশ্ববিদাত্মযোনিঃ জ্ঞঃ কালকারো গুণী সর্ববিদ সঃ।
দেহে) সন্নিবিষ্টঃ(জীব ইত্যর্থঃ)। অথবা সলিলে অগ্নিরিব অত্যন্তবিরুদ্ধ- স্বভাবোহপি মায়াময়ে জগতি অধ্যস্তইতিভাবঃ]। তম্ এব বিদিত্বা মৃত্যুম অত্যেতি, অযনায়(মোক্ষপ্রাপ্তযে) অন্যঃ পন্থাঃ(উপায়ঃ) ন | বিদ্যতে] ॥৬৷৷১৫৷৷ সরলার্থঃ।[পুনরপি জ্ঞানোপযোগিতয়া তমেব বিশিনষ্টি—“স বিশ্বকৃৎ”ইতি।]
সঃ(পবমেশ্বরঃ) বিশ্বকৃৎ(জগৎকর্তা) বিশ্ববিদ্(সব্বজ্ঞঃ), আত্মযোনিঃ (আত্মাচ যোনিঃ কারণঞ্চ), জ্ঞঃ(জানাতীতি জ্ঞঃ চেতনঃ), কালকারঃ (কালস্য প্রবর্ত্তকঃ). গুণী(অপহতপাপত্বাদিগুণসম্পন্নঃ) সর্ব্ববিদ্[৮]। পরস্পর বিরুদ্ধস্বভাব, তেমনি মাযাময় জগৎ ও পরমাত্মা অত্যন্ত বিরুদ্ধস্বভাব, তথাপি মায়াময় জগতে তিনি অধ্যস্ত], তাহাকে জানিবাই মৃত্যু অতিক্রম করে— মুক্তি লাভ করে, মুক্তিক্ষেত্রে যাইবার আর অন্য পথ নাই ॥ ৬ ॥ ১৫ ॥
মূলানুবাদ। মোক্ষোপযোগী জ্ঞানোপদেশের জন্য পুনরায় তাহাকে বিশেষ করিয়া বলিতেছেন—“স বিশ্বকৃৎ”ইতি। তিনি বিশ্বকর্ত্তা, বিশ্ববিদ্ অর্থাৎ “ব্যোমাতীতোহগ্নিরীশ্বরঃ” ইতি। সলিলে দেহাত্মনা পরিণতে। উক্তঞ্চ “ইতি তু পঞ্চম্যামাহুতাবাপঃ পুরুষবচসো ভবন্তি” ইতি। সন্নিবিষ্টঃ সম্যগাত্মত্বেন। যথা সলিলে ইব স্বচ্ছে যজ্ঞ-দানাদিনা বিমলীকৃতেহন্তঃকরণে সন্নিবিষ্টো বেদান্তবাক্যার্থ- সম্যগজ্ঞানফলকারূঢোহবিদ্যাতৎকাৰ্য্যস্য দাহক ইত্যর্থঃ। তস্মাৎ তমেব বিদিত্বাহিমৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যুতেহয়নায় পরমপদপ্রাপ্তয়ে ॥ ৬ ॥ ১৫ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। পুনরপি বিশেষতো দর্শয়তি—স বিশ্বকৃদিতি। স বিশ্বকৃদ্বিশ্বস্য কর্তা। বিশ্ব বেত্তাতি বিশ্ববিৎ। আত্মা চাসৌ যোনিশ্চেত্যা- করেন বলিয়াই পরমাত্মা অগ্নির মত। অন্যত্র উক্ত আছে ‘ঈশ্বর ব্যোমাতীত অগ্নি’। সেই পরমাত্মরূপী অগ্নি সলিলে নিহিত অর্থাৎ আত্মারূপে ব্যবস্থিত, অর্থাৎ জল- যজ্ঞাহুতির জলীয় অংশ “এই প্রকারে পঃনী আহুতিতে(স্ত্রীদেহে) আহুত হইয়া পুরুষ-পদবাচ্য হয় অর্থাৎ জীবদেহে পরিণব হয়, এই উক্তি অনুসারে বুঝিতে হইবে, সলিলে অর্থ—জলপরিণাম দেহে[সন্নিবিষ্ট]। অথবা ‘সলিলে’ অর্থ—যজ্ঞ- দানাদি ক্রিয়া দ্বারা সলিলের ন্যায় বিমলীকৃত বিশুদ্ধ অন্তঃকরণে বৈদন্ত-বাক্যার্থ বিচারের ফলে অবিদ্যা ও তৎকার্য্যসমূহের দাহকারীরূপে অবস্থিত। সেই কারণে একমাত্র তাঁহাকে বিদিত হইয়াই মৃত্যু অতিক্রম করে। মোক্ষরাজ্যে যাইবার আর অন্য পথ(উপায়) নাই, অর্থাৎ ব্রহ্ম-জ্ঞানই একমাত্র উপায়
॥ ৬ ॥ ১৫ ॥
প্রধানক্ষেত্রজ্ঞপতিগুণেশঃ
সপ্তসারমোক্ষস্থিতিবন্ধহেতুঃ ॥ ৬ ॥ ১৬ ॥
স তন্মায়ে। হ্যমৃত ঈশসংস্থো।
জ্ঞঃ সর্ব্বগো ভুবনস্যাস্য গোপ্তা।
যঃ প্রধান-ক্ষেত্রজ্ঞপতিঃ(প্রকৃতি-পুরুষয়োঃ প্রভুঃ) গুণেশঃ(গুণানাং সত্বরজ- স্তমসাং ঈশ্বরঃ), সংসার-মোক্ষ-স্থিতি-বন্ধহেতুঃ(সংসারস্য জন্ম-মরণপ্রবাহরূপস্য, মোক্ষস্য(মুক্তেঃ চ) যা স্থিতিঃ, তস্যাঃ, বন্ধস্থ্য চ হেতুঃ—কারণং। অথবা সংসারাদ্ যঃ মোক্ষঃ, তত্র স্থিতৌ, বন্ধস্থ্য চ কারণমিত্যর্থঃ) ॥ ৬॥ ১৬॥
সরলার্থঃ। সঃ(পরমেশ্বরঃ) তন্ময়ঃ(বিশ্বময়ঃ, পূর্ব্বোক্তপ্রধান- ক্ষেত্রজ্ঞময়ো বা) অমৃতঃ(মরণরহিতঃ নিত্যইত্যর্থঃ) ঈশসংস্তঃ(ঈশে—ঈশভাবে স্বে মহিম্নি সংস্থা স্থিতির্যস্য, সঃ তথা), জ্ঞঃ(জানাতীতি জ্ঞঃ) সর্ব্বগঃ(সর্ব্ব- সর্ব্বজ্ঞ, এবং আত্মাও বটে, সব্বকারণও বটে, এবং চেতন, কালের প্রবর্ত্তক, অপহতপাপত্বাদিগুণসম্পন্ন ও সর্ব্ববিষয়ক জ্ঞানসম্পন্ন। অধিকন্তু তিনি প্রকৃতি ও পুরুষের নিয়ামক, ত্রিগুণের অধীশ্বর, এবং সংসারস্থিতি, মোক্ষপ্রাপ্তি ও বন্ধনের হেতুভূত ॥ ৬ ॥ ১৬ ॥ মূলানুবাদ। তিনি(পরমেশ্বর) তন্ময় অর্থাৎ বিশ্বময় বা পূর্ব্বকথিত প্রধান ও ক্ষেত্রজ্ঞময়, মরণধম্মবজ্জিত, স্বীয় মহিমায় প্রতিষ্ঠিত, সর্ব্বজ্ঞ ও সব্বগত স্মযোনিঃ। জানাতীতি জ্ঞঃ। সর্ব্বস্যাত্মা সর্ব্বস্য চ যোনিঃ সর্ব্বজ্ঞশ্চৈতন্যজ্যোতি- রিত্যর্থঃ। কালকারঃ কালস্য কর্ত্তা। গুণী অপহতপাপত্বাদিমান্, বিশ্ববিদিত্যস্য প্রপঞ্চঃ। প্রধাননব্যক্তম্। ক্ষেত্রজ্ঞো বিজ্ঞানাত্মা। তয়োঃ পতিঃ পালয়িতা। গুণানাং সত্ত্বরজস্তমসামীশঃ। সংসারমোক্ষস্থিতিবন্ধানাং হেতুঃ কারণম্ ॥ ৬৷১৬ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কিঞ্চ, স তন্ময় ইতি। স তন্ময়ো বিশ্বাত্মা, অথবা তন্ময়ো জ্যোতির্ম্ময় ইতি, “তস্য ভাসা সর্ব্বমিদ, বিভাতি”ইত্যেতদপেক্ষয়োচ্যতে। অমৃতোহমরণধৰ্মা। ঈশে স্বামিনি সম্যক্ স্থিতির্যস্যাসাবীশসংস্থঃ। জানাতীতি
ভাষ্যানুবাদ। মুক্তিরূপ পরমপদ প্রাপ্তির উপায়রূপে পুনশ্চ তাঁহাকে বিশেষভাবে প্রদর্শন করিতেছেন—“স বিশ্বকৃৎ” ইত্যাদি।
তিনি সমস্ত জগতের কর্তা(উৎপাদক) বলিয়া বিশ্বকৃৎ, বিশ্বকে জানেন, এইজন্য বিশ্ববিদ, আত্মা অথচ উৎপত্তিস্থান বলিয়া আত্মযোনি, জানেন বলিয়া জ্ঞ(জ্ঞাতা), অভিপ্রায় এই যে, যিনি সকলের আত্মা, যোনি ও সর্ব্বজ্ঞ চৈতন্যস্বরূপ, কালকার অর্থাৎ কালেরও প্রবর্তক, এবং অপহতপাপত্বাদিগুণসম্পন্ন,—এ সমস্ত কথা পূর্ব্বোক্ত ‘সর্ব্ববিৎ’ কথারই প্রপঞ্চ অর্থাৎ বিস্তারমাত্র। প্রধান অর্থ অব্যক্ত (জগতের বীজাবস্থা), ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থ বিজ্ঞানাত্মা(জীব),[তিনি] তদুভয়ের পতি —পালক। সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের অধীশ্বর, এবং সংসার-বন্ধ ও তাহা হইতে মোক্ষলাভের হেতু বা কারণ ॥ ৬॥ ১৬॥
য ঈশেহস্য জগতো নিত্যমেব
নানো হেতুব্বিদ্যত ঈশনায় ॥ ৬ ॥ ১৭ ॥
যো ব্রহ্মাণং বিদধাতি পূর্ব্বং
যো বৈ বেদাংশং প্রহিণোতি তস্মৈ।
তৎহ দেবমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদং
মুমুক্ষুর্ব্বৈ শরণমহং প্রপদ্যে ॥ ৬ ॥ ১৮ ॥
নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়শ্চ শান্তং নিরবদ্যং নিরঞ্জনম্।
অঘৃতস্য পরঞ্চেতুং দগ্ধেনামিবানলম্ ॥ ৬ ॥ ১৯ ॥
(প্রেবয়তি), মুমুক্ষুঃ(মোক্ষমিচ্ছুঃ অহং) আত্মবুদ্ধিপ্রকাশং(আত্মনঃ বুদ্ধৌ প্রকাশতে, অথবা আত্মবিষয়া যা বুদ্ধিঃ, তাং প্রকাশয়তি ইতি—আত্মবুদ্ধিপ্রকাশং) তং দেবং(স্বপ্রকাশং পরমেশ্বরং) শরণং(আশ্রয়ং প্রপদ্যে(প্রাপ্নোমি) ॥৬৷৷১৮৷৷
সরলার্থঃ। ইদানীং তস্যৈব শবণীয়স্য স্বরূপমাহ—“নিষ্কলম্” ইতি। নিষ্কলং(নাস্তি কলাঃ অংশাঃ যস্য, তং) নিষ্ক্রিয়ং(নাস্তি ক্রিয়া শরীরাদিচেষ্টা যস্য, তং) শান্তং(নিরুদ্বেগং) নিরবদ্যং(নিদ্দোষং) নিরঞ্জনং(পাপাদিলেপ- রহিতং) অমৃতস্য(মোক্ষস্য) পবং(উৎকৃষ্টং) সেতুং(প্রাপকং), দগ্ধেন্ধনং অনলং(ধূমাদিকালুষ্যরহিতম্ অগ্নিম) ইব[স্থিতৎ তং শরণং প্রপদ্যে ইতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ] ॥ ৬ ॥ ১৯ ॥
আমি মুক্তির অভিলাষী হইয়া শরণ লইতেছি, অর্থাৎ আমি মুক্তির জন্য তাঁহার শরণাপন্ন হইতেছি ॥ ৬ ॥ ১৮ ॥ মূলানুবাদ। সেই আশ্রয়ণীয় পরমেশ্বরের স্বরূপ বলিতেছেন “নিষ্কলম্” ইত্যাদি। যাহার কলা—অংশ বা অবয়ব নাই, ক্রিয়া নাই, রাগদ্বেষাদিদোষ নাই, নিন্দার কিছু নাই, এবং পাপপুণ্যাদির লেপ নাই, এমন নিষ্কল নিষ্ক্রিয় শান্ত নিরবদ্য ও নিরঞ্জন এবং অমৃতের অর্থাৎ সংসাবসাগর-পারের উত্তম সেতু- স্বরূপ ও কাষ্ঠ ভস্মীভূত হইলে ধূমাদিসম্পর্কশূন্য অগ্নির ন্যায় দেদীপ্যমান [ সেই দেবকে আমি শরণ লইতেছি] ॥ ৬ ॥ ১৯ ॥
বৈ বেদাংশ্চ প্রহিণোতি তস্মৈ। তং হ হশব্দোহবধারণে, তমেব পরমাত্মানং। উক্তঞ্চ—
“তমেব ধীবো বিজ্ঞায় প্রজ্ঞাং কুব্বীত ব্রাহ্মণঃ। নাসুধ্যয়াদ্ বহুশৃঙ্গান্ বাচো বিম্রাপনং হি তৎ ॥” “তমেবৈকং জানথ আত্মানম্” ইতি চ। দেবং জ্যোতির্ময়ং। আত্মনি যা বুদ্ধিঃ, তস্যা প্রসাদকরম্। প্রসন্নে হি পরমেশ্বরে বুদ্ধিরপি তদ্বিষয়া প্রমা নিষ্প্র- পঞ্চাকারব্রহ্মাত্মনাহবতিষ্ঠতে বর্ত্ততে। আত্মবুদ্ধিপ্রকাশমিত্যন্যেহধীয়তে। আত্ম- বুদ্ধিংপ্রকাশয়তীত্যাত্মবুদ্ধিপ্রকাশম্। অথবা আত্মৈব বুদ্ধিরাত্মবুদ্ধিঃ, সৈব প্রকাশোহস্যেতি আত্মবুদ্ধিপ্রকাশং, মুমুক্ষুর্ব্বে—বৈশব্দোহবধারণে, মুমুক্ষুরেব সন্ ন ফলান্তরমিচ্ছন্ শরণমহং প্রপদ্যে ॥ ৬ ॥ ১৮ ॥
তাঁহাকেই—সেই পরমাত্মাকেই। অন্যত্রও উক্ত আছে—‘ব্রহ্মনিষ্ঠ ধীর পুরুষ তাহাকেই বিশদভাবে অবগত হইয়া প্রজ্ঞা লাভ করিবে, বহু শব্দের অনুধ্যান
যদা চর্ম্মবদাকাশং বেষ্টয়িষ্যন্তি মানবাঃ। তদা দেবমরিজ্ঞায় দুঃখস্যান্তো ভবিষ্যতি ॥ ৬ ॥ ২০ ॥
সরলার্থঃ। ব্রহ্মজ্ঞানমন্তরেন মুক্তেরসম্ভবমাচ—“যদা” ইতি। মানবাঃ যদা(যস্মিন্কালে) আকাশং(নিরবয়বং গগনং) চম্মবৎ(শরীর- চর্ম্ম ইব) বেষ্টয়িষ্যন্তি(শারীরং চর্ম্ম যথা যথেচ্ছং সংকোচয়ন্তি বস্ত্রাদিনা বেষ্টয়ন্তি , নিরবয়বং অপরিছিন্নমাকাশমপি স্বেচ্ছয়া বস্ত্রাদিনা আবৃতং করিষ্যন্তি ইতি ভাবঃ), তদা(তস্মিন্ কালে) দেবং(প্রকাশময়ং পরমেশ্বরং) অবিজ্ঞায় (অজ্ঞাত্বা)[স্থিতানাং মানবানাং] দুঃখস্য(সাংসারিক-তাপস্য) অন্তঃ (বিনাশঃ)[ভবিষ্যতি, চর্ম্মবদাকাশবেষ্টন যথা অসম্ভবং, ব্রহ্মজ্ঞানং বিনা সংসাবদুঃখনিবৃত্তিরূপঃ মোক্ষোহপি তথা অসম্ভব ইতি ভাবঃ] ॥ ৬ ॥ ২০ ॥
মূলানুবাদ। ব্রহ্মজ্ঞান ব্যতীত যে, মুক্তিলাভ অসম্ভব, তাহা বলিতেছেন—“যদা” ইত্যাদি।
মানবগণ যখন শরীরের চর্ম্মের ন্যায় আকাশকে বস্ত্রাদি দ্বারা বেষ্টন করিতে পারিবে, তখনই দেবকে—প্রকাশময় পরশ্বেবকে না জানিয়াও দুঃখধ্বংস করিতে পারিবে। অভিপ্রায় এই যে, চর্ম্ম স্বভাবতই পরিচ্ছিন্ন বস্তু, ইচ্ছামত বস্ত্রাদি দ্বারা তাহার বেষ্টন বা আচ্ছাদন করা যাইতে পারে, কিন্তু আকাশ অপরিছিন্ন ও নিরবয়ব, সুতরাং চর্ম্মের ন্যায় তাহার বেষ্টন করা কখনই সম্ভবপর হয় না। চর্ম্মের ন্যায় আকাশকে বেষ্টন করাও যেরূপ অসম্ভব, ব্রহ্মজ্ঞান ব্যতিরেকে দুঃখধ্বংসরূপ মুক্তিও অসম্ভব ॥ ৬ ॥ ২০ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। এবং তাবৎ সৃষ্ট্যাদিনা যল্লক্ষ্য স্বরূপমুপদশিতম্ অথেদানীং তৎ স্বরূপেণ দশয়তি-নিষ্কলমিতি। কলা অবয়বা নির্গতা যস্মাৎ তন্নিষ্কলং নিরবয়বমিত্যর্থঃ। নিষ্ক্রিয়ং স্বমহিমপ্রতিষ্ঠিতং কূটস্থমিত্যর্থঃ। শান্তমুপস হৃতসর্ব্ববিকারম্। নিরবদ্যং অগহণীয়ম্। নিবঞ্জনং নির্লেপম্। অমৃতস্য অমৃতত্বস্য মোক্ষস্য প্রাপ্তয়ে সেতুবি সেতুঃ সংসারমহোদধেরুত্তারণোপায়- ত্বাৎ, তম্ অমৃতস্য পরং সেতুং দগ্ধেননানলমিব দেদীপ্যমানং ঝটঝটায়মানম্ ॥৬৷৷১৯৷৷ করিবে না। কেন না, তাহা(বহু শব্দ আবৃত্তি করা) কেবল বাগিন্দিয়ের গ্লানি বা পীড়াকর মাত্র, এবং ‘একমাত্র সেই আত্মাকেই জানিবে’ ইতি।[যে পরমাত্মা] দেব-জ্যোতির্ময়, আর আত্মবিষয়ক বুদ্ধির(অন্তঃকরণের) প্রসন্নতাকর, পরমেশ্বর প্রসন্ন(সন্তুষ্ট) হইলেই তদ্বিষয়ক জ্ঞান প্রপঞ্চাতীত ব্রহ্মাকাবে অবস্থান করে। কেহ কেহ “আত্মবুদ্ধি প্রসাদ” এর স্থলে ‘আত্মবুদ্ধিপ্রকাশং’ পাঠ কবে, [তাহার অর্থ] আত্মবিষয়ক বুদ্ধি প্রকাশ করেন। অথবা আত্মাই বুদ্ধি(জ্ঞান), তাহাই প্রকাশ যাহার, তিনি আত্মবৃদ্ধি প্রকাশ, অর্থাৎ তিনিই স্বপ্রকাশ জ্ঞান- স্বরূপ আত্মা। “মুমুক্ষুঃ বৈ” এই ‘বৈ’ শব্দটা অবধারণার্থক। অর্থ এই যে, আমি মুমুক্ষু-মুক্তিব অভিলাষী হইয়াই-কিন্তু কলাথী হইয়া নহে, শরণ লইতেছি (শরণাপন্ন হইতেছি) ॥ ৬ ॥ ১৮॥
শাঙ্করভাষ্যম্। কিমিতি তমেব বিদিত্বা মুচ্যতে নান্যেনেতি, তত্রাহ -যদেতি। যদা যদ্বৎ চৰ্ম্ম সঙ্কোচয়িষ্যন্তি, তদ্বদাকাশমমূর্ত্তং ব্যাপিনং যদি বেষ্টয়িষ্যন্তি সংবেষ্টয়িষ্যন্তি মানবাঃ, তদা দেবং’ জ্যোতিৰ্ম্ময়মনুদিতানস্তমিত- জ্ঞানাত্মনাহবস্থিতমশনায়াদ্যসংস্পৃষ্টং পরমাত্মানমবিজ্ঞায় দুঃখস্যাধ্যাত্মিকস্যাধি- ভৌতিকস্যাধিদৈবিকস্যান্তো বিনাশো ভবিষ্যতি। আত্মাজ্ঞাননিমিত্তত্বাৎ সংসারস্য, যাবৎ পরমাত্মানমাত্মত্বেন ন জানাতি, তাবৎ তাপত্রয়াভিভূতো মকরাদিভিরিব রাগাদিভিরিতস্ততঃ কৃষ্যমাণঃ প্রেততির্য্যঙ্ মনুষ্যাদিযোনিঘজ এব জীন- ভাবমাপন্নো মোমুহ্যমানঃ সংসরতি। যদা পুনরপূর্ব্বমনপরং নেতি নেতী- ত্যাদিলক্ষণমশনায়াদ্যসংস্প, ষ্টমনুদিতানস্তমিতজ্ঞানাত্মনাবস্থিতং পূর্ণানন্দং পরমাত্মা- নমাত্মত্বেন সাক্ষাজ্জানাতি, তদা নিরস্তাজ্ঞানতৎকার্য্যঃ পূর্ণানন্দো ভবতীত্যর্থঃ।
উক্তঞ্চ—
“অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ। “অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহান্তি জন্তবঃ। জ্ঞানেন তু তদজ্ঞানং যেষাং নাশিতমাত্মনঃ ॥ তেষামাদিত্যবজ্জ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎ পরম্। তদ্বুদ্ধয়স্তদাত্মানস্তন্নিষ্ঠাস্তৎপরায়ণাঃ। গচ্ছন্ত্যপুনরাবৃত্তিং জ্ঞাননিদ্ধ তকল্মযাঃ ॥ ৬ ॥ ২০ ॥
ভাষ্যানুবাদ। এই প্রকারে সৃষ্টি স্থিতি প্রভৃতি কার্য্য দ্বারা যাহার স্বরূপ পরোক্ষভাবে বর্ণিত হইল, অতঃপর তাহার স্বরূপটী সাক্ষাদ্ভাবে প্রদর্শন করিতেছেন—“নিষ্কলম্” ইত্যাদি। যাহা হইতে কলা—অবয়বসমূহ চলিয়া গিয়াছে, অর্থাৎ যিনি নিরবয়ব, নিষ্ক্রিয় অর্থ—স্বীয় মহিমায় প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ কূটস্থ, শান্ত—যাহা সর্ব্বপ্রকার প্রশমন প্রাপ্ত(নির্বিকার) নিরবদ্য—অনিন্দ্য, নিবঞ্জন—নিলেপ(তাহাতে দোষগুণ কিছুই সংলগ্ন হয় না), অমৃতত্ত্বরূপ মুক্তিলাভের সেতুর তুল্য; তিনিই সংসার-মহা সমুদ্র পার হইবার উপায়, সেই কারণে অমৃতের উৎকৃষ্ট সেতুস্বরূপ, দগ্ধেন্ধন অনলের ন্যায় অর্থাৎ দাহ্য কাষ্ঠ পুড়িয়া গেলে অগ্নি যেরূপ উজ্জ্বল হয়, ঠিক সেইরূপ দেদীপ্যমান।[সেই পরমাত্মাকে শরণ লইতেছি] ॥ ৬ ॥ ১৯ ॥
ভাষ্যানুবাদ। কেন তাঁহাকে জানিলেই মুক্ত হয়, অন্য উপায়ে হয় না? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন—“যদা”ইতি। মানবগণ শরীরের চর্ম্ম যেরূপ বেষ্টন করে অর্থাৎ ইচ্ছামভ সংকোচিত করে, সেইরূপ নিরবয়ব সর্ব্বব্যাপী আকাশকেও যখন বেষ্টন করিতে(আচ্ছাদন করিতে) পারিবে, তখন উদয়াস্তবিবর্জ্জিত জ্ঞানরূপে অবস্থিত অশনায়াদি সংসারধর্ম্মে অসংস্পৃষ্ট জ্যোতির্ময় পরমাত্মাকে না জানিলেও আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক(১) দুঃখেরও অন্তে—বিনাশে সমর্থ হইবে।[অভিপ্রায় এই যে,]
(১) দুঃখ ত্রিবধ। তন্মধ্যে যাহা দেহ ও ইন্দ্রিয় আশ্রয় করিয়া উৎপন্ন হয়, তাহা আধ্যাত্মিক দুঃখ, যেমন জ্বরাদি রোগজ দুঃখ। যাহা কোন প্রাণী হইতে উৎপন্ন হয়, তাহা আধিভৌতিক দুঃখ। যেমন ব্যাঘ্র চৌবাদিজনিত দুঃখ। আর যাহা দেবতা হইতে উৎপন্ন হয়, তাহা আধিদৈবিক দুঃখ। যেমন বর্ষা বজ্রপাত ও গ্রহবৈগুণ্যজাত দুঃখ।
তপঃপ্রভাবাদেবপ্রসাদাচ্চ ব্রহ্ম হ শ্বেতাশ্বতরোহথ বিদ্বান্। অত্যাশ্রমিভ্যঃ পরমং পবিত্রং প্রোবাচ সম্যগৃষিসঙ্ঘজুষ্টম্ ॥ ৬॥ ২১।
সরলার্থঃ।[অথেদানীং ব্রহ্মবিদ্যাসম্প্রদায়ং নিৰ্দ্দিশতি-“তপঃ প্রভাবাৎ” ইতি।] শ্বেতাশ্বতরঃ(তন্নামা ঋষিঃ) ত(ঐতিহ্যে) তপঃপ্রভাবাৎ (চিত্তশুদ্ধিকর তপোবলাৎ) দেবপ্রসাদাৎ(নিষ্কামং সমারাধিতস্য পরমেশ্ববস্য সন্তোষাৎ) চ(অপি) ব্রহ্ম(পরংব্রহ্ম) বিদ্বান্(সাক্ষাৎ কুর্ব্বন্) অথ(অনন্তবং) অত্যাশ্রমিভ্যঃ(সন্ন্যাসিভ্যঃ) ঋষিসংঘজুষ্টং(সনকাদিভিঃ সেবিতং)[এতেন গুরুপারম্পর্য্যমুক্তং ভবতীতি ভাবঃ।] পবমৎ(সর্ব্বোৎকৃষ্টং) পবিত্রং (অতিগুহ্যং) সম্যক্(সাক্ষাৎকারানুরূপং) প্রোবাচ(কথিতবান্ ইত্যর্থঃ) ॥৬৷৷২১৷৷ মূলানুবাদ। এখন ব্রহ্মবিদ্যায় গুরুপারম্পর্য্যক্রম বলিতেছেন- “তপঃ” ইত্যাদি। শ্বেতাশ্বতবনামক ঋষি তপস্যায় প্রভাবে ও নিষ্কাম কৰ্ম্ম দ্বারা সারাধিত পরমেশ্বরের প্রাসাদে ব্রহ্মতত্ত্ব অবগত হইয়াছিলেন। অনন্তর তিনিই আবার সনকাদি ঋষিবৃন্দ সেবিত এই পরম পবিত্র ব্রহ্মতত্ত্ব অত্যাশ্রমী- দিগকে(সন্ন্যাসিগণকে) নিজে যেরূপ অনুভব করিয়াছিলেন, ঠিক সেইরূপই বলিয়াছিলেন ৷ ৬৷ ২১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। সম্প্রদায়পবম্পয়া ব্রহ্মবিদ্যাযা মোক্ষপ্রদত্বং প্রদর্শয়িতুং সম্প্রদায়ং বিদ্যাধিকাবিণঞ্চ দর্শয়তি-তপঃপ্রভাবাদিতি। তপসঃ কচ্ছুচান্দ্রায়ণাদি- লক্ষণস্য, তত্র তপঃশব্দস্য রূঢ়ত্বাৎ। নিত্যাদীনাং বিধিবদনুষ্ঠিতানাং কৰ্ম্মণাম্ উপলক্ষণমিদম্। “মনসশ্চেন্দ্রিয়াণাঞ্চ ঐকাগ্র্যৎ পবমন্তপঃ” ইতি স্মরণাৎ। তস্য চ সর্ব্বস্থ্য তপসস্তস্মিন্ শ্বেতাশ্বতবে নিয়মেন সত্বাৎ, তৎপ্রভাবাৎ তৎসামর্থ্যাদ্ দেবপ্রসাদাচ্চ কৈবল্যমুদ্দিশ্য তদধিকারসিদ্ধযে বহুজন্মসু সম্যগাবাধিতপরমেশ্বরস্য প্রসাদাচ্চ ব্রহ্মাপরিচ্ছিন্নং মহত্তত্ত্বং। হ ইতি প্রসিদ্ধিদ্যোতনার্থঃ। শ্বেতা-
আত্মবিষয়ে অজ্ঞান(লান্তিজ্ঞান) বশতঃ সংসার হয়, অতএব জীব যে পর্যন্ত পরমাত্মাকে আত্মস্বরূপে না জানে, তাবৎপর্য্যন্ত ত্রিতাপের জ্বালায় অভিভূত হইয়া মকরকুম্ভিরাদির ন্যায় বাগদ্বেষাদি দ্বারা ইতস্ততঃ(নানাদিকে) আকৃষ্ট হইয়া প্রেত তির্য্যক্(পশু পক্ষী প্রভৃতি) ও মনুষ্যাদি যোনিতে জীবভাব প্রাপ্ত হইয়া পুনঃপুনঃ মোহবশে সংসারে ভ্রমণ করে। কিন্তু যখন অপূর্ব্ব(যাহার পূর্ব্ব নাই) অনপর(যাহার পশ্চাৎ নাই), ‘নেতি নেতি’ ইত্যাদি নিষেধ”স্য, অশনায়াপিপাসাদি দ্বারা অস্পষ্ট এবং উদয়াস্তবহিত নিত্যজ্ঞানরূপে বিদ্যমান পূর্ণানন্দস্বরূপ পরমাত্মাকে আত্মরূপে অবগত হয়, তখন অজ্ঞান ও অজ্ঞানপ্রসূত সমস্ত কার্য্য নিরস্ত হইয়া যায় এবং পূর্ণ আনন্দরূপে বিরাজ করে। ভগবানও বলিয়াছেন—
শ্বতবো নাম ঋষির্বিদ্বান্ যথোক্তং ব্রহ্মপরম্পবাপ্রাপ্তং গুরুমুখাচ্ছত্বা মনননিদিধ্যা- সনাদরনৈরন্তর্য্যসৎকারাদিভিরহ্মাহমস্মীত্যপরোক্ষীকৃতাখণ্ডসাক্ষাৎকারবান্। অথ স্বানুভবদার্চ্যানন্তরং অত্যাশ্রমিভ্যঃ—অতিঃ পূজায়ামিতি স্মরণাৎ: অত্যন্তং পূজ্য- তমাশ্রমিভ্যঃ সাধনচতুষ্টয়সম্পত্তিমহিন্না স্বেষু দেহাদিস্বপি জীবনভোগাদিঘনাশাবদ্যুঃ, অতএব বৈরাগ্যপুষ্কলবদ্যুঃ। তদুক্তম্—
“বৈরাগ্যং পুষ্কলং ন শ্যান্নিষ্ফলং ব্রহ্মদর্শনম্। তস্মাদ্বিপ্রকতে বিরতিং বুধো যত্নেন সর্ব্বদা”॥ ইতি।
স্মৃত্যন্তরে চ—“যদা মনসি বৈরাগ্যং জায়তে সর্ব্ববস্তু। তদৈব সংসাদ্ বিদ্যানন্যা পতিতো ভবেৎ ॥” ইতি পবমহংসসংন্যাসিনস্ত এবাত্যাশ্রমিণঃ। তথা চ ক্রয়তে—“ন্যাস ইতি ব্রহ্মা। ব্রহ্মা হি পরঃপরো হি ব্রহ্মা। তানি বা এতান্যববাণি তপান্তসি। ন্যাস এবা- ত্যবেচয়ৎ” ইতি ॥
“চতুর্ব্বিধা ভিক্ষবশ্চ বহুদক-কুটীচকৌ। হংসঃ পরমহংসশ্চ যো যঃ পশ্চাৎ স উত্তমঃ ॥” ইতি স্মবণাচ্চ। তেভ্যোহত্যাশ্রমিভ্যঃ পরমং প্রকৃতং ব্রহ্ম তদেব পবমমুৎ- কৃষ্টতমং নিরস্তসমস্তাবিদ্যাতৎকার্য্য-নিবতিশয়সুখৈকবসং পবিত্রং শুদ্ধং প্রকৃতি- প্রাকৃতাদিমলবিনির্ম্মুক্তম্। ঋষিসঙ্ঘজুষ্টং বামদেবসনকাদীনাং সঙ্গৈঃ সমহৈর্জুষ্টং সেবিতমাত্মত্বেন সম্যক্ পরিভাবিতং প্রিয়তমানন্দত্বেনাশ্রিতম্। “আত্মনস্তু কামায সর্ব্বং প্রিয়ম্ভবতি” ইতি শ্রুতেঃ। সম্যগাত্মতয়াহপবোক্ষীকৃতং যথা ভবতি তথা। সম্যগিতি কাকাক্ষিন্যায়েন উভয়ত্রানুসঙ্গঃ কর্তব্যঃ। প্রোবাচ উক্তবান্ ॥ ৬॥ ২১ ॥
‘মানবের জ্ঞান অজ্ঞানে আবৃত আছ, সেই কারণে মানবগণ মোহগ্রস্ত হয়। যাহাদের সেই অজ্ঞান জ্ঞান দ্বারা বিনাশিত হইয়াছে, তাহাদের আদিত্যের ন্যায় সমুজ্জল জ্ঞানই সেই পরমাত্মাকে প্রকাশ করিয়া দেয়। যাহাদেব বুদ্ধি আত্মা ও নিষ্ঠা(একাগ্রতা) তাহাতে(পরমাত্মাতে) সমর্পিত, তাহারা জ্ঞানবলে সর্ব্বপাপ- বিমুক্ত হইয়া অপুনবাবৃত্তিরূপ মোক্ষ প্রাপ্ত হয়।” ইতি ॥ ৬॥ ২০॥
ভাষ্যানুবাদ। গুরুশিষ্যপরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত ব্রহ্মবিদ্যাই মোক্ষপ্রদ হয়, ইহা জানাইবার নিমিত্ত বিদ্যার সম্প্রদায় ও মোক্ষাধিকারী প্রদর্শন করিতেছেন— “তপঃপ্রভাবাৎ”ইতি। ‘তপঃ’ অর্থ কৃচ্ছ্র(প্রাজাপত্য) ও চান্দ্রায়ণাদিব্রত, কারণ, তপঃশব্দটী ঐরূপ অর্থেই রূঢ় বা প্রসিদ্ধ। এখানে ‘তপঃ’ শব্দটী যথাবিধি অনুষ্ঠিত নিত্য নৈমিত্তিকাদি কর্ম্মেরও উপলক্ষণ(বোধক), কারণ, স্মৃতিশাস্ত্রে ‘মন ও ইন্দ্রিয়সমূহের একাগ্রতা বা(নিশ্চলতা) পরম তপ’ বলিয়া উক্ত আছে। সেই তপস্যা শ্বেতাশ্বতরে সম্পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। সেই তপস্যার প্রভাবে অর্থাৎ তপস্যার বলে দেবপ্রসাদ(পরমেশ্বরের প্রসন্নতা) লাভ হয়, এবং তাহার ফলে কৈবল্য লাভের অধিকার পাইবার জন্য বহু জন্মে যথানিয়মে পরমেশ্বরের আরাধনা করিয়াছিলেন, শ্বেতাশ্বতর ঋষি সেই আরাধনাবলে অপরিচ্ছিন্ন ব্রহ্ম—মহত্তত্ব অবগত হন, অনন্তর গুরুর মুখ হইতে যথাযথভাবে
বেদান্তে পরমং গুহ্যং পুরাকল্পে প্রচোদিতম্। নাপ্রশান্তায় দাতব্যং নাপুত্রায়াশিষ্যায় বা পুনঃ ॥ ৬ ॥ ২২ ॥
সরলার্থঃ।[অথেদানীং গুণসম্পন্নায় শিষ্যায় বিদ্যাযা দানং তদি- পরীতে চ তন্নিষেধমাহ-“বেদান্তে” ইতি।]
বেদান্তে(উপনিষৎসু) পরমং গুহ্যং(অতীব গোপনীয়ং মুক্তিতত্ত্ব) পুরা- কল্পে(পুবা কালে) প্রচোদিতং(উপদিষ্ট.)[অস্তি। তচ্চ] অপ্রশান্তায় (অশান্তচিত্তায় জনায়) ন দাতব্যম্, তথা অপুলায়(পুত্রভিন্নায়) অশিষ্যায় (শিষ্যভিন্নায়চ) পুনঃ ন[দাতব্যম।।[পুনঃশব্দোহত্র যথোক্তনিয়মলঙ্ঘনে প্রত্যবায়জ্ঞাপনার্থঃ]।[অশান্তচিত্তায় পুত্রায় শিষ্যায বা ন স্নেহবশেন দাতব্য- মিত্যাশয়ঃ] ॥ ৬॥ ২২ ॥
মূলানুবাদ। গুণসম্পন্ন ভিন্ন কাহাকেও এই বিদ্যাদান করিতে নাই; ইহা জ্ঞাপনার্থ বলিতেছেন—“বেদান্তে” ইতি।
বেদান্তনামক উপনিষৎশাস্ত্রে পরম গুহ্য অর্থাৎ পরম পুরুষার্থ মুক্তিতত্ত্ব পূর্ব্ব- কল্পে প্রতিষ্ঠিত(উপদিষ্ট। হইয়াছে। যাহার চিত্ত রাগাদিদোষশূন্য ও প্রশান্ত নহে, এমন কাহাকেও সে তত্ত্ব দিবে না—বলিবেনা; যে লোক পুত্র বা শিষ্য না হইলেও বলিবে না, এই নিয়ম লঙ্ঘন করিলে পাপ হইবে, ইহা জ্ঞাপনের জন্য ‘পুনঃ’ শব্দ প্রদত্ত হইয়াছে ॥ ৬ ॥ ২১ ॥
শাঙ্করভাষ্যম্। শিষ্যপরাক্ষণপূর্ব্বকং বিদ্যা বক্তব্য, তদ্বিহায়তদুক্তৌ দোষং যথোক্তবিদ্যাযা বৈদিকত্বং গুপ্তত্বং সম্প্রদায়পরস্পরযা প্রতিপাদিতত্বঞ্চাহ —বেদান্ত ইতি। বেদান্ত ইতি জাত্যৈকবচনম। সকলাসূপনিষংস্থিতিয়াবৎ। পরমং পরমপুরুষার্থস্বরূপ, গুহ্যং গোপ্যানামপি গোপ্যতম, পুরাকল্পে প্রচোদিতং পূর্ব্বকল্পে চোদিতমুপদিষ্টমিতি সম্প্রদায়দর্শনং কৃতমিত্যেতৎ। প্রশান্তায় পুলায় পরম্পরাগত ব্রহ্মতত্ত্ব শ্রবণপূর্ব্বক মনন(বিচার), নিদিধ্যাসন, নিরন্তর আদব ও সৎকার(পূজা বা সম্মান প্রদর্শন) প্রভৃতি দ্বারা ব্রহ্মবিষয়ে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ ইত্যাকার অখণ্ডাকারাকাবিত সাক্ষাৎকাবাত্মক জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। (অথ) অনন্তর অর্থাৎ স্বীয় ব্রহ্মানুভূতি দৃঢ়তর হইবার পর ‘অতি অর্থ পূজা’ এই শাস্ত্রবাক্য অনুসারে, ‘অত্যাশ্রমী’ অর্থ অত্যন্ত পূজ্যতম আশ্রমভুক্ত—যাহারা চতুর্বিধ সাধনসম্পত্তির প্রভাবে দেহাদিতে এবং জীবন ও ভোগাদি বিষয়ে আস্থাশূন্য(আগ্রহরহিত), সুতরাং পূর্ণমাত্রায় বৈরাগ্যসম্পন্ন, তাদৃশ সন্ন্যাসীদিগের উদ্দেশ্যে—অন্যত্র উক্ত আছে— ‘বৈরাগ্য যদি পূর্ণতা প্রাপ্ত না হয়, তবে তাহার ব্রহ্মদর্শন(ব্রহ্মবিষয়ে পবোক্ষ জ্ঞান) নিষ্ফল। অতএব বুদ্ধিমান্ পুরুষ যত্নপূর্ব্বক বৈরাগ্য রক্ষা করিবেন।’ অন্য স্মৃতিতে আছে—‘যখন সমস্ত বস্তুবিষয়ে মনের বৈরাগ্য জন্মে, বিদ্বান্ তখনই সন্ন্যাস গ্রহণ করিবেন, নচেৎ পতিত হইবেন।’ ইতি। অতএব যাহারা ‘পরমহংস’ সন্ন্যাসী, তাহারাই অত্যাশ্রমী। শ্রুতিতেও সেই রকম কথা আছে ‘ন্যাসই
প্রকর্ষেণ শান্তং সকলরাগাদিমলরহিতং চিত্তং যদ্য তস্মৈ পুত্রায় তাদৃশশিষ্যায় বা দাতব্যং বক্তব্যমিতি যাবৎ। তদ্বিপরীতায়াপুত্রায়াশিষ্যায় বা স্নেহাদিনা ব্রহ্মবিদ্যা ন বক্তব্যা। অন্যথা প্রত্যবায়াপত্তিরিতি পুনঃশব্দার্থঃ। অতএব ব্রহ্মবিদ্যাবিবক্ষুণা গুরুণা চিরকালং পরীক্ষ্য শিষ্যগুণান্ জ্ঞাত্বা ব্রহ্মবিদ্যা বক্তব্যেতি ভাবঃ। তথা চ শ্রুতিঃ “ভূয় এব তপসা ব্রহ্মচর্য্যেণ শ্রদ্ধয়া সংবৎসরং পরীক্ষেত”ইতি। শ্রুত্যন্তরে চ “শতবর্ষং প্রজাপতৌ মঘবান্ ব্রহ্মচর্য্যমুবাস”ইতি চ। এতচ্চ বহুধা প্রপঞ্চিত- মুপদেশসহস্রিকায়ামিত্যত্র সঙ্কোচঃ কৃতঃ ॥ ৬ ॥ ২১ ॥
ব্রহ্ম’, ব্রহ্মই পবম(সর্ব্বোত্তম, পর ব্রহ্ম)। ‘সেই এই সকল তপস্যা অবর(নিকৃষ্ট), ন্যাসই এ সকলকে অতিক্রম করিয়াছিল’ ইতি। এবং ‘ভিক্ষু অর্থাৎ সন্ন্যাসী চারি প্রকার—বহুদক, কুটীচক, হংস ও পবমহংস। ইহাদের মধ্যে পূর্ব্ববর্তী অপেক্ষা পরবর্তী—ভিক্ষুক উত্তম।’ এইরূপ স্মৃতিবাক্যও আছে। সেই সকল অত্যাশ্রমী সন্ন্যাসিগণের উদ্দেশ্যে পরম—সর্ব্বোৎকৃষ্ট—যাহা অবিদ্যা ও তৎকার্য্যের সহিত সম্বন্ধশূন্য সর্ব্বাধিক আনন্দমাত্রসার ও পবিত্র অর্থাৎ প্রকৃতি ও প্রকৃতিপ্রসূত সর্ব্বপ্রকার মলদোষবর্জ্জিত এবং ঋষিসংঘজুষ্ট—বামদেব ও সনকাদি ঋষিগণকর্তৃক সেবিত—আত্মস্বরূপে চিন্তিত অর্থাৎ প্রিয়তম বা সর্ব্বাধিক আনন্দরূপে আশ্রিত,—কেননা শ্রুতি বলিতেছেন ‘আত্মপ্রীতির জন্যই অপর সমস্ত প্রিয় হয়।’[সেই প্রিয়তম ব্রহ্মতত্ত্ব] সম্যরূপে’ অর্থাৎ আত্ম- স্বরূপে প্রত্যক্ষ গোচর যেভাবে হইতে পারে, সেইভাবে বলিয়াছিলেন।[শ্রুতির সম্যক্ শব্দটার ‘জুষ্টং’ ও ‘প্রোবাচ’ এই উভয় স্থলেই সম্বন্ধ আছে] ॥ ৬॥ ২১ ॥ ভাষ্যানুবাদ। পূর্ব্বোক্ত শিষ্যকে পরীক্ষা করিয়া অর্থাৎ তাহার ব্রহ্মবিদ্যাগ্রহণোপযোগী গুণসম্পদ্ আছে কি না, তাহা নির্ণয় করিয়া ব্রহ্মবিদ্যা বলিতে হইবে, তাহা না করিয়া বিদ্যার উপদেশ করিলে যে দোষ হয়, এবং ব্রহ্মবিদ্যা যে, বেদবোধিত, গোপনীয় ও শিষ্যপরস্পরাক্রমে উপদিষ্ট হইয়াছে, ইহা বুঝাইবার জন্য বলিতেছেন—“বেদান্তে” ইত্যাদি। ‘বেদান্তে’ অর্থ বেদান্তজাতীয় সমস্ত গ্রন্থ, এইজন্যই[বেদান্তেষু না বলিয়া] ‘বেদান্তে’ বলা হইয়াছে, বুঝিতে হইবে সমস্ত উপনিষদে, পরম অর্থাৎ পবমপুরুষার্থ মুক্তিরূপ গুহ্য-সমস্ত গোপনীয়েব মধ্যে গোপনীয়তম বা অতিশয় গোপনীয় [ব্রহ্মতত্ত্ব] পুবাকল্পে অর্থাৎ পূর্ব্বকালে উপদিষ্ট হইয়াছিল। এ কথায় সম্প্রদায় পারম্পর্য্য প্রদর্শিত হইল।[সেই গুহ্যতত্ত্ব] প্রশান্ত-প্রকৃষ্টরূপে(উত্তমরূপে) শান্ত, অর্থাৎ যাহার চিত্ত সম্পূর্ণরূপে রাগদ্বেযাদি মলরহিত হইয়াছে, এমন পুত্র বা তাদৃশগুণসম্পন্ন শিষ্যকে দিবে অর্থাৎ উপদেশ করিবে, কিন্তু ইহার বিপরীত- ভাবাপন্ন অথবা পুল নয় এবং শিষ্যও নয়, এমন লোককে স্নেহবশে ব্রহ্মবিদ্যা বলিবে না। ইহার অন্যথা করিলে পাপ হয়। একথাই শ্রুতির ‘পুনঃ’ শব্দ দ্বারা বিজ্ঞাপিত হইল। অভিপ্রায় এই যে, অতএব ব্রহ্মবিদ্যা উপদেশ করিতে ইচ্ছুক গুরুকে পরীক্ষা করিয়া অর্থাৎ শিষ্যের গুণসমূহ জানিয়া তবে ব্রহ্মবিদ্যা বলিতে হইবে। সেইরূপ শ্রুতি এই যে, ‘তপশ্চৰ্য্যা, ব্রহ্মচর্য্য ও শ্রদ্ধা দেখিয়া এক বৎসর
সরলার্থঃ। যস্য(জনস্য) দেবে(পরমেশ্বরে) পরা(অকৃত্রিমা) ভক্তিঃ(অনুরাগঃ)[অস্তি]। দেবে যথা, গুরৌ(ব্রহ্মবিদ্যোপদেশকে)[অপি]
মূলানুবাদ। কিরূপ লোককে বলিবে, তাহা বলিতেছেন—“যস্য” ইতি।
দেবতাতে(পরমেশ্বরে) যাহার পরম ভক্তি আছে, এবং পরমেশ্বরে যেরূপ,
শাঙ্করভাষ্যম্। অত্রাপি দেবতাগুরুভক্তিমতামেব গুরুণা প্রকাশিতা বিদ্যানুভবায় ভবতীতি প্রদর্শয়তি—যস্যেতি। যস্য পুরুষস্যাধিকারিণো দেবে ইষতা প্রবন্ধেন দর্শিতাখণ্ডৈকরসে সচ্চিদানন্দপরজ্যোতিঃস্বরূপিণি পরমেশ্বরে পবা উৎকৃষ্টা নিরুপচরিতা ভক্তিঃ। এতদুপলক্ষণং। অচাঞ্চল্য, শ্রদ্ধা চোভে যথা, তথা ব্রহ্মবিদ্যোপদেষ্টরি গুরাবপি তদুভয়ং যস্য বর্ত্ততে, তস্য তপুশিবসো জলরাশ্যন্বেষণং বিহায় যথা সাধনান্তরং নাস্তি। যথা চ বুভূক্ষিতস্য ভোজনাদন্যত্র সাধনান্তব, ন, এবং গুরুকৃপাং বিহায় ব্রহ্মবিদ্যা দুল্লভেতি ত্বরান্বিতস্য মুখ্যাধিকারিণো মহাত্মন উত্তমস্য—এতে কথিতাঃ অস্যাং শ্বেতাশ্বতরোপনিষদি শ্বেতাশ্বতবেণ মহাত্মনা
কাল পুনঃ পুনঃ শিষ্যকে পরীক্ষা করিবেন’ ইতি। অন্য শ্রুতিতেও আছে— ‘ইন্দ্র প্রজাপতির নিকট একশত বৎসর ব্রহ্মচারীরূপে বাস করিয়াছিলেন।’ এবিষয় ‘উপদেশসহস্রিকা’(উপদেশ-সাহস্রী) গ্রন্থে বহু প্রকারে বিস্তৃতভাবে কথিত হইয়াছে, এই কারণে এখানে স-ক্ষেপ করা হইল ॥ ৬ ॥ ২২ ॥
ভাষ্যানুবাদ। তাহাতেও বিশেষ এই যে, দেবতা ও গুরুর প্রতি যাহাদের ভক্তি আছে, তাহাদের পক্ষেই গুরুপদেশলব্ধ বিদ্যা অনুভবযোগ্য হইয়া থাকে, ইহা প্রদর্শন করিতেছেন—“যস্য” ইতি।
পূর্ব্বোক্ত বাক্যে বর্ণিত অখণ্ডৈকরস সৎ-চিৎ-আনন্দময় পরম জ্যোতিঃস্বরূপ দেবতায়:অর্থাৎ পরমেশ্বরে যে অধিকারী পুরুষের পরাভক্তি অর্থাৎ অকৃত্রিম ভক্তি আছে, ইহা উপলক্ষণমাত্র, অচঞ্চলভাব ও শ্রদ্ধা, এই উভয় থাকাই আবশ্যক। দেবতাতে যেরূপ, ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশক গুরুতেও যাহার ঐ উভয় বর্তমান থাকে, তাহার পক্ষে—যাহার মাথায় অগ্নি প্রজ্বলিত হইয়াছে, তাহার যেমন জলাম্বেষণ ভিন্ন আর অপর সাধন নাই, তেমনি[তাহার পক্ষেও এতদতিরিক্ত অপর কোন সাধন নাই]। যেমন ক্ষুধার্ত ব্যক্তির ভোজন ভিন্ন আর শান্তির উপায় নাই, তেমনি গুরুকৃপা ব্যতিরেকে ব্রহ্মবিদ্যাও দুর্লভ.; এই কারণে, যে উত্তমাধিকারী মহাত্মা এবিষয়ে সত্বর থাকেন, এই শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে মহাত্মা শ্বেতাশ্বতর কর্তৃক উপদিষ্ট এই সকল বিষয় তাহার নিকটই প্রকাশ পায়, অর্থাৎ অনুভবগোচর হয়। শ্রুতিতে “প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ” কথার উদ্দেশ্য—উপযুক্ত মুখ্যশিষ্যপ্রাপ্তি ও সাধনসম্পত্তির দুর্লভত্বজ্ঞাপন করা,
১৯৮
তস্যৈতে কথিতা হ্যর্থাঃ প্রশন্তে, মহাত্মনঃ . প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ ॥ ৬ ॥ ২৩ ॥ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎসু ষষ্ঠোহধ্যায়ঃ ॥ ৬ ॥ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ সমাপ্তা ॥
তথা(তদ্বদেব ভক্তিঃ অস্তি), তস্য মহাত্মনঃ(শুদ্ধান্তঃকরণস্য)[হৃদয়ে এতে কথিতাঃ(পূর্ব্ববর্ণিতাঃ বিষয়াঃ) প্রকাশন্তে(স্ফুরন্তি) ॥৬৷২৩৷৷ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥ ০ ॥ সেয়মল্লপদোপেতা শ্রীশঙ্করমতে স্থিতা। শ্বেতাশ্বতরসদ্ব্যাখ্যা সরলা স্যাৎ সতাংমুদে ॥ ০ ॥
ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশদাতা গুরুতেও তদ্রূপ[ভক্তি আছে], পূর্ব্বকথিত শাস্ত্রার্থ সকল সেই মহাত্মার নিকটই প্রকাশ পায়,(অন্যের নিকটে নহে) ॥ ৬ ॥ ২৩ ॥ ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥
কবিনা উপদিষ্টাঃ প্রকাশন্তে স্বানুভবায় ভবন্তি। দ্বির্বচনং মুখ্যশিষ্য-তৎসাধনাদি- দুল্লভত্বপ্রদর্শনার্থমধ্যায়পবিসমাপ্ত্যর্থমাদরার্থঞ্চ ॥ ৬॥ ২৩ ॥ ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপদশিষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজবাচার্য্যস্য শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ভাষ্যে ষষ্ঠোহধ্যায়ঃ ॥ ৬ ॥
অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি সূচনা করা এবং ব্রহ্মবিদ্যার প্রতি আদর প্রদর্শন করা, অর্থাৎ এই তিন উদ্দেশ্যে দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥ ৬ ॥ ২৩ ॥
ইতি শ্বেতাশ্বতরোপনিষদের ষষ্ঠাধ্যায়ের ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ৬ ॥
000
ওঁম্ সহ নাববতু সহ নৌ ভুনক্তু সহ বীর্য্যং করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্ত মা বিদ্বিষাবহৈ ॥ * ॥ ॥ ওঁ শান্তিঃ ॥ ওঁ শান্তিঃ ॥ ওঁ শান্তিঃ ॥ . ॥ * ॥ ওঁ হরিঃ ওঁ ॥ * ॥
পরব্রহ্ম আমাদিগকে(গুরু ও শিষ্য উভয়কে) বক্ষা করুন ও ভোগযোগ্য করুন। আমরা উভয়ে যেন বীর্য্যবৎ কর্মসম্পাদনে সমর্থ হই। আমাদের অধীত বিদ্যা তেজস্বী হউক—উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত হউক। আমরা যেন পরস্পরের পতি বিদ্বেষভাবাপন্ন না হই॥
ইতি কৃষ্ণ-যজুর্ব্বেদীয়-শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ সম্পূর্ণ। ॥ * ॥ ওঁ তং সং ওঁ ॥ * ॥
প্রিন্টাব—শ্রীআশুতোষ মজুমদার। বি, পি, এমস্ প্রেস্। ২২।৫বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা।